📄 মুমিন্বী কীভাবে নিজে মনকে নামাযে উপস্থিত রাখবে?
মুস্বল্লী নিজ হৃদয়কে তখনই উপস্থিত রাখতে পারবে এবং মহান প্রতিপালকের সাথে মশগুল রাখতে পারবে, যখন সে নিজের ইন্দ্রিয়-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারবে। নচেৎ যে হৃদয়কে ইন্দ্রিয়-বাসনা পরাভূত করেছে, কুপ্রবৃত্তি বন্দী করে রেখেছে এবং শয়তান তাতে বসার স্থায়ী আসন করে নিয়েছে, সে হৃদয়কে নানা কুচিন্তা ও স্মৃতিচারণ থেকে মুক্ত করা যায় কীভাবে?
হৃদয় হল তিন প্রকার:
(এক) এমন হৃদয়, যা ঈমান ও সকল প্রকার কল্যাণ থেকে শূন্য। এ হল অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়। এমন হৃদয়ে কুচিন্তা প্রক্ষেপ করা থেকে শয়তান আরামে আছে। যেহেতু সেটা তার ঘর ও দেশ। সে সেখানে ইচ্ছামতো রাজত্ব করে। সেখানে তার স্থায়ী আধিপত্য।
(দুই) এমন হৃদয়, যা ঈমানের আলোকে আলোকপ্রাপ্ত। তাতে ঈমানের প্রদীপ প্রদীপ্ত। কিন্তু তাতে ইন্দ্রিয়-বাসনার অন্ধকার থেকে গেছে এবং কুপ্রবৃত্তির ঝটিকাও আছে। তাই সেখানে শয়তানের অগ্রযাত্রা ও পশ্চাদপসরণ আছে, আক্রমণ ও বিজয়-লিপ্সা আছে। আর যুদ্ধে কখনো জয় হয়, কখনো পরাজয়।
এই শ্রেণীর হৃদয়ের মানুষরা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে কারো কারো জয়ের সময় অধিক। আবার কারো কারো দুশমনের জয়ের সময় অধিক। আবার কেউ কেউ সমান হারে জেতে ও হারে।
(তিন) এমন হৃদয়, যা ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ। ঈমানের আলোকে আলোকিত। ইন্দ্রিয় কামনা-বাসনার সকল পর্দা উঠে গেছে এবং কুপ্রবৃত্তির সকল অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে। তার বক্ষে রয়েছে সেই আলোর ছটা। সেই ছটার রয়েছে দাহিকাশক্তি। কোন কুচিন্তা তার নিকটবর্তী হলে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। সুতরাং সেই হৃদয় হল আকাশের মতো, যাকে উল্কা দ্বারা নিরাপদ রাখা হয়। শয়তান নিকটবর্তী হলে উল্কা উৎক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আর মু'মিন অপেক্ষা আকাশের মর্যাদা বেশি নয়। মহান আল্লাহ আকাশের চাইতে মু'মিনের হিফাযত বেশি করে থাকেন। আকাশ হল ফিরিস্তাবর্গের উপাসনালয়, অহীর অবতীর্ণস্থল এবং সেখানে আছে আনুগত্যের আলোকমালা।
পক্ষান্তরে মু'মিনের হৃদয় তাওহীদ, মহব্বত, মা'রিফাত ও ঈমানের স্থিতিস্থল। সেখানে আছে সে সবের আলোকমালা। আর নিশ্চয় তা দুশমনের দুরভিসন্ধি ও চক্রান্ত থেকে হিফাযতযোগ্য। সুতরাং সেখান হতে অপহরণ ছাড়া কিছু চুরি যাওয়ার উপায় নেই।
উক্ত তিন হৃদয়ের চমৎকার উপমা রয়েছে। তা যেন তিনটি ঘর।
(এক) রাজার ঘর, তাতে আছে রাজার ধনভান্ডার, অর্থালঙ্কার ও মণিমুক্তা ইত্যাদি।
(দুই) দাসের ঘর, তাতে আছে দাসের অর্থালঙ্কার। আর তা রাজার মতো নয়।
(তিন) শূন্য ঘর, তাতে কিছু নেই।
এক চোর এসে চুরি করতে চাইলে কোন্ ঘরে ঢুকে চুরি করবে?
যদি বলেন, 'শূন্য ঘর ঢুকে', তাহলে তা অসম্ভব। কারণ খালি ঘরে চুরি করার মতো কিছুই নেই। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলা হল, 'ইয়াহুদীরা মনে করে, তাদের নামাযে কোন কুচিন্তা আসে না।' তিনি বললেন, 'শয়তান বিধ্বস্ত হৃদয় নিয়ে কী করবে?'
যদি আপনি বলেন, 'রাজার ঘর থেকে চুরি করবে।' তাহলে তাও অসম্ভব। কারণ রাজার ঘরে আছে মজবুত দ্বার ও দ্বাররক্ষী। তার ধারে-কাছেই যেতে পারবে না চোরে। পরন্তু খোদ রাজা যদি নিজেই প্রহরী হয়, তাহলে তো সম্ভাবনার কোন পথই নেই। তাহলে চোরের জন্য একটাই ঘর অবশিষ্ট থাকছে, তা হল দ্বিতীয় ঘর বা দাসের ঘর। সেখানেই তার চৌর্যবৃত্তির আশা পূরণ হয়।
জ্ঞানীর উচিত, এই উপমাকে অনুধাবন করা এবং হৃদয়সমূহের উপর আরোপ করা। কারণ তা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এমন হৃদয়, যা সম্পূর্ণরূপে কল্যাণশূন্য, আর তা হল কাফের ও মুনাফিকের হৃদয়, এমন হৃদয় শয়তানের ঘর। শয়তান তা নিজের জন্য বেছে নেয় এবং সেটাকেই নিজের দেশ মনে করে। সেখানেই সে বাসা বাঁধে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করে। সুতরাং সেখান থেকে সে কী চুরি করবে? সেখানে তো তারই ধনভান্ডার, ধনপেটিকা, সংশয় ও সন্দেহ, কুখেয়াল ও কুচিন্তা আছে।
এমন হৃদয়, যা মহান আল্লাহর প্রতাপ, ভক্তি, ভালোবাসা, ভয় ও লজ্জা দ্বারা পরিপূর্ণ। কোন্ শয়তান এ হৃদয়ে আক্রমণ করার দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন করবে? আর সেখান থেকে কিছু চুরি করতে চাইলেও সে কী চুরি করবে? হয়তো বা বান্দার সাময়িক ঔদাস্যের কারণে সে সেখান থেকে কিছু অপহরণ বা ছিন্তাই করতে পারে। আর এটা হতেই পারে। কারণ সে তো মানুষ। মানুষের প্রকৃতিতে ঔদাস্য, বিস্মৃতি, ভুল-ভ্রান্তি এবং প্রকৃতি-বিরুদ্ধ অনেক কিছু থাকা অস্বাভাবিক নয়।
এমন হৃদয়, যাতে আছে মহান আল্লাহর তাওহীদ, তাঁর ভালোবাসা, মা'রিফাত, তাঁর প্রতি ঈমান, তাঁর প্রতিশ্রুতির সত্যজ্ঞান এবং তাতে আছে ইন্দ্রিয় বাসনা এবং তারই প্রভাবান্বিত চরিত্র। আর আছে কুপ্রবৃত্তি ও প্রকৃতির চাহিদা পূরণের আরো অনেক উপকরণ।
অন্য এক হৃদয় আছে, এই দুই দূতের মাঝে। সুতরাং কখনো তা আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর মা'রিফাত, মহব্বত ও ইচ্ছার দূতের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আবার কখনো শয়তান, কুপ্রবৃত্তি ও প্রকৃতির চাহিদার দূতের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এমন হৃদয়ে শয়তানের লোলুপ দৃষ্টি থাকে। তার সাথে তার সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বাধে। আর মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিজয় দান করেন।
وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
"বিজয় শুধু পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট থেকেই আসে।"⁴⁰⁹ এমন হৃদয়ে নিজের অস্ত্র প্রয়োগ ছাড়া শয়তান প্রবেশ করতে সক্ষম হয় না। শয়তান তাতে প্রবেশ করে এবং সেখানে তার অস্ত্র মজুদ পায়। তা নিয়ে সে তারই বিরুদ্ধে লড়াই লড়ে। আর তার অস্ত্র হল, উদগ্র ইন্দ্রিয় কামনা-বাসনা, কুপ্রবৃত্তি, খেয়াল-খুশী, মিথ্যা আশা ইত্যাদি। আর সে সব হৃদয়ের মধ্যেই মজুদ। সুতরাং প্রবেশ করার পর সে সব প্রস্তুত পায়। তা নিয়ে সে হৃদয়ের উপরেই হামলা শুরু করে। অতঃপর বান্দার হৃদয়ে যদি ঈমানী অস্ত্র মজুদ থাকে এবং তা শয়তানী অস্ত্রের মোকাবেলা করে তাকে পরাস্ত করে, তাহলেই মুক্তি। নচেৎ তার উপর ক্ষমতাসীন হবে শয়তান। অলা হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। পক্ষান্তরে বান্দা যদি দুশমনকে নিজ মনের গৃহে আসতে অনুমতি দেয়, তার জন্য প্রবেশ-দ্বার খুলে দেয় এবং তাকে অস্ত্র হাতে তুলে দেয়, তাহলে অবশ্যই সে নিন্দিত ও ভর্ৎসিত। আরবী কবি বলেছেন,
فَنَفْسِك لَمْ وَلَا تَلْمِ الْمَطَايَا *** وَمُتْ كَمَدًا فَلَيْسَ لَكَ اعْتِذَارُ
অর্থাৎ, নিজেকে ভর্ৎসনা কর এবং বাহনকে ভর্ৎসনা করো না। আর শোকাহত হয়ে মৃত্যুবরণ কর, কারণ তোমার কোন ওজুহাত নেই।⁴¹⁰
টিকাঃ
৪০৯. সূরা আলে ইমরান-৩:১২৬
৪১০. সূরা আলে ইমরান-৩:১২৬