📄 হাই শয়তানের পক্ষ থেকে
হাই তোলা বা মুখ ব্যাদানো শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। এটা শয়তান পছন্দ করে এবং আল্লাহ অপছন্দ করেন। আমাদের উচিত আল্লাহর পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া। নবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ ، وَيَكْرَهُ التَّقَاؤُبَ ، فَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وَحَمِدَ الله تَعَالَى كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ : يَرْحَمُكَ اللَّهُ ، وَأَمَّا التَّشَاؤُبُ فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَانِ ، فَإِذَا تَشَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا تَشَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ
"আল্লাহ তাআলা হাঁচি ভালবাসেন, আর হাই তোলা অপছন্দ করেন। অতএব তোমাদের কেউ যখন হাঁচবে এবং 'আলহামদুলিল্লা-হ' পড়বে তখন প্রত্যেক মুসলিম শ্রোতার উচিত হবে যে, সে তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলবে। আর হাই তোলার ব্যাপারটা এই যে, তা হচ্ছে শয়তানের পক্ষ থেকে (আলস্য ও কজ্জান্তির লক্ষণ)। অতএব কেউ যখন হাই তুলবে তখন সে যেন যথাসাধ্য তা রোধ করে। কেননা, যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে, তখন শয়তান তা দেখে হাসে।"³⁸⁸ তিনি আরো বলেছেন,
إِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيُمْسِكُ بِيَدِهِ عَلَى فِيهِ ؛ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ
"যখন তোমাদের কেউ হাই তুলবে, তখন সে যেন আপন হাত দিয়ে নিজ মুখ চেপে ধরে রাখে। কেননা, শয়তান (মুখে) প্রবেশ করে থাকে।"³⁸⁹
যেহেতু হাই তোলা আলস্যের লক্ষণ। অলস মানুষ কাজে-কর্মে ও ইবাদতে নেহাতই কম। তাই শয়তান তাতে খুশী হয় ও হাসে। নিজের সাফল্য ও দুশমনের ক্ষতি দেখে তো দুশমন হাসবেই।
টিকাঃ
৩৮৮. বুখারী ইফা. হা/৫৬৮০, আপ্র. হা/৫৭৮৫, তাও. হা/৬২২৬
৩৮৯. মুসলিম মাশা. হা/৭৬৮৩
📄 সপ্তমতঃ তওবা ও ইস্তিগফার
শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বান্দার উচিত, শয়তানের চক্রান্তে কোন পাপ ঘটে বসলে সত্বর তওবা ও ইস্তিগফার করা। এ হল মহান আল্লাহর নেক বান্দাগণের রীতি। তিনি বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
"নিশ্চয়ই যারা পরহেযগার হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।"³⁹⁰
"শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়” অর্থাৎ, কোন পাপ কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে অথবা পাপ কাজ ঘটিয়ে ফেলে।
"তখন তারা আত্মসচেতন হয়” অর্থাৎ, আল্লাহর কঠিন শাস্তি ও অপরিমিত সওয়াব এবং তিরস্কার ও পুরস্কারের কথা স্মরণ করে। অতঃপর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তাঁর কাছে তওবা করে, ক্ষমাপ্রার্থনা করে এবং শয়তান থেকে পানাহ চায়।
"তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়" অর্থাৎ, তারা সরল পথে ফিরে আসে, নিষ্ঠাবান হয়, নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়।
এখান হতে বুঝা যায় যে, শয়তান মানুষকে এমন অন্ধ করে তোলে যে, সে তখন 'হক' দেখতেই পায় না। তার চোখে পর্দা ফেলে দেয়, হৃদয়ে সন্দেহ ও সংশয় ভরে দেয়। কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে ইস্তিগফার তাকে মূল পথে ফিরিয়ে আনে। শয়তানের প্রতিজ্ঞা আছে, সে মানুষকে নানাভাবে ভ্রষ্ট করবে। তবে মহান প্রতিপালকেরও প্রতিশ্রুতি আছে, তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করবেন। নবী বলেছেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ قَالَ وَعِزَّتِكَ يَا رَبِّ لَا أَبْرَحُ أُغْوِي عِبَادَكَ مَا دَامَتْ أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْسَادِهِمْ قَالَ الرَّبُّ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا أَزَالُ أَغْفِرُ لَهُمْ مَا اسْتَغْفَرُونِي
"নিশ্চয় শয়তান বলেছে, 'আপনার ইয্যতের কসম হে রব! আমি তোমার বান্দাদিগকে অবিরামভাবে ভ্রষ্ট করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের দেহের মধ্যে তাদের প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে।' রব বলেছেন, 'আর আমার ইয্যত ও প্রতাপের কসম! আমি অবিরামভাবে তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব, যতক্ষণ তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। ¹³⁹¹
অতএব বান্দার উচিত, গোনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা-ইস্তিগফার করে নিজেকে পরিশোধিত করে নেওয়া। এ ব্যাপারে আমাদের উত্তম আদর্শ হলেন, আমাদের আদি পিতামাতা। ভুল করে ভুল স্বীকারপূর্বক মহান প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হলেন। তাঁরা উভয়ে বললেন,
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।'³⁹²
পক্ষান্তরে শয়তানের ভ্রাতা-ভগিনীদের আচরণ বিপরীত। তাদের অবস্থা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الْغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ
"যারা শয়তানদের ভাই, শয়তানরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।"³⁹³
অর্থাৎ, শয়তানদের মানুষ-ভাইদেরকে শয়তানরা ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না। যেমন "যে মানুষরা অপচয় করে, তারা শয়তানের ভাই।"³⁹⁴ তারা শয়তানদের কথা শোনে, তাদের আনুগত্য করে, প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে ভ্রান্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। এতে তারা কোন প্রকারের শৈথিল্য, ক্লান্তিবোধ বা আলস্য করে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَزًّا
"তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে রেখেছি; তারা তাদেরকে মন্দকর্মে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করে থাকে।"³⁹⁵
টিকাঃ
৩৯০. সূরা আল আরা-ফ-৭:২০১
৩৯১. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১১২৩৭, হাকেম, মাশা. হা/৭৬৭২
৩৯২. সূরা আল আ'রাফ-৭:২৩
৩৯৩. সূরা আল আ'রাফ-৭:২০২
৩৯৪. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:২৭
৩৯৫. সূরা মারইয়াম-১৯:৮৩
📄 অষ্টমতঃ যে ছিদ্র দিয়ে শয়তান অনুপ্রবেশ করতে পারে, তা বন্ধ করুন
আপনার ব্যাপারে লোকের মনে শয়তান প্রবেশ করতে পারে, এমন কোন ছিদ্রপথ থাকলে তা বন্ধ করুন এবং লোকেদের মন থেকে সন্দেহের শিকড় তুলে ফেলুন। যাতে শয়তান তাদের মনে কোন প্রকার কুধারণা প্রক্ষিপ্ত না করতে পারে। এ ব্যাপারে আপনার আদর্শ হল নবী।
মু'মিন জননী সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, নবী (মসজিদে) ই'তিকাফ থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে রাত্রি বেলায় দেখা করতে গেলাম। তাঁর সাথে কথাবার্তার পর ফিরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। সুতরাং তিনিও আমাকে (বাসায়) ফিরিয়ে দেবার জন্য আমার সাথে উঠে দাঁড়ালেন। (অতঃপর যখন আমরা মসজিদের দরজার কাছে এলাম) তখন আনসারদের দু'জন লোক (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) (সেদিক দিয়ে) চলে যাচ্ছিলেন। যখন তাঁরা উভয়েই নবী কে দেখতে পেলেন, তখন দ্রুত বেগে চলতে লাগলেন। তখন আল্লাহর রসূল তাঁদেরকে বললেন, "ধীরে চল। এ হল সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই।" তাঁরা বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! ইয়া রসূলুল্লাহ! (আপনার ব্যাপারেও কি আমরা কোন সন্দেহ করতে পারি?)' তিনি (তাঁদেরকে) বললেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ ابْنِ آدَمَ مَجْرَى الدَّمِ ، وَإِنِّي خَشِيْتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَراً
"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের দেহে রক্ত চলাচলের ন্যায় চলাফিরা করে। তাই আমার আশংকা হল যে, সম্ভবতঃ সে তোমাদের অন্তরে মন্দ কোন কিছু (সন্দেহ) প্রক্ষেপ করতে পারে।"³⁹⁶
খাত্ত্বাবী বলেছেন, 'এ হাদীসে জ্ঞাতব্য রয়েছে যে, সেই সকল বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করা উত্তম, যাতে কুধারণা জন্ম নিতে পারে এবং মনে খটকা সৃষ্টি করতে পারে। উত্তম, সন্দেহ দূর করে লোকের কাছে তাদের মন পরিষ্কার রাখতে আবেদন করা।'
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, 'নবী আশঙ্কা করলেন যে, তাদের উভয়ের হৃদয়ে তাঁর ব্যাপারে কোন (সন্দেহ) প্রক্ষিপ্ত হবে, ফলে তারা কাফের হয়ে যাবে। তিনি ঐ কথা তাদেরকে বললেন নিজের তরফ হতে তাদের প্রতি স্নেহপূর্বক, নিজের ব্যাপারে কোন আশঙ্কার জন্য নয়। ³⁹⁷
মহান প্রতিপালক আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে আমরা লোককে উত্তম কথা বলি। যাতে শয়তান কোন ধারণাপ্রসূত মন্দ কথার ছিদ্রপথ বেয়ে আমাদের মাঝে ও লোকেদের মাঝে প্রবেশ করে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি না করে বসে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا
“আমার দাসদেরকে বল, তারা যেন সেই কথা বলে যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। "³⁹⁸
এটি এমন একটি নির্দেশ, যার ব্যাপারে বহু মানুষ অবজ্ঞা, অবহেলা ও শৈথিল্য প্রদর্শন করে থাকে। অনেকে এমন কথা বলে, যা ভালো-মন্দ একাধিক অর্থে বহন করা যায়, ফলে অনেকে কুধারণাবশতঃ মন্দ দিকটা গ্রহণ করে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুসলিম ভাইকে অশালীন ভাষা বলে, তাকে মন্দ খেতাব দিয়ে মানুষের মাঝে প্রচার করে। মন্দ অপবাদ দিয়ে মানুষের চোখে ছোট করে। সেই সুযোগে শয়তান তাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করে এবং ফিতনা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে কৃতকার্য হয়। আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে শত্রুতার বীজ রোপণ করে ছাড়ে। সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতির জায়গায় বিরাজ করে ঘৃণা ও ঈর্ষা। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
টিকাঃ
৩৯৬. মুসলিম মাশা. হা/৫৮০৮
৩৯৭. তালবীসু ইবলীস ৪৬পৃ.
৩৯৮. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৫৩
📄 শয়তানের সাথে সংঘর্ষের ময়দানে মানুষের মন
এ মর্মে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম একটি চমৎকার চিত্রাঙ্কন করেছেন, যার সারমর্ম নিম্নরূপঃ
মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। সারা সৃষ্টির সেরা করে তাকে মর্যাদা দিয়েছেন। তার হৃদয়ে স্থাপিত করেছেন ঈমান, তওহীদ, ইখলাস, মহব্বত ও আশা-ভরসা। আবার তাকে পরীক্ষা করার জন্য তার মাঝে প্রক্ষিপ্ত করেছেন ইন্দ্রিয়-বাসনা, ক্রোধ, ঔদাস্য ইত্যাদি। তার উপর আরো পরীক্ষার জন্য চিরশত্রু ইবলীসকে পিছে লাগিয়ে দিয়েছেন, যার কোন ক্লান্তি ও আলস্য নেই।
ইবলীস মানুষের মাঝে প্রবেশ করে সেই সকল দরজা দিয়ে, যেগুলি তার অনুকূল। তাই মানুষের মন তার প্রতি আসক্ত হয়। কারণ সে তাই নিয়ে প্রবেশ করে, যা মানুষ পছন্দ করে। পরিশেষে তা ইবলীসের ইচ্ছা ও মানুষের মন ও প্রবৃত্তি একমত হয়ে যায়। শয়তান, মানুষের মন ও তার প্রবৃত্তি---এই তিনটি মানুষের মাঝে আধিপত্য লাভ করে, মানুষকে আদেশ করে, নির্দেশ দেয়। তার ইন্দ্রিয়সমূহকে উত্তেজিত করে। আর ইন্দ্রিয় হল অনুগত যন্ত্রের মতো। ইন্দ্রিয় ঐ তিনের আনুগত্য করে। যা আদেশ করে, তাই পালন করে।
এ হল মানুষের অবস্থার বাস্তব রূপ। তাই তার করুণাময় মহান প্রতিপালক চাইলেন তাকে অন্য সৈন্য দ্বারা সাহায্য করবেন, অন্য মদদ দিয়ে মদদপুষ্ট করবেন। সেই সৈন্য ঐ সৈন্যের মোকাবেলা করবে, যে তাকে ধ্বংস করতে চায়। সুতরাং তিনি মানুষের প্রতি রসূল প্রেরণ করলেন, তাঁর উপর নিজ কিতাব অবতীর্ণ করলেন এবং তাকে এক সম্মানিত ফিরিস্তা দ্বারা সাহায্য করলেন, যিনি তার দুশমন শয়তানের মোকাবেলা করবেন। সুতরাং যখনই শয়তান তাকে কোন (মন্দ) আদেশ দেয়, তখনই ফিরিস্তা তাকে নিজ প্রতিপালকের আদেশ দেন এবং শয়তানের আনুগত্যে যে ধ্বংস আছে, সে কথা তাকে জানান। বলা বাহুল্য, সে তাকে একবার চেপে ধরে এবং তিনি তাকে একবার মুক্ত করেন। আর সাহায্যপ্রাপ্ত সেই মানুষই হয়, যাকে আল্লাহ আয্যা অজাল্ল সাহায্য করেন এবং নিরাপদ সেই ব্যক্তি হয়, যাকে আল্লাহ তাআলা নিরাপত্তা দেন।
মহান আল্লাহ মানুষকে নাক্সে আম্মারার মোকাবেলায় নাক্সে মুতুমাইন্নাহ দান করেছেন। নাক্সে আম্মারাহ যখনই তাকে কোন মন্দ কাজের আদেশ দেয়, নাক্সে মুতুমাইন্নাহ তখনই তাকে নিবারিত করে। নাক্সে আম্মারাহ যখনই তাকে কোন ভালো কাজ করতে বারণ করে, নাক্সে মুতুমাইন্নাহ তখনই তাকে সে কাজে আদেশ করে। সুতরাং সে কখনো এর আনুগত্য করে, কখনো ওর। সে উভয়ের উপর বিজয়ী। থাকে। কখনো বা উভয়ের মধ্যে একটি এমন পূর্ণরূপে পরাভূত হয় যে, কখনও তার জন্য সক্রিয় হয় না।
মহান আল্লাহ মানুষকে যেমন নাফসে আম্মারাহ দিয়েছেন, তেমনি তাকে কুপ্রবৃত্তি দিয়েছেন, যার ফলে সে শয়তানের আনুগত্য করে। কিন্তু তার মোকাবেলায় তাকে দান করেছেন জ্ঞানের আলো ও বিবেক-বুদ্ধি, যা তাকে কুপ্রবৃত্তির আহবানে সাড়া দিতে বাধাদান করে। সুতরাং যখনই সে কুপ্রবৃত্তির আহবানে সাড়া দিতে চায়, তখনই তার জ্ঞান ও বিবেবক-বুদ্ধি তাকে ডেকে বলে, 'সাবধান! সাবধান! তোমার সামনে রয়েছে ধ্বংস ও বিনাশের বধ্যভূমি। এই রাহবারের অনুসরণ করলে তুমি লুটেরা ও রাহাজানের শিকার হবে।'
কিন্তু সে একবার উক্ত উপদেষ্টার আনুগত্য করে, যে তার জন্য সুমতি কামনা ও হিতাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে থাকে। আবার অন্যবার সে কুপ্রবৃত্তির রাহবারের অনুসরণ করে, ফলে রাস্তাতেই তার মাল লুঠ হয়ে যায়, তার লেবাস পর্যন্ত ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
তাকে বলা হয়, 'তুমি কি জানো, তুমি কোন্ পথে আছ?' আজব যে, সে জানে কোন্ পথে চলে তার সব কিছু লুঠ হয়ে গেল। তবুও সে সেই পথেই আবারো চলতে থাকে। যেহেতু তার রাহবার তাকে বশীভূত করে নেয়। তার উপর আধিপত্য কায়েম করে শক্তিশালী অধিপতি হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এতসত্ত্বেও সে যদি চাইত, তার বিরোধিতা করে তাকে দুর্বল করতে পারত, সে ডাকলে তাকে ধমক দিতে পারত, লুঠের চেষ্টা করলে সে আত্মরক্ষা করতে পারত, তাহলে ঐ রাহবার তার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারত না। কিন্তু সে নিজে তাকে আনুগত্য দিয়েছে, নিজেই তাকে নিজের উপর আধিপত্য দান করেছে, সুতরাং মুক্তির পথ কোথায়?
তখন সে হয় এমন এক ব্যক্তির মতো, যে তার শত্রুর হাতে হাত রেখে কোলাকুলি করে, অতঃপর সে তাকে অতর্কিতে কঠিন শাস্তি প্রদান করে। আর সেই সময় সে 'বাঁচাও' বলে ডাকলেও কেউ তাকে বাঁচাবার থাকে না। মানুষ এইভাবে শয়তান, কুপ্রবৃত্তি ও নাফসে আম্মারার হাতে বন্দী হয়ে যায়, অতঃপর মুক্তি পেতে চায়। কিন্ত তখন মুক্তিলাভে অসমর্থ হয়।
বান্দার এমন দুর্দশা আছে বলেই তাকে লোক-লশকর, অস্ত্রশস্ত্র ও দুর্গ দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, 'তুমি তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ো ও তাকে পরাস্ত কর। এই লোক-লশকর ও অস্ত্রশস্ত্র থেকে যত ইচ্ছা নিয়ে ব্যবহার কর, এই দুর্গসমূহতে চাইলে তুমি আত্মরক্ষা কর। আমরণ শত্রুর মোকাবেলা কর। বিজয় নিকটবর্তী। মোকাবেলার সময়কাল অতি সামান্য। (এমন সময় আসবে) যেন তুমি মহারাজের লোক। যিনি তোমার নিকট নিজ দূত পাঠিয়েছেন। তারা তোমাকে তাঁর রাজমহলে বহন করে নিয়ে গেছেন। লড়াই থেকে আরাম পেয়েছ। তোমার দুশমন থেকে তুমি পৃথক হয়ে গেছ। সম্মানজনক গৃহে তোমাকে স্বাধীন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তুমি ইচ্ছামতো স্বচ্ছন্দে আহার-বিহার করছ।
ওদিকে তোমার শত্রুকে সবচেয়ে কঠিন কারাগারে বন্দী রাখা হয়েছে, তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ। যে কারাগারে সে তোমাকে বন্দী করতে চেয়েছিল, সেই কারাগারে তাকে বন্দী রাখা হয়েছে এবং তার দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়েছে। অতঃপর সে নিষ্কৃতি ও মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।
আর তুমি আছ ইচ্ছাসুখে। সেখানে তোমার চক্ষু শীতল হয়েছে। মোকাবেলার সামান্য সময়ে ধৈর্যধারণের এ হল বিনিময়।
দুনিয়ার এ শত্রু-মোকাবিলার সময়কে যদি সামান্য বলে মন মানতে না চায়, পার্থিব জীবন যে ক্ষণস্থায়ী তা অনুভব করতে মন দুর্বল হয়, তাহলে মহান আল্লাহর এ বাণী অনুধাবন করা উচিত, তিনি বলেছেন,
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَ مَا يُوعَدُونَ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِّن نَّهَارٍ
"তাদেরকে যে বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা যেদিন তারা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন দিবসের এক দণ্ডের বেশী পৃথিবীতে অবস্থান করেনি।”³⁹⁹
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا
“যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্রভাতকাল অবস্থান করেছে।"⁴⁰⁰
قَالَ كَمْ لَبِثْتُمْ فِي الْأَرْضِ عَدَدَ سِنِينَ - قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ فَاسْأَلُ الْعَادِّينَ - قَالَ إِن لَبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا لَّوْ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
"তিনি বলবেন, 'তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে?' তারা বলবে, 'আমরা অবস্থান করেছিলাম এক দিন অথবা একদিনের কিছু অংশ, তুমি না হয় গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখ।' তিনি বলবেন, 'তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে; যদি তোমরা জানতে। "⁴⁰¹
يَوْمَ يُنفَخُ فِي الصُّورِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا - يَتَخَافَتُونَ بَيْنَهُمْ إِن لَبِثْتُمْ إِلَّا عَشْرًا - نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ إِذْ يَقُولُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيقَةً إِن لَبِثْتُمْ إِلَّا يَوْمًا
"যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদের (চক্ষু) নীল হয়ে যাওয়া অবস্থায় সমবেত করব। ওরা নিজেদের মধ্যে চুপি চুপি বলাবলি করবে, 'তোমরা পৃথিবীতে মাত্র দশদিন অবস্থান করেছিলে।' ওরা কী বলবে, তা আমি ভাল জানি। ওদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশী উত্তম পথের অনুসারী বলবে, 'তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে।"⁴⁰² নবী একদিন ভাষণ দিচ্ছিলেন। অতঃপর যখন সূর্য পাহাড়ের মাথায় এসে অস্তের কাছাকাছি হল, তখন তিনি বললেন,
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّهُ لَمْ يَبْقِ مِنْ دُنْيَاكُمْ فِيمَا مَضَى مِنْهَا إِلَّا كَمَا بَقِيَ مِنْ يَوْمِكُمْ هُذَا فِيمَا مَضَى مِنْهُ
"হে লোক সকল! দুনিয়ার সময় যতটুকু পার হয়ে গেছে, তার মোকাবেলায় কেবল ততটুকু অবশিষ্ট আছে, তোমাদের আজকের দিনের সময় পার হওয়ার মোকাবেলায় যতটুকু অবশিষ্ট আছে।"⁴⁰³
সুতরাং সেই জ্ঞানীর উচিত উক্ত হাদীস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা, যে নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করে। তার জানা উচিত, দুনিয়ার অবশিষ্ট এই সামান্য সময়ে সে কী অর্জন করতে পেরেছে? তার জানা উচিত, সে ছলনাময় এক ভোগ-বিলাসী জীবনে এবং স্বপ্নময় এক বিলাস-নিদ্রায় বিভোর রয়েছে। সে চির সুখ ও স্থায়ী সম্পদকে কানা কড়ির বিনিময়ে বিক্রয় করে দিচ্ছে। অথচ সে যদি আল্লাহর কাছে পরকাল কামনা করত, তাহলে তিনি তাকে পর্যাপ্ত ও পরিপূর্ণরূপে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করতেন। যেমন কোন কোন আষারে এসেছে, “হে আদম-সন্তান! তুমি দুনিয়াকে আখেরাতের বিনিময়ে বিক্রি কর, তাহলে তুমি উভয়ই লাভ করবে। আর আখেরাতকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করো না, তাহলে উভয়ই হাতছাড়া হবে।"
কোন কোন সলফ বলেছেন, "হে আদম-সন্তান! তুমি দুনিয়ার কিছু অংশের মুখাপেক্ষী। কিন্তু তুমি আখেরাতের অংশের অধিকতর মুখাপেক্ষী। যদি তুমি দুনিয়ার অংশ অর্জন করতে শুরু কর, তাহলে আখেরাতের অংশ নষ্ট করে ফেলবে। আর দুনিয়ার অংশের ব্যাপারেও তোমার অবস্থান বিপন্ন হবে। পক্ষান্তরে যদি তুমি আখেরাতের অংশ অর্জন করতে শুরু কর, তাহলে তোমার দুনিয়ার অংশ অর্জনে সফল হবে। সুতরাং তুমি তোমার অর্জন-পদ্ধতিকে সুশৃঙ্খলিত কর।"
উমার বিন আব্দিল আযীয তাঁর খুতবায় বলতেন, “হে লোক সকল! তোমরা অকারণে সৃষ্ট হওনি। তোমাদেরকে নিরর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে না। তোমাদের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল রয়েছে, তাতে বিচার ও ফায়সালার জন্য আল্লাহ আয্যা অজাল্ল তোমাদেরকে সমবেত করবেন। সুতরাং ব্যর্থ ও হতভাগ্য হবে সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ আয্যা অজাল্ল নিজ রহমত থেকে বহিষ্কার করবেন, যে রহমত প্রত্যেক জিনিসে ছেয়ে আছে এবং সেই জান্নাত থেকে বঞ্চিত করবেন, যে জান্নাতের প্রস্থ হল আকাশ-পৃথিবীর সমান।
আগামীকাল নিরাপত্তা পাবে সেই ব্যক্তি, যে মহান আল্লাহর ভয় রাখে, যার পরহেযগারি আছে। সামান্যকে প্রচুরের বিনিময়ে, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ীর বিনিময়ে, দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যের বিনিময়ে বিক্রি করেছে। তোমরা কি দেখ না, তোমরা রয়েছ ধ্বংসোন্মুখদের মেরুদণ্ডে, অতঃপর তোমাদের পরবর্তীরা তার স্থলাভিষিক্ত হবে? তোমরা কি দেখ না, তোমরা প্রত্যেক দিন আল্লাহর দিকে যাত্রী মৃতের জানাযায় অংশগ্রহণ করছ? যার কর্তব্য পূরণ হয়ে গেছে এবং আশা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সুতরাং তাকে তোমরা মাটির ফাটলের উদরে বিনা বালিশ ও বিছানায় স্থাপন করছ। তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, সে সকল প্রিয়জন থেকে পৃথক হয়ে গেছে এবং হিসাবের সম্মুখীন হয়েছে।"
উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ আয্যা অজাল্ল এই সামান্য সময়ের জন্যই বান্দাকে সৈন্য, সাজসরঞ্জাম ও সাহায্য দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। তাকে এ কথাও বলে দিয়েছেন, সে কীভাবে নিজের শত্রুর হাত হতে রক্ষা পাবে এবং বন্দী হলে কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে।
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী হারেছ আশআরী থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী বলেছেন, "আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা য়্যাহয়্যা বিন যাকারিয়া কে পাঁচটি বাক্য দিয়ে তার উপর আমল করতে এবং বানী ইস্রাঈলকে আমল করতে আদেশ দিতে বললেন। অতঃপর তিনি সে ব্যাপারে প্রায় দেরী করে ফেলেছিলেন। সুতরাং ঈসা (আঃ) তাঁকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আপনাকে পাঁচটি বাক্য দিয়ে তার উপর আমল করতে এবং বানী ইস্রাঈলকে আমল করতে আদেশ দিতে বলেছেন। অতএব আপনি কি তাদেরকে আদেশ করবেন, নাকি আমি তাদেরকে আদেশ করব?' য়্যাহয়্যা বললেন, 'আমার ভয় হয়, আপনি আমার আগে বললে আমাকে মাটিতে ধসিয়ে দেওয়া হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।'
সুতরাং য়্যাহয়্যা বায়তুল মাকদিসে লোকেদেরকে জমা করলেন। মসজিদ ভরে গেলে লোকেরা উঁচু জায়গাতেও বসল। অতঃপর তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে পাঁচটি বাক্য দিয়ে তার উপর আমল করতে এবং তোমাদেরকে আমল করতে আদেশ দিতে বলেছেন।' উক্ত বাক্যাবলীর পঞ্চম বাক্য ছিল,
وَآمُرُكُمْ أَنْ تَذْكُرُوا اللهَ ، فَإِنَّ مَثَلَ ذَلِكَ كَمَثَلِ رَجُلٍ خَرَجَ الْعَدُوُّ فِي أَثَرِهِ سِرَاعًا ، حَتَّى إِذَا أَتَى عَلَى حِصْنٍ حَصِينٍ فَأَحْرَزَ نَفْسَهُ مِنْهُمْ ، كَذَلِكَ الْعَبْدُ لَا يُحْرِزُ نَفْسَهُ مِنَ الشَّيْطَانِ إِلَّا بِذِكْرِ اللَّهِ
"আমি তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছি যে, তোমরা আল্লাহর যিক্র কর। যেহেতু এর উপমা হল সেই ব্যক্তির মতো, যার পশ্চাতে শত্রু ত্রস্তপদে ধাওয়া করেছে। পরিশেষে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে এসে নিজেকে তাদের হাত হতে রক্ষা করেছে। অনুরূপই আল্লাহর যিক্র ছাড়া বান্দা নিজেকে শয়তান থেকে রক্ষা করতে পারে না।"⁴⁰⁴ উক্ত হাদীসেই আছে,
وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَكُمْ بِالصَّلاةِ فَإِذَا صَلَّيْتُمْ فَلا تَلْتَفِتُوا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْصِبُ وَجْهَهُ لِوَجْهِ عَبْدِهِ فِي صَلَاتِهِ مَا لَمْ يَلْتَفِتْ
"আর আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন স্বলাতের। সুতরাং যখন তোমরা নামায পড়বে, তখন অন্যমনস্ক হয়ো না। যেহেতু আল্লাহ নিজের চেহারা নামাযে নিজ বান্দার চেহারার সাথে স্থির রাখেন, যতক্ষণ সে অন্যমনস্ক হয় না।"
নামাযে অন্যমনস্ক হওয়া, দৃষ্টি বা চেহারা ফিরোনো দুইভাবে হয়ে থাকে:
(এক) আল্লাহ আয্যা অজাল্ল থেকে নিজের হৃদয়কে গায়রুল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
(দুই) এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরানো।
উভয়ই নিষিদ্ধ। আল্লাহ নিজ বান্দার প্রতি আগ্রহী থাকেন, যতক্ষণ বান্দা নিজ নামাযে আগ্রহী থাকে। সুতরাং যখনই সে নিজ হৃদয় বা দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যমনস্ক হয়, তখনই মহান আল্লাহ তার নিকট থেকে আগ্রহ ছিন্ন করেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রসূলুল্লাহ কে এই দৃষ্টি ফিরানোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন,
هُوَ اخْتِلَاسُ يَخْتَلِسُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ صَلَاةِ الْعَبْدِ
"এটা এক প্রকার অপহরণ। শয়তান বান্দার নামায থেকে অপহরণ করে।"⁴⁰⁵
আষারে আছে, আল্লাহ তাআলা (এমন অন্যমনস্ক মুস্বল্লীকে) বলেন, "আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠের দিকে, আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠের দিকে?"
যে মুস্বল্লী তার নামাযে নিজ দৃষ্টি বা হৃদয় ফিরিয়ে অন্যমনস্ক হয়, তার উপমা সেই ব্যক্তির মতো, যাকে বাদশা ডেকে পাঠিয়ে নিজের সামনে দন্ডায়মান করেছেন। অতঃপর তিনি আগ্রহের সাথে তাকে ডাকছেন ও সম্বোধন করছেন। কিন্তু সে সেই সময় বাদশা থেকে মুখ ফিরিয়ে ডানে- বামে তাকাতাকি করছে। তার হৃদয়ও বাদশা থেকে সরে গেছে। সুতরাং তিনি তাকে কী বলে সম্বোধন করছেন, তা সে বুঝতে পারে না। যেহেতু তার হৃদয় তার সাথে উপস্থিত নয়। তাহলে সে ব্যক্তির ধারণায়, বাদশা তার সাথে কী আচরণ করতে পারেন? তার ব্যাপারে কম-সে-কম এমন শাস্তি কি প্রযোজ্য নয় যে, তিনি তার সামনে থেকে রাগান্বিত অবস্থায় সরে যাবেন, তাকে দূর করে দেবেন এবং সে তাঁর দৃষ্টিতে হীন হয়ে যাবে?
বলা বাহুল্য এ মুস্বল্লী সেই মুস্বল্লীর সমতুল্য নয়, যে মুস্বল্লীর মন তার নামাযে উপস্থিত থাকে, সে আল্লাহ তাআলার প্রতি আগ্রহী থাকে, যার হৃদয় তাঁর বিশালত্ব অনুভব করে, যাঁর সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে তাঁর ভয়ে তার হৃদয় পরিপূর্ণ থাকে এবং তাঁর জন্য গর্দান অবনত থাকে। অন্যমনস্ক হতে অথবা অন্য কিছুর প্রতি মন ও দৃষ্টি ফিরাতে প্রতিপালকের নিকট লজ্জা করে। উক্ত দুজনের নামাযে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
হাসান বিন আত্বিয়্যাহ বলেন, 'দুজন লোক একই নামাযে থাকে, কিন্তু মর্যাদায় উভয়ের মাঝে আসমান-যমীনের তফাৎ। যেহেতু একজন নিজ হৃদয়ের সাথে আল্লাহর প্রতি আগ্রহী থাকে। আর অপরজন থাকে অন্যমনস্ক উদাস। যদি বান্দা তারই মতো কোন সৃষ্টির সম্মুখে দাঁড়ায় এবং তার মাঝে ও ঐ সৃষ্টির মাঝে পর্দা রাখে, তাহলে তাতে অভিমুখ হয় না এবং নৈকট্যও হয় না। সুতরাং মহান সৃষ্টির্তার সম্মুখে অনুরূপ দাঁড়ালে কী ধারণা হয়?
বান্দা যখন মহান সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে দন্ডায়মান হয় এবং তার ও তাঁর মাঝে ইন্দ্রিয়-বাসনা ও কুচিন্তার পর্দা থাকে, মন তাতে বিভোল ও পরিপূর্ণ থাকে, তখন আল্লাহ-অভিমুখ কীভাবে হবে? তখন তো কুচিন্তা ও স্মৃতিচারণ তাকে উদাস করে ফেলে এবং সেখান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। বান্দা যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন শয়তান ইর্ষান্বিত হয়। যেহেতু সে দন্ডায়মান হয় সবচেয়ে উচ্চ স্থানে, যা আল্লাহর নিকটবর্তী, শয়তানের জন্য ক্ষোভ সৃষ্টিকারী, তার জন্য ভীষণ কঠিন। তাই সে সাগ্রহে প্রচেষ্টা চালায়, যাতে বান্দা সেখানে দন্ডায়মান না থাকে। তার মনের মাঝে এসে নানা ওয়াদা দিতে থাকে, আশা দিতে থাকে, বিস্মৃত করে এবং তার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য দ্বারা তার উপর আক্রমণ চালায়, যাতে তার কাছে স্বলাতের মর্যাদা হাস পায়। সুতরাং সে তাতে শৈথিল্য প্রদর্শন করে, পরিশেষে সে নামাযই ত্যাগ করে বসে!
এতে যদি শয়তান অপারগ হয়, বান্দা তার অবাধ্য হয় এবং সে উক্ত স্থানে দন্ডায়মান হয়, তাহলে আল্লাহর দুশমন তার কাছে এসে তার হৃদয়-মনে নানা চিন্তার উদ্রেক করে, তার নামাযে তাকে এমন কথা স্মরণ করায়, যা সে ভুলে ছিল। এমনকি এমন জিনিসও তার মনে পড়ে যায়, যা বিস্মৃতির অতল তলে তলিয়ে ছিল। শয়তান তার স্মৃতিচারণ করে তাকে নামায থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহর দরবার থেকে তার মনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ফলে সেখানে কেবল তার দেহ পড়ে থাকে, তাতে হৃদয় থাকে না। সুতরাং সে তখন নামাযে মহান আল্লাহর প্রতি একাগ্রতার সে মর্যাদা ও সওয়াব পেয়ে ধন্য হয় না, যা নামাযে একাগ্রতার সাথে হৃদয়-মন নিয়ে উপস্থিত মুস্বল্লী পেয়ে থাকে। সে তখন নামায থেকে সেই অবস্থায় ফিরে আসে, যে অবস্থা ছিল স্বলাতের পূর্বে। তার সকল পাপের বোঝা একই অবস্থায় মাথায় চাপানো থাকে, নামায তার কিছুও হাল্কা করতে পারে না। আসলে নামায তার পাপ মাফ করায়, যে মুস্বল্লী তার স্বলাতের যথার্থ হক আদায় করে, তার মাঝে পরিপূর্ণরূপে বিনয়ী ও বিনম্র হয় এবং মহান আল্লাহর সামনে কায়মনোবাক্যে দন্ডায়মান হয়।
وَأَقِمِ الصَّلاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذُلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ
"নামায কায়েম কর দিবসের দু'প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে; নিঃসন্দেহে পূণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; এটা হচ্ছে যিক্রকারীদের জন্য একটি যিক্রের মাধ্যম।"⁴⁰⁶
এই মুস্বল্লী যখন নামায থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার মনে হাল্কাভাব অনুভব করে। অনুভব করে, যেন ভারী বোঝা মাথা থেকে নেমে গেছে। মনে হয় সে তার যথার্থ কর্তব্য পালন করতে পেরেছে। সুতরাং সে নিজের মধ্যে স্ফূর্তি, স্বস্তি ও সজীবতা পায়। এমনকি স্বলাতের আকর্ষণে সে আশা করে, যদি সে নামায থেকে বের হয়ে না আসত! যেহেতু নামায তার চক্ষু-শীতলতা, তার আত্মার প্রশান্তি, তার হৃদয়ের বেহেস্ত ও দুনিয়ার বিশ্রামাগার। তাই সে যেন সর্বদা কারাগার ও সংকীর্ণতায় থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাতে পুনঃ প্রবেশ করেছে। অতঃপর তাতে প্রবেশ করলে সে তার মাধ্যমে শান্তি ও আরাম পায়। নামায থেকে আরাম পায়- --সে কথা নয়। সুতরাং ভক্তগণ বলেন, 'নামায পড়ি ও স্বলাতের মাধ্যমে আরাম পাই।' যেমন তাঁদের ইমাম ও আদর্শ নবী বলেছিলেন, “হে বেলাল! (ইকামত দাও এবং) স্বলাতের মাধ্যমে আমাদেরকে আরাম দাও।”⁴⁰⁷ এ কথা বলেননি যে, "নামায থেকে আরাম দাও (মুক্তি দাও)।”
নবী আরো বলেছেন, "নামাযে আমার চক্ষু-শীতলতা রাখা হয়েছে।"⁴⁰⁸ সুতরাং স্বলাতের মধ্যে যাঁর চক্ষু শীতল হয়, নামায ছাড়া তাঁর চক্ষু শীতল হবে কীভাবে? তা ব্যতিরেকে মনে ধৈর্যই বা থাকবে কীভাবে?
বর্ণিত আছে যে, বান্দা যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন মহান আল্লাহ বলেন, "পর্দাসমূহ উন্মোচন কর।” অতঃপর যখন সে অন্যমনস্ক হয়, তখন বলেন, "পর্দাসমূহ নিপাতন কর।"
উক্ত অন্যমনস্কতার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মহান আল্লাহর ধ্যান ছেড়ে অন্যের প্রতি হৃদয়ের অন্যমনস্কতা। সুতরাং যখন সে অন্যের প্রতি হৃদয় ফিরিয়ে নেয়, তখন তাঁর ও বান্দার মাঝে পর্দা ফেলা হয়। তখন শয়তান প্রবেশ করে এবং পার্থিব নানা বিষয় তার কাছে পেশ করে। সেসব তাকে আয়নার আকারে প্রদর্শন করে।
টিকাঃ
৩৯৯. সূরা আহকাফ-৪৬:৩৫
৪০০. সূরা নাযিআত-৭৯:৪৬
৪০১. সূরা মু'মিনূন-২৩:১১২-১১৪
৪০২. সূরা ত্বহা-২০:১০২-১০৪
৪০৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/৬১৭৩
৪০৪. আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহুল জামে' লিল আলবানী, মাশা. হা/১৭২৪
৪০৫. বুখারী ইফা. হা/৭১৫, আপ্র. হা/৭০৭, তাও. হা/৭৫১
৪০৬. সূরা হুদ-১১:১১৪
৪০৭. মুসনাদে আহমাদ মাশা. হা/২৩০৮৮, আবু দাউদ আলএ. হা/৪৯৮৭
৪০৮. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১৪০৩৭, নাসাঈ মাথ, হা/৩৯৪০