📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 জলদিবাজি শয়তানের কাজ

📄 জলদিবাজি শয়তানের কাজ


শয়তান যে সকল কাজকে ভালোবাসে, তার মধ্যে একটি হল জলদিবাজি ও তাড়াহুড়া করা। যেহেতু তাড়ার কাজ বাড়া হয় এবং তাতে ভুল সংঘটিত হয় অনেক। নবী বলেছেন,

التَّأَنِّي مِن الله، والعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ

"ধীর-স্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর জলদিবাজি শয়তানের পক্ষ থেকে।"³⁸⁶

সুতরাং শয়তানের বিপরীত করে আমাদের উচিত, সেই আচরণ গ্রহণ করা, যা রহমান ভালোবাসেন। নবী আশাজ্জ আব্দুল কাইসকে বলেছিলেন,

إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ

"নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু'টি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন; সহনশীলতা ও চিন্তা-ভাবনা (ধীরে-সুস্থে) করে কাজ করা।"³⁸⁷

টিকাঃ
৩৮৬. বাইহাক্বী, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/১৭৯৫
৩৮৭. মুসলিম মাশা. হা/১২৬-১২৭

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 হাই শয়তানের পক্ষ থেকে

📄 হাই শয়তানের পক্ষ থেকে


হাই তোলা বা মুখ ব্যাদানো শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। এটা শয়তান পছন্দ করে এবং আল্লাহ অপছন্দ করেন। আমাদের উচিত আল্লাহর পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া। নবী বলেছেন,

إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ ، وَيَكْرَهُ التَّقَاؤُبَ ، فَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وَحَمِدَ الله تَعَالَى كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ : يَرْحَمُكَ اللَّهُ ، وَأَمَّا التَّشَاؤُبُ فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَانِ ، فَإِذَا تَشَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا تَشَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ

"আল্লাহ তাআলা হাঁচি ভালবাসেন, আর হাই তোলা অপছন্দ করেন। অতএব তোমাদের কেউ যখন হাঁচবে এবং 'আলহামদুলিল্লা-হ' পড়বে তখন প্রত্যেক মুসলিম শ্রোতার উচিত হবে যে, সে তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলবে। আর হাই তোলার ব্যাপারটা এই যে, তা হচ্ছে শয়তানের পক্ষ থেকে (আলস্য ও কজ্জান্তির লক্ষণ)। অতএব কেউ যখন হাই তুলবে তখন সে যেন যথাসাধ্য তা রোধ করে। কেননা, যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে, তখন শয়তান তা দেখে হাসে।"³⁸⁸ তিনি আরো বলেছেন,

إِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيُمْسِكُ بِيَدِهِ عَلَى فِيهِ ؛ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ

"যখন তোমাদের কেউ হাই তুলবে, তখন সে যেন আপন হাত দিয়ে নিজ মুখ চেপে ধরে রাখে। কেননা, শয়তান (মুখে) প্রবেশ করে থাকে।"³⁸⁹

যেহেতু হাই তোলা আলস্যের লক্ষণ। অলস মানুষ কাজে-কর্মে ও ইবাদতে নেহাতই কম। তাই শয়তান তাতে খুশী হয় ও হাসে। নিজের সাফল্য ও দুশমনের ক্ষতি দেখে তো দুশমন হাসবেই।

টিকাঃ
৩৮৮. বুখারী ইফা. হা/৫৬৮০, আপ্র. হা/৫৭৮৫, তাও. হা/৬২২৬
৩৮৯. মুসলিম মাশা. হা/৭৬৮৩

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 সপ্তমতঃ তওবা ও ইস্তিগফার

📄 সপ্তমতঃ তওবা ও ইস্তিগফার


শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বান্দার উচিত, শয়তানের চক্রান্তে কোন পাপ ঘটে বসলে সত্বর তওবা ও ইস্তিগফার করা। এ হল মহান আল্লাহর নেক বান্দাগণের রীতি। তিনি বলেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

"নিশ্চয়ই যারা পরহেযগার হয়, যখন শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আত্মসচেতন হয় এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়।"³⁹⁰

"শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়” অর্থাৎ, কোন পাপ কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে অথবা পাপ কাজ ঘটিয়ে ফেলে।

"তখন তারা আত্মসচেতন হয়” অর্থাৎ, আল্লাহর কঠিন শাস্তি ও অপরিমিত সওয়াব এবং তিরস্কার ও পুরস্কারের কথা স্মরণ করে। অতঃপর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তাঁর কাছে তওবা করে, ক্ষমাপ্রার্থনা করে এবং শয়তান থেকে পানাহ চায়।

"তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়" অর্থাৎ, তারা সরল পথে ফিরে আসে, নিষ্ঠাবান হয়, নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়।

এখান হতে বুঝা যায় যে, শয়তান মানুষকে এমন অন্ধ করে তোলে যে, সে তখন 'হক' দেখতেই পায় না। তার চোখে পর্দা ফেলে দেয়, হৃদয়ে সন্দেহ ও সংশয় ভরে দেয়। কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে ইস্তিগফার তাকে মূল পথে ফিরিয়ে আনে। শয়তানের প্রতিজ্ঞা আছে, সে মানুষকে নানাভাবে ভ্রষ্ট করবে। তবে মহান প্রতিপালকেরও প্রতিশ্রুতি আছে, তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করবেন। নবী বলেছেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ قَالَ وَعِزَّتِكَ يَا رَبِّ لَا أَبْرَحُ أُغْوِي عِبَادَكَ مَا دَامَتْ أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْسَادِهِمْ قَالَ الرَّبُّ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا أَزَالُ أَغْفِرُ لَهُمْ مَا اسْتَغْفَرُونِي

"নিশ্চয় শয়তান বলেছে, 'আপনার ইয্যতের কসম হে রব! আমি তোমার বান্দাদিগকে অবিরামভাবে ভ্রষ্ট করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের দেহের মধ্যে তাদের প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে।' রব বলেছেন, 'আর আমার ইয্যত ও প্রতাপের কসম! আমি অবিরামভাবে তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব, যতক্ষণ তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। ¹³⁹¹

অতএব বান্দার উচিত, গোনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা-ইস্তিগফার করে নিজেকে পরিশোধিত করে নেওয়া। এ ব্যাপারে আমাদের উত্তম আদর্শ হলেন, আমাদের আদি পিতামাতা। ভুল করে ভুল স্বীকারপূর্বক মহান প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হলেন। তাঁরা উভয়ে বললেন,

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।'³⁹²

পক্ষান্তরে শয়তানের ভ্রাতা-ভগিনীদের আচরণ বিপরীত। তাদের অবস্থা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الْغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ

"যারা শয়তানদের ভাই, শয়তানরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।"³⁹³

অর্থাৎ, শয়তানদের মানুষ-ভাইদেরকে শয়তানরা ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না। যেমন "যে মানুষরা অপচয় করে, তারা শয়তানের ভাই।"³⁹⁴ তারা শয়তানদের কথা শোনে, তাদের আনুগত্য করে, প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে ভ্রান্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। এতে তারা কোন প্রকারের শৈথিল্য, ক্লান্তিবোধ বা আলস্য করে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,

أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَزًّا

"তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে রেখেছি; তারা তাদেরকে মন্দকর্মে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করে থাকে।"³⁹⁵

টিকাঃ
৩৯০. সূরা আল আরা-ফ-৭:২০১
৩৯১. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১১২৩৭, হাকেম, মাশা. হা/৭৬৭২
৩৯২. সূরা আল আ'রাফ-৭:২৩
৩৯৩. সূরা আল আ'রাফ-৭:২০২
৩৯৪. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:২৭
৩৯৫. সূরা মারইয়াম-১৯:৮৩

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 অষ্টমতঃ যে ছিদ্র দিয়ে শয়তান অনুপ্রবেশ করতে পারে, তা বন্ধ করুন

📄 অষ্টমতঃ যে ছিদ্র দিয়ে শয়তান অনুপ্রবেশ করতে পারে, তা বন্ধ করুন


আপনার ব্যাপারে লোকের মনে শয়তান প্রবেশ করতে পারে, এমন কোন ছিদ্রপথ থাকলে তা বন্ধ করুন এবং লোকেদের মন থেকে সন্দেহের শিকড় তুলে ফেলুন। যাতে শয়তান তাদের মনে কোন প্রকার কুধারণা প্রক্ষিপ্ত না করতে পারে। এ ব্যাপারে আপনার আদর্শ হল নবী।

মু'মিন জননী সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, নবী (মসজিদে) ই'তিকাফ থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে রাত্রি বেলায় দেখা করতে গেলাম। তাঁর সাথে কথাবার্তার পর ফিরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। সুতরাং তিনিও আমাকে (বাসায়) ফিরিয়ে দেবার জন্য আমার সাথে উঠে দাঁড়ালেন। (অতঃপর যখন আমরা মসজিদের দরজার কাছে এলাম) তখন আনসারদের দু'জন লোক (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) (সেদিক দিয়ে) চলে যাচ্ছিলেন। যখন তাঁরা উভয়েই নবী কে দেখতে পেলেন, তখন দ্রুত বেগে চলতে লাগলেন। তখন আল্লাহর রসূল তাঁদেরকে বললেন, "ধীরে চল। এ হল সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই।" তাঁরা বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! ইয়া রসূলুল্লাহ! (আপনার ব্যাপারেও কি আমরা কোন সন্দেহ করতে পারি?)' তিনি (তাঁদেরকে) বললেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ ابْنِ آدَمَ مَجْرَى الدَّمِ ، وَإِنِّي خَشِيْتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَراً

"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের দেহে রক্ত চলাচলের ন্যায় চলাফিরা করে। তাই আমার আশংকা হল যে, সম্ভবতঃ সে তোমাদের অন্তরে মন্দ কোন কিছু (সন্দেহ) প্রক্ষেপ করতে পারে।"³⁹⁶

খাত্ত্বাবী বলেছেন, 'এ হাদীসে জ্ঞাতব্য রয়েছে যে, সেই সকল বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করা উত্তম, যাতে কুধারণা জন্ম নিতে পারে এবং মনে খটকা সৃষ্টি করতে পারে। উত্তম, সন্দেহ দূর করে লোকের কাছে তাদের মন পরিষ্কার রাখতে আবেদন করা।'

ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, 'নবী আশঙ্কা করলেন যে, তাদের উভয়ের হৃদয়ে তাঁর ব্যাপারে কোন (সন্দেহ) প্রক্ষিপ্ত হবে, ফলে তারা কাফের হয়ে যাবে। তিনি ঐ কথা তাদেরকে বললেন নিজের তরফ হতে তাদের প্রতি স্নেহপূর্বক, নিজের ব্যাপারে কোন আশঙ্কার জন্য নয়। ³⁹⁷

মহান প্রতিপালক আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে আমরা লোককে উত্তম কথা বলি। যাতে শয়তান কোন ধারণাপ্রসূত মন্দ কথার ছিদ্রপথ বেয়ে আমাদের মাঝে ও লোকেদের মাঝে প্রবেশ করে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি না করে বসে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا

“আমার দাসদেরকে বল, তারা যেন সেই কথা বলে যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। "³⁹⁸

এটি এমন একটি নির্দেশ, যার ব্যাপারে বহু মানুষ অবজ্ঞা, অবহেলা ও শৈথিল্য প্রদর্শন করে থাকে। অনেকে এমন কথা বলে, যা ভালো-মন্দ একাধিক অর্থে বহন করা যায়, ফলে অনেকে কুধারণাবশতঃ মন্দ দিকটা গ্রহণ করে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুসলিম ভাইকে অশালীন ভাষা বলে, তাকে মন্দ খেতাব দিয়ে মানুষের মাঝে প্রচার করে। মন্দ অপবাদ দিয়ে মানুষের চোখে ছোট করে। সেই সুযোগে শয়তান তাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করে এবং ফিতনা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে কৃতকার্য হয়। আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে শত্রুতার বীজ রোপণ করে ছাড়ে। সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতির জায়গায় বিরাজ করে ঘৃণা ও ঈর্ষা। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।

টিকাঃ
৩৯৬. মুসলিম মাশা. হা/৫৮০৮
৩৯৭. তালবীসু ইবলীস ৪৬পৃ.
৩৯৮. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৫৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00