📄 গণকের কথা সত্য হয় কেন?
ইসলামে গণক, দৈবজ্ঞ, জ্যোতিষী ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়ক বক্তাদের কাজ বৈধ নয়, তাদের বক্তব্য বিশ্বাস্য নয়, তাহলে তা সত্য হয় কেন?
এ কথা বিদিত যে, তাদের বক্তব্যের সবটাই সত্য হয় না। যেটুকু হয়, তা হলঃ
> (ক) তা তাদের অনুমানের তীর কাকতালীয়ভাবে লেগে যাওয়া কথা।
> (খ) পারিপার্শ্বিকতা বুঝে অন্তর্দৃষ্টি বা পরিজ্ঞান দ্বারা বলা কথা।
> (গ) চাতুর্যপূর্ণ ছল কথা।
> (ঘ) জ্বিনের সাহায্য নিয়ে তার দেখা কথা। অথবা
আল্লাহ তাআলা যখন আসমানে পৃথিবীর কোন ঘটনার ফায়সালা করেন, ফিরিশতারা সে কথা শুনেন যেন পাথরের উপর শিকল পড়ার শব্দ। তাতে তাঁরা ঘাবড়ে যান বা মূর্ছিত হন। তাঁদের ঘাবড়ানি বা মূর্ছা-অবস্থা দূর হলে একে অপরকে প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহ কী বললেন বা কী ফায়সালা করলেন?' বলেন, 'সত্য।' ফিরিশতাগণের আপোসের আলোচনায় নিম্ন আসমানের ফিরিশতামণ্ডলীও শামিল হন। তার কিছু চুরি-ছুপে শয়তান জ্বিন শুনে নেয় এবং তারাও একে অপরকে আপোসের মধ্যে জানিয়ে থাকে। আকাশের ধারে-পাশে শুনতে গেলে উল্কা ছুটে এসে বাধা দেয়। আল্লাহ পাক আকাশকে অবাধ্য শয়তান হতে হিফাযতে রেখেছেন। ফলে সে ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। ³²¹
কিছু শয়তান সেই খবর পৃথিবীতে তাদের সহচর গণকদের মনে পৌঁছে দেয়। গণকরা তাদের অনুমান ও ধারণার আরো শত মিথ্যা জুড়ে বিশদভাবে প্রচার করে। ফলে যা সত্য তা সত্য ঘটে, কিছু আন্দাজও সঠিক হয়ে যায় এবং অধিকতরই মিথ্যা ও অবাস্তব। ³²²
আর যারা গায়বী খবর বলে দেয়, যেমন চুরির চোরের নাম বলে দেয় অথবা সাক্ষাৎকারীর নাম-ঠিকানা বলে দেয়, তারা আসলে জ্বিন বা মানুষ শিশ্য ব্যবহার করে অথবা কোন যান্ত্রিক সহযোগিতায় জানা কথা তাকে বলে। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সুনিশ্চিত যে, তারা গায়বের খবর অবশ্যই জানে না।
📄 গণক ও দৈবজ্ঞরা শয়তানদের দূত
ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, 'গণকগণ শয়তানের দূত। যেহেতু মুশরিকরা তাদের দিকে ছুটে আসে। বড় বড় বিষয়ে তারা তাদের দিকে সশঙ্কচিত্তে দৌড়ে আসে। তাদেরকে বিশ্বাস করে, তাদের নিকট বিচারপ্রার্থী হয়, তাদের বিচারে সন্তুষ্ট হয়; যেমন রসূলের অনুসারিগণ রসূলের সাথে অনুরূপ আচরণ করে থাকে। ওরা বিশ্বাস করে, গণকরা অদৃশ্যের খবর জানে, গায়বী বিষয়ে তারা খবর দিয়ে থাকে, যা অন্য কেউ জানে না। সুতরাং তারা মুশরিকদের নিকটে রসূলের মর্যাদায়!
প্রকৃতপক্ষে গণকরা শয়তানের দূত। সে তাদেরকে তার নিজ সম্প্রদায় মুশরিকদের নিকট প্রেরণ করেছে এবং তাদেরকে রসূলগণের সাথে তুলনা করেছে, তাই তার সম্প্রদায় তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছে। তাদেরকে আল্লাহর রসূলদের চরিত্র দিয়েছে, যাতে সে তাঁদের ব্যাপারে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করতে পারে। সে নিজ দূতগণকেই আসল সত্যবাদী ও অদৃশ্যজ্ঞে পরিণত করে। সুতরাং যেহেতু দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিশাল বৈপরীত্ব বর্তমান, সেহেতু নবী বলেছেন,
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ
“যে ব্যক্তি কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ এর প্রতি অবতীর্ণ জিনিসের সাথে কুফরী করে।"³²³
মানুষ দুই শ্রেণীভুক্ত : গায়বী দাবীদার দৈবজ্ঞ (বা পীর-ফকীরবাবা) ইত্যাদির অনুসারী এবং মহান আল্লাহর রসূলগণের অনুসারী। আর এটা কোন মতেই সম্ভব নয় যে, বান্দা এদের অনুসারী হবে এবং ওঁদেরও অনুসারী হবে। বরং সে যত গণকের নিকটবর্তী হবে, তত রসূল থেকে দূরবর্তী হয়ে যাবে। সে যত পরিমাণ গায়বী খবরের দাবীদারকে সত্যায়ন করবে, সে তত রসূল কে মিথ্যায়ন করবে। ³²⁴
প্রকৃতপ্রস্তাবে যারা নানা জাতির ইতিহাস ও পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত, তারা অবশ্যই জানে যে, তাদের গণক ও যাদুকর শ্রেণীর মানুষ ও শয়তানী দূতগণকে তারা নবী ও রসূলগণের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তারা চোখ বন্ধ করে তাদের আনুগত্য করেছে ও করছে। তারা যা হালাল করেছে ও করছে, অনুসারিগণ তাই হালাল মনে করেছে ও করছে। তারা যা হারাম গণ্য করেছে, ভক্তগণ তাই হারাম মনে করেছে ও করছে। তারা ইচ্ছামতো ভক্তদের মাল কুক্ষিগত করেছে ও করছে। এমনকি তাদের অন্তঃপুরবাসিনীদেরকেও উদার মনে সঁপে দিয়েছে ও দিচ্ছে! তারা তাদের মুরীদ ও শিশ্যদের জন্য ইবাদতের এমন আনুষ্ঠানিকতা ও পদ্ধতি নির্বাচন করেছে ও করছে, যাতে শয়তান খোশ হয়েছে ও হচ্ছে। বরং শয়তানের অনুগত মানুষই বেশি। প্রকৃতপক্ষে
وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
“ওদের উপর ইবলীস তার অনুমান সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ফলে ওদের মধ্যে একটি বিশ্বাসী দল ছাড়া সকলেই তার অনুসরণ করেছে।”³²⁵
টিকাঃ
৩২১. সূরা আস স-ফফাত-৩৭:৭-১০
৩২২. বুখারী ইফা, হা/৪৩৪১, আপ্র, হা/৪৩৪১, তাও. হা/৪৭০১
৩২৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/২/৪০৮, ৪৭৬, আবু দাউদ আলএ. হা/৩৮০৪, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ তাও. হা/৫২২
৩২৪. ইগাষাতুল লাহফান ১/২৭১
৩২৫. সূরা সাবা-৩৪:২০
📄 তাদের প্রতি উম্মাহর কর্তব্য
উক্ত প্রকার শয়তানী দূত, গণক, দৈবজ্ঞ বা গায়বের দাবীদার পীর-ফকীরবাবাদের প্রতি উম্মাহর কর্তব্য আছে। যারা মানুষের হাত দেখে, ভাগ্য গণনা করে, শনি দূর করে, ভূত-ভবিষ্যতের খবর বলে দেয়, ভালোবাসা বা বিচ্ছেদ, আকর্ষণ বা বিকর্ষণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যোগ-যাদু-টোনা করে, বাণ মারে, ওষুধ করে, তাবীয করে এবং তারই মাধ্যমে লোকের মাল লুঠে খায়, তাদের প্রতি মুসলিম জাতির করণীয় আছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।"³²⁶
তাদেরকে বাধা দেওয়া উচিত। সাদা মনের মানুষদের নিকট তাদের প্রচার, পত্র-পত্রিকায়, টিভি ইত্যাদিতে তাদের প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের নানা প্রকার অভিচার ক্রিয়া দেখেও চক্ষু অবনত করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা আদৌ বৈধ নয়। নচেৎ বানী ইস্রাঈলের মতো অভিশপ্ত হতে হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ - كَانُوا لا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
"বানী ইস্রাঈলের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল, তারা দাউদ ও মারয়্যাম-তনয় কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী। তারা যেসব গর্হিত কাজ করত, তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট। ³²⁷ নবী বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَراً فَلْيُغَيِّرُهُ بِيَدِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।"³²⁸
যদি কেউ তা না করে, তা করা নিজের দায়িত্ব মনে না করে, তাহলে এমন নয় যে সে বেঁচে যাবে। কারণ নবী বলেছেন,
إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَوشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابٍ مِنْهُ
"যখন লোকেরা অত্যাচারীকে (অত্যাচার করতে) দেখবে এবং তার হাত ধরে না নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে (আমভাবে) তার শাস্তির কবলে নিয়ে নেবেন।” ³²⁹
টিকাঃ
৩২৬. সূরা আল বাক্বারাহ-২:২০৮
৩২৭. সূরা মায়িদাহ-৫:৭৮-৭৯
৩২৮. মুসলিম মাশা. হা/১৮৬
৩২৯. আবু দাউদ আলএ. হা/৪৩৪০, সহীহ আত-তিরমিযী মাথ, হা/২১৬৮