📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ 📄 দৈবজ্ঞ বা গণককে কেবল পরামর্শদানে অদৃশ্য জিজ্ঞাসা

📄 দৈবজ্ঞ বা গণককে কেবল পরামর্শদানে অদৃশ্য জিজ্ঞাসা


কোন দৈবজ্ঞ বা গণককে লাঞ্ছিত করার জন্য এবং তাদের দাবী মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য পরীক্ষাস্বরূপ তাদেরকে কোন অদৃশ্য বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা দূষণীয় নয়। যেহেতু নবী ইবনে স্বাইয়াদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কী দেখ?" সে বলল, 'আমার নিকট সত্যবাদী আসে ও মিথ্যাবাদী আসে।' তিনি বললেন, "ব্যাপারটা তোমার কাছে গোলমেলে হয়ে গেছে। আমি তোমার জন্য একটি জিনিস (মনে মনে) গোপন করেছি (সেটা কী বলতে পারবে)?" সে বলল, 'দুখ'। তিনি বললেন,

اخْسَأُ فَلَنْ تَعْدُوَ قَدْرَكَ

"ধুৎ! তুমি কখনই তোমার মর্যাদা অতিক্রম করতে পারবে না।"³¹⁵ আসলে সেটা ছিল 'দুখান' শব্দ। নবী এই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সাহাবাগণের জন্য প্রমাণ করলেন যে, সে যা দাবী করছে, তা মিথ্যা।

টিকাঃ
৩১৫. বুখারী ইফা. হা/১২৭২, আপ্র. হা/১২৬৫, তাও. হা/১৩৫৪, মুসলিম মাশা, হা/৭৫২৯

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ 📄 জ্যোতিষ-বিদ্যা

📄 জ্যোতিষ-বিদ্যা


গ্রহ নক্ষত্রাদির গতি-স্থিতি ও সঞ্চার অনুসারে শুভাশুভ নিরূপণ করা যায় না। পৃথিবীর মঙ্গলামঙ্গল ঘটনাঘটনের সাথে তাঁর এই সৃষ্টি-বিচিত্রের কোন সম্পর্ক নেই।

সুতরাং এই বিদ্যা শিক্ষা করা ও দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়। যেহেতু তা এক প্রকার যাদু-বিদ্যা। আর যাদু-বিদ্যা ইসলামে হারাম। রসূলুল্লাহ বলেছেন,

مَنِ اقْتَبَسَ عِلْمًا مِنَ النُّجُومِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السَّحْرِ زَادَ مَا زَادَ

“যে ব্যক্তি জ্যোতিষ বিদ্যার কিছু অংশ শিক্ষা করল, সে আসলে যাদু বিদ্যার একটি অংশ শিক্ষা করল। বিধায় জ্যোতিষ বিদ্যা যত বেশী পরিমাণে শিক্ষা করবে, অত বেশী পরিমাণে তার যাদু বিদ্যা বেড়ে যাবে।”³¹⁶ আর এই যাদু-বিদ্যা সকল নবীগণের নিকট অবৈধ। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ

অর্থাৎ, ‘আমরা (হারূত ও মারূত) পরীক্ষাস্বরূপ। ‘তোমরা কুফরী করো না’---এ না ব’লে তারা (হারূত ও মারূত) কাউকেও (যাদু) শিক্ষা দিত না। ³¹⁷ এ ছিল সুলাইমান (আঃ) এর যুগের কথা। মূসা (আঃ) এর যুগে বলা হয়েছিল,

وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُونَ

“যাদুকররা সফলকাম হয় না!”³¹⁸ মহান আল্লাহ বলেছেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلاء أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا

“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিন্ত (শয়তান, শির্ক, যাদু প্রভৃতি) ও তাগূত (বাতিল উপাস্যে) বিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী (কাফের) দের সম্বন্ধে বলে যে, এদের পথ বিশ্বাসী (মুমিন) দের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর।”³¹⁹ উমার বিন খাত্তাব বলেন, ‘জিব্‌ত’ মানে যাদু। ³²⁰

টিকাঃ
৩১৬. আবু দাউদ আলএ. হা/৩৯০৭
৩১৭. সূরা আল বাক্বারাহ-২:১০২
৩১৮. সূরা ইউনুস-১০:৭৭
৩১৯. সূরা আন নিসা-৪:৫১
৩২০. তাফসীর ইবনে কাষীর

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ 📄 গণকের কথা সত্য হয় কেন?

📄 গণকের কথা সত্য হয় কেন?


ইসলামে গণক, দৈবজ্ঞ, জ্যোতিষী ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়ক বক্তাদের কাজ বৈধ নয়, তাদের বক্তব্য বিশ্বাস্য নয়, তাহলে তা সত্য হয় কেন?

এ কথা বিদিত যে, তাদের বক্তব্যের সবটাই সত্য হয় না। যেটুকু হয়, তা হলঃ
> (ক) তা তাদের অনুমানের তীর কাকতালীয়ভাবে লেগে যাওয়া কথা।

> (খ) পারিপার্শ্বিকতা বুঝে অন্তর্দৃষ্টি বা পরিজ্ঞান দ্বারা বলা কথা।

> (গ) চাতুর্যপূর্ণ ছল কথা।

> (ঘ) জ্বিনের সাহায্য নিয়ে তার দেখা কথা। অথবা

আল্লাহ তাআলা যখন আসমানে পৃথিবীর কোন ঘটনার ফায়সালা করেন, ফিরিশতারা সে কথা শুনেন যেন পাথরের উপর শিকল পড়ার শব্দ। তাতে তাঁরা ঘাবড়ে যান বা মূর্ছিত হন। তাঁদের ঘাবড়ানি বা মূর্ছা-অবস্থা দূর হলে একে অপরকে প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহ কী বললেন বা কী ফায়সালা করলেন?' বলেন, 'সত্য।' ফিরিশতাগণের আপোসের আলোচনায় নিম্ন আসমানের ফিরিশতামণ্ডলীও শামিল হন। তার কিছু চুরি-ছুপে শয়তান জ্বিন শুনে নেয় এবং তারাও একে অপরকে আপোসের মধ্যে জানিয়ে থাকে। আকাশের ধারে-পাশে শুনতে গেলে উল্কা ছুটে এসে বাধা দেয়। আল্লাহ পাক আকাশকে অবাধ্য শয়তান হতে হিফাযতে রেখেছেন। ফলে সে ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। ³²¹

কিছু শয়তান সেই খবর পৃথিবীতে তাদের সহচর গণকদের মনে পৌঁছে দেয়। গণকরা তাদের অনুমান ও ধারণার আরো শত মিথ্যা জুড়ে বিশদভাবে প্রচার করে। ফলে যা সত্য তা সত্য ঘটে, কিছু আন্দাজও সঠিক হয়ে যায় এবং অধিকতরই মিথ্যা ও অবাস্তব। ³²²

আর যারা গায়বী খবর বলে দেয়, যেমন চুরির চোরের নাম বলে দেয় অথবা সাক্ষাৎকারীর নাম-ঠিকানা বলে দেয়, তারা আসলে জ্বিন বা মানুষ শিশ্য ব্যবহার করে অথবা কোন যান্ত্রিক সহযোগিতায় জানা কথা তাকে বলে। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সুনিশ্চিত যে, তারা গায়বের খবর অবশ্যই জানে না।

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ 📄 গণক ও দৈবজ্ঞরা শয়তানদের দূত

📄 গণক ও দৈবজ্ঞরা শয়তানদের দূত


ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, 'গণকগণ শয়তানের দূত। যেহেতু মুশরিকরা তাদের দিকে ছুটে আসে। বড় বড় বিষয়ে তারা তাদের দিকে সশঙ্কচিত্তে দৌড়ে আসে। তাদেরকে বিশ্বাস করে, তাদের নিকট বিচারপ্রার্থী হয়, তাদের বিচারে সন্তুষ্ট হয়; যেমন রসূলের অনুসারিগণ রসূলের সাথে অনুরূপ আচরণ করে থাকে। ওরা বিশ্বাস করে, গণকরা অদৃশ্যের খবর জানে, গায়বী বিষয়ে তারা খবর দিয়ে থাকে, যা অন্য কেউ জানে না। সুতরাং তারা মুশরিকদের নিকটে রসূলের মর্যাদায়!

প্রকৃতপক্ষে গণকরা শয়তানের দূত। সে তাদেরকে তার নিজ সম্প্রদায় মুশরিকদের নিকট প্রেরণ করেছে এবং তাদেরকে রসূলগণের সাথে তুলনা করেছে, তাই তার সম্প্রদায় তাদের আহবানে সাড়া দিয়েছে। তাদেরকে আল্লাহর রসূলদের চরিত্র দিয়েছে, যাতে সে তাঁদের ব্যাপারে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করতে পারে। সে নিজ দূতগণকেই আসল সত্যবাদী ও অদৃশ্যজ্ঞে পরিণত করে। সুতরাং যেহেতু দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিশাল বৈপরীত্ব বর্তমান, সেহেতু নবী বলেছেন,

مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ

“যে ব্যক্তি কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ এর প্রতি অবতীর্ণ জিনিসের সাথে কুফরী করে।"³²³

মানুষ দুই শ্রেণীভুক্ত : গায়বী দাবীদার দৈবজ্ঞ (বা পীর-ফকীরবাবা) ইত্যাদির অনুসারী এবং মহান আল্লাহর রসূলগণের অনুসারী। আর এটা কোন মতেই সম্ভব নয় যে, বান্দা এদের অনুসারী হবে এবং ওঁদেরও অনুসারী হবে। বরং সে যত গণকের নিকটবর্তী হবে, তত রসূল থেকে দূরবর্তী হয়ে যাবে। সে যত পরিমাণ গায়বী খবরের দাবীদারকে সত্যায়ন করবে, সে তত রসূল কে মিথ্যায়ন করবে। ³²⁴

প্রকৃতপ্রস্তাবে যারা নানা জাতির ইতিহাস ও পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত, তারা অবশ্যই জানে যে, তাদের গণক ও যাদুকর শ্রেণীর মানুষ ও শয়তানী দূতগণকে তারা নবী ও রসূলগণের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তারা চোখ বন্ধ করে তাদের আনুগত্য করেছে ও করছে। তারা যা হালাল করেছে ও করছে, অনুসারিগণ তাই হালাল মনে করেছে ও করছে। তারা যা হারাম গণ্য করেছে, ভক্তগণ তাই হারাম মনে করেছে ও করছে। তারা ইচ্ছামতো ভক্তদের মাল কুক্ষিগত করেছে ও করছে। এমনকি তাদের অন্তঃপুরবাসিনীদেরকেও উদার মনে সঁপে দিয়েছে ও দিচ্ছে! তারা তাদের মুরীদ ও শিশ্যদের জন্য ইবাদতের এমন আনুষ্ঠানিকতা ও পদ্ধতি নির্বাচন করেছে ও করছে, যাতে শয়তান খোশ হয়েছে ও হচ্ছে। বরং শয়তানের অনুগত মানুষই বেশি। প্রকৃতপক্ষে

وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ

“ওদের উপর ইবলীস তার অনুমান সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, ফলে ওদের মধ্যে একটি বিশ্বাসী দল ছাড়া সকলেই তার অনুসরণ করেছে।”³²⁵

টিকাঃ
৩২১. সূরা আস স-ফফাত-৩৭:৭-১০
৩২২. বুখারী ইফা, হা/৪৩৪১, আপ্র, হা/৪৩৪১, তাও. হা/৪৭০১
৩২৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/২/৪০৮, ৪৭৬, আবু দাউদ আলএ. হা/৩৮০৪, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ তাও. হা/৫২২
৩২৪. ইগাষাতুল লাহফান ১/২৭১
৩২৫. সূরা সাবা-৩৪:২০

ফন্ট সাইজ
15px
17px