📄 দৈবজ্ঞ ও গণকরা কি গায়েব জানে?
বহু সাধারণ মানুষ এ কথা ধারণা করে যে, তারা গায়বের খবর জানে, ভূত-ভবিষ্যতের খবর বলতে পারে। ফলে তারা তাদের কাছে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য জিজ্ঞাসা করে, চুরি বা অপরাধ সম্পর্কে হদীস খোঁজে, আরো কত কী।
অথচ তাদের এ ধারণা বিশাল ভুল। বাংলা প্রবাদে আছে, 'দৈবজ্ঞ যদি বলে ঠিক, তবে কেন মাগে ভিক?'
যেহেতু মহান আল্লাহ ছাড়া এ আকাশ-পৃথিবীর কেউই গায়বের খবর জানে না, বলতে পারে না। তিনি রসূলদের মধ্যে যাঁকে ইচ্ছা, তাঁকে জানান, অতঃপর তিনি বলতে পারেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا - إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِن رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا - لِيَعْلَمَ أَن قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَى كُلَّ شَيْءٍ عَدَدًا
"তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না। তাঁর মনোনীত রসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে তিনি রসূলের অগ্রে এবং পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন। যাতে তিনি জেনে নেন, তারা তাদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছে; আর তাদের নিকট যা আছে, তা তাঁর জ্ঞানায়ত্ত এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের সংখ্যা গুনে রেখেছেন।” ³¹⁰
বলা বাহুল্য, অমুক অদৃশ্যের খবর বলতে পারে---এই বিশ্বাস ভ্রষ্ট ও পাপময়। এ বিশ্বাস ইসলামী আকীদার পরিপন্থী। যেহেতু মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে না। উক্ত ভ্রষ্ট আকীদার অপরাধ বর্ণনা করে হাদীসে বলা হয়েছে,
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
'যে ব্যক্তি গণকের নিকট এসে কোন (গায়বী) বিষয়ে প্রশ্ন করে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল করা হয় না। ³¹¹
এটা শুধু জিজ্ঞাসা করার সাজা। কিন্তু জিজ্ঞাসার পর উত্তরে বিশ্বাস করার সাজা আরো বড়। তিনি বলেছেন,
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ
“যে ব্যক্তি কোন গণকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ এর প্রতি অবতীর্ণ জিনিসের সাথে কুফরী করে। "³¹²
অর্থাৎ, কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে বলা হয়েছে, সকল প্রকার ভূত-ভবিষ্যৎ ও অদৃশ্যের খবর একমাত্র আল্লাহই জানেন।
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ
অর্থাৎ, তাঁরই নিকট অদৃশ্যের চাবি রয়েছে; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। ³¹³
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ
অর্থাৎ, বল, 'আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না এবং ওরা কখন পুনরুত্থিত হবে (তাও) ওরা জানে না। ³¹⁴
টিকাঃ
৩১০. সূরা জ্বিন-৭২:২৬-২৮
৩১১. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৫৭
৩১২. মুসনাদে আহমাদ মাশা. হা/২/৪০৮, ৪৭৬, আবু দাউদ আলএ. হা/৩৮০৪, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ তাও. হা/৫২২
৩১৩. সূরা আল আন'আম-৬:৫৯
৩১৪. সূরা নামল-২৭:৬৫
📄 দৈবজ্ঞ বা গণককে কেবল পরামর্শদানে অদৃশ্য জিজ্ঞাসা
কোন দৈবজ্ঞ বা গণককে লাঞ্ছিত করার জন্য এবং তাদের দাবী মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য পরীক্ষাস্বরূপ তাদেরকে কোন অদৃশ্য বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা দূষণীয় নয়। যেহেতু নবী ইবনে স্বাইয়াদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কী দেখ?" সে বলল, 'আমার নিকট সত্যবাদী আসে ও মিথ্যাবাদী আসে।' তিনি বললেন, "ব্যাপারটা তোমার কাছে গোলমেলে হয়ে গেছে। আমি তোমার জন্য একটি জিনিস (মনে মনে) গোপন করেছি (সেটা কী বলতে পারবে)?" সে বলল, 'দুখ'। তিনি বললেন,
اخْسَأُ فَلَنْ تَعْدُوَ قَدْرَكَ
"ধুৎ! তুমি কখনই তোমার মর্যাদা অতিক্রম করতে পারবে না।"³¹⁵ আসলে সেটা ছিল 'দুখান' শব্দ। নবী এই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সাহাবাগণের জন্য প্রমাণ করলেন যে, সে যা দাবী করছে, তা মিথ্যা।
টিকাঃ
৩১৫. বুখারী ইফা. হা/১২৭২, আপ্র. হা/১২৬৫, তাও. হা/১৩৫৪, মুসলিম মাশা, হা/৭৫২৯
📄 জ্যোতিষ-বিদ্যা
গ্রহ নক্ষত্রাদির গতি-স্থিতি ও সঞ্চার অনুসারে শুভাশুভ নিরূপণ করা যায় না। পৃথিবীর মঙ্গলামঙ্গল ঘটনাঘটনের সাথে তাঁর এই সৃষ্টি-বিচিত্রের কোন সম্পর্ক নেই।
সুতরাং এই বিদ্যা শিক্ষা করা ও দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়। যেহেতু তা এক প্রকার যাদু-বিদ্যা। আর যাদু-বিদ্যা ইসলামে হারাম। রসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنِ اقْتَبَسَ عِلْمًا مِنَ النُّجُومِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السَّحْرِ زَادَ مَا زَادَ
“যে ব্যক্তি জ্যোতিষ বিদ্যার কিছু অংশ শিক্ষা করল, সে আসলে যাদু বিদ্যার একটি অংশ শিক্ষা করল। বিধায় জ্যোতিষ বিদ্যা যত বেশী পরিমাণে শিক্ষা করবে, অত বেশী পরিমাণে তার যাদু বিদ্যা বেড়ে যাবে।”³¹⁶ আর এই যাদু-বিদ্যা সকল নবীগণের নিকট অবৈধ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
অর্থাৎ, ‘আমরা (হারূত ও মারূত) পরীক্ষাস্বরূপ। ‘তোমরা কুফরী করো না’---এ না ব’লে তারা (হারূত ও মারূত) কাউকেও (যাদু) শিক্ষা দিত না। ³¹⁷ এ ছিল সুলাইমান (আঃ) এর যুগের কথা। মূসা (আঃ) এর যুগে বলা হয়েছিল,
وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُونَ
“যাদুকররা সফলকাম হয় না!”³¹⁸ মহান আল্লাহ বলেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلاء أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিন্ত (শয়তান, শির্ক, যাদু প্রভৃতি) ও তাগূত (বাতিল উপাস্যে) বিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী (কাফের) দের সম্বন্ধে বলে যে, এদের পথ বিশ্বাসী (মুমিন) দের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর।”³¹⁹ উমার বিন খাত্তাব বলেন, ‘জিব্ত’ মানে যাদু। ³²⁰
টিকাঃ
৩১৬. আবু দাউদ আলএ. হা/৩৯০৭
৩১৭. সূরা আল বাক্বারাহ-২:১০২
৩১৮. সূরা ইউনুস-১০:৭৭
৩১৯. সূরা আন নিসা-৪:৫১
৩২০. তাফসীর ইবনে কাষীর
📄 গণকের কথা সত্য হয় কেন?
ইসলামে গণক, দৈবজ্ঞ, জ্যোতিষী ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়ক বক্তাদের কাজ বৈধ নয়, তাদের বক্তব্য বিশ্বাস্য নয়, তাহলে তা সত্য হয় কেন?
এ কথা বিদিত যে, তাদের বক্তব্যের সবটাই সত্য হয় না। যেটুকু হয়, তা হলঃ
> (ক) তা তাদের অনুমানের তীর কাকতালীয়ভাবে লেগে যাওয়া কথা।
> (খ) পারিপার্শ্বিকতা বুঝে অন্তর্দৃষ্টি বা পরিজ্ঞান দ্বারা বলা কথা।
> (গ) চাতুর্যপূর্ণ ছল কথা।
> (ঘ) জ্বিনের সাহায্য নিয়ে তার দেখা কথা। অথবা
আল্লাহ তাআলা যখন আসমানে পৃথিবীর কোন ঘটনার ফায়সালা করেন, ফিরিশতারা সে কথা শুনেন যেন পাথরের উপর শিকল পড়ার শব্দ। তাতে তাঁরা ঘাবড়ে যান বা মূর্ছিত হন। তাঁদের ঘাবড়ানি বা মূর্ছা-অবস্থা দূর হলে একে অপরকে প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহ কী বললেন বা কী ফায়সালা করলেন?' বলেন, 'সত্য।' ফিরিশতাগণের আপোসের আলোচনায় নিম্ন আসমানের ফিরিশতামণ্ডলীও শামিল হন। তার কিছু চুরি-ছুপে শয়তান জ্বিন শুনে নেয় এবং তারাও একে অপরকে আপোসের মধ্যে জানিয়ে থাকে। আকাশের ধারে-পাশে শুনতে গেলে উল্কা ছুটে এসে বাধা দেয়। আল্লাহ পাক আকাশকে অবাধ্য শয়তান হতে হিফাযতে রেখেছেন। ফলে সে ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। ³²¹
কিছু শয়তান সেই খবর পৃথিবীতে তাদের সহচর গণকদের মনে পৌঁছে দেয়। গণকরা তাদের অনুমান ও ধারণার আরো শত মিথ্যা জুড়ে বিশদভাবে প্রচার করে। ফলে যা সত্য তা সত্য ঘটে, কিছু আন্দাজও সঠিক হয়ে যায় এবং অধিকতরই মিথ্যা ও অবাস্তব। ³²²
আর যারা গায়বী খবর বলে দেয়, যেমন চুরির চোরের নাম বলে দেয় অথবা সাক্ষাৎকারীর নাম-ঠিকানা বলে দেয়, তারা আসলে জ্বিন বা মানুষ শিশ্য ব্যবহার করে অথবা কোন যান্ত্রিক সহযোগিতায় জানা কথা তাকে বলে। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সুনিশ্চিত যে, তারা গায়বের খবর অবশ্যই জানে না।