📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 জ্বিনকে তুষ্ট করে জ্বিনের খিদমত নেওয়া

📄 জ্বিনকে তুষ্ট করে জ্বিনের খিদমত নেওয়া


যারা জ্বিনের খিদমত নেয়, তারা আসলে তাকে তুষ্ট করে। শির্ক ও কুফরী করার মাধ্যমে তুষ্ট হয়ে জ্বিন মানুষের খিদমত করে। যেমন যাদুকরকে তার যাদু প্রদর্শনে সহযোগিতা করে, বাউলিয়াকে তার তথাকথিত 'কারামত' প্রদর্শনে সাহায্য করে এবং অনেক ফকীরবাবা ও দৈবজ্ঞকে অলৌকিক প্রদর্শনে মদদ যুগিয়ে থাকে।

তারা কিন্তু আসলে জ্বিনের জন্য এমন কিছু করে, যার ফলে তার নৈকট্য পাওয়া যায় এবং তার ফলে তুষ্ট হয়ে তাদের খিদমত আঞ্জাম দেয়। কখনো এমন কাজ তার জন্য তারা করে, যা শরীয়তে শির্ক বা কুফরী। যেমন অনেকে নোংরা জিনিস দিয়ে কুরআনের আয়াত লেখে, উল্টা করে কুরআনী আয়াত লেখে, তাদের নামে বলিদান দেয় ইত্যাদি। অতঃপর শয়তান তুষ্ট হয়ে তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করে। তাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, কোন দূরবর্তী জায়গা থেকে কিছু এনে দেয়, এমন লোকের নিকট থেকে খাদ্য বা অর্থ চুরি করে আনে, যারা আল্লাহর যিক্র ব্যবহার করে না। আরো কত কী করে!

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 গায়বী ব্যক্তি

📄 গায়বী ব্যক্তি


ত্বাহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাকার বলেন, “কিছু শয়তান আছে, লোকেরা তাদেরকে ‘গায়বী ব্যক্তি’ বলে থাকে। কিছু লোক তাদের সাথে কথা বলে। তাদের মাধ্যমে কিছু অলৌকিক কর্মকান্ড ঘটে থাকে, যার কারণে লোকেরা তাদেরকে আল্লাহর আওলিয়া ধারণা করে থাকে। ওদের কেউ কেউ মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করে থাকে। বলে, রসূল তাকে মুশরিকদের সপক্ষে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ দিয়েছেন। কারণ মুসলিমরা অবাধ্য হয়ে পড়েছে।”

অতঃপর উক্ত ব্যাখ্যাতা আরো বলেন, “প্রকৃতপক্ষে ওরা হল মুশরিকদের ভাই।”

আসলে যা দেখা যায়, তা হল শয়তানের চেলাচামুন্ডা। গায়বী ব্যক্তি যাদেরকে ধারণা করা হয়, তারা হল জ্বিন। ওরা ওদেরকে ‘রিজালুল গায়ব’ (অদৃশ্য পুরুষ) বলে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا

“কতিপয় পুরুষ মানুষ কতক পুরুষ জ্বিনদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করত, ফলে তারা জ্বিনদের অহংকার বাড়িয়ে দিত।”²⁹⁶

আসলে অধিকাংশ মানুষের নিকট কিতাব ও সুন্নাহর সে নিক্তি নেই, যার দ্বারা আওলিয়াউর রাহমান ও আওলিয়াউশ শায়তানের মাঝে পার্থক্য করতে পারে। এই জন্য তারা শয়তানী কোন কর্মকাণ্ড দেখলেও তা আওলিয়ার কারামত মনে করে বসে, যাদুকে কারামত ধারণা করে।

অথচ মুসলিমের উচিত, শরীয়তের মানদণ্ডে বিচার করে কোন কিছু বিশ্বাস করা, কাউকে আল্লাহর অলী বলে স্বীকার করে নেওয়ার আগে বারবার যাচাই করে দেখা। উর্দু-কবি বলেছেন,
'উড়তে আগার হুয়ে হাওয়া পর ফকীর জী,

ঘুস্তে হো আগ মে তো না জালতা হো উন্‌ন্ডী।
দরিয়া কো পায়েরতে তো পা তর্ না হো কভী,
সুন্নাত কে হ্যায় খেলাপ তো সঝো উন্‌হ গাবী।'

কোন দরবেশ যদি বাতাসে উড়তে পারে, আগুনে প্রবেশ করলে তার একটা পশমও না পোড়ে, নদীর উপরে হেঁটে গেলেও যদি তার পা না ভেজে, তবুও সে যদি সুন্নাতের খিলাপ হয়, তাহলে বুঝবে, সে হল ভ্রষ্ট।

ইবনে তাইমিয়‍্যাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রাহমানী ও নাফসানী অবস্থার মাঝে পার্থক্য করতে পারবে না, তার কাছে হক ও বাতিল তালগোল খেয়ে যাবে। আল্লাহ যার হৃদয়কে ঈমানের প্রকৃতত্ব ও কুরআনের আনুগত্য দ্বারা আলোকিত করেননি, সে হকপন্থী ও বাতিলপন্থীর মাঝে সঠিক রাস্তা খুঁজে পাবে না। তার নিকট ঘটনা ও অবস্থা গোলমেলে হয়ে যাবে। যেমন বহু লোকের নিকট য়‍্যামামার মিথ্যুক নবী মুসাইলিমার ও আরো অনেকের ব্যাপার গোলমেলে হয়ে গিয়েছিল, যাদের দাবী ছিল, তারা নবী; অথচ তারা ছিল ডাহা মিথ্যাবাদী।”²⁹⁷ এ ব্যাপারে অধিক পথনির্দেশনা পেতে তাঁর গ্রন্থ 'আল-ফুরক্বান বাইনা আওলিয়ার রাহমানি অআউলিয়াইশ শাইত্বান' পঠনীয়।

টিকাঃ
২৯৬. সূরা জ্বিন-৭২:৬
২৯৭. জামেউর রাসাইল ১৯৭ পৃ

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 জ্বিন বশ করা কি সম্ভব?

📄 জ্বিন বশ করা কি সম্ভব?


আল্লাহর নবী সুলাইমান (আ.) এর পর আর কারো জন্য জ্বিনকে তার অধীনস্থ করে দেওয়া হয়নি। যেহেতু মহান প্রতিপালক তাঁর জন্য জ্বিনকে তাবে করে দিয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন,

رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজ্য দান কর, যার অধিকারী আমার পরে অন্য কেউ হতে পারবে না। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।'²⁹⁸

মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। সুতরাং তাঁর মতো আর কারো জন্য জ্বিনকে বশীভূত করা সম্ভব নয়। অবশ্য কোন জ্বিন যদি স্বেচ্ছায় কোন মানুষের অনুগত হয়, তাহলে তাকে 'বশ করা' বলা হয় না। অনেক সময় এই আনুগত্যের জন্য মানুষ কোন বিনিময় প্রদান করে। কিন্তু তা কি বৈধ? জ্বিনকে অনুগত করা কি বৈধ?

যদি কেউ তার অনুগত জিনকে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দেয় এবং তাকে জিন ও ইনসানের মাঝে দ্বীনের তবলীগে ব্যবহার করে, তবে তা শ্রেষ্ঠ অলীর কাজ।

আবার কেউ যদি তাকে কোন বৈধ সাংসারিক কাজে ব্যবহার করে এবং এই আনুগত্যের বিনিময়ে জিন যদি ইনসানের কাছে কোন হারাম মূল্য (যেমন, তার জন্য সেজদা, কুরবানী বা পশুবলিদান ইত্যাদি) না চায়, তবে তা জায়েয।

কিন্তু যদি কেউ জিনকে অবৈধ কাজে যেমন, শির্ক, হত্যা, চুরি ইত্যাদিতে, নিজেকে অলী বা বুযুর্গ জাহির করার উদ্দেশ্যে তার সাহায্যে কেরামতি প্রদর্শন, শত্রুতা করে কিংবা পয়সা কামাবার লোভে কাউকে অসুখে ফেলা, কোন নারী হাত করা ইত্যাদিতে ব্যবহার করে, তবে তা নিশ্চিতভাবে হারাম। ²⁹⁹

টিকাঃ
২৯৮. সূরা সোয়া-দ-৩৮:৩৫
২৯৯. মাজমু ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়‍্যাহ ১১/৩০৭, ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/২২৯

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 রূহ হাজির করা

📄 রূহ হাজির করা


যে মানুষ মারা যায়, দেহত্যাগ করে বারযাখী বা কবর জগতে চলে যায়, সে আর ইহ জগতে ফিরে আসে না, কেউ তাকে আনতে বা হাজির করতে পারে না। মরণের পর কয়েক দিন বাড়িতে আসা-যাওয়া করে না। শবেবরাতের রাতেও কেউ ফিরে আসে না। 'রূহ' একটি গায়বী বস্তু। তার প্রকৃতত্ব মানুষের জ্ঞান-বহির্ভূত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلاً

"তোমাকে তারা আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বল, 'আত্মা আমার প্রতিপালকের আদেশ বিশেষ; আর তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।”³⁰⁰ মহান আল্লাহ মানুষের মৃত্যু ঘটান এবং তিনিই রূহসমূহকে আটকে রাখেন।

اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

"মৃত্যুর সময় আল্লাহ প্রাণ হরণ করেন এবং যারা জীবিত তাদেরও চেতনা হরণ করেন ওরা যখন নিদ্রিত থাকে। অতঃপর যার জন্য মৃত্যু অবধারিত করেছেন, তিনি তার প্রাণ রেখে দেন এবং অপরকে এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চেতনা ফিরিয়ে দেন। এতে অবশ্যই চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। "³⁰¹

অতঃপর ফিরিস্তার মাধ্যমে তিনি অপরাধী রূহকে আযাব ও অনুগত রূহকে শান্তি দিতে থাকেন। ও থাকে সিজ্জীনে, এ থাকে ইল্লিয়্যীনে। নেক রূহসমূহ থাকে তাদের প্রতিপালকের নিকটে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاء عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ

"যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনই মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট জীবিত; তারা জীবিকা-প্রাপ্ত হয়ে থাকে।"³⁰² আর সে জীবন তাদের বিশেষ জীবন, এ জীবন থেকে তা অনুভূতির বাইরে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبيلِ اللهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاء وَلَكِن لَّا تَشْعُرُونَ

"যারা আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে, তাদেরকে মৃত বল না, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তা তোমরা উপলব্ধি করতে পার না।”³⁰³ আর নবী বলেছেন,

أَرْوَاحُهُمْ فِي جَوْفِ طَيْرٍ خُضْرٍ لَهَا قَنَادِيلُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَسْرَحُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ شَاءَتْ ثُمَّ تَأْوِي إِلَى تِلْكَ الْقَنَادِيلِ

“তাদের (শহীদদের) আত্মাসমূহ সবুজ পক্ষীকুলের দেহ মধ্যে অবস্থান করে। ঐ পক্ষীকুলের অবস্থান ক্ষেত্র হল (আল্লাহর) আরশে ঝুলন্ত দীপাবলী। তারা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা বিচরণ করে বেড়ায়। অতঃপর পুনরায় ঐ দীপাবলীতে ফিরে এসে আশ্রয় নেয়।”³⁰⁴

জান্নাতে ইচ্ছামত পরিভ্রমণ করে বেড়ায়। আওলিয়া ও সালেহীনদের রূহও পাখির বেশে জান্নাতের গাছে গাছে অবস্থান করে। ³⁰⁵ এ দুনিয়ায় কোন রূহের ফিরে আসা যে অসম্ভব, সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ - لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ

অর্থাৎ, যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে পুনরায় (দুনিয়ায়) প্রেরণ কর। যাতে আমি আমার ছেড়ে আসা জীবনে সৎকর্ম করতে পারি।' না এটা হবার নয়; এটা তো তার একটা উক্তি মাত্র; তাদের সামনে বারযাখ (যবনিকা) থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। ³⁰⁶

সুতরাং সেই জগৎ থেকে এ জগতে কোন রূহ উপস্থিত করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে। যারা দাবী করে, তারা আওলিয়া বা অন্য কোন ভালো বা মন্দ লোকের রূহ হাজির করে, তারা মিথ্যুক।

مَّا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ وَلَا لِآبَائِهِمْ كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا

"এই বিষয়ে তাদের কোনই জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না; তাদের মুখনিঃসৃত বাক্য কি সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।"³⁰⁷

তাহলে অনেক সময় তথাকথিত উপস্থিত রূহ যে কথা বলে, তা সত্য হয় কীভাবে?

যদি সত্য হয়, তাহলে তা অনুমানে দু-একটা লেগে যাওয়া সত্য। নচেৎ তা শয়তান জ্বিনের মাধ্যমে অথবা উক্ত রূহের 'ক্বারীন' (আজীবন সঙ্গী) জ্বিন দ্বারা বলানো হয়।

অনেক 'জ্বিন-বাবা' অথবা 'জ্বিন-বিবি' রূহ হাজির করার নামে বাতিল উপায়ে মানুষের অর্থ-সম্পদ লুটে খাচ্ছে। আল্লাহই তাদের হিদায়াতের মালিক।

টিকাঃ
৩০০. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৮৫
৩০১. সূরা যুমার-৩৯:৪২
৩০২. সূরা আলে ইমরান-৩:১৬৯
৩০৩. সূরা আল বাক্বারাহ-২:১৫৪
৩০৪. মুসলিম মাশা, হা/৪৯৯৩
৩০৫. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/৩/৪৫৫, ইবনে মাজাহ তাও, হা/১৪৪৯
৩০৬. সূরা মু'মিনূন-২৩:৯৯-১০০
৩০৭. সূরা আল কাহাফ-১৮:৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00