📄 গান-বাজনা
গান-বাজনার তীর দ্বারা শয়তান কত মানুষের হৃদয়কে শিকার করে এবং কত ভালো মনকে খারাপ করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, "আল্লাহর দুশমনের জাল ও ফাঁদসমূহের একটি হল তাই, যা দিয়ে সে স্বল্প বুদ্ধি, ইলম ও দ্বীনের মানুষদেরকে প্রতারিত করেছে এবং অজ্ঞ ও অকমণ্য লোকেদের হৃদয়কে শিকার করেছে, আর তা হল শিস ও হাততালি শোনা, নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্রের সাথে গাওয়া গান শোনা। যার দ্বারা শয়তান কুরআন থেকে হৃদয়সমূহকে ফিরিয়ে নেয় এবং ফাসেকী ও পাপাচরণে আবদ্ধ রাখে। বলা বাহুল্য, তা হল শয়তানী কুরআন এবং রহমান ও হৃদয়ের মাঝে মোটা পর্দা। তা হল ব্যভিচার ও সমকামের মন্ত্র। এর মাধ্যমে শয়তান বহু অকেজো মনকে প্রতারিত করেছে। চক্রান্ত ও প্রতারণা করে তার কাছে তা সুশোভিত করেছে। বাতিল সন্দেহ অহী করে তার কাছে হালাল প্রতীয়মান করেছে। আর সে তার অহীকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং তার ফলে আল্লাহর অহী কুরআনকে বর্জন করেছে!”²⁸⁴
আজব ব্যাপার এই যে, বহু মানুষ আছে, যারা গান-বাজনার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে, হেলে-দুলে, নেচে-গেয়ে তাদের ধারণা মতে আল্লাহকে খোশ করে! রহমানী কথামালা বর্জন করে শয়তানী কথামালা দ্বারা রহমানকে তুষ্ট করবে মনে করে!
এই শয়তানী কথামালা বা অবৈধ গানকে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম অনেক নাম দিয়েছেন। যেমন: অসার বাক্য, তামাশা বাক্য, বাতিল বাক্য, ঝুটা বাক্য, ব্যভিচারের মন্ত্র, শয়তানী কুরআন, মুনাফিকী উৎপাদক বাক্য, আহমকের শব্দ, পাপময় শব্দ, শয়তানী শব্দ, শয়তানের বাঁশী, শয়তানী সুর ইত্যাদি।
এই শ্রেণীর অশ্লীল, কুফরী, শির্কী, বিদআতী ও অর্থহীন অসার কবিতা দ্বারাও শয়তান বহু মানব-মনকে শিকার করে। যেহেতু মানুষ যে ব্যাপারে দুর্বল সেই দরজা দিয়ে তার মনের মণিকোঠায় প্রবেশ করে। নবী বলেছেন,
مَا مِنْ رَاكِبٍ يَخْلُو فِي مَسِيرِهِ بِالله وَذِكْرِهِ إِلا كَانَ رِدْفَهُ مَلَكٌ وَلَا يَخْلُو بِشِعْرٍ وَنَحْوِهِ إِلَّا كَانَ رِدْفَهُ شَيْطَانٌ
“যে মুসাফির আল্লাহ ও তাঁর যিক্র নিয়ে একান্ততা অবলম্বন করে, ফিরিস্তা তার সঙ্গী হন। আর যে কাব্য-চিন্তা নিয়ে একান্ততা অবলম্বন করে, শয়তান তার সঙ্গী হয়।”²⁸⁵ মহান আল্লাহ 'কবিগণ' সূরায় সেই কথার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ - تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ - يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ - وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ - أَلَمْ تَرَى أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ - وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ
অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। ওরা কান পেতে থাকে এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সকল বিষয়ে কল্পনাবিহার করে থাকে? এবং তা বলে, যা করে না। ²⁸⁶
#### ঘুঙুর বা ঘন্টি শয়তানের বাঁশী
নবী বলেছেন,
الْجَرَسُ مَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ
"ঘন্টি হল শয়তানের বাঁশী। "²⁸⁷
এই জন্য ফিরিশ্তা সে কাফেলার সঙ্গী হন না, যার সাথে ঘন্টি থাকে। নবী বলেছেন,
لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ
"সেই কাফেলার সঙ্গে (রহমতের) ফিরিশতা থাকেন না, যাতে কুকুর কিংবা ঘুঙুর থাকে।”²⁸⁸ অনুমেয় যে, সে ঘুঙুর যদি কিশোরী বা যুবতীর পায়ে থাকে, তাহলে শয়তানী জালের প্রসার কত হবে? আবার তা যদি কোন নর্তকীর পায়ে থাকে, তার প্রভাব কত হবে?
ঘন্টি যদি শয়তানের বাঁশী হয়, তাহলে নানা শ্রেণীর মিউজিক কার বাঁশী হতে পারে? সুতরাং সেসব শোনা এবং নিজের কোন যন্ত্রে রিং-টন হিসাবে ইউজ করা কী রহমানের বান্দাগণের জন্য শোভনীয় হতে পারে?
টিকাঃ
২৮৪. ইগাষাতুল লাহফান ১/২৪২
২৮৫. ত্বাবারানীর কাবীর হা/৮৯৫, সহীহুল জামে' মাশা. হা/৫৭০৬
২৮৬. সূরা শুআরা-২৬:২২১-২২৬
২৮৭. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৭০
২৮৮. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৬৮
📄 ঘুঙুর বা ঘন্টা শয়তানের বাঁশী
নবী বলেছেন,
الْجَرَسُ مَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ
"ঘন্টি হল শয়তানের বাঁশী। "²⁸⁷
এই জন্য ফিরিশ্তা সে কাফেলার সঙ্গী হন না, যার সাথে ঘন্টি থাকে। নবী বলেছেন,
لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ
"সেই কাফেলার সঙ্গে (রহমতের) ফিরিশতা থাকেন না, যাতে কুকুর কিংবা ঘুঙুর থাকে।”²⁸⁸ অনুমেয় যে, সে ঘুঙুর যদি কিশোরী বা যুবতীর পায়ে থাকে, তাহলে শয়তানী জালের প্রসার কত হবে? আবার তা যদি কোন নর্তকীর পায়ে থাকে, তার প্রভাব কত হবে?
ঘন্টি যদি শয়তানের বাঁশী হয়, তাহলে নানা শ্রেণীর মিউজিক কার বাঁশী হতে পারে? সুতরাং সেসব শোনা এবং নিজের কোন যন্ত্রে রিং-টন হিসাবে ইউজ করা কী রহমানের বান্দাগণের জন্য শোভনীয় হতে পারে?
টিকাঃ
২৮৭. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৭০
২৮৮. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৬৮
📄 আনুগত্যে মুসলিমদের অবহেলা
শয়তানের এটি একটি ভ্রষ্ট করার অসীলা, মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করার ছিদ্রপথ। মুসলিমরা যদি ইসলামের সঠিক অনুসারী হতো, তাহলে কোনভাবেই শয়তান তাদেরকে ভ্রষ্ট করতে অথবা তাদেরকে নিয়ে আজব খেলা খেলতে সুযোগ পেত না। কিন্তু যখনই সে ইসলামী নির্দেশ পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে, তখনই সুযোগ বুঝে শয়তান তাকে ভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। "২৮⁹
বলা বাহুল্য, ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ মানেই শয়তান থেকে পূর্ণ নিরাপত্তা। নচেৎ কিছু পরিমাণও বাড়ির বাইরে থাকলে যেমন ঝড়-তুফান থেকে কেউ নিস্তার পায় না, তেমনি কোন মুসলিম ইসলাম-গৃহের বাইরে থাকলে শয়তান থেকে নিরাপত্তা পায় না।
স্বলাতের কাতারে ঘন হয়ে দাঁড়াতে হয়, মাঝে ফাঁক রাখা নিষেধ। কিন্তু এ নির্দেশ পালন না করে মুসল্লীরা দাঁড়ালে সেই ফাঁকে শয়তান প্রবেশ করে। হয়তো-বা সেই সুযোগে পাশাপাশি দুই মুস্বল্লীর মনেও ফাঁক ও ফারাক সৃষ্টি করে দেয়। তাই নবী বলেছেন,
أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ لَا يَتَخَلَّلُكُمُ الشَّيَاطِينُ كَأَوْلَادِ الْحَذَفِ
"তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর। (ঘন হয়ে দাঁড়াও) তোমাদের মাঝে ছাগলের কালো ছানার মতো যেন শয়তানরা প্রবেশ না করে।”²⁹⁰ তিনি আরো বলেছেন,
أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ وتَراضُوا فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنِّي لَأَرَى الشَّيَاطِينَ بَيْنَ صُفُوفِكُمْ كَأَنَّهَا غَنَمٌ عُفْرٌ
"তোমরা কাতার সোজা কর এবং ঘন হয়ে দাঁড়াও। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! আমি শয়তানদেরকে তোমাদের কাতারসমূহের মাঝে মেটে রঙের ছাগলের মতো অবশ্যই দেখতে পাচ্ছি।”²⁹¹
টিকাঃ
২৮৯. সূরা আল বাক্বারাহ-২:২০৮
২৯০. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১৮৬১৮, হাকেম, মাশা. হা/৭৮৬
২৯১. ত্বায়ালিসী, সহীহুল জামে' লিল আলবানী, মাশা, হা/১১৯৪
📄 শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা
শয়তান অনায়াসে মানুষের মনে প্রবেশ করে কীভাবে মানুষের চিন্তা ও মর্মমূলে পৌঁছতে সক্ষম হয় এবং নানা কথা প্রক্ষিপ্ত করে, তা আমরা বুঝতে পারি না। এ ব্যাপারে শয়তানের সৃষ্টিগত প্রকৃতিই তার সহযোগী। একেই আমরা 'অসঅসাহ' বা কুমন্ত্রণা বলি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন। তিনি তাকে বলেছেন, 'আল-অসওয়া-সুল খান্নাস', অর্থাৎ, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতা।
শয়তান মানুষের পিছনে লেগে থাকে, আদম-সন্তানের মর্মমূলে বাসা বেঁধে থাকে। অতঃপর সে যখন ভুলে যায় অথবা উদাস হয়, তখন শয়তান কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। তারপর যখন সে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান সরে পড়ে, আত্মগোপন করে। নবী বলেছেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ
অর্থাৎ, শয়তান আদম সন্তানের রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়।”²⁹² এই কুমন্ত্রণা দ্বারাই হিংসুটে শয়তান আদমকে ভ্রষ্ট করেছিল এবং বেহেস্তের বৃক্ষ ভক্ষণ করতে প্ররোচিত করেছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَّا يَبْلَى
"অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, 'হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষ ও অক্ষয় রাজ্যের কথা?’”²⁹³
فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْءَاتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَا كُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ
"অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান যা গোপন রাখা হয়েছিল, তা প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, 'পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা (জান্নাতে) চিরস্থায়ী হও, এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।”²⁹⁴
শয়তান ইচ্ছারূপ ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। সুতরাং সে কোন মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষের সাথে কথা বলতে পারে, কথা শুনাতে পারে, কোন আদেশ করতে পারে, কোন নিষেধ করতে পারে---যেমন তার ইচ্ছা।
টিকাঃ
২৯২. বুখারী ইফা. হা/১৯০৭, আথ, হা/১৮৯৫, তাও. হা/২০৩৮, মুসলিম মাশা. হা/৫৮০৭
২৯৩. সূরা ত্বহা-২০:১২০
২৯৪. সূরা আল আ'রাফ-৭:২০