📄 মানুষের দুর্বলতা
শয়তানের এটি একটি মাধ্যম। মানব-মনে বহু দুর্বলতা আছে। আসলে সেগুলি এক-একটি রোগ। এই রোগসমূহকে মানব-মনে বৃদ্ধি করে এবং তার মাঝে তাকে ভ্রষ্ট করার উন্মুক্ত দরজা লাভ করে। এমন রোগ যেমন: অক্ষমতা, নিরাশা, হতাশা, গর্ব, গর্বযুক্ত আনন্দ, আত্মমুগ্ধতা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্য, অহংকার, অত্যাচার, বিদ্রোহ, অস্বীকার, অকৃতজ্ঞতা, শীঘ্রতা, আবেগ, কার্পণ্য, বিতর্ক-প্রিয়তা, সন্দেহ, সংশয়, অজ্ঞতা, উদাসীনতা, প্রতারণা, মিথ্যা দাবী, ভীরুতা, ত্রাস, ধৈর্যহীনতা, সীমা লংঘন, বিষয়াসক্তি, অর্থলোলুপতা ইত্যাদি।
ইসলাম মানুষকে আত্মার সংশুদ্ধির প্রতি আহবান করে, মন পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তার সকল রোগকে নির্মূল করতে উৎসাহিত করে। আর এ কাজে প্রয়োজন আছে শ্রম ও চেষ্টা ব্যয়ের। যেমন প্রয়োজন আছে সে পথের কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করা।
পক্ষান্তরে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ এবং মন্দপ্রবণ মনের আনুগত্য বাধাহীন পথের দুর্বার গতি।
প্রথম কাজটি হল ভারী পাথর মাথায় উঁচু পাহাড়ে চড়ার মতো কঠিন এবং দ্বিতীয় কাজটি হল উঁচু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নামার মতো সহজ। এই জন্য শয়তানের আহবানে সাড়া পড়ে বেশি। পক্ষান্তরে হকের দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার লোক অতি নগণ্য, তাতে সাড়া দেওয়া বড় কঠিন।
এ অবসরে আমরা পাঠকের খিদমতে সলফদের কতিপয় উক্তি উদ্ধৃত করব, যার মাধ্যমে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে যে, শয়তান কীভাবে মানুষের দুর্বলতাসমূহের সুযোগ নিয়ে তাকে পথভ্রষ্ট করে।
মু'তামির বিন সুলাইমান বলেন, তাঁর পিতা বলেছেন, 'আমাকে বর্ণিত করা হয়েছে যে, কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান আদম সন্তানের দুঃখ ও আনন্দের সময় তার হৃদয়ে কুমন্ত্রণা দেয়। অতঃপর আল্লাহর যিক্র করা হলে আত্মগোপন করে। ²⁷⁷
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেছেন, 'এক পাদরীর নিকট শয়তান প্রকাশ পেলে সে তাকে জিজ্ঞাসা করল, "আদম সন্তানের কোন্ কোন্ চরিত্র তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য বেশি সহায়ক?" সে বলল, "উগ্রতা। বান্দা উগ্র হলে আমরা তাকে উলট-পালট করি, যেমন শিশুরা বলকে উলট-পালট করে।”²⁷⁸
ইবনে উমার কর্তৃক বর্ণিত, একদা নূহ (আঃ) শয়তানকে সেই চরিত্রাবলী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন, যার দ্বারা সে মানুষকে সর্বনাশগ্রস্ত করতে পারে। শয়তান বলল, 'হিংসা ও লোভ।'
কুরআনের সে ইতিহাস কারো অজানা নয়, যাতে শয়তান হিংসার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মাঝে কেমন শত্রুতা সৃষ্টি করেছিল এবং তারা তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। পরিশেষে এক সময় তিনি মহান প্রতিপালকের প্রশংসা করে বলেছিলেন,
وَقَدْ أَحْسَنَ بَي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاء بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ مِن بَعْدِ أَن نَّزِغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
"তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”²⁷⁹
টিকাঃ
২৭৭. তাফসীর ইবনে কাষীর ৮/৪৫০
২৭৮. তালবীসু ইবলীস ৪২পৃ.
২৭৯. সূরা ইউসুফ-১২:১০০
📄 নারী
ভালো মানুষকে খারাপ ও সৎকে পথভ্রষ্ট করার শয়তানের একটি অসীলা হল নষ্ট-ভ্রষ্ট নারী। এ ব্যাপারে নবী আমাদেরকে জানিয়েছেন,
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
"আমি আমার পর পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক অন্য কোন ফিত্না ছাড়লাম না।”²⁸⁰
ললনার ছলনার চাইতে বেশি বড় ফিতনার কারণ হল তার দেহ-সৌন্দর্য। এই জন্য ইসলাম পর পুরুষের কাছে তাকে পর্দার নির্দেশ দিয়েছে এবং তার দেহ-সৌন্দর্যকে গোপন করতে আদেশ করেছে। পুরুষকে নির্দেশ দিয়েছে চক্ষু অবনত করতে এবং নিষেধ করেছে চোখ তুলে নারী-সৌন্দর্যের দিকে তাকাতে। কারণ শয়তান তাকে অসীলা বানিয়ে পুরুষকে বিপথগামী করে। নবী বলেছেন,
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
"মেয়ে মানুষের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে।”²⁸¹
ইসলাম নিষেধ করেছে নারী-পুরুষের একাকিত্ব বা নির্জনতা অবলম্বন করতে। কারণ শয়তান তাতে সুযোগ গ্রহণ করে। নবী বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ثَالِثُهُمَا
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী হয়।”²⁸² "তোমরা এমন মহিলাদের নিকট গমন করো না, যাদের স্বামী বর্তমানে উপস্থিত নেই। কারণ শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের রক্ত-শিরায় প্রবাহিত হয়।" আমরা বললাম, 'আর আপনারও রক্ত-শিরায়?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমারও রক্ত-শিরায়। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সহায়তা করেন বলেই আমি নিরাপদে থাকি।"²⁸³
আধুনিক যুগে নারীদেহ বড় সুলভ ও সহজলভ্য। না চাইলেও দেখা যায়। আর ছবিতে ও প্রচার মাধ্যমে তো নারীকে নিয়ে পুরুষের সর্বশেষ কামনা চরিতার্থ করতেও দেখা যায়! প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শয়তানের ভাই-বন্ধুরা নগ্ন নারীদেহ দ্বারা ভালো মানুষকে যেভাবে ভ্রষ্ট করছে, তাদের কাছে খোদ শয়তানও হার মানবে।
টিকাঃ
২৮০. বুখারী ইফা, হা/৪৭২৫, আপ্র. হা/৪৭২৩, তাও, হা/৫০৯৬, মুসলিম মাশা, হা/৭১২১
২৮১. সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/১১৭৩, মিশকাত হাএ. হা/৩১০৯
২৮২. সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/৯৩৪
২৮৩. ইবনে মাজাহ তাউ. হা/১৭৭৯, সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/৯৩৫
📄 বিষয়াসক্তি
বিষয়াসক্তি, দুনিয়া-প্রীতি, গদির লোভ ও ধনলোভ শয়তানের একটি হাতিয়ার। এটি প্রত্যেক পাপের মূল। এর কারণে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, কত নারী বিধবা হচ্ছে, কত শিশু অনাথ হচ্ছে, কত ধন-সম্পত্তি লুণ্ঠিত হচ্ছে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।
📄 গান-বাজনা
গান-বাজনার তীর দ্বারা শয়তান কত মানুষের হৃদয়কে শিকার করে এবং কত ভালো মনকে খারাপ করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, "আল্লাহর দুশমনের জাল ও ফাঁদসমূহের একটি হল তাই, যা দিয়ে সে স্বল্প বুদ্ধি, ইলম ও দ্বীনের মানুষদেরকে প্রতারিত করেছে এবং অজ্ঞ ও অকমণ্য লোকেদের হৃদয়কে শিকার করেছে, আর তা হল শিস ও হাততালি শোনা, নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্রের সাথে গাওয়া গান শোনা। যার দ্বারা শয়তান কুরআন থেকে হৃদয়সমূহকে ফিরিয়ে নেয় এবং ফাসেকী ও পাপাচরণে আবদ্ধ রাখে। বলা বাহুল্য, তা হল শয়তানী কুরআন এবং রহমান ও হৃদয়ের মাঝে মোটা পর্দা। তা হল ব্যভিচার ও সমকামের মন্ত্র। এর মাধ্যমে শয়তান বহু অকেজো মনকে প্রতারিত করেছে। চক্রান্ত ও প্রতারণা করে তার কাছে তা সুশোভিত করেছে। বাতিল সন্দেহ অহী করে তার কাছে হালাল প্রতীয়মান করেছে। আর সে তার অহীকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং তার ফলে আল্লাহর অহী কুরআনকে বর্জন করেছে!”²⁸⁴
আজব ব্যাপার এই যে, বহু মানুষ আছে, যারা গান-বাজনার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে, হেলে-দুলে, নেচে-গেয়ে তাদের ধারণা মতে আল্লাহকে খোশ করে! রহমানী কথামালা বর্জন করে শয়তানী কথামালা দ্বারা রহমানকে তুষ্ট করবে মনে করে!
এই শয়তানী কথামালা বা অবৈধ গানকে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম অনেক নাম দিয়েছেন। যেমন: অসার বাক্য, তামাশা বাক্য, বাতিল বাক্য, ঝুটা বাক্য, ব্যভিচারের মন্ত্র, শয়তানী কুরআন, মুনাফিকী উৎপাদক বাক্য, আহমকের শব্দ, পাপময় শব্দ, শয়তানী শব্দ, শয়তানের বাঁশী, শয়তানী সুর ইত্যাদি।
এই শ্রেণীর অশ্লীল, কুফরী, শির্কী, বিদআতী ও অর্থহীন অসার কবিতা দ্বারাও শয়তান বহু মানব-মনকে শিকার করে। যেহেতু মানুষ যে ব্যাপারে দুর্বল সেই দরজা দিয়ে তার মনের মণিকোঠায় প্রবেশ করে। নবী বলেছেন,
مَا مِنْ رَاكِبٍ يَخْلُو فِي مَسِيرِهِ بِالله وَذِكْرِهِ إِلا كَانَ رِدْفَهُ مَلَكٌ وَلَا يَخْلُو بِشِعْرٍ وَنَحْوِهِ إِلَّا كَانَ رِدْفَهُ شَيْطَانٌ
“যে মুসাফির আল্লাহ ও তাঁর যিক্র নিয়ে একান্ততা অবলম্বন করে, ফিরিস্তা তার সঙ্গী হন। আর যে কাব্য-চিন্তা নিয়ে একান্ততা অবলম্বন করে, শয়তান তার সঙ্গী হয়।”²⁸⁵ মহান আল্লাহ 'কবিগণ' সূরায় সেই কথার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ - تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ - يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ - وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ - أَلَمْ تَرَى أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ - وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ
অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। ওরা কান পেতে থাকে এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সকল বিষয়ে কল্পনাবিহার করে থাকে? এবং তা বলে, যা করে না। ²⁸⁶
#### ঘুঙুর বা ঘন্টি শয়তানের বাঁশী
নবী বলেছেন,
الْجَرَسُ مَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ
"ঘন্টি হল শয়তানের বাঁশী। "²⁸⁷
এই জন্য ফিরিশ্তা সে কাফেলার সঙ্গী হন না, যার সাথে ঘন্টি থাকে। নবী বলেছেন,
لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ
"সেই কাফেলার সঙ্গে (রহমতের) ফিরিশতা থাকেন না, যাতে কুকুর কিংবা ঘুঙুর থাকে।”²⁸⁸ অনুমেয় যে, সে ঘুঙুর যদি কিশোরী বা যুবতীর পায়ে থাকে, তাহলে শয়তানী জালের প্রসার কত হবে? আবার তা যদি কোন নর্তকীর পায়ে থাকে, তার প্রভাব কত হবে?
ঘন্টি যদি শয়তানের বাঁশী হয়, তাহলে নানা শ্রেণীর মিউজিক কার বাঁশী হতে পারে? সুতরাং সেসব শোনা এবং নিজের কোন যন্ত্রে রিং-টন হিসাবে ইউজ করা কী রহমানের বান্দাগণের জন্য শোভনীয় হতে পারে?
টিকাঃ
২৮৪. ইগাষাতুল লাহফান ১/২৪২
২৮৫. ত্বাবারানীর কাবীর হা/৮৯৫, সহীহুল জামে' মাশা. হা/৫৭০৬
২৮৬. সূরা শুআরা-২৬:২২১-২২৬
২৮৭. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৭০
২৮৮. মুসলিম মাশা. হা/৫৬৬৮