📄 মূর্তিপূজার বেদী
শয়তান গায়রুল্লাহ পূজার বেদী তৈরি করতে বড় আগ্রহী। কারণ সেখানে শির্কের আখড়া গড়ে ওঠে, হয়ে ওঠে ঈমান লুটার সুন্দর ঘাঁটি। সে ঘাঁটিতে বসে সে আরাম-সে শিকার ঘায়েল করতে পারে। তাই বিশেষ শ্রেণীর মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে গায়রুল্লাহর পূজাপাঠের ব্যবস্থা করে। নূহ এর সম্প্রদায় বুযুর্গ লোকদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল। তারা তাদের লোকেদেরকে বলেছিল,
لا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلاَ سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
অর্থাৎ, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করো না অদ্দ, সুওয়া', ইয়াগূষ, ইয়াউ'ক ও নাস্ত্রকে। ²⁶⁹
এঁরা ছিলেন নূহ (আঃ) এর জাতির সেই লোক যাঁদের তারা ইবাদত করত। এঁরা এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন যে, আরবেও তাঁদের পূজা শুরু হয়েছিল। তাই ১০ (অদ্দ) 'দূমাতুল জানদাল'এর কাল্ব গোত্রের, سُواع (সুআ) সমুদ্র উপকূলবর্তী গোত্র 'হুযায়েল'-এর, يَغُوْثَ (ইয়াগূস) ইয়ামানের সাবার সন্নিকটে 'জুরুফ' নামক স্থানের 'মুরাদ' এবং 'বানী গুত্বাইফ' গোত্রের, يعوق (য়্যাউক্ব) হামদান গোত্রের এবং (নাস্ত্র) হিমইয়ার জাতির 'যুল কিলাআ' গোত্রের উপাস্য ছিলেন। ²⁷⁰
এই পাঁচটিই হল নূহ (আঃ) এর জাতির নেক লোকদের নাম। যখন এঁরা মৃত্যুবরণ করলেন, তখন লোকেরা তাঁদের কবর যিয়ারত করত এবং সেখানে আল্লাহর ইবাদত করত। তাঁদের কবরের তা'যীম করত। অতঃপর শয়তান তাঁদের ভক্তদের মনে কুমন্ত্রণা দিল যে, তোমরা এঁদের প্রতিমা বানিয়ে নিজেদের ঘরে ও দোকানে স্থাপন কর। যাতে তাঁরা সর্বদা তোমাদের স্মরণে থাকেন এবং তাঁদেরকে খেয়ালে রেখে তোমরাও তাঁদের মত নেক কাজ করতে পার। প্রতিমা বানিয়ে যারা রেখেছিল, তারা যখন মৃত্যুবরণ করল, তখন শয়তান তাদের বংশধরকে এই বলে শির্কে পতিত করল যে, 'তোমাদের পূর্বপুরুষরা তো এঁদের পূজা করত, যাঁদের প্রতিমা তোমাদের বাড়িতে বাড়িতে স্থাপিত রয়েছে।' ফলে তারা এঁদের পূজা করতে আরম্ভ করে দিল। ²⁷¹ আর পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম মূর্তিপূজা।
একটা প্রসিদ্ধ গল্প প্রচলিত আছে। গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সাপ্তাহিক হাট। সেখানে এক পান-ওয়ালা পান বিক্রি করত। এক হাটের দিন সকালে যাওয়ার পথে এক বিশাল বটগাছের নিচে মাথা থেকে পানের ঝুড়ি নামিয়ে বিশ্রাম নিল। পুনরায় ঝুড়ি মাথায় তুলে নিতে যাওয়ার সময় ভর্তি ঝুড়ি থেকে কয়েকটি পান পড়ে গেল। ঝুড়ি নামিয়ে পানগুলিকে তুলে নিতে গিয়ে দেখে শেষ পানটির নিচে শিয়ালের গু রয়েছে। আমানতদার পান-ব্যবসায়ী ভাবল, গু-লাগা পান মানুষকে বিক্রি করা অন্যায় হবে। সুতরাং তা ফেলে রেখে হাটে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর আলু-ওয়ালা সেই পথে হাটে যাচ্ছিল। সে এই সাত সকালে বটগাছের নিচে পান পড়ে থাকতে দেখে অবাক হল। এই গাছের নিচে কেন এই টাটকা পানের পাতা পড়ে আছে? ধাঁ করে তার মনে অস্বাভাবিকতার অন্ধবিশ্বাস দানা বাঁধল। শয়তান তার মনে ফুসমন্ত্র দিল, পানটা কি এমনিই পড়ে আছে? নিশ্চয় কোন কারণ আছে। যে পানটা দিয়ে গেছে, সে নিশ্চয় কোন উপকার বুঝে দিয়ে গেছে। তুইও যদি দু'টো আলু রেখে যাস, তাহলে তোরও উপকার হবে, ব্যবসায় লাভ বেশি হবে। যেমনি ভাবা, অমনি কাজ। ঝুড়ি থেকে দু'টো আলু নিয়ে পানের পাশে রেখে দিয়ে হাটে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর পিঁয়াজ-ওয়ালাও তাই করল। বেগুন-ওয়ালাই বা বাদ যায় কেন? সেও দু'টো বেগুন রেখে হাটে গেল। যারা হাট করতে যাচ্ছিল, তাদের অনেকেই সেখানে পান, আলু, পিঁয়াজ, বেগুন ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখে ভাবতে লাগল কারণের কথা। শয়তান একই ভাবে তাদের মনে ফুসমন্ত্র দিল। তারাও কোন মঙ্গলের আশায় সেখানে টাকা-পয়সা রেখে হাটে যেতে লাগল।
দুপুরের দিকে পান-ওয়ালা ফিরার পথে নিজের ফেলে যাওয়া পানটির দিকে লক্ষ্য করতেই আজব কান্ড দেখতে পেল। ঝুড়ি নামিয়ে সাথে সাথে সেসব কুড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেও ভাবতে লাগল, সে পানে গু লেগেছিল বলে পান ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু তার পাশে আলু, পিঁয়াজ, বেগুন, পয়সা ইত্যাদি পড়ে কেন?
শয়তান তার মনে ফুসমন্ত্র দিল, 'দ্যাখ! এটা সুবর্ণ সুযোগ। আর পানের ঝুড়ি মাথায় বয়ে মাথায় টাক ফেলতে হবে না। ওখানে একটা আস্তানা বানিয়ে বসে যা, আপ-সে রোজগার হবে।'
যেই চিন্তা, সেই পরিকল্পনা। সন্ধ্যার দিকে কিছু ইট-সিমেন্ট নিয়ে রাতারাতি বটগাছের নিচেটা বাঁধিয়ে দিল এবং তার উপরে একটা কঞ্চির ডগায় সবুজ কাপড় বেঁধে পতাকা গেড়ে দিল। আর তার নিচে পান রেখে দিয়ে তার 'কারামত-ব্যবসা' শুরু করে দিল। ফল ভালই হতে লাগল। পথ বেয়ে যে পথিকই পার হয়ে যায়, সেই তার সাথে থাকা কিছু না কিছু প্রণামি দিয়ে যায়।
ধীরে-ধীরে আয় বাড়তে লাগল। আয় আরো বৃদ্ধির জন্য একটি সাইনবোর্ড ঝুলানোর ব্যবস্থা করল, যাতে লোকমাঝে আস্তানাটি স্বনামে প্রসিদ্ধ হয়।
কিন্তু তার নাম কী দেওয়া যায়? বড় ভাবনা-চিন্তার পর সে নাম আবিষ্কার করল। আস্তানাটির মূল সূত্র যখন শিয়ালের গু থেকে, তখন তার নাম হল 'পীরে-কেবলা আল্লামা শিয়াল-গাযী (রহঃ) এর মাযার'।
আয় বৃদ্ধি পেল। সেই আয় দ্বারা পাশে বিল্ডিং হল, মাযার হল। বার্ষিক মেলা ও উরস অনুষ্ঠান হতে লাগল। নযর-নিয়ায, সেলামি-উপঢৌকন সহ আরো কত কীসের অর্থ-আমদানি হতে লাগল। সরকারী সহযোগিতা ও নিরাপত্তা লাভ করল। যেমন মুশরিক সরকারও অর্থ-আয়ের একটা উৎস খুঁজে পেল।
পাকা রাস্তা বা রেল-লাইনের ধারে ধারে এই শ্রেণীর কত মাযার আছে। আর এক শ্রেণীর মানুষ তারই অসীলায় উদরপূর্তি ও অর্থোপার্জন করে। শয়তানী সহায়তায় শির্কের আখড়া সমৃদ্ধি লাভ করে। সরল মুসলিম তারই আকর্ষণে ফেঁসে গিয়ে মুশরিক হয়ে যায়।
আসলে শয়তান হয় তার বিজ্ঞাপক। তার জন্য 'কারামত' সৃষ্টি করা কাজ তারই। আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী কিছু লোকের আশা পূরণ হয় সেখানে। ফলে ঝড়ে কাক মরে, আর শিয়াল-গাযীর কেরামতি বাড়ে।
এক দম্পতির সন্তান হয় না। ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হল না। এক বুড়ির রূপে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, খাসি মানত কর, সন্তান হবে।'
এক লোকের রোগ ভাল হয় না। হোমিওপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি ও কবিরাজি কোন ওষুধ কাজে লাগল না। এক বুড়োর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, মুরগী মানত কর, রোগ ভাল হবে।' একজনের ব্যবসায় নোকসান আর নোকসান যায়। এক শুভানুধ্যায়ীর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, হাজার টাকা মানত কর, ব্যবসায় লাভ হবে।'
একজনের মামলা চলছে, মামলায় জিততে হবে। এক হিতাকাঙ্ক্ষীর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, সিন্নী মানত কর, মামলায় জিত হবে।'
শয়তান সেই আখড়ায় বাসা বাঁধে। সেখানে অবস্থান করে পূজা নিতে থাকে। কোন কোন সময় তার ভক্তদেরকে অলৌকিক কিছু প্রদর্শন করে তাদের ভ্রষ্ট ঈমান পাকা ও মজবুত করে। কখনো গায়বী আওয়াজ শোনায়। কখনো আশা নিয়ে আগত ভক্তদের আশা পূরণ করে। কখনো কাকতালীয়ভাবে সেখানে তাদের আশা পূরণ হয়। তাই তারা সেখানে তাদের প্রয়োজনের কথা জানায়। বিপদে আহবান করে। যুদ্ধের (ও ভোটের) সময় সেখানে বিজয় প্রার্থনা করে। নজর ও নিয়ায নিবেদন করে। সেখানে পশু বলিদান করে। নাচে-গানে-কাওয়ালীতে সরগরম করে। মহা সমারোহে তার জন্য মেলা ও উরস অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। এই (মাটির নিচের ও উপরের) মূর্তির মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ ভ্রষ্ট হয়েছে। যার জন্য ইব্রাহীম (আঃ) মহান আল্লাহর কাছে দু'আ করে বলেছিলেন,
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ - رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ
“হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখ। হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে; সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”²⁷²
টিকাঃ
২৬৯. সূরা নূহ-৭১:২৩
২৭০. ইবনে কাষীর, ফাতহুল ক্বাদীর
২৭১. বুখারী তাও. হা/৪৯২০
২৭২. সূরা ইবরাহীম-১৪:৩৫-৩৬
📄 ভাগ্য-নির্ণায়ক শর
ভাগ্যনির্ণায়ক শর ব্যবহার দ্বারা শয়তান মানুষকে শির্কে আপতিত করে। কারণ অদৃশ্য ও ভাগ্য বিষয়ক জ্ঞান কেবল মহান প্রতিপালকের নিকটেই। কোন সংশয়যুক্ত কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শরীয়তে আমাদের জন্য 'ইস্তিখারাহ' বিধেয় আছে। কিন্তু তা ছেড়ে মানুষ শর বা তীর দ্বারা, ফালকাঠি ও ফালনামা দ্বারা, লিখিত বর্ণমালা বা পাখি ব্যবহার দ্বারা নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জানতে চায়। অথচ তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, জানতে পারে না। আগামীর সফর মঙ্গল হবে, না অমঙ্গল, অমুক জায়গায় বিয়ে শুভ হবে, না অশুভ, অমুক ব্যবসায় লাভ হবে, নাকি ক্ষতি হবে এবং আরো অনেক ভাগ্য-ভবিষ্যতের খবর জানতে মানুষ আগ্রহী ও উদ্গ্রীব হয়, তাএই সুযোগ গ্রহণ করে শয়তান মানুষকে শির্কে লিপ্ত করে।
📄 মানুষের দুর্বলতা
শয়তানের এটি একটি মাধ্যম। মানব-মনে বহু দুর্বলতা আছে। আসলে সেগুলি এক-একটি রোগ। এই রোগসমূহকে মানব-মনে বৃদ্ধি করে এবং তার মাঝে তাকে ভ্রষ্ট করার উন্মুক্ত দরজা লাভ করে। এমন রোগ যেমন: অক্ষমতা, নিরাশা, হতাশা, গর্ব, গর্বযুক্ত আনন্দ, আত্মমুগ্ধতা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্য, অহংকার, অত্যাচার, বিদ্রোহ, অস্বীকার, অকৃতজ্ঞতা, শীঘ্রতা, আবেগ, কার্পণ্য, বিতর্ক-প্রিয়তা, সন্দেহ, সংশয়, অজ্ঞতা, উদাসীনতা, প্রতারণা, মিথ্যা দাবী, ভীরুতা, ত্রাস, ধৈর্যহীনতা, সীমা লংঘন, বিষয়াসক্তি, অর্থলোলুপতা ইত্যাদি।
ইসলাম মানুষকে আত্মার সংশুদ্ধির প্রতি আহবান করে, মন পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তার সকল রোগকে নির্মূল করতে উৎসাহিত করে। আর এ কাজে প্রয়োজন আছে শ্রম ও চেষ্টা ব্যয়ের। যেমন প্রয়োজন আছে সে পথের কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করা।
পক্ষান্তরে কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ এবং মন্দপ্রবণ মনের আনুগত্য বাধাহীন পথের দুর্বার গতি।
প্রথম কাজটি হল ভারী পাথর মাথায় উঁচু পাহাড়ে চড়ার মতো কঠিন এবং দ্বিতীয় কাজটি হল উঁচু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নামার মতো সহজ। এই জন্য শয়তানের আহবানে সাড়া পড়ে বেশি। পক্ষান্তরে হকের দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার লোক অতি নগণ্য, তাতে সাড়া দেওয়া বড় কঠিন।
এ অবসরে আমরা পাঠকের খিদমতে সলফদের কতিপয় উক্তি উদ্ধৃত করব, যার মাধ্যমে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে যে, শয়তান কীভাবে মানুষের দুর্বলতাসমূহের সুযোগ নিয়ে তাকে পথভ্রষ্ট করে।
মু'তামির বিন সুলাইমান বলেন, তাঁর পিতা বলেছেন, 'আমাকে বর্ণিত করা হয়েছে যে, কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান আদম সন্তানের দুঃখ ও আনন্দের সময় তার হৃদয়ে কুমন্ত্রণা দেয়। অতঃপর আল্লাহর যিক্র করা হলে আত্মগোপন করে। ²⁷⁷
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেছেন, 'এক পাদরীর নিকট শয়তান প্রকাশ পেলে সে তাকে জিজ্ঞাসা করল, "আদম সন্তানের কোন্ কোন্ চরিত্র তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য বেশি সহায়ক?" সে বলল, "উগ্রতা। বান্দা উগ্র হলে আমরা তাকে উলট-পালট করি, যেমন শিশুরা বলকে উলট-পালট করে।”²⁷⁸
ইবনে উমার কর্তৃক বর্ণিত, একদা নূহ (আঃ) শয়তানকে সেই চরিত্রাবলী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন, যার দ্বারা সে মানুষকে সর্বনাশগ্রস্ত করতে পারে। শয়তান বলল, 'হিংসা ও লোভ।'
কুরআনের সে ইতিহাস কারো অজানা নয়, যাতে শয়তান হিংসার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মাঝে কেমন শত্রুতা সৃষ্টি করেছিল এবং তারা তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। পরিশেষে এক সময় তিনি মহান প্রতিপালকের প্রশংসা করে বলেছিলেন,
وَقَدْ أَحْسَنَ بَي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاء بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ مِن بَعْدِ أَن نَّزِغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
"তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”²⁷⁹
টিকাঃ
২৭৭. তাফসীর ইবনে কাষীর ৮/৪৫০
২৭৮. তালবীসু ইবলীস ৪২পৃ.
২৭৯. সূরা ইউসুফ-১২:১০০
📄 নারী
ভালো মানুষকে খারাপ ও সৎকে পথভ্রষ্ট করার শয়তানের একটি অসীলা হল নষ্ট-ভ্রষ্ট নারী। এ ব্যাপারে নবী আমাদেরকে জানিয়েছেন,
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
"আমি আমার পর পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক অন্য কোন ফিত্না ছাড়লাম না।”²⁸⁰
ললনার ছলনার চাইতে বেশি বড় ফিতনার কারণ হল তার দেহ-সৌন্দর্য। এই জন্য ইসলাম পর পুরুষের কাছে তাকে পর্দার নির্দেশ দিয়েছে এবং তার দেহ-সৌন্দর্যকে গোপন করতে আদেশ করেছে। পুরুষকে নির্দেশ দিয়েছে চক্ষু অবনত করতে এবং নিষেধ করেছে চোখ তুলে নারী-সৌন্দর্যের দিকে তাকাতে। কারণ শয়তান তাকে অসীলা বানিয়ে পুরুষকে বিপথগামী করে। নবী বলেছেন,
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
"মেয়ে মানুষের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভন করে তোলে।”²⁸¹
ইসলাম নিষেধ করেছে নারী-পুরুষের একাকিত্ব বা নির্জনতা অবলম্বন করতে। কারণ শয়তান তাতে সুযোগ গ্রহণ করে। নবী বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ثَالِثُهُمَا
"যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী হয়।”²⁸² "তোমরা এমন মহিলাদের নিকট গমন করো না, যাদের স্বামী বর্তমানে উপস্থিত নেই। কারণ শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের রক্ত-শিরায় প্রবাহিত হয়।" আমরা বললাম, 'আর আপনারও রক্ত-শিরায়?' তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমারও রক্ত-শিরায়। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সহায়তা করেন বলেই আমি নিরাপদে থাকি।"²⁸³
আধুনিক যুগে নারীদেহ বড় সুলভ ও সহজলভ্য। না চাইলেও দেখা যায়। আর ছবিতে ও প্রচার মাধ্যমে তো নারীকে নিয়ে পুরুষের সর্বশেষ কামনা চরিতার্থ করতেও দেখা যায়! প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শয়তানের ভাই-বন্ধুরা নগ্ন নারীদেহ দ্বারা ভালো মানুষকে যেভাবে ভ্রষ্ট করছে, তাদের কাছে খোদ শয়তানও হার মানবে।
টিকাঃ
২৮০. বুখারী ইফা, হা/৪৭২৫, আপ্র. হা/৪৭২৩, তাও, হা/৫০৯৬, মুসলিম মাশা, হা/৭১২১
২৮১. সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/১১৭৩, মিশকাত হাএ. হা/৩১০৯
২৮২. সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/৯৩৪
২৮৩. ইবনে মাজাহ তাউ. হা/১৭৭৯, সহীহ আত-তিরমিযী মাখ, হা/৯৩৫