📄 মদ
মানুষকে ভ্রষ্ট করার শয়তানের অসীলাসমূহের মধ্যে উক্ত চারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ খবর দিয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। তিনি বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلٍ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ - إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
“হে মু'মিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?”²⁶³
* মদ : প্রত্যেক মাদকদ্রব্য, যার ব্যবহারে মাদকতা ও নেশা সৃষ্টি হয়।
* জুয়া: বাজি, যাতে এক পক্ষের লাভ ও অপর পক্ষের ক্ষতি থাকে।
মূর্তিপূজার বেদী: সে মূর্তি মাটির উপরে থাক অথবা ভিতরে। যা আল্লাহ ব্যতিরেকে তার ইবাদত, উপাসনা বা পূজার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; চাহে তা পাথর হোক অথবা গাছ, প্রতিমা, কবর বা পতাকা।
ভাগ্যনির্ণায়ক শর: যে তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা হয়; ফালকাঠি, ফালনামা ইত্যাদি।
শয়তান উক্ত চার প্রকার জিনিসের মাধ্যমে মানুষকে ভ্রষ্ট করে থাকে। পরন্তু এ জিনিসগুলি এমনিতেই ভ্রষ্টকারী। যেহেতু এগুলির পরিণাম বড় অশুভ ও ক্ষতিকর, এগুলির প্রভাব বড় মন্দ।
মাদকদ্রব্য সেবন করলে মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়। আর জ্ঞানশূন্য হলে মহাপাপ ঘটে, নিষিদ্ধ কর্ম কৃত হয়, সৎকর্ম বর্জিত হয় এবং আল্লাহর বান্দাগণকে কষ্ট দেওয়া হয়। এ কথা নবী বলেছেন-
الخَمْرُ أُمُّ الخَبَائِثِ
"মাদকদ্রব্য সকল জঘন্য কর্মের মা।”²⁶⁴
তিনি আরো বলেছেন, “তোমরা মদ পান করো না, কারণ মদ হল প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি।”²⁶⁵
উষমান বিন আফফান (রাঃ) বলেছেন, “তোমরা মদ থেকে দূরে থাকো। কারণ তা হল সকল নোংরা কাজের প্রধান। তোমাদের পূর্বযুগে একটি লোক ছিল, যে সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করত এবং লোকজন থেকে দূরে থাকত। এক ভ্রষ্ট মেয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলল। সে এক সময় তার দাসী দ্বারা কোন ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়ার নাম করে তাকে ডেকে পাঠাল। সে দাসীর সাথে এসে তার বাড়িতে প্রবেশ করল। এক একটা দরজা পার হতে তা বন্ধ করা হল। অবশেষে এক সুন্দরী মহিলার নিকট পৌঁছল। তার সাথে ছিল একটি কিশোর ও মদের পাত্র।
মেয়েটি বলল, 'আমি আসলে তোমাকে কোন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি। আমি তোমাকে ডেকেছি আমার সাথে মিলন করার জন্য অথবা এই কিশোরকে খুন করার জন্য অথবা এই মদ পান করার জন্য। তাতে যদি তুমি অস্বীকার কর, তাহলে আমি চিৎকার করে তোমার নামে অপবাদ দিয়ে তোমাকে লাঞ্ছিত করব।'
সুতরাং সে যখন নিরুপায় অবস্থা দেখল, তখন মদপানকে হাল্কা মনে করল। বলল, 'ঠিক আছে, আমাকে এক গ্লাস মদ দাও।' সে তা পান করল। কিন্তু সে দ্বিতীয় গ্লাস চাইল। অতঃপর নেশায় চুর হলে সে মেয়েটির সাথে ব্যভিচার করল এবং সবশেষে কিশোরটিকেও খুন করে বসল।
সুতরাং তোমরা মদপান থেকে দূরে থাকো। যেহেতু বান্দার মধ্যে মদ ও ঈমান কখনই একত্র হতে পারে না। আর হলে অদূর ভবিষ্যতে একটি তার সঙ্গীকে বহিষ্কার করে দেয়।”²⁶⁶
এক আনসারী কিছু সাহাবীর জন্য খাবার প্রস্তুত করলেন। মদ হারাম হওয়ার আগে তাদেরকে মদও খেতে দিলেন। সুতরাং তাঁরা মদ খেয়ে আপোসে গর্ব করতে লাগলেন। পরিশেষে মারামারিও শুরু হয়ে গেল। তাঁদের একজন সা'দ বিন আবী অক্কাস নাকে আঘাতপ্রাপ্ত হলেন। ²⁶⁷
এক সাহাবী মদ হারাম হওয়ার পূর্বে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইমামতি করছিলেন। সূরা পড়ার সময় পড়লেন,
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ
অর্থাৎ, বল হে কাফেরদল! আমি তার পূজা করি, যার পূজা তোমরা কর! এরই প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হল,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় স্বলাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা কী বলছ, তা বুঝতে পার।”²⁶⁸
ব্যক্তি, সাংসারিক ও সামাজিক জীবনে মদের অপকারিতা কারো অজানা নয়। শয়তানের কারসাজিতেই তার বাজার বড় রমরমা। ছোটলোক থেকে ভদ্রলোক পর্যন্ত নারী-পুরুষ তার বাজারে ভিড় জমিয়ে থাকে।
জুয়াও মদের মতো নেশাদার কর্ম। তাতে একবার কেউ নেশাগ্রস্ত হলে তাকে ছাড়ানো দুষ্কর। তাতে মানুষের সময় ও অর্থ লুঠ হয়। সৃষ্টি হয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানি।
টিকাঃ
২৬৩. সূরা মায়িদাহ-৫:৯০-৯১
২৬৪. ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৩৬৬৭, সহীহুল জামে' লিল আলবানী, মাশা. হা/৩৩৪৪
২৬৫. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩০৪৩, ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩২৫৯
২৬৬. নাসাঈ মাথ, হা/৫৬৬৬, বাইহাক্বী ১৭১১৬
২৬৭. আদ-দুরুল মানসূর ৩/১৫৮
২৬৮. সূরা আন নিসা-৪:৪৩
📄 জুয়া
জুয়াও মদের মতো নেশাদার কর্ম। তাতে একবার কেউ নেশাগ্রস্ত হলে তাকে ছাড়ানো দুষ্কর। তাতে মানুষের সময় ও অর্থ লুঠ হয়। সৃষ্টি হয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানি।
📄 মূর্তিপূজার বেদী
শয়তান গায়রুল্লাহ পূজার বেদী তৈরি করতে বড় আগ্রহী। কারণ সেখানে শির্কের আখড়া গড়ে ওঠে, হয়ে ওঠে ঈমান লুটার সুন্দর ঘাঁটি। সে ঘাঁটিতে বসে সে আরাম-সে শিকার ঘায়েল করতে পারে। তাই বিশেষ শ্রেণীর মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে গায়রুল্লাহর পূজাপাঠের ব্যবস্থা করে। নূহ এর সম্প্রদায় বুযুর্গ লোকদেরকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল। তারা তাদের লোকেদেরকে বলেছিল,
لا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلاَ سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
অর্থাৎ, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের দেব-দেবীকে; পরিত্যাগ করো না অদ্দ, সুওয়া', ইয়াগূষ, ইয়াউ'ক ও নাস্ত্রকে। ²⁶⁹
এঁরা ছিলেন নূহ (আঃ) এর জাতির সেই লোক যাঁদের তারা ইবাদত করত। এঁরা এত প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন যে, আরবেও তাঁদের পূজা শুরু হয়েছিল। তাই ১০ (অদ্দ) 'দূমাতুল জানদাল'এর কাল্ব গোত্রের, سُواع (সুআ) সমুদ্র উপকূলবর্তী গোত্র 'হুযায়েল'-এর, يَغُوْثَ (ইয়াগূস) ইয়ামানের সাবার সন্নিকটে 'জুরুফ' নামক স্থানের 'মুরাদ' এবং 'বানী গুত্বাইফ' গোত্রের, يعوق (য়্যাউক্ব) হামদান গোত্রের এবং (নাস্ত্র) হিমইয়ার জাতির 'যুল কিলাআ' গোত্রের উপাস্য ছিলেন। ²⁷⁰
এই পাঁচটিই হল নূহ (আঃ) এর জাতির নেক লোকদের নাম। যখন এঁরা মৃত্যুবরণ করলেন, তখন লোকেরা তাঁদের কবর যিয়ারত করত এবং সেখানে আল্লাহর ইবাদত করত। তাঁদের কবরের তা'যীম করত। অতঃপর শয়তান তাঁদের ভক্তদের মনে কুমন্ত্রণা দিল যে, তোমরা এঁদের প্রতিমা বানিয়ে নিজেদের ঘরে ও দোকানে স্থাপন কর। যাতে তাঁরা সর্বদা তোমাদের স্মরণে থাকেন এবং তাঁদেরকে খেয়ালে রেখে তোমরাও তাঁদের মত নেক কাজ করতে পার। প্রতিমা বানিয়ে যারা রেখেছিল, তারা যখন মৃত্যুবরণ করল, তখন শয়তান তাদের বংশধরকে এই বলে শির্কে পতিত করল যে, 'তোমাদের পূর্বপুরুষরা তো এঁদের পূজা করত, যাঁদের প্রতিমা তোমাদের বাড়িতে বাড়িতে স্থাপিত রয়েছে।' ফলে তারা এঁদের পূজা করতে আরম্ভ করে দিল। ²⁷¹ আর পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম মূর্তিপূজা।
একটা প্রসিদ্ধ গল্প প্রচলিত আছে। গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সাপ্তাহিক হাট। সেখানে এক পান-ওয়ালা পান বিক্রি করত। এক হাটের দিন সকালে যাওয়ার পথে এক বিশাল বটগাছের নিচে মাথা থেকে পানের ঝুড়ি নামিয়ে বিশ্রাম নিল। পুনরায় ঝুড়ি মাথায় তুলে নিতে যাওয়ার সময় ভর্তি ঝুড়ি থেকে কয়েকটি পান পড়ে গেল। ঝুড়ি নামিয়ে পানগুলিকে তুলে নিতে গিয়ে দেখে শেষ পানটির নিচে শিয়ালের গু রয়েছে। আমানতদার পান-ব্যবসায়ী ভাবল, গু-লাগা পান মানুষকে বিক্রি করা অন্যায় হবে। সুতরাং তা ফেলে রেখে হাটে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর আলু-ওয়ালা সেই পথে হাটে যাচ্ছিল। সে এই সাত সকালে বটগাছের নিচে পান পড়ে থাকতে দেখে অবাক হল। এই গাছের নিচে কেন এই টাটকা পানের পাতা পড়ে আছে? ধাঁ করে তার মনে অস্বাভাবিকতার অন্ধবিশ্বাস দানা বাঁধল। শয়তান তার মনে ফুসমন্ত্র দিল, পানটা কি এমনিই পড়ে আছে? নিশ্চয় কোন কারণ আছে। যে পানটা দিয়ে গেছে, সে নিশ্চয় কোন উপকার বুঝে দিয়ে গেছে। তুইও যদি দু'টো আলু রেখে যাস, তাহলে তোরও উপকার হবে, ব্যবসায় লাভ বেশি হবে। যেমনি ভাবা, অমনি কাজ। ঝুড়ি থেকে দু'টো আলু নিয়ে পানের পাশে রেখে দিয়ে হাটে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর পিঁয়াজ-ওয়ালাও তাই করল। বেগুন-ওয়ালাই বা বাদ যায় কেন? সেও দু'টো বেগুন রেখে হাটে গেল। যারা হাট করতে যাচ্ছিল, তাদের অনেকেই সেখানে পান, আলু, পিঁয়াজ, বেগুন ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখে ভাবতে লাগল কারণের কথা। শয়তান একই ভাবে তাদের মনে ফুসমন্ত্র দিল। তারাও কোন মঙ্গলের আশায় সেখানে টাকা-পয়সা রেখে হাটে যেতে লাগল।
দুপুরের দিকে পান-ওয়ালা ফিরার পথে নিজের ফেলে যাওয়া পানটির দিকে লক্ষ্য করতেই আজব কান্ড দেখতে পেল। ঝুড়ি নামিয়ে সাথে সাথে সেসব কুড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেও ভাবতে লাগল, সে পানে গু লেগেছিল বলে পান ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু তার পাশে আলু, পিঁয়াজ, বেগুন, পয়সা ইত্যাদি পড়ে কেন?
শয়তান তার মনে ফুসমন্ত্র দিল, 'দ্যাখ! এটা সুবর্ণ সুযোগ। আর পানের ঝুড়ি মাথায় বয়ে মাথায় টাক ফেলতে হবে না। ওখানে একটা আস্তানা বানিয়ে বসে যা, আপ-সে রোজগার হবে।'
যেই চিন্তা, সেই পরিকল্পনা। সন্ধ্যার দিকে কিছু ইট-সিমেন্ট নিয়ে রাতারাতি বটগাছের নিচেটা বাঁধিয়ে দিল এবং তার উপরে একটা কঞ্চির ডগায় সবুজ কাপড় বেঁধে পতাকা গেড়ে দিল। আর তার নিচে পান রেখে দিয়ে তার 'কারামত-ব্যবসা' শুরু করে দিল। ফল ভালই হতে লাগল। পথ বেয়ে যে পথিকই পার হয়ে যায়, সেই তার সাথে থাকা কিছু না কিছু প্রণামি দিয়ে যায়।
ধীরে-ধীরে আয় বাড়তে লাগল। আয় আরো বৃদ্ধির জন্য একটি সাইনবোর্ড ঝুলানোর ব্যবস্থা করল, যাতে লোকমাঝে আস্তানাটি স্বনামে প্রসিদ্ধ হয়।
কিন্তু তার নাম কী দেওয়া যায়? বড় ভাবনা-চিন্তার পর সে নাম আবিষ্কার করল। আস্তানাটির মূল সূত্র যখন শিয়ালের গু থেকে, তখন তার নাম হল 'পীরে-কেবলা আল্লামা শিয়াল-গাযী (রহঃ) এর মাযার'।
আয় বৃদ্ধি পেল। সেই আয় দ্বারা পাশে বিল্ডিং হল, মাযার হল। বার্ষিক মেলা ও উরস অনুষ্ঠান হতে লাগল। নযর-নিয়ায, সেলামি-উপঢৌকন সহ আরো কত কীসের অর্থ-আমদানি হতে লাগল। সরকারী সহযোগিতা ও নিরাপত্তা লাভ করল। যেমন মুশরিক সরকারও অর্থ-আয়ের একটা উৎস খুঁজে পেল।
পাকা রাস্তা বা রেল-লাইনের ধারে ধারে এই শ্রেণীর কত মাযার আছে। আর এক শ্রেণীর মানুষ তারই অসীলায় উদরপূর্তি ও অর্থোপার্জন করে। শয়তানী সহায়তায় শির্কের আখড়া সমৃদ্ধি লাভ করে। সরল মুসলিম তারই আকর্ষণে ফেঁসে গিয়ে মুশরিক হয়ে যায়।
আসলে শয়তান হয় তার বিজ্ঞাপক। তার জন্য 'কারামত' সৃষ্টি করা কাজ তারই। আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী কিছু লোকের আশা পূরণ হয় সেখানে। ফলে ঝড়ে কাক মরে, আর শিয়াল-গাযীর কেরামতি বাড়ে।
এক দম্পতির সন্তান হয় না। ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হল না। এক বুড়ির রূপে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, খাসি মানত কর, সন্তান হবে।'
এক লোকের রোগ ভাল হয় না। হোমিওপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি ও কবিরাজি কোন ওষুধ কাজে লাগল না। এক বুড়োর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, মুরগী মানত কর, রোগ ভাল হবে।' একজনের ব্যবসায় নোকসান আর নোকসান যায়। এক শুভানুধ্যায়ীর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, হাজার টাকা মানত কর, ব্যবসায় লাভ হবে।'
একজনের মামলা চলছে, মামলায় জিততে হবে। এক হিতাকাঙ্ক্ষীর বেশে শয়তান বলে, 'শিয়াল-গাযীর মাযার যা, সিন্নী মানত কর, মামলায় জিত হবে।'
শয়তান সেই আখড়ায় বাসা বাঁধে। সেখানে অবস্থান করে পূজা নিতে থাকে। কোন কোন সময় তার ভক্তদেরকে অলৌকিক কিছু প্রদর্শন করে তাদের ভ্রষ্ট ঈমান পাকা ও মজবুত করে। কখনো গায়বী আওয়াজ শোনায়। কখনো আশা নিয়ে আগত ভক্তদের আশা পূরণ করে। কখনো কাকতালীয়ভাবে সেখানে তাদের আশা পূরণ হয়। তাই তারা সেখানে তাদের প্রয়োজনের কথা জানায়। বিপদে আহবান করে। যুদ্ধের (ও ভোটের) সময় সেখানে বিজয় প্রার্থনা করে। নজর ও নিয়ায নিবেদন করে। সেখানে পশু বলিদান করে। নাচে-গানে-কাওয়ালীতে সরগরম করে। মহা সমারোহে তার জন্য মেলা ও উরস অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে। এই (মাটির নিচের ও উপরের) মূর্তির মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ ভ্রষ্ট হয়েছে। যার জন্য ইব্রাহীম (আঃ) মহান আল্লাহর কাছে দু'আ করে বলেছিলেন,
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ - رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ
“হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখ। হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে; সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”²⁷²
টিকাঃ
২৬৯. সূরা নূহ-৭১:২৩
২৭০. ইবনে কাষীর, ফাতহুল ক্বাদীর
২৭১. বুখারী তাও. হা/৪৯২০
২৭২. সূরা ইবরাহীম-১৪:৩৫-৩৬
📄 ভাগ্য-নির্ণায়ক শর
ভাগ্যনির্ণায়ক শর ব্যবহার দ্বারা শয়তান মানুষকে শির্কে আপতিত করে। কারণ অদৃশ্য ও ভাগ্য বিষয়ক জ্ঞান কেবল মহান প্রতিপালকের নিকটেই। কোন সংশয়যুক্ত কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শরীয়তে আমাদের জন্য 'ইস্তিখারাহ' বিধেয় আছে। কিন্তু তা ছেড়ে মানুষ শর বা তীর দ্বারা, ফালকাঠি ও ফালনামা দ্বারা, লিখিত বর্ণমালা বা পাখি ব্যবহার দ্বারা নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জানতে চায়। অথচ তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না, জানতে পারে না। আগামীর সফর মঙ্গল হবে, না অমঙ্গল, অমুক জায়গায় বিয়ে শুভ হবে, না অশুভ, অমুক ব্যবসায় লাভ হবে, নাকি ক্ষতি হবে এবং আরো অনেক ভাগ্য-ভবিষ্যতের খবর জানতে মানুষ আগ্রহী ও উদ্গ্রীব হয়, তাএই সুযোগ গ্রহণ করে শয়তান মানুষকে শির্কে লিপ্ত করে।