📄 আমলে শিথিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও অলসতা সৃষ্টি
এই কাজেও তার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। যেমন- নবী বলেছেন,
يَعْقِدُ الشَّيْطَانُ عَلَى قَافِيَةِ رَأسِ أَحَدِكُمْ ، إِذَا هُوَ نَامَ ، ثَلَاثَ عُقَدٍ ، يَضْرِبُ عَلَى كُلِّ عُقْدَةٍ : عَلَيْكَ لَيْلٌ طَوِيلٌ فَارْقُدُ، فَإِنِ اسْتَيْقَظَ ، فَذَكَرَ اللَّهَ تَعَالَى الْحَلَّتْ عُقْدَةً ، فَإِنْ تَوَضَّأَ ، الْحَلَّتْ عُقدَةٌ ، فَإِنْ صَلَّى ، الْحَلَّتْ عُقَدُهُ كُلُّهَا ، فَأَصْبَحَ نَشِيطاً طَيِّبَ النَّفْسِ ، وَإِلا أَصْبَحَ خَبِيثَ النَّفْسِ كَسْلَانَ
“যখন তোমাদের কেউ নিদ্রা যায় তখন) তার গ্রীবাদেশে শয়তান তিনটি করে গাঁট বেঁধে দেয়; প্রত্যেক গাঁটে সে এই বলে মন্ত্র পড়ে যে, 'তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি ঘুমাও।' অতঃপর যদি সে জেগে উঠে আল্লাহর যিক্র করে, তাহলে একটি গাঁট খুলে যায়। তারপর যদি ওযু করে, তবে তার আর একটি গাঁট খুলে যায়। তারপর যদি নামায পড়ে, তাহলে সমস্ত গাঁট খুলে যায়। আর তার প্রভাত হয় স্ফূর্তিভরা ভালো মনে। নচেৎ সে সকালে ওঠে কলুষিত মনে ও অলসতা নিয়ে।”²³³ তিনি আরো বলেছেন,
إِذَا اسْتَيْقَظَ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنَامِهِ فَتَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرُ ثَلَاثًا فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَبِيتُ عَلَى خَيْشُومِهِ
“তোমাদের মধ্যে কেউ যখন ঘুম থেকে উঠে উযূ করে, সে যেন তিনবার নাক ঝাড়ে। কেননা শয়তান তার নাকের খুব ভিতরে রাত্রিযাপন করে। "²³⁴ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, এমন একটি লোকের কথা নবী এর নিকট উল্লেখ করা হল, যে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করে। তিনি বললেন,
ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنَيْهِ
"এ এমন এক মানুষ, যার দু' কানে শয়তান প্রস্রাব করে দিয়েছে।”²³⁵ এ হল শয়তানের নিজ কর্ম দ্বারা মানব-মনে আমল-বিমুখতা সৃষ্টি। সে তার কুমন্ত্রণা দ্বারাও অনুরূপ কাজ করে থাকে। সুতরাং তার মনে আলস্য-প্রিয়তার কুমন্ত্রণা দেয়, আমলের সময় 'করছি-করব'-এর দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে। এর সাথে সুদীর্ঘ আশাকে সুবিন্যস্ত করে।
এ প্রসঙ্গে ইবনুল জাওযী (রঃ) বলেছেন, "কত ইয়াহুদী-খ্রিস্টানের মনে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা জাগরিত হয়। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতিহত করে। বলে, 'তাড়াহুড়া করো না, ভালোভাবে ভেবে-চিন্তে দেখো।' সুতরাং এইভাবে তাদের মাঝে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে, ফলে কাফের অবস্থাতেই তাদের মরণ হয়।
এমনিভাবে পাপীকে তওবার ব্যাপারে পিছিয়ে দেয়। তার ইন্দ্রিয়-বাসনা পূরণের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে, কিন্তু তওবার ব্যাপারে কেবল আশা দেয়। কবি বলেছেন,
لا تعجل الذنب لما تشتهي وتأمل التوبة من قابل
অর্থাৎ, আগামীতে তওবার আশা রেখে চাহিদামতো পাপে শীঘ্রতা করো না।
কত প্রকৃত কাজের দৃঢ় সংকল্পের লোককে শয়তান দীর্ঘসূত্রতা দ্বারা পিছিয়ে দিয়েছে। কত উচ্চ মর্যাদা-অভিলাষী ব্যক্তিকে প্রতিহত করেছে। যখনই ফকীহ তার দর্সসমূহের পুনরালোচনা করতে চায়, তখনই সে বলে, 'একটু আরাম কর।' অথবা যখনই কোন আবেদ তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে চায়, তখনই সে বলে, 'এখনও অনেক সময় আছে।' এইভাবে সে মানুষের মনে আলস্যকে প্রিয় করে তোলে এবং আমলকে দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে পিছিয়ে দেয়। আর এর সাথে সুদীর্ঘ আশাকে সুবিন্যস্ত করে।
সুতরাং বুদ্ধিমানের উচিত, বুদ্ধি করে আমল করা। আর বুদ্ধি হল, সময়ের সদ্ব্যবহার করা, দীর্ঘসূত্রতা ত্যাগ করা এবং দুরাশা বর্জন করা। যেহেতু ভয়ানক জায়গা নিরাপদ নয় এবং মৃত (কিয়ামতের আগে) পুনরুত্থিত হবে না। প্রত্যেক ত্রুটি ও অবহেলা এবং মন্দ-প্রবণতার কারণ হল দীর্ঘ দুরাশা। কেননা মানুষ মনে মনে করতে থাকে, এবারে সে মন্দকাজ বর্জন করে ভালো কাজে ব্রতী হবে। কিন্তু সে কেবল নিজের মনকে প্রতিশ্রুতি দেয়। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, যে ব্যক্তি আশা করে যে, সে দিনে চলবে, তার যাত্রা হবে শিথিল। আর যে সকাল হওয়ার আশা করবে, সে রাত্রে দুর্বল আমল করবে। আর যে মৃত্যুকে দ্রুত বলে কল্পনা করবে, সে সত্যই যথার্থরূপে পথ চলবে। কোন কোন সলফ বলেছেন, আমি তোমাদেরকে দীর্ঘসূত্রতা থেকে সতর্ক করছি। কারণ তা ইবলীসের সবচেয়ে বড় সৈন্য।
একজন বিচক্ষণ লোক ও একজন দুরাশাবাদী লোকের উপমা সফরে একটি কাফেলার মতো, যারা একটি জনপদে প্রবেশ করল। অতঃপর বিচক্ষণ ব্যক্তি সেখান হতে তার সফরের পরিপূরক সামগ্রী ক্রয় করল এবং যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত থাকল। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়জন বলল, 'প্রস্তুতি নেব। এখনো হয়তো সফরের এক মাস বাকী।' অতঃপর যথাসময়ে কুচ করে যাওয়ার বাঁশি বেজে উঠল। সুতরাং বিচক্ষণ লোকটি ঈর্ষাযোগ্য হল এবং দুরাশাবাদী হল আফসোসের সাথে দিশাহারা। অনুরূপই হল দুনিয়ার মানুষের উপমা। তাদের মধ্যে কেউ আছে সদা প্রস্তুত ও সজাগ। সুতরাং যে কোন সময়ে তার নিকট 'মালাকুল মাওত' এসে গেলে সে অনুতপ্ত হয় না।
পক্ষান্তরে অন্য কেউ আছে প্রতারিত গয়ংগচ্ছকারী। সে সফরের সময় অনুতাপের তিক্ত-শরবত কষ্টের সাথে পান করতে থাকে।
সুতরাং প্রকৃতিতে শৈথিলতা ও দীর্ঘ দুরাশা থাকে, অতঃপর ইবলীস এসে তাকে তার প্রকৃতি অনুযায়ী আমল করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে সে সময় মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে যে আত্মসচেতন হয় এবং বুঝতে পারে যে, সে আছে যুদ্ধের সৈন্য-সারিতে এবং তার শত্রু তার ব্যাপারে কোন শৈথিল্য করবে না। আর যদিও সে বাহ্যতঃ শৈথিল্য প্রদর্শন করে, অভ্যন্তরে সে কোন চক্রান্ত চালাবে এবং তার জন্য অতর্কিতে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ওঁৎ পেতে থাকার ঘাঁটি পেতে রাখবে।"²³⁶
পূর্ণ গতির আমলের ঘূর্ণমান চাকাকে থমকে দেয় শয়তান। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, কটাক্ষ, সমালোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে ভালো কাজের কাজীকে কাজ ছাড়তে রাজি করে ফেলে। এর ফলে পর্দানশীন পর্দা ছাড়ে, দাড়ি-ওয়ালা দাড়ি কাটে, মসজিদ-মাদ্রাসার দায়িত্বশীল দায়িত্ব ছাড়ে, বহু মুস্বল্লী নামায ছাড়ে, নিঃস্বার্থ সমাজসেবী সমাজসেবা ছাড়ে ইত্যাদি। মানবরূপী এমন দানবদের সমালোচনা ও কটাক্ষে থমকে যায় নেক আমলের প্রবহমান যোত। নাজমুদ্দীন বিন মিনফাখ বলেন, “শুনেছি যে, শয়তান জ্বিনরা চুরি করে ঊর্ধ্ব জগতের কোন খবর শুনতে গেলে তাদেরকে উল্কা ছুঁড়ে মারা হয়। কিন্তু আমি যখন বড় হয়ে তারকা হলাম, তখন বড় বড় শয়তান আমাকে আঘাত করতে লাগল!”
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, যাতে সে শয়তানদেরকেও আল্লাহ অভাবের উল্কা মেরে তাদের স্বভাব পরিবর্তন করেন।
টিকাঃ
২৩৩. বুখারী ইফা. হা/১০৭৬, আপ্র. হা/১০৭১, তাও. হা/১১৪২, মুসলিম মাশা. হা/১৮৫৫
২৩৪. বুখারী ইফা, হা/৩০৬২, আপ্র. হা/৩০৫৩, তাও. হা/৩২৯৫, মুসলিম মাশা. হা/৫৮৭
২৩৫. বুখারী তাও. হা/১১৪৪, মুসলিম মাশা. হা/১৮৫৩
২৩৬. তালবীসু ইবলীস ৪৫৮পৃ.
📄 প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাদান
শয়তান মানুষকে মিথ্যা ওয়াদা দেয় এবং মধুমাখা আশা সঞ্চারিত করে ভ্রষ্টতার পঙ্কে নিপাতিত করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا
“সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র।”²³⁷ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাফেরদেরকে সাহায্য ও বিজয়ের আশা ও প্রতিশ্রুতি দেয়। অতঃপর গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে চম্পট দেয়। যেমন করেছিল বদর যুদ্ধের দিন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَّكُمْ فَلَمَّا تَرَاءتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكُمْ
“স্মরণ কর, শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করেছিল এবং বলেছিল, 'আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হবে না, আর আমি অবশ্যই তোমাদের সহযোগী (প্রতিবেশী)।' অতঃপর দু'দল যখন পরস্পরের সম্মুখীন হল, তখন সে পিছু হটে সরে পড়ল ও বলল, 'নিশ্চয় তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”²³⁸ কাফের ধনীদেরকে পরকালেও ধনী থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের অনেকে বলে,
وَلَئِن رُّدِدتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا
“আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবৃত্ত হই-ই, তাহলে আমি অবশ্যই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব।”²³⁹
وَلَئِن رَّجِعْتُ إِلَى رَبِّي إِنَّ لِي عِندَهُ لَلْحُسْنَى
'আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিতও হই, তাহলে তাঁর নিকট তো আমার জন্য কল্যাণই থাকবে।'
মহান আল্লাহ বলেন, “আমি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে ওদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করব এবং ওদেরকে আস্বাদন করাব কঠিন শাস্তি।” ²⁴⁰
অনেক সময় শয়তান মানুষকে মধুময় বাসনায় বিভোল রাখে, যা বাস্তব জীবনে পূরণ হবার নয়। কিন্তু সে তার মাধ্যমে তাকে ফলপ্রদ উচিত আমল থেকে বিরত রাখে। তখন সে কেবল কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তুষ্ট থাকে এবং কোন কাজ করে না।
টিকাঃ
২৩৭. সূরা আন নিসা-৪:১২০
২৩৮. সূরা আল আনফাল-৮:৪৮
২৩৯. সূরা আল কাহাফ-১৮:৩৬
২৪০. সূরা হা-মীম সাজদাহ-৪১:৫০
📄 মানুষের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষিতা প্রকাশ
শয়তান মানুষকে পাপাচরণের দিকে আহবান করে। কিন্তু বাহ্যতঃ সে প্রকাশ করে, সে তার হিতাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ী। যেমন আমাদের আদি পিতামাতার জন্য সে কসম করে হিতাকাঙ্ক্ষিতা প্রকাশ করেছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ
"সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল, 'আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন। "²⁴¹
এ মর্মে অহাব বিন মুনাব্বিহ আহলে কিতাবদের একটি মজার গল্প বর্ণনা করেছেন। আমরা এখানে তা উল্লেখ করছি, যাতে বুঝতে পারি, শয়তান কীভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। যাতে পাঠক এমন শুভাকাঙ্ক্ষীর উপদেশ গ্রহণ না করে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
তিনি বলেন, বানী ইস্রাঈলের মধ্যে একজন আবেদ লোক ছিল। সে ছিল সে যুগের সবচেয়ে বড় আবেদ। তার সমসাময়িক কালে তিন ভাই ছিল, তাদের ছিল একটি কুমারী বোন। একদা রাজার পক্ষ থেকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাদের নাম এল। ফলে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ল, তারা তাদের বোনকে কার কাছে রেখে যাবে, কে তার দেখাশোনা করবে এবং কে হবে তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল?
পরিশেষে তারা একমত হল যে, বানী ইস্রাঈলের আবেদের কাছে তাকে রেখে যাবে। যেহেতু সে ছিল তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত। সুতরাং তারা তার কাছে এসে আবেদন রাখল যে, তারা তাদের বোনকে তার কাছে রেখে যাবে এবং যুদ্ধ থেকে ফেরা অবধি সে তার হিফাযত ও দায়িত্বে থাকবে। কিন্তু সে তরুণীকে তার কাছে রাখতে অস্বীকার করল এবং তাদের থেকে ও তাদের বোন থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করল। কিন্তু পরবর্তীতে বারবার অনুরোধ করার পর আবেদ রাজী হল। সে তাদেরকে বলল, 'আমার গীর্জার সামনের ঘরে তাকে রেখে যাও।' সুতরাং তারা তাই করল এবং সকল ব্যবস্থা করে দিয়ে যুদ্ধে বের হয়ে গেল।
তরুণী গীর্জার পাশে তপস্বীর প্রতিবেশিনী হয়ে দিন কাটাতে লাগল। সে নিজের ভজনালয়ের দরজার বাইরে খাবার রেখে দিত অতঃপর নিজ জায়গায় প্রবেশ পূর্বক দরজা বন্ধ করে দিয়ে তরুণীকে আওয়াজ দিত, সে তার ঘর থেকে বের হয়ে খাবার নিয়ে যেত। শয়তান যেন আবেদের প্রতি সদয় হল। সে তার মনে অতিরিক্ত কল্যাণকামিতার আগ্রহ সৃষ্টি করল। তার মনে আশঙ্কা সৃষ্টি করল, এইভাবে দিনে-রাতে তরুণীর একাকিনী বের হওয়া সঙ্গত নয়। কেউ দেখে ফেললে তার পিছনে লেগে যেতে পারে। সুতরাং সে যদি নিজে গিয়ে তার দরজার পাশে খাবার রেখে আসে, তাহলে আরো বেশি সওয়াবের অধিকারী হবে।
সুতরাং এক সময় থেকে সে তাই করতে লাগল এবং খাবার নিয়ে গিয়ে তার দরজায় রেখে আসতে লাগল। সে দরজায় করাঘাত করে খাবারের কথা জানিয়ে দিত, কিন্তু তার সাথে কোন কথা বলত না।
এইভাবে কিছুদিন কেটে গেল। অতঃপর ইবলীস এসে তাকে আরো বেশি সওয়াব অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত করল। সুতরাং সে ভাবল, তার ঘরের ভিতরে খাবার পৌঁছে দেওয়া আরো বড় সওয়াবের কাজ।
কিছুদিন আরো অতিবাহিত হল। শয়তান আবার তাকে বলল, 'একটা মানুষ একাকী বাস করছে, তার কত কষ্ট হয়? তার সাথে মাঝে-মধ্যে দু-চারটি ভালো কথা বলতে দোষ কী? তাতে তার মনটাও ফ্রি হবে এবং তার জন্য তোমার অনেক সওয়াব হবে।' সুতরাং সে তার সাথে সান্ত্বনামূলক কথা বলতে শুরু করল।
কিছুদিন পর আবার ইবলীস এসে কুমন্ত্রণা দিল, 'তুমি যদি তার পাশে বসে কথা বলতে, তাহলে তার মনটা আরো খোশ হতো এবং তুমিও বেশি সওয়াব পেতে।' সুতরাং সে তাই করল।
তারপর আবার এসে তাকে ফুসমন্ত্র দিল, যদি তার ঘরে গিয়ে তার সাথে কথা বল, তাহলে আরো ভালো হবে। সুতরাং সে তাই করল। অতঃপর শয়তান তরুণীকে তার চোখে সুশোভিতা করে তুললে সে তাকে চুম্বন করে বসল এবং এক সময় তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল।
কিছু দিনের ভিতরেই তরুণীর গর্ভে সন্তান এসে গেল। এক সময় সে একটি সন্তানও প্রসব করল।
অতঃপর ইবলীস আবেদের কাছে এসে বলল, 'তুমি তো মেয়েটিকে ছেলের মা বানিয়ে দিলে, এখন তার ভাইরা ফিরে এলে কী করবে? তাদেরকে কী জওয়াব দেবে? তুমি তো লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। তুমি বরং একটা কাজ কর, ছেলেটিকে হত্যা করে ফেল। তাহলে তোমার সমস্ত কীর্তি ঢাকা যাবে।' সুতরাং সে শিশুটিকে হত্যা করে ঘরের পাশে একটি গর্তে ফেলে দিল।
তারপর ইবলীস এসে আবার তাকে বলল, 'তুমি কি মনে কর, মেয়েটির ভাইরা এলে সে তাদের কাছে তোমার আচরণের কথা গোপন রাখবে? তোমার ব্যভিচার ও সন্তান হত্যার কথা সে তো তাদেরকে বলে দেবে। তাতে তুমি লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে পারবে না। বরং তুমি মেয়েটিকেও খুন করে গায়েব করে ফেল।' অতএব সে তাই করল এবং তাকে জবাই করে সেই গর্তে ফেলে দিল। তারপর নিজের উপাসনালয়ে উপাসনায় মন দিল। কিছুদিন পর মেয়েটির ভাইগণ যুদ্ধ থেকে ফিরে এল। তারা প্রথমেই আবেদের কাছে এসে তাদের বোনের কথা জিজ্ঞাসা করল। সে তার মৃত্যুর খবর শুনিয়ে দু'আ করে কাঁদতে লাগল। সে তাদেরকে বলল, 'সে খুব ভালো মেয়ে ছিল। এই হল তার কবর।' কবরস্থানের একটি কাঁচা কবরের দিকে ইঙ্গিত করে দেখিয়ে দিল।
তিন ভাই মিলে তার কবরের কাছে এসে কেঁদে কেঁদে দু'আ করতে লাগল। সেখানে তারা কিছু সময় কাটিয়ে নিজেদের বাড়ি ফিরে গেল। রাত্রে শুয়ে যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ল, তখন শয়তান তাদের স্বপ্নে এক মুসাফিরের বেশে এসে বলল, 'তোমাদের বোন মারা যায়নি, তার সাথে আবেদ ব্যভিচার করলে তার সন্তান হয়েছিল। অতঃপর সে ঐ সন্তান ও তোমার বোনকে হত্যা করে ঘরের পাশে একটি গর্তে ফেলে দিয়েছে। তোমরা গিয়ে দেখতে পার।'
তিন ভাইই একই রাতে একই স্বপ্ন দেখল। তারা সকলেই দারুণ অবাক হল। কেউ বলল, 'এটা অর্থহীন স্বপ্ন। এতে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়।' ছোট ভাইটি বলল, 'পরীক্ষা করে দেখতে দোষ কী?'
সুতরাং তারা সেখানে গিয়ে দেখল, ঘটনা সত্য। গলা কাটা অবস্থায় দু'টি লাশ পড়ে আছে। সুতরাং তারা রাজার দরবারে আবেদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। রাজার সিপাই তাকে গ্রেফতার করে বিচারে শূলি দেওয়ার রায় হল।
সুতরাং যখন তাকে শূলিকাষ্ঠে বাঁধা হল, তখন শয়তান তার কাছে এসে বলল, 'তুমি কি বুঝতে পেরেছ? আমিই তোমার সেই সঙ্গী, যার পরামর্শে তুমি মেয়েটির সাথে ব্যভিচার করলে, তাকে সন্তানের মা বানালে অতঃপর তার সন্তান ও পরে তাকে খুন করলে। আজ যদি তুমি আমার পরামর্শ নাও, তাহলে আমি তোমাকে তোমার এ বিপদ থেকে রক্ষা করব। তুমি আল্লাহকে অস্বীকার কর এবং আমাকে সিজদা কর।' সুতরাং সন্ত্রস্ত অবস্থায় সে কাফের হয়ে গেল। অতঃপর শয়তান অদৃশ্য হয়ে গেল। যথাসময়ে আবেদের শূলি হয়ে গেল। ²⁴²
এই গল্পটি সাধারণতঃ মুফাস্সিরগণ নিম্নোল্লিখিত আয়াতের তফসীরে উল্লেখ করে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ
অর্থাৎ, (ওরা) শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে, 'কুফরী কর।' অতঃপর যখন সে কুফরী করে, তখন শয়তান বলে, 'তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, নিশ্চয় আমি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।' ²⁴³ তাঁরা বলেন, আয়াতে উদ্দেশ্য হল উক্ত আবেদের মতো লোকেরা, যারা শয়তানের চক্রান্তে পড়ে ঐভাবে কাফের হয়ে যায়। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
টিকাঃ
২৪১. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:২১
২৪২. তালবীসু ইবলীস, ৩৯পৃ.
২৪৩. সূরা হাশর-৫৯:১৬
📄 ভ্রষ্টকরণে ক্রমান্বয় অবলম্বন
পূর্বোক্ত ঘটনায় আমরা জানতে পেরেছি, শয়তান মানুষকে সরাসরি একবারেই বিভ্রান্ত করে না, বরং সে ক্রমে-ক্রমে ধাপে-ধাপে মানুষকে কুফরীর দিকে নিয়ে যায়। তাতে সে কোন প্রকার তাড়াহুড়া করে না, ক্লান্তি ও বিরক্তিবোধ করে না। একটি পাপে ফেলতে পারলে পরবর্তীতে তুলনামূলক আরো বড় পাপে ফেলতে চেষ্টা করে। পরিশেষে সবচেয়ে বড় পাপে আলিপ্ত করে তাকে ধ্বংসগহ্বরে ধাক্কা দিয়ে নিক্ষেপ করে। আর এ হল বান্দাগণের মাঝে মহান স্রষ্টার একটি রীতি। যখনই তারা বাঁকা পথ অবলম্বন করে, তখনই তাদের উপর শয়তানকে আধিপত্য দেন এবং তাদের হৃদয়কে বাঁকা করে দেন। তিনি মূসা নবী (আঃ) এর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেছেন,
فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
"অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। "²⁴⁴
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ
"এটা এ জন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করেছে, ফলে তাদের হৃদয় মোহর করে দেওয়া হয়েছে, সুতরাং তারা বুঝবে না।”²⁴⁵
টিকাঃ
২৪৪. সূরা আস-স্বফ-৬১:৫
২৪৫. সূরা মুনাফিকুন-৬৩:৩