📄 শয়তান-জগৎ ও মনুষ্য-জগতের মাঝে যুদ্ধের সেনাপতি
ইবলীসই হল মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের সেনাপতি। সেই হল শয়তানদের মহান নেতা। সেই বিভিন্ন অভিযানে সৈন্য প্রেরণ করে, সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেয়। পরিশেষে নিজ সিংহাসনে বসে সৈন্যদের নিকট থেকে অভিযানের ফলাফল ও জয়-পরাজয়ের রিপোর্ট সংগ্রহ করে। প্রত্যেকের কাজের হিসাব নেয় এবং যে সবচেয়ে ভালো কাজ (তার মানে সবচেয়ে জঘন্য কাজ) করতে পারে, সে সম্মানপ্রাপ্ত হয়। নবী বলেছেন,
إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ، فَيُدْنِيهِ مِنْهُ وَيَقُولُ نِعْمَ أَنْتَ، فَيَلْتَزِمُهُ
"ইবলীস পানির উপর তার সিংহাসন রেখে (ফিতনা ও পাপের) অভিযান-সৈন্য পাঠায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তার নৈকট্য লাভ করে সে, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। অতঃপর প্রত্যেকে কাজের হিসাব দেয়; বলে, 'আমি এই করেছি।' সে বলে, 'তুমি কিছুই করনি।' একজন এসে বলে, 'আমি এক দম্পতির মাঝে ঢুকে পরস্পর কলহ বাধিয়ে পরিশেষে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি।' তখন শয়তান সিংহাসন ছেড়ে উঠে এসে তাকে আলিঙ্গন করে বলে, 'হ্যাঁ। (তুমিই কাজের মতো কাজ করেছ!)”²⁰¹
শয়তানের সিংহাসন সমুদ্রের উপর। সেখান থেকে সারা পৃথিবীতে অভিযান চালায়। সুদক্ষ সেনাপতি, অভিজ্ঞতায় প্রাচীন ও পরিপক্ব। পরিকল্পনায় নির্ভুল ও নিখুঁত। জাল বিস্তার করা, ফাঁদ পাতা, অতর্কিতে আক্রমণের জন্য ওঁৎ পেতে থাকার ঘাঁটি স্থাপন করার ব্যাপারে সে সুনিপুণ কারিগর। সমস্ত রণকৌশল তার নখদর্পণে। এ ব্যাপারে সে সর্বশক্তিমানের কাছে শক্তি চেয়ে নিয়েছে, তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য তা তাকে দানও করেছেন।
قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ - قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ - إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ
"সে (ইবলীস) বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।' তিনি (আল্লাহ) বললেন, 'যাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।”²⁰²
বাস্! সে কিয়ামত পর্যন্ত অবিরাম অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের অভিযান চালিয়ে যাবে। সে প্রতিজ্ঞা করে মহান প্রতিপালককে বলেছে,
وَعِزَّتِكَ يَا رَبِّ لَا أَبْرَحُ أُغْوِي عِبَادَكَ مَا دَامَتْ أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْسَادِهِمْ
"আপনার ইয্যতের কসম হে রব! আমি আপনার বান্দাদিগকে অবিরামভাবে ভ্রষ্ট করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের দেহের মধ্যে তাদের প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে।"
তবে বান্দাগণের প্রতি মহান করুণাময় প্রতিপালকের মহা করুণা এই যে, তিনি বলেছেন,
وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا أَزَالُ أَغْفِرُ لَهُمْ مَا اسْتَغْفَرُونِي
"আর আমার ইয্যত ও প্রতাপের কসম! আমি অবিরাম তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব, যতক্ষণ তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে।”²⁰³
টিকাঃ
২০১. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৪
২০২. সূরা আল হিজ্বর-১৫:৩৬-৩৮
২০৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১১২৩৭, হাকেম, মাশা. হা/৭৬৭২
📄 জ্বিন ও ইনসান থেকে শয়তানের সিপাই
সমরাভিযানে শয়তানের দুই শ্রেণীর সিপাই আছে: এক শ্রেণী জ্বিন জাতিভুক্ত এবং অন্য শ্রেণী মনুষ্য জাতিভুক্ত। জ্বিন জাতিভুক্ত সিপাই প্রেরণ করে সিংহাসনে বসে হিসাব নেওয়ার হাদীস ইতিপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। আর মহান আল্লাহ তাকে অভিযান চালানোর ব্যাপারে এখতিয়ার ও অনুমতি দিয়েছেন। তিনি তাকে বিতাড়িত করার সময়ই বলেছিলেন,
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الأَمْوَالِ وَالأَوْلادِ وَعِدُهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا
"তোমার আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্যে যাকে পার সত্যচ্যুত কর, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যাও ও তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র।”²⁰⁴ সুতরাং তার অভিযানে আছে অশ্বারোহী-বাহিনী ও পদাতিক-বাহিনী। মানুষের প্রতি তা প্রেরণ করে প্রত্যহ অসংখ্য মানুষকে বন্দী করে। কাফেরদের প্রতিও তার অভিযান চলে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُهُمْ أَنَّا
"তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে রেখেছি; তারা তাদেরকে মন্দকর্মে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করে থাকে।”²⁰⁵
টিকাঃ
২০৪. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৬৪
২০৫. সূরা মারইয়াম-১৯:৮৩
📄 প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে আছে শয়তান সঙ্গী
প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে যেমন ফিরিস্তা থাকেন, তেমনি সর্বক্ষণের জন্য একটি শয়তান জ্বিন সঙ্গীও থাকে। এই সঙ্গী সর্বদা তাকে মন্দের দিকে ধাবিত করতে থাকে।
একদা রাত্রি বেলায় মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সতীনদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করলে নবী তাঁকে বললেন, “আয়েশা! তোমাকে তোমার শয়তান ধরেছে।” আয়েশা বললেন, 'আপনার কি শয়তান নেই?' তিনি বললেন,
مَا مِنْ آدَمِيٌّ إِلَّا لَهُ شَيْطَانٌ
অর্থাৎ, এমন কোন আদম-সন্তান (আদমী বা মানুষ) নেই, যার শয়তান নেই। আয়েশা বললেন, 'আর আপনি হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, “আর আমিও। তবে আমি তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছি, তাই আমি নিরাপদ থাকি।”²⁰⁶ রসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنَّ وَقَرِينُهُ مِنَ الْمَلَائِكَةِ
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে তার সঙ্গী জ্বিন ও সঙ্গী ফিরিস্তা নিযুক্ত নেই।” লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেন, “আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার (জ্বিন সঙ্গীর) বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেন বলে আমি নিরাপদে থাকি। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দিতে পারে না।”²⁰⁷ মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضُ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
"যে ব্যক্তি পরম দয়াময় আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হয়, তিনি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করেন, অতঃপর সে হয় তার সহচর। "²⁰⁸
وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاء فَزَيَّنُوا لَهُم مَّا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِم مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَاسِرِينَ
"আমি ওদের সঙ্গী দিয়েছিলাম, যারা ওদের অতীত ও ভবিষ্যৎকে ওদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল। ওদের ব্যাপারে ওদের পূর্ববর্তী জ্বিন এবং মানুষদের ন্যায় শাস্তির কথা বাস্তব হয়েছে। নিশ্চয় ওরা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত। "²⁰⁹
টিকাঃ
২০৬. বাইহাক্বী ২৫৫২, হাকেম, মাশা, হা/৮৩২, ইবনে হিব্বান ১৯৩৩, সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, মাশা, হা/৬৫৪
২০৭. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৬-৭২৮৭
২০৮. সূরা আয যুখরুফ-৪৩:৩৬
২০৯. সূরা হা-মীম সাজদাহ-৪১:২৫
📄 শয়তানের বন্ধু-বান্ধব
শয়তানের প্রচুর মানুষ বন্ধু আছে, যারা তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে। তারা তার পথে চলে, তার ইশারা ও ইঙ্গিতে উঠা-বসা করে। তার মতে মত দেয়। অথচ সে তাদের এমন শত্রু, যে সর্বদা তাদের অকল্যাণ ও ধ্বংস কামনা করে। আর সে মানুষ কত বোকা, যে নিজ শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সম্বোধন করে বলেছেন,
أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاء مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا
"তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করবে; অথচ তারা তোমাদের শত্রু? সীমালংঘনকারীদের পরিবর্ত কত নিকৃষ্ট!”²¹⁰ প্রতিপালকের এ সতর্কবাণী অমান্য করে যে শত্রু শয়তানকে নিজের বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে অবশ্যই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا
"যে আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, নিশ্চয় সে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। "²¹¹
শয়তানের বন্ধুরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেহেতু শয়তান তাদের হৃদয়কে মরুভূমি বানিয়ে দেবে, তাদেরকে হিদায়াতের আলো থেকে বঞ্চিত করবে এবং ভ্রষ্টতা ও সংশয়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত (শয়তান সহ অন্যান্য উপাস্য)। এরা তাদেরকে (ঈমানের) আলোক থেকে (কুফরীর) অন্ধকারে নিয়ে যায়। এরাই দোযখের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”²¹²
তারা ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ তাদের বন্ধু তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ
"সে তো তার দলবলকে এ জন্যই আহবান করে যে, ওরা যেন জাহান্নামী হয়। "²¹³
শয়তানের বন্ধু-বান্ধবরা তার তাবেদারি করে, তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তার আশা ও ইচ্ছা পূরণ করে। তারা আসলে শয়তানের বাহন, শয়তানের সৈন্য।
টিকাঃ
২১০. সূরা আল কাহাফ-১৮:৫০
২১১. সূরা আন নিসা-৪:১১৯
২১২. সূরা আল বাক্বারাহ-২:২৫৭
২১৩. সূরা ফাত্বির-৩৫:৬