📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 মুস্তাহাব সামনে রেখে অতিক্রম

📄 মুস্তাহাব সামনে রেখে অতিক্রম


শয়তান চায় মুস্বল্লীর নামায নষ্ট করতে। বিনা সুতরায় নামায পড়লে এবং তার সামনে বেয়ে সিজদার জায়গার ভিতর দিয়ে কেউ পার হয়ে গেলে তার স্বলাত বাতিল হয়ে যায়। এই জন্য মুস্বল্লীর উচিত, তার সামনে বেয়ে কাউকে পার হতে না দেওয়া। কেউ ইঙ্গিত না মানলে তার সাথে বল প্রয়োগ করা। কিন্তু শয়তান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, যাতে সে মুস্বল্লীর সামনে বেয়ে অতিক্রম করে। যাতে মুস্বল্লীর নামায নষ্ট হয়ে যায়।

নবী বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ সামনে সুতরাহ রেখে নামায পড়লে এবং কেউ তার ঐ সুতরার ভিতর দিয়ে পার হতে চাইলে সে যেন তার বুকে ঠেলে পার হতে বাধা দেয় ও যথাসম্ভব রুখতে চেষ্টা করে।” এক বর্ণনায় আছে, "তাকে যেন দু' দু' বার বাধা দেয়। এর পরেও যদি সে মানতে না চায় (এবং ঐ দিকেই পার হতেই চায়) তাহলে সে যেন তার সাথে লড়াই করে। কারণ, (বাধাদান সত্ত্বেও যে বাধা মানে না) সে তো শয়তান। "¹⁶⁸

তিনি বলেন, “সুতরাহ ছাড়া নামায পড়ো না। কাউকে তোমার সামনে বেয়ে পার হতেও দিয়ো না। (সুতরার ভিতর বেয়ে যেতে) সে যদি মানা না মানে, তবে তার সাথে লড়। কারণ, তার সাথে শয়তান আছে। "¹⁶⁹

আবু সাঈদ খুদরী জুমআর দিন একটি থামকে সুতরাহ বানিয়ে নামায পড়ছিলেন। ইত্যবসরে বানী উমাইয়ার এক ব্যক্তি তাঁর ও থামের মাঝ বেয়ে পার হতে গেলে তিনি তাকে বাধা দিলেন। কিন্তু লোকটি পুনরায় পার হওয়ার চেষ্টা করল। তিনি তার বুকে এক থাপ্পড় দিলেন। লোকটি মদীনার গভর্নর মারওয়ানের নিকট তাঁর বিরুদ্ধে নালিশ জানাল। মারওয়ান আবু সাঈদ কে বললেন, 'আপনি আপনার ভাইপোকে মেরেছেন কী কারণে?' আবু সাঈদ বললেন, 'আল্লাহর রসূল বলেছেন,

إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ إِلَى شَيْءٍ يَسْتُرُهُ مِنْ النَّاسِ فَأَرَادَ أَحَدٌ أَنْ يَجْتَازَ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلْيَدْفَعُهُ فَإِنْ أَبَى فَلْيُقَاتِلُهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ

“তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কিছুকে সুতরাহ বানিয়ে নামায পড়ে, অতঃপর কেউ তার ঐ সুতরার ভিতর দিয়ে পার হতে চায়, তবে সে যেন তাকে বাধা দেয়। এতেও যদি সে না মানে, তাহলে সে যেন তার সাথে লড়াই করে। কারণ, সে তো শয়তান।" সুতরাং আমি শয়তানকেই তো মেরেছি! ¹⁷⁰

"কারণ, সে তো শয়তান।” অর্থাৎ, তার এ কাজ শয়তানের কাজ। অথবা তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধকারী হল শয়তান। অথবা তার সাথে আছে শয়তান। অথবা তার সাথে আছে 'ক্বারীন' (শয়তান)।¹⁷¹

টিকাঃ
১৬৮. বুখারী ইফা, হা/৪৮৫, আপ্র. হা/৪৭৯, তাও,, হা/৫০৯, মুসলিম, ইবনে খুযাইমা, মিশকাত, হা/৭৭৭
১৬৯. সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, মাশা. হা/৮০০
১৭০. বুখারী ইফা, হা/৪৮৫, আপ্র. হা/৪৭৯, তাও, হা/৫০৯, মুসলিম, ইবনে খুযাইমা, মিশকাত, হা/৭৭৭, সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, মাশা. হা/৮১৭
১৭১. মুসলিম মাশা. হা/১১৫৮

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 রহমানের অবাধ্যতা মানেই শয়তানের আনুগত্য

📄 রহমানের অবাধ্যতা মানেই শয়তানের আনুগত্য


যখনই কোন বান্দা মহান প্রতিপালকের অবাধ্যতা করে, তখনই সে আসলে শয়তানের আনুগত্য করে। গায়রুল্লাহর ইবাদত করলে, সে ইবাদত হয় আসলে শয়তানের। মহান আল্লাহ বলেছেন,

إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا - لَّعَنَهُ اللَّهُ وَقَالَ لَا تَخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا

"তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল নারীদেরকে (দেবীদেরকে) আহবান করে এবং তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানের পূজা করে। আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) অভিসম্পাত করেছেন এবং সে (শয়তান) বলেছে, 'আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (নিজের দলে) গ্রহণ করবই। "¹⁷²

বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তি কোন প্রতিমা, মাজার, সূর্য, চন্দ্র, মনের খেয়াল-খুশী, নেতা-বুযুর্গ অথবা মতবাদের পূজা করে, সে আসলে শয়তানেরই পূজা করে, সে এ কথা মানুক, চাহে না মানুক। শয়তানই তার পূজা গ্রহণ করে। কারণ, সেই এ পূজায় উদ্বুদ্ধকারী ও আদেশদাতা। এই জন্য ফিরিস্তার উপাসকদল আসলে শয়তানেরই উপাসক। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِم بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ

"যেদিন তিনি এদের সকলকে একত্রিত করবেন এবং ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, 'এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?' ফিরিশতারা বলবে, 'তুমি পবিত্র মহান! আমাদের সম্পর্ক তোমারই সাথে; ওদের সাথে নয়। বরং ওরা তো পূজা করত জ্বিনদের এবং ওদের অধিকাংশই ছিল তাদেরই প্রতি বিশ্বাসী।”¹⁷³

অর্থাৎ, ফিরিস্তাগণ তাদেরকে এ উপাসনার আদেশ দেননি। আসলে আদেশ দিয়েছে জ্বিন, যাতে তারা শয়তানদের পূজা করে, যারা প্রকৃতপক্ষে ফিরিস্তার নামে পূজাগ্রহণকারী। যেমন প্রত্যেক পূজ্য প্রতিমার সাথে থাকে শয়তান।

মোট কথা হল, শয়তান প্রত্যেক মন্দ ও অমঙ্গলের আদেশ ও উৎসাহ দেয় এবং প্রত্যেক ভালো ও মঙ্গলে বাধা সৃষ্টি করে ও ভয় দেখায়। যাতে মানুষ প্রথমটা বরণ করে এবং দ্বিতীয়টা বর্জন করে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,

الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلاً وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়, পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ বিপুল দাতা, সর্বজ্ঞ। "¹⁷⁴ "দারিদ্র্যের ভয় দেখায়" মানে সে বলে, 'দান করলে গরীব হয়ে যাবে।' "জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়" মানে প্রত্যেক নোংরা কাজ, যেমন কৃপণতা, ব্যভিচার ইত্যাদিতে প্ররোচিত করে।

টিকাঃ
১৭১. সূরা আন নিসা-৪:১১৭-১১৮
১৭০. সূরা সাবা-৩৪:৪০-৪১
১৭২. সূরা আন নিসা-৪:১১৭-১১৮
১৭৩. সূরা সাবা-৩৪:৪০-৪১
১৭৪. সূরা আল বাক্বারাহ-২:২৬৮

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 মানুষকে শারীরিক ও মানসিক কষ্টদান

📄 মানুষকে শারীরিক ও মানসিক কষ্টদান


শয়তান যেমন মানুষকে ভ্রষ্ট করে কুফরী, বিদআত ও পাপাচরণে লিপ্ত করে, তেমনি তাকে শারীরিক ও মানসিক যাতনা দিয়ে আনন্দ পায়। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, আমরা এখানে তার কিছু উদ্ধৃত করব।

(ক) রসূল এর উপর হামলা

ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, শয়তান হাতে অগ্নিশিখা নিয়ে নবী এর মুখে ছুড়তে চেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তা প্রতিহত করেছিলেন এবং শয়তানকে তাঁর আয়ত্তাধীন করে দিয়েছিলেন।

(খ) দুঃস্বপ্ন, কুস্বপ্ন ও স্বপ্নদোষ শয়তানের পক্ষ থেকে

স্বপ্ন সাধারণত তিন প্রকার হয়ে থাকে:
> ১. মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে,
> ২. শয়তানের পক্ষ থেকে
> ৩. মনের খেয়ালী কল্পনা।

এ কথা বলেছেন নবী,

الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ فَبُشْرَى مِنْ اللَّهِ وَحَدِيثُ النَّفْسِ وَتَخْوِيفٌ مِنْ الشَّيْطَانِ

"স্বপ্ন হল তিন প্রকারঃ আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, মনের কল্পনা এবং শয়তানের ভীতিপ্রদর্শন। "¹⁷⁵

অন্য এক বর্ণনায় আছে, "শয়তানের পক্ষ থেকে ভয়ানক স্বপ্ন, যার দ্বারা সে আদম-সন্তানকে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে থাকে।"¹⁷⁶ তিনি আরো বলেছেন,

إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يُحِبُّهَا فَإِنَّمَا هِيَ مِنْ اللَّهِ فَلْيَحْمَدُ اللهَ عَلَيْهَا وَلْيُحَدِّثُ بِهَا وَإِذَا رَأَى غَيْرَ ذَلِكَ مِمَّا يَكْرَهُ فَإِنَّمَا هِيَ مِنْ الشَّيْطَانِ فَلْيَسْتَعِذْ مِنْ شَرِّهَا وَلَا يَذْكُرُهَا لِأَحَدٍ فَإِنَّهَا لَا تَضُرُّهُ

"তোমাদের কেউ যখন কোন এমন স্বপ্ন দেখবে, যা সে পছন্দ করে, তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং সে যেন তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে এবং তা অপরের নিকট বর্ণনা করে। পক্ষান্তরে যদি এ ছাড়া অন্য কিছু দেখে, যা সে অপছন্দ করে, তাহলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং সে যেন তার মন্দ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তা অপরের নিকট বর্ণনা না করে। কারণ তা তার কোন ক্ষতি করবে না।"¹⁷⁷

(গ) বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া

মু'মিনের কষ্টতে শয়তানের আনন্দ। এমনকি সুযোগ মতো তার বাড়িতে আগুন ধরিয়েও আনন্দ পায়। যদি সে সেই সময় আল্লাহ সম্বন্ধে কোন অসমীচীন কথা বলে, তাহলে তাতেই তার লাভ।

এই জন্য শোবার সময় আগুন ছেড়ে রাখতে হয় না। বিশেষ করে তেলের প্রদীপ, মশা তাড়াবার জন্য খড়ের ধুয়া ইত্যাদি। কারণ শয়তান সুযোগ বুঝে ইঁদুর ইত্যাদির সাহায্যে বড় অগ্নিকান্ড ঘটাতে পারে। এই জন্য নবী বলেছেন,

غَطُّوا الإِناءَ وَأَوْكُوا السِّقَاءَ وَأَغْلِقُوا الْبَابَ وَأَطْفِئُوا السَّرَاجَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَحُلُّ سِقَاءً وَلَا يَفْتَحُ بَابًا وَلَا يَكْشِفُ إِنَاءً فَإِنْ لَمْ يَجِدُ أَحَدُكُمْ إِلَّا أَنْ يَعْرُضَ عَلَى إِنَائِهِ عُودًا وَيَذْكُرَ اسْمَ اللهِ فَلْيَفْعَلْ فَإِنَّ الْفُوَيْسِقَةَ تُضْرِمُ عَلَى أَهْلِ الْبَيْتِ بَيْتَهُمْ

"(রাত্রে ঘুমাবার আগে) তোমরা পাত্র ঢেকে দাও, পানির মশকের মুখ বেঁধে দাও, দরজা বন্ধ করে দাও, প্রদীপ নিভিয়ে দাও। কেননা, শয়তান মুখ বাঁধা মশক খুলে না, বন্ধ দরজাও খুলে না এবং পাত্রের ঢাকনাও উন্মুক্ত করে না। সুতরাং তোমাদের কেউ যদি পাত্রের মুখে 'বিসমিল্লাহ' বলে আড় করে রাখার জন্য কেবল একটি কাষ্ঠখন্ড ছাড়া অন্য কিছু না পায়, তাহলে সে যেন তাই করে। কারণ ইঁদুর ঘরের লোকজনসহ ঘর পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।"¹⁷⁸ অন্য এক বর্ণনায় আছে,

إِذَا نِمْتُمْ فَأَطْفِئُوا سُرُجَكُمْ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدُلُّ مِثْلَ هَذِهِ عَلَى هُذَا فَتَحْرِقَكُمْ

"যখন তোমরা ঘুমাতে যাবে, তখন বাতিগুলো নিভিয়ে দিয়ো। কারণ শয়তান (ইঁদুর) এর মতো কিছুকে (বাতি) এর প্রতি পথনির্দেশ করে তোমাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলবে।"¹⁷⁹

(ঘ) সংসারে আগুন লাগায় শয়তান

বাইরের আগুন ধরানোর চাইতে মনের আগুন ধরাতে বেশি দক্ষ ইবলীস শয়তান ও তার সাঙ্গোপাঙ্গ। তারা যেমন অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং তার জন্য কোটনা ও দূতী সাজে, তেমনি বৈধ প্রেম-ভালোবাসাকে নষ্ট ও ধ্বংস করার জন্য স্বামী-স্ত্রীর মনে নানা লোভ, সন্দেহ, অনীহা, অহংকার, অভিমান ও রাগ-বিরাগ সৃষ্টি করে। পরিশেষে তা বিবাহ-বিচ্ছেদ পর্যন্তও পৌঁছে দেয় তারা। এমনিতেই নারী দুর্বল, তার উপর সে বঙ্কিম পঞ্জরাস্থি থেকে সৃষ্ট, তাই প্রকৃতিতে সে টেরা। আর তার উপরে শয়তানী প্ররোচনা পেলে আগুনে ঘৃতাহুতি হয়। আর সে আগুনে জ্বলে ছারখার হয়ে যায় পবিত্র বন্ধনের নির্মল ভালোবাসার বহু সুখের সংসার। নবী বলেছেন,

إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ،

“ইবলীস পানির উপর তার সিংহাসন রেখে (ফিতনা ও পাপের) অভিযান-সৈন্য পাঠায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তার নৈকট্য লাভ করে সে, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। অতঃপর প্রত্যেকে কাজের হিসাব দেয়; বলে, 'আমি এই করেছি।' সে বলে, 'তুমি কিছুই করনি।' একজন এসে বলে, 'আমি এক দম্পতির মাঝে ঢুকে পরস্পর কলহ বাধিয়ে পরিশেষে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি।' তখন শয়তান সিংহাসন ছেড়ে উঠে এসে তাকে আলিঙ্গন করে বলে, 'হ্যাঁ। (তুমিই কাজের মতো কাজ করেছ!)"¹⁸⁰

(ঙ) মৃত্যুর সময়ও শয়তান পিছন ছাড়ে না

সব ভালো তার, শেষ ভালো যার। তাই শয়তান চায়, শেষকালে যদি মুসলিমকে বিভ্রান্ত করতে পারে, তাহলে তার দলে একটি লোক বৃদ্ধি পাবে। তাই মরণকালে তার কাছে এসে শয়তানী স্পর্শ করে, যাতে সে কষ্ট পেয়ে কোন খারাপ কথা বলে এবং তার ফলে তার জীবনের গতিবিধি পাল্টে যায়! এ জন্যই নবী মহান প্রতিপালকের নিকট দু'আ করে বলতেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ التَّرَدِّي وَالْهَدَمِ وَالْغَرَقِ وَالْحَرَقِ، وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ يَتَخَبَّطَنِيَ الشَّيْطَانُ عِنْدَ الْمَوْتِ، وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ فِي سَبِيلِكَ مُدْبِراً، وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ لَدِيغاً

অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি পড়ে যাওয়া, ভেঙ্গে (চাপা) পড়া, ডুবে ও পুড়ে যাওয়া থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মৃত্যুকালে শয়তানের স্পর্শ থেকে, তোমার পথে (জিহাদে) পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে মরা থেকে এবং সর্পদষ্ট হয়ে মরা থেকেও আমি তোমার নিকট পানাহ চাচ্ছি। ¹⁸¹

(চ) জন্মের সময় সদ্যোজাত শিশুকে স্পর্শ

ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় শয়তান প্রত্যেক শিশুকে স্পর্শ করে এবং খোঁচা দিয়ে কষ্ট দেয়। নবী বলেছেন,

كُلُّ بَنِي آدَمَ يَمَسُّهُ الشَّيْطَانُ يَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ إِلَّا مَرْيَمَ وَابْنَهَا

“মারয়‍্যাম ও তাঁর পুত্র ব্যতীত প্রত্যেক আদম-সন্তান (শিশু)কে তার মা যেদিন ভূমিষ্ঠ করে, সেদিন শয়তান তাকে স্পর্শ করে।”¹⁸² অন্য এক বর্ণনায় আছে,

كُلُّ بَنِي آدَمَ يَطْعُنُ الشَّيْطَانُ فِي جَنْبَيْهِ بِإِصْبَعِهِ حِينَ يُولَدُ غَيْرَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَهَبَ يَطْعُنُ فَطَعَنَ فِي الْحِجَابِ

“প্রত্যেক আদম-সন্তানের জন্মের সময় তার দুই পাঁজরে শয়তান নিজ আঙ্গুল দ্বারা খোঁচা মারে। তবে ঈসা বিন মারয়‍্যামকে মারেনি। তাঁকে খোঁচা মারতে গিয়ে সে পর্দায় খোঁচা মেরেছিল।”¹⁸³ আর এক বর্ণনায় আছে,

مَا مِنْ بَنِي آدَمَ مَوْلُودٌ إِلَّا يَمَسُّهُ الشَّيْطَانُ حِينَ يُولَدُ فَيَسْتَهِلُ صَارِخًا مِنْ مَسَّ الشَّيْطَانِ غَيْرَ مَرْيَمَ وَابْنِهَا

“এমন কোন নব জাতক আদম-সন্তান নেই, যাকে তার জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করে না। সে সময় সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তবে মারয়‍্যাম ও তাঁর সন্তানের কথা স্বতন্ত্র।” এর কারণ উম্মে মারয়‍্যাম বলেছিলেন,

وَإِنِّي أُعِيدُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ

“(হে আমার প্রতিপালক!) অভিশপ্ত শয়তান হতে তার ও তার বংশধরদের জন্য তোমার পানাহ দিচ্ছি।”¹⁸⁴

উম্মে মারয়‍্যামের উক্ত দু'আ মহান প্রতিপালক কবুল করেছিলেন, তাই শয়তান তাঁর শিশুকন্যা এবং সেই কন্যার সন্তানকে স্পর্শ করতে ও কষ্ট দিতে পারেনি।

হাদীসে আছে, “মহান আল্লাহ তাঁর নবীর জবানে আম্মার বিন ইয়াসির কে শয়তান থেকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।"¹⁸⁵

(ছ) প্লেগ রোগ আসে জ্বিনদের কারণে

রসূলুল্লাহ বলেছেন,

فَنَاءُ أُمَّتِي بِالطَّعْنِ وَالطَّاعُونِ وَخُزُ أَعْدَائِكُمْ مِنَ الْجِنِّ وَفِي كُلِّ شَهَادَةٌ

"আমার উম্মতের ধ্বংস রয়েছে যুদ্ধ ও প্লেগ রোগে; আর তা হল জ্বিন জাতির তোমাদের দুশমনদের খোঁচা। আর উভয়ের মধ্যেই রয়েছে শহীদের মর্যাদা।"¹⁸⁶

অন্য এক বর্ণনায় আছে, "প্লেগ রোগ হল জ্বিন জাতির তোমাদের দুশমনদের খোঁচা। আর তা হল তোমাদের জন্য শহীদী মরণ।”¹⁸⁷ আল্লাহর নবী আইয়ূব এর যে ব্যাধি হয়েছিল, তা আসলে ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَاذْكُرْ عَبْدَنَا أَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الشَّيْطَانُ بِنُصْبٍ وَعَذَابٍ

"স্মরণ কর, আমার দাস আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।"¹⁸⁸

(জ) মহিলাদের অতিরিক্ত রক্তঃক্ষরণ

মহিলাদের মাসিক যথানিয়মে প্রত্যেক মাসে একবার করে আসে। কিন্তু কোন কোন সময় তা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করে এবং অতিরিক্ত খুন আসতে থাকে। শরয়ী পরিভাষায় একে 'ইস্তিহাযাহ' বলে। এটা একটা স্ত্রীরোগ। এ রোগ সৃষ্টি করে শয়তান। নবী হামনা বিনতে জাহ্শকে বলেছিলেন,

إِنَّمَا هَذِهِ رَكْضَةٌ مِن رَكَضَاتِ الشَّيْطَانِ

"এ হল আসলে শয়তানের (লাথি) পদাঘাতের পরিণাম।"¹⁸⁹

(ঝ) মানুষের বাসা ও পানাহারে শয়তানের অংশগ্রহণ

মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের যে সব ক্ষেত্রে শয়তান হস্তক্ষেপ করে কষ্টদান করে, তার মধ্যে একটি এই যে, সে তাদের খাদ্য ও পানীয়তে শরীক হয় এবং বাসস্থানে বাসা বাঁধে। অবশ্য এটা মানুষই নিজেদের দোষে শয়তানকে সে সুযোগ করে দেয়। যখন তারা শরীয়তের নিয়ম-নীতিকে অবজ্ঞা করে এবং মহান প্রতিপালকের যিক্র বিস্মৃত হয়। বলা বাহুল্য, মুসলিম যদি শরয়ী বিধিনিয়ম মেনে চলে এবং যথাসময়ে মহান আল্লাহর যিক্র করে, তাহলে শয়তান তার ধন-সম্পদ, বাসস্থান ও পানাহারে শরীক হওয়ার কোন সুযোগ লাভে সক্ষম হয় না।

শয়তান মানুষের বিশাল ভয়ানক শত্রু, কিন্তু তাকে ঘায়েল করা অতি সহজ। মহান প্রতিপালকের যিক্র-বাণের আঘাতে সহসায় সে ধরাশায়ী হয়ে পড়ে।

সে মানুষের পানাহারে শরীক হয়। কিন্তু মানুষ যদি পানাহারের শুরুতে আল্লাহর নাম নেয়, তাহলে সে খাদ্য ও পানীয় শয়তানের জন্য হারাম হয়ে যায়। তা খেতে সে সক্ষম হয় না।

পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, হুযাইফাহ বলেন, আমরা যখন আল্লাহর রসূল এর সঙ্গে আহারে বসতাম, তখন রসূলুল্লাহ খাবারে হাত রেখে শুরু না করা পর্যন্ত আমরা তাতে হাত রাখতাম না (এবং আহার শুরু করতাম না)। একদা আমরা রসূলুল্লাহ এর সঙ্গে খাবারে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ একটি বাচ্চা মেয়ে এমনভাবে এল, যেন তাকে (পিছন থেকে) ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল এবং সে নিজ হাত খাবারে দিতে উদ্যত হয়েছিল, এমন অবস্থায় রসূলুল্লাহ তার হাত ধরে নিলেন। তারপর এক বেদুঈনও (তদ্রূপ দ্রুত বেগে) এল, যেন তাকে ধাক্কা মারা হচ্ছিল (সেও খাবারে হাত রাখতে উদ্যত হলে) রসূলুল্লাহ তার হাতও ধরে নিলেন এবং বললেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَسْتَحِلُّ الطَّعَامَ أَنْ لاَ يُذْكَرَ اسْمُ اللَّهِ تَعَالَى عَلَيْهِ وَإِنَّهُ جَاءَ بِهَذِهِ الجَارِيَةِ لِيَسْتَحِلَّ بِهَا ، فَأَخَذْتُ بِيَدِهَا ، فَجَاءَ بِهَذَا الْأَعْرَابِي لِيَسْتَحِلَّ بِهِ ، فَأَخَذْتُ بِيَدِهِ ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، إِنَّ يَدَهُ فِي يَدِي مَعَ يَدَيْهِمَا

“যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, অবশ্যই শয়তান সে খাদ্যকে হালাল মনে করে। আর এ মেয়েটিকে শয়তানই নিয়ে এসেছে, যাতে ওর বদৌলতে নিজের জন্য খাদ্য হালাল করতে পারে। কিন্তু আমি তার হাত ধরে ফেললাম। তারপর সে বেদুঈনকে নিয়ে এল, যাতে ওর দ্বারা খাদ্য হালাল করতে পারে। কিন্তু আমি ওর হাতও ধরে নিলাম। সেই মহান সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ আছে, শয়তানের হাত ঐ দু’জনের হাতের সঙ্গে আমার হাতে (ধরা পড়েছিল)।" অতঃপর তিনি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আহার করলেন। ¹⁹⁰

রসূলুল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন রাত্রে আল্লাহর নাম নিয়ে বাড়ির দরজা বন্ধ করে, খাদ্য ও পানপাত্র ঢেকে বা বন্ধ রেখে আমাদের ধন-সম্পদ ও খাদ্যাদি শয়তানের ভোগ-দখল থেকে রক্ষা করি। তিনি বলেছেন,

إِذَا كَانَ جُنْحُ اللَّيْلِ - أَوْ أَمْسَيْتُمْ - فَكُفُّوا صِبْيَانَكُمْ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْتَشِرُ حِينَئِذٍ فَإِذَا ذَهَبَ سَاعَةٌ مِنَ اللَّيْلِ فَخَلُّوهُمْ وَأَغْلِقُوا الْأَبْوَابَ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَفْتَحُ بَابًا مُغْلَقًا

"সন্ধ্যা হলে শিশুদেরকে বাইরে ছেড়ো না। কারণ ঐ সময় শয়তানদল ছড়িয়ে পরে। রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হলে তাদেরকে ছেড়ে দাও। (শয়নকালে) সমস্ত দরজা অর্গলবদ্ধ কর এবং (সেই সাথে) আল্লাহর নামের স্মরণ নাও। কারণ, শয়তান বন্ধ দরজা খোলে না।"¹⁹¹

অন্য এক বর্ণনায় আছে, “পাত্র আবৃত কর, মশক বেঁধে দাও, দরজা বন্ধ করে দাও, বাতি নিভিয়ে দাও। যেহেতু শয়তান ('বিসমিল্লাহ' বলে) বাঁধা মশক খোলে না, বন্ধ দরজা খোলে না এবং ঢাকা পাত্রও খোলে না।”¹⁹² দাঁড়িয়ে পানি পান করলে, সে পানে শয়তান অংশী হয়! নবী এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে দাঁড়িয়ে পান করছে। তিনি তাঁকে বললেন, "বমি করে ফেলো।” সে বলল, 'কেন?' তিনি বললেন, "তুমি কি এতে খুশী হবে যে, তোমার সাথে বিড়ালও পান করুক?" সে বলল, 'না।' তিনি বললেন,

فَإِنَّهُ قَدْ شَرِبَ مَعَكَ مَنْ هُوَ شَرٌّ مِنْهُ، الشَّيْطَانُ

"কিন্তু তোমার সাথে এমন কেউ পান করেছে, যে বিড়াল থেকেও নিকৃষ্ট, শয়তান।”¹⁹³

বলা বাহুল্য, যদি চান যে, শয়তান আপনার বাসস্থান ও পানাহারে আপনার সঙ্গী না হোক, তাহলে যথাসময়ে আল্লাহর নাম নিন, শয়তান আপনার সঙ্গ পাবে না। নবী বলেছেন,

إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللهَ تَعَالَى عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ لأَصْحَابِهِ : لَا مَبِيتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ ، وَإِذَا دَخَلَ فَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ تَعَالَى عِنْدَ دُخُولِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ : أَدْرَكْتُمُ المَبِيتَ وَإِذَا لَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ تَعَالَى عِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ : أَدْرَكْتُمُ المَبِيتَ وَالعَشَاءَ

"কোন ব্যক্তি যখন নিজ বাড়ি প্রবেশের সময় ও আহারের সময় আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে; অর্থাৎ, ('বিসমিল্লাহ' বলে) তখন শয়তান তার অনুচরদেরকে বলে, 'আজ না তোমরা এ ঘরে রাত্রি যাপন করতে পারবে, আর না খাবার পাবে।' অন্যথা যখন সে প্রবেশ কালে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে না (অর্থাৎ 'বিসমিল্লাহ' বলে না), তখন শয়তান বলে, 'তোমরা রাত্রি যাপন করার স্থান পেলে।' আর যখন আহার কালেও আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে না (অর্থাৎ, 'বিসমিল্লা-হ' বলে না), তখন সে তার চেলাদেরকে বলে, 'তোমরা রাত্রিযাপন স্থল ও নৈশভোজ উভয়ই পেয়ে গেলে। "¹⁹⁴

(ঞ) জ্বিন স্পর্শ বা জ্বিন পাওয়া

আয়েম্মায়ে আহলে সুন্নাহ এ বিষয়ে একমত যে, জ্বিন মানুষের দেহে-মনে প্রবিষ্ট হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ

"যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তির মতো দন্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে।”¹⁹⁵ আর আল্লাহর রসূল বলেন, "শয়তান মানুষের রক্তশিরায় পরিভ্রমণ করে। "¹⁹⁶

আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদ বলেন, আমি পিতাকে (ইমাম আহমাদকে) বললাম, 'বহু লোক বলে থাকে যে, জ্বিন মানুষের দেহে প্রবেশ করে না?' তিনি বললেন, 'বেটা ওরা মিথ্যা বলছে। (জ্বিন প্রবিষ্ট হয় এবং) মানুষের জিভে কথা বলে।'

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেন, 'তিনি (ইমাম আহমাদ) যা বলেছেন তাই প্রসিদ্ধ। কারণ, মানুষ জ্বিন আকৃষ্ট হয়ে কখনো এমন ভাষা বলে, যার অর্থ বুঝা যায় না। তার দেহে এত বেশী আঘাত করা হয় যে, যদি সে আঘাত কোন উটের উপর করা যায়, তো উট কষ্ট পায়। অথচ আকৃষ্ট ব্যক্তি সে আঘাতের কিছুও অনুভব করে না। '¹⁹⁷

আবার অনেক সময় এমন ক্ষমতা প্রদর্শন করে, যে ক্ষমতা সেই আকৃষ্ট মানুষের নয়। কখনো বা কুরআন পড়ে, যে আরবী অক্ষর পর্যন্ত চেনে না। তিনি আরো বলেন, 'আয়েম্মায়ে মুসলেমীনদের কেউই মানুষের দেহে জ্বিন প্রবেশকে অস্বীকার করে না। যে অস্বীকার ও অবিশ্বাস করে এবং দাবী করে যে, শরীয়ত তা মিথ্যা মনে করে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সেই শরীয়তের উপর মিথ্যা বলে। আর শরীয়তে এমন কোন দলীল নেই, যা জ্বিন আকৃষ্ট হওয়াকে অস্বীকার করে বা দেহে জ্বিন প্রবেশকে অসম্ভব মনে করে। '¹⁹⁸ আর তিনি (১৯/১২তে) আরো উল্লেখ করেন যে, 'এ কথা মু'তাযিলার এক সম্প্রদায় অস্বীকার করে থাকে।' তদনুরূপ বিজ্ঞান ও বাস্তববাদীরাও এসব কিছুকে অলীক ধারণা মনে করে।

নবী করীম হতে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে; যাতে বুঝা যায় যে, জ্বিন মানুষের শরীরে প্রবিষ্ট হয়। যারে' নামক জনৈক সাহাবী তাঁর এক উন্মাদ ছেলে অথবা ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে রসূল এর নিকট এলেন এবং তার জন্য তাঁকে দু'আ করার আবেদন জানালেন। তিনি ছেলেটিকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে আদেশ করলেন এবং বললেন, 'ওর পিঠের দিকটা আমার নিকট কর।' তারপর তিনি ছেলেটির কাপড়ে ধরে পিঠে আঘাত করতে করতে বললেন, 'বের হ' আল্লাহর দুশমন, বের হ' আল্লাহর দুশমন'। সাথে সাথে ছেলেটি সুস্থ ও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তিনি পানি দ্বারা তার মুখ মুছে দিলেন এবং তার জন্য দু'আ করলেন। ¹⁹⁹ অনুরূপভাবে অপর এক ঘটনায় তিনি এক শিশুর মুখে থুথু দিয়ে জ্বিন বিতাড়িত করেছেন। ২০০

টিকাঃ
১৭৫. মুসনাদে আহমাদ, মাশা. হা/৯১২৯, ইবনে মাজাহ তাও, হা/৩৯০৬
১৭৬. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩৯০৭
১৭৭. বুখারী ইফা. হা/৬৫১৪, আপ্র, হা/৬৫০১, তাও. হা/৬৯৮৫, ৭০৪৫
১৭৮. মুসলিম মাশা. হা/৫৩৬৪
১৭৯. আবূ দাউদ আলএ. হা/৫২৪৯
১৮০. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৪
১৮১. আবু দাউদ আলএ. হা/১৫৫২, নাসাঈ মাথ, হা/৫৫৩১
১৮২. মুসলিম মাশা. হা/৬২৮৪
১৮৩. বুখারী ইফা, হা/৩০৫৩, আপ্র. হা/৩০৪৪, তাও. হা/৩২৮৬
১৮৪. সূরা আলে ইমরান-৩:৩৬, বুখারী তাও, হা/৩৪৩১
১৮৫. বুখারী ইফা, হা/৩০৫৪, আপ্র. হা/৩০৪৫, তাও. হা/৩২৮৭
১৮৬. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১৯৫২৮, ত্বাবারানী
১৮৭. হাকেম, মাশা. হা/১৫৮
১৮৮. সূরা সোয়া-দ-৩৮৪১
১৮৯. আবু দাউদ আলএ. হা/২৮৭, তিরমিযী, হা/১২৮, মিশকাত, হা/৫৬১
১৯০. মুসলিম মাশা. হা/৫৩৭৮
১৯১. বুখারী ইফা, হা/৩০৪৭, আপ্র. হা/৩০৩৮, তাও. হা/৩২৮০, মুসলিম মাশা. হা/৫৩৬৮
১৯২. মুসলিম মাশা. হা/৫৩৬৪
১৯৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/৮০০৩, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/১৭৫
১৯৪. মুসলিম মাশা, হা/৫৩৮১
১৯৫. সূরা আল বাক্বারাহ-২:২৭৫
১৯৬. বুখারী ইফা, হা/৩০৫৬, আপ্র. হা/৩০৪৭, তাও. হা/৩২৮৯, মুসলিম মাশা. হা/২৯৭৪
১৯৭. মাজমু' ফাতাওয়া ২৪/২৭৬
১৯৮. মাজমু' ফাতাওয়া ২৪/২৭৭
১৯৯. ইবনে মাজাহ তাও. হা/৩৫৪৮, মাজমাইয যাওয়ায়িদ ৯/২
২০০. মুসনাদে আহমাদ মাশা. হা/৪/১৭০-১৭১

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 শয়তান-জগৎ ও মনুষ্য-জগতের মাঝে যুদ্ধের সেনাপতি

📄 শয়তান-জগৎ ও মনুষ্য-জগতের মাঝে যুদ্ধের সেনাপতি


ইবলীসই হল মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের সেনাপতি। সেই হল শয়তানদের মহান নেতা। সেই বিভিন্ন অভিযানে সৈন্য প্রেরণ করে, সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেয়। পরিশেষে নিজ সিংহাসনে বসে সৈন্যদের নিকট থেকে অভিযানের ফলাফল ও জয়-পরাজয়ের রিপোর্ট সংগ্রহ করে। প্রত্যেকের কাজের হিসাব নেয় এবং যে সবচেয়ে ভালো কাজ (তার মানে সবচেয়ে জঘন্য কাজ) করতে পারে, সে সম্মানপ্রাপ্ত হয়। নবী বলেছেন,

إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ، فَيُدْنِيهِ مِنْهُ وَيَقُولُ نِعْمَ أَنْتَ، فَيَلْتَزِمُهُ

"ইবলীস পানির উপর তার সিংহাসন রেখে (ফিতনা ও পাপের) অভিযান-সৈন্য পাঠায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তার নৈকট্য লাভ করে সে, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। অতঃপর প্রত্যেকে কাজের হিসাব দেয়; বলে, 'আমি এই করেছি।' সে বলে, 'তুমি কিছুই করনি।' একজন এসে বলে, 'আমি এক দম্পতির মাঝে ঢুকে পরস্পর কলহ বাধিয়ে পরিশেষে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ছেড়েছি।' তখন শয়তান সিংহাসন ছেড়ে উঠে এসে তাকে আলিঙ্গন করে বলে, 'হ্যাঁ। (তুমিই কাজের মতো কাজ করেছ!)”²⁰¹

শয়তানের সিংহাসন সমুদ্রের উপর। সেখান থেকে সারা পৃথিবীতে অভিযান চালায়। সুদক্ষ সেনাপতি, অভিজ্ঞতায় প্রাচীন ও পরিপক্ব। পরিকল্পনায় নির্ভুল ও নিখুঁত। জাল বিস্তার করা, ফাঁদ পাতা, অতর্কিতে আক্রমণের জন্য ওঁৎ পেতে থাকার ঘাঁটি স্থাপন করার ব্যাপারে সে সুনিপুণ কারিগর। সমস্ত রণকৌশল তার নখদর্পণে। এ ব্যাপারে সে সর্বশক্তিমানের কাছে শক্তি চেয়ে নিয়েছে, তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য তা তাকে দানও করেছেন।

قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ - قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ - إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ

"সে (ইবলীস) বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।' তিনি (আল্লাহ) বললেন, 'যাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।”²⁰²

বাস্! সে কিয়ামত পর্যন্ত অবিরাম অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের অভিযান চালিয়ে যাবে। সে প্রতিজ্ঞা করে মহান প্রতিপালককে বলেছে,

وَعِزَّتِكَ يَا رَبِّ لَا أَبْرَحُ أُغْوِي عِبَادَكَ مَا دَامَتْ أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْسَادِهِمْ

"আপনার ইয্যতের কসম হে রব! আমি আপনার বান্দাদিগকে অবিরামভাবে ভ্রষ্ট করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের দেহের মধ্যে তাদের প্রাণ অবশিষ্ট থাকবে।"

তবে বান্দাগণের প্রতি মহান করুণাময় প্রতিপালকের মহা করুণা এই যে, তিনি বলেছেন,

وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا أَزَالُ أَغْفِرُ لَهُمْ مَا اسْتَغْفَرُونِي

"আর আমার ইয্যত ও প্রতাপের কসম! আমি অবিরাম তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব, যতক্ষণ তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে।”²⁰³

টিকাঃ
২০১. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৪
২০২. সূরা আল হিজ্বর-১৫:৩৬-৩৮
২০৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১১২৩৭, হাকেম, মাশা. হা/৭৬৭২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00