📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 কোন শয়তান কি হিদায়াত পেতে পারে?

📄 কোন শয়তান কি হিদায়াত পেতে পারে?


ওস্তাদজী ছাত্রদেরকে কুরআনের সবক দিচ্ছিলেন। এক ছাত্র কোন প্রয়োজনে বাইরে যেতে অনুমতি নিয়ে কুরআন খোলা রেখে বের হতে যাচ্ছিল। এমন সময় পাশের ছাত্র বলে উঠল, 'এই যে, কুরআনটাকে বন্ধ করে যাও। শয়তান পড়ে নেবে যে!'

তার বন্ধ করার আগেই ওস্তাদজী বললেন, 'পড়ুক, পড়ে হিদায়াত পায় তো পাক!'

আসলেই কি শয়তান হিদায়াত পেতে পারে? না, বড় শয়তান ইবলীস কস্মিনকালেও হিদায়াত পাবে না। কারণ মহান আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী সে চিরজীবন কাফেরই থাকবে। অবশ্য সে ছাড়া অন্যান্য শয়তান হিদায়াত পেয়ে মুসলিম হতে পারে। যেহেতু হাদীসে আছে, নবী বলেছেন,

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ

"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে সঙ্গী জ্বিন নিযুক্ত নেই।” লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন,

وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ

"আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন বলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দেয় না।"¹⁴⁴

অবশ্য অন্য কিছু উলামা বলেন, শয়তান মু'মিন হয় না। তাঁদের মতে হাদীসে 'আসলাম' শব্দের অর্থ 'ইসলাম গ্রহণ করেছে নয়, বরং তার অর্থ, 'আত্মসমর্পণ করেছে বা অনুগত হয়েছে।' ¹⁴⁵

অন্য কিছু উলামা বলেন, 'আসলাম' শব্দটি অতীত কালের ক্রিয়া নয়, বরং বর্তমান কালের ক্রিয়া। অর্থাৎ, 'আসলামা' নয়, 'আসলামু'। তার মানে, আমি নিরাপদে থাকি। ¹⁴⁶

তবুও যা সঠিক বলে মনে হয়, তা এই যে, শয়তান মু'মিন থেকে কাফের হতে পারে। অনুরূপ কোন শয়তান জিনের মুসলিম হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

টিকাঃ
১৪৪. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৬
১৪৫. শারহে আক্বীদাহ তাহাবিয়‍্যাহ ৪৩৯পৃঃ
১৪৬. শারহুন নাওয়াবী ১৭/১৫৮

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 মানুষ ও শয়তানের মাঝে শত্রুতা

📄 মানুষ ও শয়তানের মাঝে শত্রুতা


মানুষ ও শয়তানের মাঝে শত্রুতা অতি প্রাচীন। তার শিকড় মাটির বহু গভীরে। এর ইতিহাস আদম সৃষ্টির সাথে জড়িত। নবী বলেন, "আল্লাহ যখন জান্নাতে আদমের মূর্তি তৈরি করলেন, তখন তাঁর ইচ্ছামতো কিছুদিন তাকে বর্জন করলেন। ইবলীস তার চারিপার্শ্ব ঘুরতে লাগল এবং দেখতে লাগল সেটা কী। অতঃপর সে যখন দেখল, তা ফাঁপা, তখন সে জানতে পারল, সে হবে এমন সৃষ্টি, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।"¹⁴⁷

অতঃপর তাঁর দেহে 'রূহ' ফুঁকে সকল জিনিসের নাম শিখিয়ে সমগ্র ফিরিশতা-মণ্ডলীকে আদেশ করলেন আদমকে সিজদা করতে। সকল ফিরিশতাবর্গ আল্লাহর আদেশ মান্য করে তাঁকে সিজদা করলেন। কিন্তু ইবলীস (যে তখন ফিরিশতার জামাআতে শামিল ছিল এবং আসমানী ফিরিস্তাবর্গের সাথে থেকে আল্লাহর ইবাদত করত। তাই আদেশ তার প্রতিও ছিল। সে) আদেশ অমান্য করল এবং সগর্বে সিজদাবনত হতে অস্বীকার করল।

আল্লাহ তাআলা তাকে বললেন, 'হে ইবলীস! কী হল তোর? আমি যখন সকলকে আমার দুই হস্তদ্বারা সৃষ্ট (আদম) কে সিজদা করতে আদেশ করলাম তখন তুই সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলি না। কে তোকে এতে নিবৃত্ত করল? তুই কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলি? না তুই উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন?'

ইবলীস বলল, 'আমি আদম হতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন হতে সৃষ্টি করেছেন এবং ওকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে। আমি কি তাকে সিজদা করব, যে মাটি হতে সৃষ্ট? আপনি পুরাতন পরিবর্তিত শুষ্ক ঠনঠনে মৃত্তিকা হতে যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আমি তাকে সিজদা করবার নই।'

আল্লাহ বললেন, 'তাহলে নেমে যা এ স্থান হতে, এখানে থেকে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। সুতরাং বের হয়ে যা, তুই অধমদের অন্তর্ভুক্ত, বিতারিত এবং কর্মফল দিবস পর্যন্ত তোর প্রতি অভিশাপ রইল।'

ইবলীস বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন।'

আল্লাহ তাআলা বললেন, 'অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত যাদের অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তাদের তুই অন্তর্ভুক্ত হলি।'

ইবলীস বলল, 'আপনার মাহাত্ম্যের শপথ! আপনার বিশুদ্ধচিত্ত খাঁটি বান্দা ছাড়া আমি সকলকে অবশ্যই ভ্রষ্ট করব।' আপনি যে আমার সর্বনাশ করলেন তার শপথ! আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্ম (ও দুনিয়া) কে শোভন করে তুলব এবং তাদের সকলের সর্বনাশ সাধন করব। আপনি আমার সর্বনাশ করলেন তার প্রতিশোধে আমিও আপনার সরল পথে মানুষের জন্য ওঁৎ পেতে থাকব। অতঃপর আমি তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান ও বাম দিক হতে তাদের নিকট আসবই এবং আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। বলুন, কেন ওকে আমার উপর মর্যাদা দান করলেন? কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দেন, তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ব্যতীত তার বংশধরকে সমূলে নষ্ট ও ভ্রষ্ট করে ছাড়ব।'

আল্লাহ বললেন, 'বের হয়ে যা এখান হতে নিকৃষ্ট ও বিতাড়িত অবস্থায়। এটাই আমার নিকট পৌঁছনর সরল পথ। বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে তারা ব্যতীত আমার বান্দাদের উপর তোর কোন ক্ষমতা থাকবে না। আমি সত্য এবং সত্যই বলছি, তোর দ্বারা এবং তোর অনুসারীদের দ্বারা আমি জাহান্নাম অবশ্যই পূর্ণ করব। জাহান্নامই তোদের সম্যক্ শাস্তি। আর তুই তোর আহবানে যাকে পারিস্ সত্যচ্যুত কর, তোর অশ্বারোহী ও পদাতিক-বাহিনী দ্বারা ওদেরকে আক্রমণ কর এবং ওদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে অংশী হয়ে যা এবং ওদেরকে প্রতিশ্রুতি দে। (আর শয়তানের প্রতিশ্রুতি তো ছলনা মাত্র)। আমার প্রকৃত বান্দাদের উপর তোর কোন ক্ষমতা নেই।'

অতঃপর আদম-এর পঞ্জরাস্থি হতে তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করে আল্লাহপাক উভয়কে আদেশ করলেন, 'তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। নচেৎ তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে আদম! এ (শয়তান) তোমার এবং তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে না দেয়। দিলে তোমরা দুঃখ কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটিই রইল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্ত হবে না এবং উলঙ্গ হবে না। আর সেখানে পিপাসার্ত ও রৌদ্রক্লিষ্টও হবে না।'

অতঃপর শুরু হল আদমের প্রতি শয়তানের হিংসা ও শত্রুতা। তাদের গোপন লজ্জাস্থান প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, 'হে আদম! আমি কি তোমাকে অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অবিনশ্বর রাজ্যের কথা বলে দেব না? পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা চিরস্থায়ী হও---এ জন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।' শয়তান উভয়ের নিকট কসম করে বলল, 'আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন।'

এভাবে সে তাঁদেরকে প্রতারিত করল। তাঁদের পদস্খলন ঘটিয়ে সেখান হতে তাদেরকে বের করতে কৃতার্থ হল। সুতরাং যখন তাঁরা সেই বৃক্ষ (ফলে)র আস্বাদ গ্রহণ করলেন, তখন তাঁদের লজ্জাস্থান প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তাঁরা জান্নাতের পত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ সম্বন্ধে নিষেধ করিনি? শয়তান যে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু আমি কি তা তোমাদেরকে বলিনি?'

অতঃপর আদম (আ.) আল্লাহর নিকট হতে কিছু বাণীপ্রাপ্ত হলেন। তাঁরা বললেন, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছি, যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।'¹⁴⁸

আল্লাহপাক তাঁর প্রতি ক্ষমাশীল হলেন ও তাঁকে হিদায়াত করলেন। বললেন, 'তোমরা সকলেই এখান হতে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু এবং পৃথিবীতে তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল। সেখানেই তোমরা জীবন-যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে এবং সেখান হতেই তোমাদেরকে বের করে আনা হবে। সেখানে যখন আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সেই নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না, বিপদগামী এবং দুর্দশাগ্রস্ত হবে না। কিন্তু যারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে ও মিথ্যা জানবে তারাই হবে দোযখবাসী এবং তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।'¹⁴⁸

টিকাঃ
১৪৭. মুসলিম মাশা. হা/৬৮১৫
১৪৮. সূরা আল বাক্বারাহ-২:৩০-৩৯, সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১১-২৫, সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৬১-৬৫, সূরা তুহা-২০:১১৫-১২৬, সূরা সোয়া-দ-৩৮৭১-৮৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00