📄 মানুষের জন্য জ্বিনদের সাক্ষ্য
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে স্বা'স্বাআহ হতে বর্ণিত, একদা আবু সাঈদ খুদরী তাঁকে বললেন, 'আমি তোমাকে দেখছি যে, তুমি ছাগল ও মরুভূমি ভালবাসো। সুতরাং তুমি যখন তোমার ছাগলে বা মরুভূমিতে থাকবে আর স্বলাতের জন্য আযান দেবে, তখন উচ্চ স্বরে আযান দিয়ো। কারণ মুআযযিনের আযান ধ্বনি যতদূর পর্যন্ত মানব-দানব ও অন্যান্য বস্তু শুনতে পাবে, কিয়ামতের দিন তারা তার জন্য সাক্ষ্য দেবে।' আবু সাঈদ বলেন, 'আমি এটি আল্লাহর রসূল এর নিকট শুনেছি। ¹⁴⁰ উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, আযান শুনে মুআযযিনের জন্য কিয়ামতে জ্বিনেরা সাক্ষ্য দেবে।
টিকাঃ
১৪০. বুখারী ইফা. হা/৫৮২, আপ্র. হা/৫৭৪, তাও. হা/৬০৯
📄 ভালো-মন্দে তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্তর
জ্বিনেদের মধ্যে অনেকে আছে, যারা পরিপূর্ণ দ্বীনদার, নেক ও ভালো লোক। কেউ তাদের থেকে কম দর্জার, কেউ নির্বোধ ও উদাস। তাদের কেউ কাফের, বরং কাফেদের সংখ্যাই বেশি। এ কথা মু'মিন জ্বিনেরা নিজেরাই স্বীকার করেছে। তারা বলেছে,
وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَلِكَ كُنَّا طَرَائِقَ قِدَدًا
"আমাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। "¹⁴¹
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে অনেকে আছে পরিপূর্ণ সৎ লোক, অনেকে আছে অসম্পূর্ণ নেক লোক। তাদের বিভিন্ন শ্রেণীভেদ আছে। মানুষের মতোই তাদেরও অবস্থা। তারা আরো বলেছিল,
وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُوْلَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا - وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا
"আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) এবং কতক সীমালংঘনকারী; সুতরাং যারা আত্মসমর্পণ করে (মুসলমান হয়), তারা নিঃসন্দেহে সত্য পথ বেছে নেয়। অপর পক্ষে সীমালংঘনকারীরা তো জাহান্নামেরই ইন্ধন। "¹⁴²
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে মুসলমান আছে এবং সীমালংঘনকারী কাফেরও আছে। আর উভয়ের পরিণাম খুব স্পষ্ট।
টিকাঃ
১৪১. সূরা জ্বিন-৭২:১১
১৪২. সূরা জ্বিন-৭২:১৪-১৫
📄 জ্বিনদের প্রকৃতি
জ্বিনদের ভিতরে ইচ্ছাশক্তি আছে, তারা ঈমান আনতে পারে, কুফরীও করতে পারে। তাদের সে শক্তি পরিবর্তনশীলও। সুতরাং ইবলীস এক সময় বড় আবেদ থেকে ফিরিস্তার দলে শামিল ছিল। অতঃপর সে মহান আল্লাহর আদেশ লংঘন করে কাফের হয়ে গেল।
সে যখন কাফের হয়ে গেল, কুফরী নিয়ে তুষ্ট হল, মন্দপ্রিয় ও মন্দপ্রার্থী হল, তখন সে নিজ কুকর্ম ও তার প্রতি দাওয়াত দ্বারা তৃপ্তি অনুভব করতে লাগল। মনের নোংরামি দরুন সর্বতোভাবে নিজের কুকর্মে ব্রতী থাকল; যদিও তা শাস্তিযোগ্য কর্ম। তার মন যেন বলে, আমি মরেছি, যার জন্য মরেছি তাকে না পারলে তার বংশধরকে যথাসাধ্য মেরে ছাড়ব। আমি জাহান্নামে যাব, তাদেরকে নিয়েই যাব। সে প্রতিপালকের সামনে প্রতিজ্ঞা করল,
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ - إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
"বলল, 'তোমার ক্ষমতার শপথ! আমি অবশ্যই ওদের সকলকেই বিভ্রান্ত করব, তবে ওদের মধ্যে তোমার খাঁটি দাসদেরকে নয়। ¹⁴³
এইরূপ মানুষের মনও। যখন তা নোংরা হয়ে যায় এবং মেজাজ পাল্টে যায়, তখন সেই জিনিস তার আকাঙ্ক্ষিত হয়, যা তার জন্য অপকারী। সেই জিনিস পেয়ে সে পরম তৃপ্তিলাভ করে। বরং সে তা এত ভালোবাসে যে, তা এক সময় তার ঈমান, জ্ঞান, দেহ, চরিত্র ও সম্পদকে ধ্বংস করে ফেলে। আমরা মদ্য ও ধূমপায়ীদের অবস্থা সমীক্ষা করে দেখতে পারি। কেমন ঐ জিনিস দুটি তার আসক্তিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর করে, অথচ সে তা পান করে পরিতৃপ্ত হয় এবং তা বর্জন করতে সহজে সক্ষম হয় না।
টিকাঃ
১৪৩. সূরা সোয়া-দ-৩৮৮২-৮৩
📄 কোন শয়তান কি হিদায়াত পেতে পারে?
ওস্তাদজী ছাত্রদেরকে কুরআনের সবক দিচ্ছিলেন। এক ছাত্র কোন প্রয়োজনে বাইরে যেতে অনুমতি নিয়ে কুরআন খোলা রেখে বের হতে যাচ্ছিল। এমন সময় পাশের ছাত্র বলে উঠল, 'এই যে, কুরআনটাকে বন্ধ করে যাও। শয়তান পড়ে নেবে যে!'
তার বন্ধ করার আগেই ওস্তাদজী বললেন, 'পড়ুক, পড়ে হিদায়াত পায় তো পাক!'
আসলেই কি শয়তান হিদায়াত পেতে পারে? না, বড় শয়তান ইবলীস কস্মিনকালেও হিদায়াত পাবে না। কারণ মহান আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী সে চিরজীবন কাফেরই থাকবে। অবশ্য সে ছাড়া অন্যান্য শয়তান হিদায়াত পেয়ে মুসলিম হতে পারে। যেহেতু হাদীসে আছে, নবী বলেছেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে সঙ্গী জ্বিন নিযুক্ত নেই।” লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন,
وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ
"আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন বলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দেয় না।"¹⁴⁴
অবশ্য অন্য কিছু উলামা বলেন, শয়তান মু'মিন হয় না। তাঁদের মতে হাদীসে 'আসলাম' শব্দের অর্থ 'ইসলাম গ্রহণ করেছে নয়, বরং তার অর্থ, 'আত্মসমর্পণ করেছে বা অনুগত হয়েছে।' ¹⁴⁵
অন্য কিছু উলামা বলেন, 'আসলাম' শব্দটি অতীত কালের ক্রিয়া নয়, বরং বর্তমান কালের ক্রিয়া। অর্থাৎ, 'আসলামা' নয়, 'আসলামু'। তার মানে, আমি নিরাপদে থাকি। ¹⁴⁶
তবুও যা সঠিক বলে মনে হয়, তা এই যে, শয়তান মু'মিন থেকে কাফের হতে পারে। অনুরূপ কোন শয়তান জিনের মুসলিম হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
টিকাঃ
১৪৪. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৬
১৪৫. শারহে আক্বীদাহ তাহাবিয়্যাহ ৪৩৯পৃঃ
১৪৬. শারহুন নাওয়াবী ১৭/১৫৮