📄 পাপাচরণের কারণে কোন কোন মু'মিনের উপর শয়তানের আধিপত্য
পাপাচরণের কারণে কোন কোন মু'মিনের উপর শয়তানের আধিপত্য এসে থাকে। যেমন সেই বিচারক, যে ন্যায়পরায়ণ নয়। নবী বলেছেন,
إِنَّ اللهَ تَعَالَى مَعَ القَاضِي مَا لَمْ يَجْرُ فَإِذَا جَارَ تَبَرَّأَ مِنْهُ وَأَلْزَمَهُ الشَّيْطَانَ
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ বিচারকের সাথে থাকেন, যতক্ষণ সে অন্যায় বিচার করে না। অতঃপর সে যখন অন্যায় বিচার করে, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং শয়তানকে তার সাথী বানিয়ে দেন।"⁹⁶
এ মর্মে আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী হাসান বাসরী থেকে একটি মজার গল্প নকল করেছেন। তা সত্য-মিথ্যা যাই হোক, তা শুনে জানা যায় যে, বান্দা যদি খাঁটি দ্বীনদার হয়, তাহলে সে শয়তানকে কীভাবে কাবু করতে পারে। পক্ষান্তরে সে যদি ভ্রষ্ট ও পথচ্যুত হয়, তাহলে শয়তান তাকে কীভাবে ধরাশায়ী করতে পারে।
তিনি বলেন, একটি গাছ ছিল, লোকেরা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে তার পূজা করত। একজন নেক লোক তা দেখে বলল, 'অবশ্যই এ গাছটি কেটে ফেলব।'
আল্লাহর ওয়াস্তে মনে রাগ নিয়ে একদিন সে গাছটিকে কাটতে এল। পথিমধ্যে ইবলীস মানুষের বেশে তার সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, 'কী করতে চাও?'
লোকটি বলল, 'এই গাছটিকে কেটে ফেলতে চাই, লোকেরা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে যার পূজা করে।'
ইবলীস বলল, 'তুমি যদি তার পূজা না কর, তাহলে যে তার পূজা করছে, সে তোমার কী ক্ষতি করছে?' লোকটি বলল, 'আমি অবশ্যই তা কেটে ফেলব।'
শয়তান বলল, 'তুমি এর থেকেও উত্তম কিছু পেতে চাও? তুমি ওটাকে কেটো না। তোমাকে প্রত্যেক দিন দুটি করে দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) দেওয়া হবে, সকালে তোমার বালিশের নিচে পাবে।'
সে বলল, 'তা আমাকে কে দেবে?' ইবলীস বলল, 'আমি দেব।' সুতরাং নেক লোকটি গাছ না কেটে ফিরে গেল। সত্যই পরদিন সকালে সে বালিশের নিচে দুটি দীনার পেল। কিন্তু পরের দিন সকালে তা আর পেল না। সুতরাং রাগে সে আবার গাছটি কেটে ফেলতে উদ্যত হল। আবারও শয়তান মানুষের বেশে এসে বলল, 'তুমি কী করতে চাও?' লোকটি বলল, 'এই গাছটিকে কেটে ফেলতে চাই, লোকেরা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে যার পূজা করছে।'
শয়তান বলল, 'মিথ্যা বলছ তুমি। তোমার ঐ গাছ কেটে ফেলার আর ক্ষমতা নেই।' সে তার কথায় কান না দিয়ে কাটতে শুরু করল। শয়তান তাকে মাটিতে আছাড় মেরে ফেলে তার গলা টিপে ধরে দম বন্ধ করে মারতে উদ্যত হল। সে তাকে বলল, 'তুমি কি জানো আমি কে? আমি হলাম শয়তান। প্রথমবার তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে রাগান্বিত হয়ে এসেছিলে বলে তোমাকে কাবু করার কোন উপায় আমার ছিল না। তাই দুই দীনার দিয়ে তোমাকে প্রবঞ্চিত করলাম। অতঃপর যখন দুটি দীনারের জন্য রাগান্বিত হয়ে এলে, তখন আমি তোমার উপর আধিপত্য পেলাম। ⁹⁷
মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে এক ব্যক্তির কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন, যাকে তিনি তাঁর আয়াত দান করেছিলেন। সে তা শিক্ষা করেছিল ও জেনেছিল। অতঃপর তা বর্জন ও উপেক্ষা করেছিল। তার ফলে মহান আল্লাহ তার উপর শয়তানকে আধিপত্য দান করেছিলেন। সুতরাং সে তাকে ভ্রষ্ট ও পথচ্যুত করেছিল। অবশেষে সে অপরের জন্য শিক্ষা ও উপদেশের বিষয়বস্তু এবং বর্ণনীয় কাহিনীর নায়করূপে পরিণত হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ - وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِن تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ذَلِكَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
"তাদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দান করেছিলাম, অতঃপর সে সেগুলি থেকে অপসৃত হয়, তারপর শয়তান তার পিছনে লাগে, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমি ইচ্ছা করলে ঐ (আয়াতসমূহ) দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয় এবং নিজ কামনা-বাসনার অনুসরণ করে। তার উদাহরণ কুকুরের মত, ওকে তুমি তাড়া করলে সে জিভ বের করে হাঁপায় এবং তুমি ওকে এমনি ছেড়ে দিলেও সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে। যে সম্প্রদায় আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে, তাদের উদাহরণ এটা। সুতরাং তুমি কাহিনী বিবৃত কর, যাতে তারা চিন্তা করে।"⁹⁸
স্পষ্ট যে, এ হল তাদের উপমা, যারা হক জেনে তা অস্বীকার ও অমান্য করে। যেমন ইয়াহুদীরা, তারা মুহাম্মাদ কে নবী জেনেও অস্বীকার করেছে। তেমনি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সেই মানুষ, যে ইসলাম জেনেও তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করে, নানা ওজর-অজুহাত দেখায়, হঠকারিতা করে ইত্যাদি।
উক্ত আয়াতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি, যে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখত; কিন্তু পরে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও শয়তানের পিছে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, সে ব্যক্তি কে ছিল? তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। কেউ কেউ বলেছেন, সে ছিল বালআম বিন বাউরা। যে ছিল এক সময় নেক লোক। অতঃপর সে কাফের হয়ে যায়। কেউ বলেছেন, সে ব্যক্তি ছিল উমাইয়া বিন আবিস স্বান্ত। যে আশা করেছিল, সে নবীরূপে প্রেরিত হবে। কিন্তু মুহাম্মাদ প্রেরিত হয়েছেন শুনে হিংসাবশতঃ সে তাঁকে নবী বলে স্বীকার করেনি। সুতরাং আল্লাহই ভালো জানেন।
এই শ্রেণীর মানুষ, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, হক জেনেও তা গ্রহণ করে না, আয়াত জেনেও তা অস্বীকার করে, তারা একটি বিপজ্জনক শ্রেণীর মানুষ। তাদের সাথে শয়তানের সাদৃশ্য রয়েছে। কেননা, শয়তান হক জানার পরেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। এই শ্রেণীর অপরাধকে নবী নিজের উম্মতের জন্য আশঙ্কা করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِنَّ مَا أَتَخَوَّفُ عَلَيْكُمْ رَجُلٌ قَرَأَ الْقُرْآنَ حَتَّى إِذَا رُثِيَتْ بَهْجَتُهُ عَلَيْهِ، وَكَانَ رِدْنَا لِلْإِسْلَامِ غَيَّرَهُ إِلَى مَا شَاءَ اللَّهُ، فَانْسَلَخَ مِنْهُ وَنَبَذَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ، وَسَعَى عَلَى جَارِهِ بِالسَّيْفِ، وَرَمَاهُ بِالشَّرك إن أخوف ما أخاف عليكم رجل قرأ القرآن حتى إذا رئيت بهجته عليه وكان ردءاً للإسلام انسلخ منه ونبذه وراء ظهره وسعى على جاره بالسيف ورماه بالشرك
"আমি যে সকল বিষয় তোমাদের জন্য আশঙ্কা করি, তার মধ্যে এমন এক ব্যক্তি, যে কুরআন পড়েছে। পরিশেষে যখন তার মধ্যে কুরআনের মনোহারিত্ব দেখা গেল এবং সে ইসলামের একজন সহায়ক হয়ে গড়ে উঠল, তখন সে তা হতে অপসৃত হল, তা নিজ পশ্চাতে নিক্ষেপ করল, নিজ প্রতিবেশীর উপর তরবারি তুলে ধরতে উদ্যত হল এবং তাকে মুশরিক বলে অপবাদ দিল।"
সাহাবী হুযাইফা ইবনুল য়্যামান বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ওদের উভয়ের মধ্যে তরবারির যোগ্য কে? অপবাদদাতা, নাকি যাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে সে?' উত্তরে তিনি বললেন, "বরং অপবাদদাতা। ⁹⁹
বলা বাহুল্য, এটা একটি তড়িৎ শাস্তি, আল্লাহর কুরআন থেকে কেউ সরে গেলে, তার কাছে এসে শয়তান সাথী হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضُ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
"যে ব্যক্তি পরম দয়াময় আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হয়, তিনি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করেন, অতঃপর সে হয় তার সহচর। "¹⁰⁰
টিকাঃ
৯৬. হাকেম, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' লিল আলবানী, মাশা. হা/১৮২৭
৯৭. তালবীসু ইবলীস ৪৩পৃ.
৯৮. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১৭৫-১৭৬
৯৯. ইবনে হিব্বান ৮১, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/৩২০১
১০০. সূরা আয যুখরুফ-৪৩:৩৬
📄 দ্বিতীয়তঃ শয়তান কিছু মু'মিনকে দেখে ভয়ে পলায়ন করে
কোন বান্দা যখন ইসলামে পরিপক্বতা লাভ করে, ঈমান তার মর্মমূলে বদ্ধমূল হয়, মহান আল্লাহর সীমারেখার হিফাযত করে, তখন শয়তান তার সাক্ষাতে ভয় করে এবং তাকে দেখে পলায়ন করে।
তেমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন উমার বিন খাত্ত্বাব। শয়তান তাঁকে ভয় করত। নবী তাঁকে বলেছিলেন, "শয়তান অবশ্যই তোমাকে ভয় করে হে উমার!”¹⁰¹ তিনি আরো বলেছিলেন, "আমি দেখছি জ্বিন ও ইনসানের শয়তানরা উমারকে দেখে পলায়ন করেছে। "¹⁰²
একদা উমার বিন খাত্ত্বাব রসূলুল্লাহ এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তখন তাঁর নিকট কুরাইশের কিছু মহিলা তাঁর সাথে কথা বলছিল এবং তাদের অধিক দাবী-দাওয়া নিয়ে তাঁর আওয়াজের উপর আওয়াজ উঁচু করছিল। উমার বিন খাত্ত্বাব অনুমতি চাইলে তারা উঠে সত্বর পর্দার আড়ালে চলে গেল। অতঃপর উমার প্রবেশ করলেন এবং রসূলুল্লাহ হাসতে লাগলেন। উমার বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ আপনার দাঁতকে হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। (হাসলেন কেন?)'
নবী বললেন, "ঐ মহিলাদের কাণ্ড দেখে আমি অবাক হলাম, যারা আমার কাছে ছিল। অতঃপর যখন তোমার আওয়াজ শুনতে পেল, তখন তারা সত্বর পর্দার আড়ালে চলে গেল।"
উমার বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি এ ব্যাপারে বেশি হকদার যে, তারা আপনাকে সমীহ করবে।'
অতঃপর মহিলাদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে নিজ আত্মার দুশমন নারীরা! তোমরা আমাকে সমীহ কর অথচ রসূলুল্লাহকে সমীহ কর না।' তারা বলল, 'হ্যাঁ, আপনি রসূলুল্লাহর চাইতে বেশি রূঢ় ও কঠোর।' রসূলুল্লাহ বললেন,
إِيهَا يَا ابْنَ الْخَطَّابِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا لَقِيَكَ الشَّيْطَانُ سَالِكًا فَجًّا قَطُّ إِلَّا سَلَكَ فَبَّا غَيْرَ فَجِّكَ
"থামো হে ইবনুল খাত্ত্বাব! সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, শয়তান যখনই তোমাকে কোন পথে চলতে দেখেছে, তখনই সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলেছে।”¹⁰³
আর শয়তানের এ ভয়-ডর শুধু উমার থেকেই নয়; বরং সে প্রত্যেক সেই মু'মিনকে ভয় পায়, যার ঈমান সবল ও মজবুত। যার ঈমান শক্তিশালী, সে তার শয়তানকে অনায়াসে কাবু করতে পারে। নবী বলেছেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُنْضِي شَيْطَانَهُ كَمَا يُنْضِي أَحَدُكُمْ بَعِيرَهُ فِي السَّفَر
"নিশ্চয় মু'মিন তার শয়তানকে কৃশ করে ফেলে, যেমন তোমাদের কেউ সফরে তার (সওয়ারী) উটকে কৃশ করে ফেলে।”¹⁰⁴
প্রত্যেক মানুষের সাথেই শয়তান থাকে। প্রত্যেক মানুষকেই সে কাবু করতে চায়। তবে মহান আল্লাহ কোন কোন বান্দাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য করেন, ফলে সে তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ() বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সাথে সঙ্গী জ্বিন নিযুক্ত নেই।" লোকেরা বলল, 'আর আপনার সাথেও কি আছে, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন,
وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمُ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ
"আমার সাথেও আছে। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেন বলে আমি নিরাপদে থাকি। সুতরাং আমাকে সে মঙ্গল ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ দিতে পারে না। "¹⁰⁵
টিকাঃ
১০১. সঃ সহীহ আত-তিরমিযী মাথ, হা/২৯১৩
১০২. ঐ ২৯১৪
১০০. বুখারী ইফা. হা/৩০৬১, আপ্র. হা/৩০৫২, তাও. হা/৩২৯৪, মুসলিম মাশা. হা/৬৩৫৫
১০৪. মুসনাদে আহমাদ মাশা. হা/৮৯৪০, আবু য়্যালা, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/৩৫৮৬
১০৫. মুসলিম মাশা. হা/৭২৮৬
📄 তৃতীয়তঃ সুলাইমান (আঃ) এর অধীনস্থ ছিল জ্বিন
মহান আল্লাহ অনেক কিছুকেই নবী সুলাইমান (আঃ) এর নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল জ্বিন ও শয়তান। তিনি তাদেরকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতেন। কেউ অবাধ্য হলে তিনি তাকে শাস্তি দিতেন, বন্দী করে রাখতেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ - وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاء وَغَوَّاصٍ - وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ
"---তখন আমি বায়ুকে তার অধীন করে দিলাম, সে যেখানে ইচ্ছা করত সেখানে (বায়ু) মৃদু গতিতে (তাকে নিয়ে) প্রবাহিত হত। আরও অধীন করে দিলাম শয়তানদেরকে; যারা ছিল সকলেই প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং আরও অন্যান্যকে; যারা শিকলে বাঁধা থাকত।”¹⁰⁶ তিনি আরো বলেছেন,
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَن يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَن يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ - يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاء مِن تَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَّاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
"আমি বাতাসকে সুলাইমানের অধীন করেছিলাম, তার সকালের ভ্রমণ একমাসের পথ ছিল এবং সন্ধ্যার ভ্রমণও এক মাসের পথ ছিল। আমি তার জন্য গলিত তামার এক ঝরনা প্রবাহিত করেছিলাম। আল্লাহর অনুমতিক্রমে কিছু সংখ্যক জ্বিন তার সম্মুখে কাজ করত। ওদের মধ্যে যারা আমার নির্দেশ অমান্য করে, তাদেরকে আমি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি আস্বাদন করাব। ওরা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, প্রতিমা, হওয-সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির ওপর স্থাপিত বৃহদাকার ডেগ নির্মাণ করত। (আমি বলেছিলাম,) 'হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করতে থাক। আমার দাসদের মধ্যে কৃতজ্ঞ অতি অল্পই।”¹⁰⁷
সুলাইমান (আঃ) এর জ্বিন অধীনস্থ হওয়ার এমন বিশাল নিয়ামত লাভ হয়েছিল তাঁর দু'আর বর্কতে। তিনি মহান প্রতিপালকের কাছে দু'আ করে বলেছিলেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজ্য দান কর, যার অধিকারী আমার পরে অন্য কেউ হতে পারবে না। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।' (স্বাদঃ ৩৫)
এই দু'আর কারণেই নবী শয়তানকে বাঁধেননি, যে অগ্নিশিখা নিয়ে তাঁর মুখে ছুড়তে চেয়েছিল। আবুদ দার্দা (রাঃ) বলেন, একদা নবী স্বলাত পড়ছিলেন। আমরা শুনলাম, তিনি 'আউযু বিল্লাহি মিন্ক্ বলছেন। পরক্ষণেই তিনবার বললেন, 'আলআনুকা বিলা'নাতিল্লাহ।' (আল্লাহর অভিশাপে তোকে অভিশাপ দিচ্ছি।) সেই সাথে তিনি হাত বাড়িয়ে কিছু ধরতে যাচ্ছিলেন।
অতঃপর তিনি স্বলাত শেষ করলে আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনাকে নামাযে এমন কিছু বলতে শুনলাম, যা ইতিপূর্বে আপনাকে বলতে শুনিনি। আর দেখলাম, আপনি আপনার হাত বাড়াচ্ছেন।' তিনি বললেন,
إِنَّ عَدُوَّ اللَّهِ إِبْلِيسَ جَاءَ بِشِهَابٍ مِنْ نَارٍ لِيَجْعَلَهُ فِي وَجْهِي فَقُلْتُ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ قُلْتُ أَلْعَنُكَ بِلَعْنَةِ اللَّهِ التَّامَّةِ فَلَمْ يَسْتَأْخِرُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ أَرَدْتُ أَخْذَهُ وَاللهِ لَوْلاَ دَعْوَةُ أَخِينَا سُلَيْمَانَ لأَصْبَحَ مُوثَقًا يَلْعَبُ بِهِ وِلْدَانُ أَهْلِ الْمَدِينَةِ
"আসলে আল্লাহর দুশমন ইবলীস একটি অগ্নিশিখা নিয়ে আমার মুখমণ্ডলে রাখতে চাইল। তাই আমি তিনবার বললাম, 'আউযু বিল্লাহি মিন্ক্'। অতঃপর বললাম, 'আলআনুকা বিলা'নাতিল্লাহ।' তবুও সে সরল না। এরূপ তিনবার বললাম। অতঃপর তাকে ধরার ইচ্ছা করলাম। আল্লাহর কসম! যদি আমাদের ভাই সুলাইমানের দু'আ না হতো, তাহলে সে বন্দী অবস্থায় সকাল করত এবং মদীনাবাসীর শিশুরা তাকে নিয়ে খেলা করত।"¹⁰⁸
অন্য এক বর্ণনায় আছে (দ্বিতীয় ঘটনা), তিনি বলেছেন, 'একটি শক্তিশালী জ্বিন গতরাত্রে আমার স্বলাত নষ্ট করার জন্য আমার ঔদাস্যের সুযোগ নিতে চাচ্ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাকে আমার আয়ত্তে করে দিলেন, সুতরাং আমি তার গলা টিপে ধরলাম। আমি সংকল্প করলাম, মসজিদের খুঁটিসমূহের কোন এক খুঁটিতে তাকে বেঁধে রাখি। যাতে সকালে তোমরা সকলে তাকে দেখতে পাও। অতঃপর আমার ভাই সুলাইমানের দু'আ স্মরণ হল,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي
'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজ্য দান কর, যার অধিকারী আমার পরে অন্য কেউ হতে পারবে না।¹⁰⁹ সুতরাং আল্লাহ তাকে নিকৃষ্ট অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। ¹¹⁰
টিকাঃ
১০৬. সূরা সোয়া-দ-৩৮৩৬-৩৮
১০৭. সূরা সাবা-৩৪:১২-১৩
১০৮. মুসলিম মাশা. হা/১২৩৯
১০৯. সূরা সোয়া-দ-৩৮:৩৫
১১০. মুসলিম মাশা. হা/১২৩৮
📄 সুলাইমান (আঃ) এর নামে ইয়াহুদীদের মিথ্যাচারিতা
যারা যাদুকার্যের মাধ্যমে জ্বিন ব্যবহার করে, সেই ইয়াহুদী ও তাদের অনুসারীরা ধারণা করে যে, আল্লাহর নবী সুলাইমান যাদুকার্যের মাধ্যমে জ্বিন ব্যবহার করতেন। অথচ সলফদের একাধিক উলামা উল্লেখ করেছেন যে, সুলাইমান (আঃ) এর ইন্তিকালের পরেই শয়তানরা যাদু ও কুফরীর নানা বই লিখে তাঁর সিংহাসনের নিচে রেখে দিয়েছিল। অতঃপর তারা বলেছিল, এই সবের সাহায্যে সুলাইমান জ্বিনকে নিজ খিদমতে ব্যবহার করতেন। তাদের কেউ কেউ বলল, 'এটা যদি হক ও জায়েয না হতো, তাহলে সুলাইমান তা করতেন না।' কিন্তু মহান আল্লাহ সে কথার খণ্ডন করলেন আল-কুরআনে,
وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاء ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
"যখন আল্লাহর নিকট থেকে একজন রসূল এলেন, যে তাদের নিকট যা (ঐশীগ্রন্থ) আছে তার সত্যায়নকারী, তখন যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের একদল আল্লাহর কিতাবকে পিছনের দিকে ফেলে দিল (অমান্য করল), যেন তারা কিছুই জানে না।”¹¹¹ অতঃপর তারা যে শয়তানী কিতাবের অনুসরণ করেছিল, সে কথা স্পষ্ট করে দিলেন,
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ
"সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানেরা যা আবৃত্তি করত, তারা তা অনুসরণ করত। অথচ সুলাইমান কুফরী করেননি; বরং শয়তানেরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত। "¹¹²
টিকাঃ
১১১. সূরা আল বাক্বারাহ-২:১০১
১১২. সূরা আল বাক্বারাহ-২:১০২