📄 অমূলক জাহেলী বিশ্বাস
আকাশে তারা ছুটলে বা উল্কাপাত ঘটলে মানুষে নানা ধারণা করে; কেউ বলে কোন মহান ব্যক্তির জন্ম হল, কোন মহান ব্যক্তির মৃত্যু হল। কেউ কালেমা পড়ে, কেউ পাঁচটা ফুলের নাম বলে ইত্যাদি।
কিন্তু আসলে এ সবের কিছু নয়। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস এক আনসারী থেকে বর্ণনা করে বলেন, একদা এক রাত্রে রসূলুল্লাহ এর সাথে সাহাবাগণ উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় উজ্জ্বল হয়ে একটি উল্কাপাত হল। রসূলুল্লাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "এরূপ উল্কাপাত হলে তোমরা জাহেলী যুগে কী বলতে?" তাঁরা বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল বেশি জানেন। আমরা বলতাম, আজ রাতে কোন মহান ব্যক্তির জন্ম হল অথবা কোন মহান ব্যক্তি মারা গেল।'
রসূলুল্লাহ বললেন, “কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা জন্মের কারণে উল্কাপাত হয় না। আসলে আমাদের প্রতিপালক তাবারাকা ওয়া তা'আলা যখন কিছু ফায়সালা করেন, তখন আরশবাহী ফিরিস্তাগণ তসবীহ পড়েন। অতঃপর তার পরবর্তী নিম্নের আসমানবাসী তাসবীহ পড়েন। পরিশেষে এই দুনিয়ার আসমানে তসবীহ এসে পৌঁছে। অতঃপর আরশবাহী ফিরিস্তাগণের কাছাকাছি আসমানবাসীরা তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনাদের প্রতিপালক কী বললেন?' সুতরাং তিনি যা বলেন, তার খবর তাঁরা জানিয়ে দেন। এইভাবে প্রত্যেক আসমানবাসী পরস্পরের মধ্যে খবর জানাজানি করেন। পরিশেষে এই দুনিয়ার আসমানে খবর এসে পৌঁছে। জ্বিনেরা সেই খবর লুফে নেয় এবং তাদের বন্ধুদের কাছে বিক্ষিপ্ত করে। সুতরাং যে খবর তারা হুবহু আনয়ন করে, তা সত্য। কিন্তু আসলে তারা তাতে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটায় ও সংযোজিত করে।”⁷¹
বলা বাহুল্য, উক্ত শ্রেণীর খবরচোর জ্বিনদেরকে প্রতিহত করার জন্য উল্কা নিক্ষেপ করা হয়।
কখনো তারা আরো সহজ উপায়ে আসমানী খবর চুরি করে। মেঘমালায় অবতীর্ণ ফিরিশতামন্ডলীর নিকট থেকে আসমানী ফায়সালা শ্রবণ করে ফেলে।
টিকাঃ
৭১. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৫৫
📄 গৃহবাসী জ্বিন
জ্বিন কখনো কখনো সাপের আকৃতি ধারণ করে মানুষের বাসায় বসবাস করে। এই জন্য নবী বাড়ির ভিতর তাড়াহুড়া করে সাপ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। যাতে কোন মুসলিম জ্বিন অকারণে মারা না যায়। তিনি বলেছেন,
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ جِنَّا قَدْ أَسْلَمُوا فَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْهُمْ شَيْئًا فَآذِنُوهُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِنْ بَدَا لَكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ فَاقْتُلُوهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ
"অবশ্যই মদীনায় কিছু জ্বিন আছে, যারা মুসলমান হয়েছে। সুতরাং তাদের কাউকে (সর্পাকারে) দেখলে তাকে তিন দিন সতর্ক কর। অতঃপর উচিত মনে হলে তাকে হত্যা কর। কারণ সে শয়তান।"⁷⁹
মদীনার এক যুবক সাহাবী তাড়াহুড়া করে বাড়ির একটি সাপ মারার ফলে তিনিও মৃত্যুর শিকার হয়েছিলেন। একদা আবুস সায়েব আবু সাঈদ খুদরী) এর নিকট তাঁর বাড়িতে গেলেন। দেখলেন, তিনি স্বলাত পড়ছেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর স্বলাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। ইত্যবসরে বাড়ির এক প্রান্তে (ছাদে লাগানো) খেজুর কাঁদির ডালগুলিতে কিছু নড়া-সরা করার শব্দ শুনতে পেলাম। দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখি, একটি সাপ। আমি লাফিয়ে উঠে তা মারতে উদ্যত হলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ইশারা করে বললেন, 'বসে যাও।' সুতরাং আমি বসে গেলাম। অতঃপর স্বলাত শেষ হলে তিনি আমাকে বাড়ির ভিতরে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, 'এ ঘরটা দেখছ?' আমি বললাম, 'জী।' তিনি বললেন, 'এ ঘরে আমাদেরই একজন নব্য বিবাহিত যুবক ছিল। আমরা রসূলুল্লাহ এর সাথে খন্দকের প্রতি বের হয়েছিলাম। সেই যুবক দুপুরে রসূলুল্লাহ এর নিকট অনুমতি নিয়ে নিজ বাসায় ফিরত। সে একদিন তাঁর নিকট অনুমতি নিল। তিনি বললেন, "তুমি তোমার অস্ত্র সঙ্গে নাও। তোমার প্রতি কুরাইযার আশঙ্কা হয়।"
সুতরাং সে নিজ অস্ত্র নিয়ে বাসায় ফিরল। দেখল তার (নতুন) বউ দরজার দুই চৌকাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঈর্ষান্বিত হয়ে বর্শা তুলে তাকে আঘাত করত উদ্যত হল! তার স্ত্রী তাকে বলল, 'আপনি আপনার বর্শা নিবারণ করুন। বাসায় প্রবেশ করুন, তাহলে দেখতে পাবেন, কে আমাকে বের করেছে?'
সুতরাং সে বাসায় প্রবেশ করে দেখল, একটি বৃহদাকার সাপ বিছানায় কুন্ডলী পাকিয়ে বসে আছে! অতএব সে বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে গেঁথে ফেলল। অতঃপর কক্ষ থেকে বের হয়ে বাড়ির (মাটিতে) বর্শাটিকে গেড়ে দিল। তৎক্ষণাৎ সাপটি ছট্ফট্ করে লাফিয়ে উঠে তার উপর হামলা করল। অতঃপর জানা গেল না যে, কে আগে সত্বর মারা গেল; সাপটি, নাকি যুবকটি?
আমরা রসূলুল্লাহ এর নিকট গিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করলাম এবং বললাম, 'আপনি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যাতে তিনি ওকে বাঁচিয়ে তোলেন।' তিনি বললেন, "তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।” অতঃপর বললেন, "অবশ্যই মদীনায় কিছু জ্বিন আছে, যারা মুসলমান হয়েছে। সুতরাং তাদের কাউকে (সর্পাকারে) দেখলে তাকে তিন দিন সতর্ক কর। অতঃপর উচিত মনে হলে তাকে হত্যা কর। কারণ সে শয়তান। "⁸⁰
টিকাঃ
৭৯. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৭৬
৮০. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৭৬
📄 সাপ হত্যার ব্যাপারে জরুরী সতর্কবাণী
> (ক) বাড়ির ভিতর কেবল সাপ হত্যাই নিষেধ। অন্য ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা নয়।
> (খ) বাড়ির বাইরের সাপ হত্যা নিষেধ নয়। বরং তা হত্যা করতে আদেশ করা হয়েছে। যেহেতু তা মানুষের শত্রু।
> (গ) বাড়ির ভিতরে সাপ দেখলে তাকে সতর্ক করতে হবে। তাকে বের হয়ে যেতে বলতে হবে। 'আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, এ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও; নচেৎ আমরা তোমাকে মেরে ফেলব’---এ কথা বলা যায়। এর তিন দিন পরে তাকে দেখা গেলে হত্যা করা যাবে।
(ঘ) সে যদি পালিয়ে না যায়, তাহলে জানতে হবে, সে জ্বিন নয় অথবা সে কাফের জ্বিন। সেহেতু বাড়ির লোকের নিরাপত্তার জন্য তাকে হত্যা করতে হবে।
(ঙ) অবশ্য এক শ্রেণীর সাপ আছে, তাকে বাড়িতে সতর্ক না করে দেখামাত্র হত্যা করা যাবে। যেহেতু তা খুবই মারাত্মক এবং সম্ভবতঃ জ্বিন তার আকৃতি ধারণ করে না। নবী বলেছেন,
لَا تَقْتُلُوا الْجِنَّانَ إِلَّا كُلَّ أَبْتَرَ ذِي طُفْيَتَيْنِ فَإِنَّهُ يُسْقِطُ الْوَلَدَ وَيُذْهِبُ الْبَصَرَ فَاقْتُلُوهُ
“মুড়া লেজ, পিঠে দুটি সাদা রেখাবিশিষ্ট সাপ ছাড়া তোমরা সাপ হত্যা করো না। কারণ ঐ সাপ ভ্রূণকে গর্ভচ্যুত করে এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে ফেলে। সুতরাং তা তোমরা মেরে ফেলো।”⁸¹ জ্ঞাতব্য যে, একটি হাদীসে আছে, নবী বলেছেন,
الْحَيَّاتُ مَسْخُ الْجِنِّ ، كَمَا مُسِخَتِ الْقِرَدَةُ وَالْخَنَازِيرُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ
“সাপ হল জ্বিনের বিকৃত আকৃতি। যেমন বানী ইস্রাঈল থেকে বানর ও শূকর পরিবর্তিত হয়েছিল।”⁸²
উক্ত হাদীসের অর্থ এই নয় যে, বর্তমানের সকল সাপ জ্বিনের বিকৃত রূপ। এর অর্থ হল, জ্বিন জাতির ভিতরে আকৃতি-বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে। আর সে আকৃতি ছিল সাপের। যেমন বানী ইস্রাঈলের ভিতরে ঘটেছিল এবং তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল। তবে সেই বিকৃত জ্বিন ও বানী ইস্রাঈলের কোন বংশধর বেঁচে নেই। যেহেতু হাদীসে এসেছে, নবী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ لِمَسْخِ نَسْلاً وَلَا عَقِبًا وَقَدْ كَانَتِ الْقِرَدَةُ وَالْخُنَازِيرُ قَبْلَ ذَلِكَ
“নিশ্চয় মহান আল্লাহ বিকৃত প্রাণীর কোন বংশধর বা উত্তরসূরি করেননি। তার পূর্বেও বানর ও শূকর বর্তমান ছিল।"⁸³
টিকাঃ
৮১. বুখারী তাও. হা/৩৩১১
৮২. ত্বাবারানী, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/১৮২৪
৮৩. আহমাদ, মুসলিম মাশা. হা/৬৯৪১