📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 দ্বিতীয়তঃ মানুষের পূর্বে জ্বিনদের মহাকাশ অভিযান

📄 দ্বিতীয়তঃ মানুষের পূর্বে জ্বিনদের মহাকাশ অভিযান


শয়তান জ্বিনেরা মহাকাশে ঊর্ধ্বে আরোহণ করে আসমানী খবর চুরিছুপে শুনতে চায়। যাতে তারা ঘটনাঘটন ঘটার পূর্বেই জানতে পারে। কিন্তু সর্বশেষ নবী প্রেরিত হওয়ার পর মহাকাশের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা হয়। তাদের বিশ্বাসী এক দলের কথা,

وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهُبًا - وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمْعِ فَمَن يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدْ لَهُ شِهَابًا رَّصَدًا

"আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা তা পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে (সংবাদ) শুনবার জন্য বসতাম, কিন্তু এখন কেউ (সংবাদ) শুনতে চাইলে, সে তার উপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডের সম্মুখীন হয়। "⁶⁷

আল্লাহ তাআলা যখন আসমানে পৃথিবীর কোন ঘটনার ফায়সালা করেন, ফিরিশতারা সে কথা শুনেন যেন পাথরের উপর শিকল পড়ার শব্দ। তাতে তাঁরা ঘাবড়ে যান বা মূর্ছিত হন। তাঁদের ঘাবড়ানি বা মূর্ছা দূর হলে একে অপরকে প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহ কী বললেন বা কী ফায়সালা করলেন?' বলেন, 'সত্য।' ফিরিশতাগণের আপোসের আলোচনায় নিম্ন আসমানের ফিরিশতামন্ডলীও শামিল হন। তার কিছু চুরি-ছুপে শয়তান জ্বিন শুনে নেয় এবং তারাও একে অপরকে আপোসের মধ্যে জানিয়ে থাকে। আকাশের ধারে-পাশে শুনতে গেলে উল্কা ছুটে এসে বাধা দেয়। আল্লাহ পাক আকাশকে অবাধ্য শয়তান হতে হিফাযতে রেখেছেন। ফলে সে ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। ⁶⁸

কিছু শয়তান সেই খবর পৃথিবীতে তাদের সহচর গণকদের মনে পৌঁছে দেয়। গণকরা তাদের অনুমান ও ধারণার আরো শত মিথ্যা জুড়ে বিশদভাবে প্রচার করে। ফলে যা সত্য তা সত্য ঘটে, কিছু আন্দাজও সঠিক হয়ে যায় এবং অধিকতরই মিথ্যা ও অবাস্তব। ⁶⁹ মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَقَدْ جَعَلْنَا فِي السَّمَاءِ بُرُوجاً وَزَيَّنَّاهَا لِلنَّاظِرِينَ - وَحَفِظْنَاهَا مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ رَجِيمٍ - إِلَّا مَنْ اسْتَرَقَ السَّمْعَ فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ مُبِينٌ

"আকাশে আমি গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি এবং ওকে করেছি দর্শকদের জন্য সুশোভিত। প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে আমি ওকে নিরাপদ রেখেছি। আর কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে ওর পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত উল্কা।" ⁷⁰

উল্কাপাতের শরয়ী কারণ হল, আসমানী খবর চুরি করা থেকে শয়তান জ্বিনেদের বাধা দান করা।

#### অমূলক জাহেলী বিশ্বাস
আকাশে তারা ছুটলে বা উল্কাপাত ঘটলে মানুষে নানা ধারণা করে; কেউ বলে কোন মহান ব্যক্তির জন্ম হল, কোন মহান ব্যক্তির মৃত্যু হল। কেউ কালেমা পড়ে, কেউ পাঁচটা ফুলের নাম বলে ইত্যাদি।

কিন্তু আসলে এ সবের কিছু নয়। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস এক আনসারী থেকে বর্ণনা করে বলেন, একদা এক রাত্রে রসূলুল্লাহ এর সাথে সাহাবাগণ উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় উজ্জ্বল হয়ে একটি উল্কাপাত হল। রসূলুল্লাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "এরূপ উল্কাপাত হলে তোমরা জাহেলী যুগে কী বলতে?" তাঁরা বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল বেশি জানেন। আমরা বলতাম, আজ রাতে কোন মহান ব্যক্তির জন্ম হল অথবা কোন মহান ব্যক্তি মারা গেল।'

রসূলুল্লাহ বললেন, “কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা জন্মের কারণে উল্কাপাত হয় না। আসলে আমাদের প্রতিপালক তাবারাকা ওয়া তা'আলা যখন কিছু ফায়সালা করেন, তখন আরশবাহী ফিরিস্তাগণ তসবীহ পড়েন। অতঃপর তার পরবর্তী নিম্নের আসমানবাসী তাসবীহ পড়েন। পরিশেষে এই দুনিয়ার আসমানে তসবীহ এসে পৌঁছে। অতঃপর আরশবাহী ফিরিস্তাগণের কাছাকাছি আসমানবাসীরা তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনাদের প্রতিপালক কী বললেন?' সুতরাং তিনি যা বলেন, তার খবর তাঁরা জানিয়ে দেন। এইভাবে প্রত্যেক আসমানবাসী পরস্পরের মধ্যে খবর জানাজানি করেন। পরিশেষে এই দুনিয়ার আসমানে খবর এসে পৌঁছে। জ্বিনেরা সেই খবর লুফে নেয় এবং তাদের বন্ধুদের কাছে বিক্ষিপ্ত করে। সুতরাং যে খবর তারা হুবহু আনয়ন করে, তা সত্য। কিন্তু আসলে তারা তাতে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটায় ও সংযোজিত করে।”⁷¹

বলা বাহুল্য, উক্ত শ্রেণীর খবরচোর জ্বিনদেরকে প্রতিহত করার জন্য উল্কা নিক্ষেপ করা হয়।

কখনো তারা আরো সহজ উপায়ে আসমানী খবর চুরি করে। মেঘমালায় অবতীর্ণ ফিরিশতামন্ডলীর নিকট থেকে আসমানী ফায়সালা শ্রবণ করে ফেলে।

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, কিছু লোক রসূলুল্লাহ ﷺ কে গণকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “ওরা অপদার্থ।” (অর্থাৎ ওদের কথার কোন মূল্য নেই)। তারা নিবেদন করল, 'হে আল্লাহর রসূল! ওরা তো কখনো কখনো আমাদেরকে কোন জিনিস সম্পর্কে বলে, আর তা সত্য ঘটে যায়।' রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “এই সত্য কথাটি জ্বিন (ফিরিশতার নিকট থেকে) ছোঁ মেরে নিয়ে তার ভক্তের কানে পৌঁছে দেয়। তারপর সে ঐ (একটি সত্য) কথার সাথে একশ'টি মিথ্যা মিশিয়ে দেয়।” ⁷² বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে,

إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَنْزِلُ فِي الْعَنَانِ وَهُوَ السَّحَابُ فَتَذْكُرُ الْأَمْرَ قُضِيَ فِي السَّمَاءِ فَتَسْتَرِقُ الشَّيَاطِينُ السَّمْعَ فَتَسْمَعُهُ فَتُوحِيهِ إِلَى الْكُهَّانِ فَيَكْذِبُونَ مَعَهَا مِائَةَ كَذَّبَةٍ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ

"ফিরিশতাবর্গ আল্লাহর বিধানসমূহ নিয়ে মেঘমালার অভ্যন্তরে অবতরণ করেন এবং সে সব কথাবার্তা আলোচনা করেন, যার সিদ্ধান্ত আসমানে হয়েছে। সুতরাং শয়তান অতি সংগোপনে লুকিয়ে তা শুনে ফেলে এবং ভবিষ্যৎ-বক্তা গণকদের মনে প্রক্ষিপ্ত করে। তারপর তার সাথে তারা নিজেদের পক্ষ থেকে একশত মিথ্যা মিশ্রণ করে তা প্রচার করে।" ⁷³

টিকাঃ
৬৭. সূরা জ্বিন-৭২:৮-৯
৬৮. সূরা আস স-ফফাত-৩৭:৭-১০
৬৯. বুখারী ইফা. হা/৪৩৪১, আপ্র. হা/৪৩৪১, তাও, হা/৪৭০১,
৭০. সূরা আল হিজ্বর-১৫:১৬-১৮
৭১. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৫৫
৭২. বুখারী ইফা. হা/৫২৩৭, আপ্র. হা/৫৩৪১, তাও. হা/৫৭৬২, মুসলিম মাশা. হা/৫৯৫৩
৭৩. বুখারী ইফা, হা/২৯৮০, আপ্র. হা/২৯৭০, তাও. হা/৩২১০

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 তৃতীয়তঃ জ্বিনদের শিল্পজ্ঞান

📄 তৃতীয়তঃ জ্বিনদের শিল্পজ্ঞান


এ ব্যাপারে বহু যুগ পূর্বে নবী সুলাইমান (আঃ) এর নির্দেশে জ্বিনেরা বহু শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَن يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَن يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ - يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاء مِن تَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَّاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ

আমি বাতাসকে সুলাইমানের অধীন করেছিলাম, তার সকালের ভ্রমণ একমাসের পথ ছিল এবং সন্ধ্যার ভ্রমণও এক মাসের পথ ছিল। আমি তার জন্য গলিত তামার এক ঝরনা প্রবাহিত করেছিলাম। আল্লাহর অনুমতিক্রমে কিছু সংখ্যক জ্বিন তার সম্মুখে কাজ করত। ওদের মধ্যে যারা আমার নির্দেশ অমান্য করে, তাদেরকে আমি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি আস্বাদন করাব। ওরা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, প্রতিমা, হওয-সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির ওপর স্থাপিত বৃহদাকার ডেগ নির্মাণ করত। (আমি বলেছিলাম,) 'হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তোমরা কাজ করতে থাক। আমার দাসদের মধ্যে কৃতজ্ঞ অতি অল্পই।'⁷⁴

টিকাঃ
৭৪. সূরা সাবা-৩৪:১২-১৩

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 চতুর্থতঃ জ্বিনদের স্বেচ্ছারূপ ধারণ করার ক্ষমতা

📄 চতুর্থতঃ জ্বিনদের স্বেচ্ছারূপ ধারণ করার ক্ষমতা


জ্বিনেরা স্বেচ্ছামতো রূপ ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। কখনো মানুষ, আবার কখনো কোন জীব-জন্তুর আকারে মানুষের কাছে আবির্ভূত হয়। বদরের দিন শয়তান সুরাকা বিন মালেকের রূপ ধারণ করে মুশরিকদের নিকট এসেছিল এবং বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিল। অতঃপর যুদ্ধ শুরু হলে এবং অবতীর্ণ ফিরিস্তা দেখতে পেলে সে পলায়ন করেছিল। মহান আল্লাহ সে কথা কুরআনে বলেছেন,

وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَّكُمْ فَلَمَّا تَرَاءتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَى عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكُمْ إِنِّي أَرَى مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ

"স্মরণ কর, শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করেছিল এবং বলেছিল, 'আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের উপর বিজয়ী হবে না, আর আমি অবশ্যই তোমাদের সহযোগী (প্রতিবেশী)।' অতঃপর দু'দল যখন পরস্পরের সম্মুখীন হল, তখন সে পিছু হটে সরে পড়ল ও বলল, 'নিশ্চয় তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। নিশ্চয় আমি তা দেখি, যা তোমরা দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমি আল্লাহকে ভয় করি।' আর আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।"⁷⁵

একদা রসূল আবু হুরাইরাকে বায়তুল মালের উপর পাহারাদার নিযুক্ত করলেন; এক চোর চুরি করতে এলে আবু হুরাইরা তাকে ধরে ফেললেন। চোরটি তাঁর নিকট ক্ষমার আশা ব্যক্ত এবং নিজ দরিদ্রতার কথা প্রকাশ করলে তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু চোরটি দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার চুরি করতে এল। প্রত্যেকবার আবু হুরাইরা তাকে ধরে বললেন, 'তোমাকে রসূলের দরবারে পেশ করবই।' চোরটি বলল, 'আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে কুরআনের এমন একটি আয়াত শিখিয়ে দেব, যা পাঠ করলে শয়তান তোমার নিকটবর্তী হবে না।' আবু হুরাইরা বললেন, 'তা কোন আয়াত?' চোরটি বলল, 'আয়াতুল কুরসী।' আবু হুরাইরা তাকে ছেড়ে দিলেন। অতঃপর তাঁর দেখা এই ঘটনা রসূল এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বললেন, "তুমি জান কি, কে এ কথা বলেছে? ও ছিল শয়তান। সে বলেছে সত্যই অথচ নিজে ভীষণ মিথ্যুক।"⁷⁶

জ্বিনেরা কখনো কোন পশু; উট, গাধা, গরু, কুকুর বা বিড়ালের রূপ ধারণ করে। অধিকাংশ তারা কালো কুকুর ও বিড়ালের রূপ ধারণ করে। নবী জানিয়েছেন, কালো কুকুর সামনে বেয়ে পার হলে স্বলাত নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, "কালো কুকুর শয়তান।" ⁷⁷

ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন, 'কালো কুকুর কুকুরদের শয়তান। জ্বিনেরা বহু ধরনের আকৃতি ধারণ করে থাকে। কালো বিড়ালের আকৃতিও ধারণ করে থাকে। কেননা অন্যান্য রঙের তুলনায় কালো রঙ শয়তানী শক্তির সাথে অধিক সমঞ্জস। আর তাতে আছে উষ্ণতার শক্তি।' ⁷⁸

#### গৃহবাসী জ্বিন

জ্বিন কখনো কখনো সাপের আকৃতি ধারণ করে মানুষের বাসায় বসবাস করে। এই জন্য নবী বাড়ির ভিতর তাড়াহুড়া করে সাপ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। যাতে কোন মুসলিম জ্বিন অকারণে মারা না যায়। তিনি বলেছেন,

إِنَّ بِالْمَدِينَةِ جِنَّا قَدْ أَسْلَمُوا فَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْهُمْ شَيْئًا فَآذِنُوهُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِنْ بَدَا لَكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ فَاقْتُلُوهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ

"অবশ্যই মদীনায় কিছু জ্বিন আছে, যারা মুসলমান হয়েছে। সুতরাং তাদের কাউকে (সর্পাকারে) দেখলে তাকে তিন দিন সতর্ক কর। অতঃপর উচিত মনে হলে তাকে হত্যা কর। কারণ সে শয়তান।"⁷⁹

মদীনার এক যুবক সাহাবী তাড়াহুড়া করে বাড়ির একটি সাপ মারার ফলে তিনিও মৃত্যুর শিকার হয়েছিলেন। একদা আবুস সায়েব আবু সাঈদ খুদরী) এর নিকট তাঁর বাড়িতে গেলেন। দেখলেন, তিনি স্বলাত পড়ছেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর স্বলাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। ইত্যবসরে বাড়ির এক প্রান্তে (ছাদে লাগানো) খেজুর কাঁদির ডালগুলিতে কিছু নড়া-সরা করার শব্দ শুনতে পেলাম। দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখি, একটি সাপ। আমি লাফিয়ে উঠে তা মারতে উদ্যত হলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ইশারা করে বললেন, 'বসে যাও।' সুতরাং আমি বসে গেলাম। অতঃপর স্বলাত শেষ হলে তিনি আমাকে বাড়ির ভিতরে একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, 'এ ঘরটা দেখছ?' আমি বললাম, 'জী।' তিনি বললেন, 'এ ঘরে আমাদেরই একজন নব্য বিবাহিত যুবক ছিল। আমরা রসূলুল্লাহ এর সাথে খন্দকের প্রতি বের হয়েছিলাম। সেই যুবক দুপুরে রসূলুল্লাহ এর নিকট অনুমতি নিয়ে নিজ বাসায় ফিরত। সে একদিন তাঁর নিকট অনুমতি নিল। তিনি বললেন, "তুমি তোমার অস্ত্র সঙ্গে নাও। তোমার প্রতি কুরাইযার আশঙ্কা হয়।"

সুতরাং সে নিজ অস্ত্র নিয়ে বাসায় ফিরল। দেখল তার (নতুন) বউ দরজার দুই চৌকাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঈর্ষান্বিত হয়ে বর্শা তুলে তাকে আঘাত করত উদ্যত হল! তার স্ত্রী তাকে বলল, 'আপনি আপনার বর্শা নিবারণ করুন। বাসায় প্রবেশ করুন, তাহলে দেখতে পাবেন, কে আমাকে বের করেছে?'

সুতরাং সে বাসায় প্রবেশ করে দেখল, একটি বৃহদাকার সাপ বিছানায় কুন্ডলী পাকিয়ে বসে আছে! অতএব সে বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে গেঁথে ফেলল। অতঃপর কক্ষ থেকে বের হয়ে বাড়ির (মাটিতে) বর্শাটিকে গেড়ে দিল। তৎক্ষণাৎ সাপটি ছট্‌ফট্ করে লাফিয়ে উঠে তার উপর হামলা করল। অতঃপর জানা গেল না যে, কে আগে সত্বর মারা গেল; সাপটি, নাকি যুবকটি?

আমরা রসূলুল্লাহ এর নিকট গিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করলাম এবং বললাম, 'আপনি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যাতে তিনি ওকে বাঁচিয়ে তোলেন।' তিনি বললেন, "তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।” অতঃপর বললেন, "অবশ্যই মদীনায় কিছু জ্বিন আছে, যারা মুসলমান হয়েছে। সুতরাং তাদের কাউকে (সর্পাকারে) দেখলে তাকে তিন দিন সতর্ক কর। অতঃপর উচিত মনে হলে তাকে হত্যা কর। কারণ সে শয়তান। "⁸⁰

#### সাপ হত্যার ব্যাপারে জরুরী সতর্কবাণী

> (ক) বাড়ির ভিতর কেবল সাপ হত্যাই নিষেধ। অন্য ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা নয়।

> (খ) বাড়ির বাইরের সাপ হত্যা নিষেধ নয়। বরং তা হত্যা করতে আদেশ করা হয়েছে। যেহেতু তা মানুষের শত্রু।

> (গ) বাড়ির ভিতরে সাপ দেখলে তাকে সতর্ক করতে হবে। তাকে বের হয়ে যেতে বলতে হবে। 'আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, এ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও; নচেৎ আমরা তোমাকে মেরে ফেলব’---এ কথা বলা যায়। এর তিন দিন পরে তাকে দেখা গেলে হত্যা করা যাবে।

(ঘ) সে যদি পালিয়ে না যায়, তাহলে জানতে হবে, সে জ্বিন নয় অথবা সে কাফের জ্বিন। সেহেতু বাড়ির লোকের নিরাপত্তার জন্য তাকে হত্যা করতে হবে।

(ঙ) অবশ্য এক শ্রেণীর সাপ আছে, তাকে বাড়িতে সতর্ক না করে দেখামাত্র হত্যা করা যাবে। যেহেতু তা খুবই মারাত্মক এবং সম্ভবতঃ জ্বিন তার আকৃতি ধারণ করে না। নবী বলেছেন,

لَا تَقْتُلُوا الْجِنَّانَ إِلَّا كُلَّ أَبْتَرَ ذِي طُفْيَتَيْنِ فَإِنَّهُ يُسْقِطُ الْوَلَدَ وَيُذْهِبُ الْبَصَرَ فَاقْتُلُوهُ

“মুড়া লেজ, পিঠে দুটি সাদা রেখাবিশিষ্ট সাপ ছাড়া তোমরা সাপ হত্যা করো না। কারণ ঐ সাপ ভ্রূণকে গর্ভচ্যুত করে এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে ফেলে। সুতরাং তা তোমরা মেরে ফেলো।”⁸¹ জ্ঞাতব্য যে, একটি হাদীসে আছে, নবী বলেছেন,

الْحَيَّاتُ مَسْخُ الْجِنِّ ، كَمَا مُسِخَتِ الْقِرَدَةُ وَالْخَنَازِيرُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ

“সাপ হল জ্বিনের বিকৃত আকৃতি। যেমন বানী ইস্রাঈল থেকে বানর ও শূকর পরিবর্তিত হয়েছিল।”⁸²

উক্ত হাদীসের অর্থ এই নয় যে, বর্তমানের সকল সাপ জ্বিনের বিকৃত রূপ। এর অর্থ হল, জ্বিন জাতির ভিতরে আকৃতি-বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে। আর সে আকৃতি ছিল সাপের। যেমন বানী ইস্রাঈলের ভিতরে ঘটেছিল এবং তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল। তবে সেই বিকৃত জ্বিন ও বানী ইস্রাঈলের কোন বংশধর বেঁচে নেই। যেহেতু হাদীসে এসেছে, নবী বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ لِمَسْخِ نَسْلاً وَلَا عَقِبًا وَقَدْ كَانَتِ الْقِرَدَةُ وَالْخُنَازِيرُ قَبْلَ ذَلِكَ

“নিশ্চয় মহান আল্লাহ বিকৃত প্রাণীর কোন বংশধর বা উত্তরসূরি করেননি। তার পূর্বেও বানর ও শূকর বর্তমান ছিল।"⁸³

টিকাঃ
৭৫. সূরা আল আনফাল-৮:৪৮
৭৬. বুখারী ইফা, অনুচ্ছেদ: ১৪৩৮, আপ্র. কিতাবুল ওয়াকালাহ অনুচ্ছেদ, তাও. হা/২৩১১
৭৭. মুসলিম মাশা. হা/১১৬৫
৭৮. মাজম্' ফাতাওয়া ১৯/৫২
৭৯. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৭৬
৮০. মুসলিম মাশা. হা/৫৯৭৬
৮১. বুখারী তাও. হা/৩৩১১
৮২. ত্বাবারানী, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা. হা/১৮২৪
৮৩. আহমাদ, মুসলিম মাশা. হা/৬৯৪১

📘 জ্বিন ও শয়তান জগৎ > 📄 পঞ্চমতঃ শয়তান মানুষের রক্তশিরায় চলাফেরা করে

📄 পঞ্চমতঃ শয়তান মানুষের রক্তশিরায় চলাফেরা করে


একদা রাত্রিকালে সফিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ই'তিকাফরত স্বামী নবী কে মসজিদে দেখা করার জন্য এলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর তিনি বাসায় ফিরতে গেলে নবী তাঁকে পৌঁছে দিতে তাঁর সাথে বের হলেন। পথে আনসারদের দুই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের দেখা হলে তারা লজ্জায় অন্য দিকে ফিরে গেল। নবী বললেন, "ওহে! কে তোমরা? শোন। আমার সাথে এ মহিলা হল (আমারই স্ত্রী) সফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই।” তারা বলল, 'আল্লাহর পানাহ! সুবহানাল্লাহ! আপনার ব্যাপারেও কি আমরা কোন সন্দেহ করতে পারি?' নবী বললেন,

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنَ الإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ وَإِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَرًّا

"নিশ্চয় শয়তান আদম সন্তানের রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়। আর আমার ভয় হয় যে, সে তোমাদের মনে কোন কুধারণা প্রক্ষিপ্ত করে দেবে।"⁸⁴ তিনি আরো বলেছেন,

لا تَلِجُوا عَلَى المُغَيَّبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ

"তোমরা এমন মহিলাদের নিকট গমন করো না, যাদের স্বামী বর্তমানে উপস্থিত নেই। কারণ শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের রক্ত-শিরায় প্রবাহিত হয়।" সাহাবাগণ বললেন, 'আর আপনারও রক্ত-শিরায়?' তিনি বললেন,

وَمِنِّي وَلَكِنْ أَعَانَنِي اللَّهُ عَلَيْهِ فَأَسْلَم

"হ্যাঁ, আমারও রক্ত-শিরায়। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সহায়তা করেন বলে আমি নিরাপদে থাকি।"⁸⁵

টিকাঃ
৮৪. বুখারী ইফা, হা/১৯০৭, আপ্র. হা/১৮৯৫, তাও. হা/২০৩৮, মুসলিম মাশা. হা/২১৭৪
৮৫. আহমাদ, সহীহ আত-তিরমিযী মাথ, হা/৯৩৫, মিশতাত হাএ. হা/৩১১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00