📄 জ্বিনদের বয়স ও মৃত্যু
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জ্বিন ও শয়তানের মৃত্যু আছে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ - وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
"ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)। "⁵¹ নবী তাঁর এক প্রার্থনায় বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِعِزَّتِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَنْ تُضِلَّنِي، أَنْتَ الْحَيُّ الَّذِي لَا يَمُوْتُ وَالْجِنُّ وَالْإِنسُ يَمُوتُونَ
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি তোমারই নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, তোমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তোমারই উপর ভরসা রেখেছি, তোমারই প্রতি অভিমুখ করেছি এবং তোমারই সাহায্যে বিতর্ক করেছি। হে আল্লাহ! অবশ্যই আমি তোমার ইজ্জতের অসীলায় পানাহ চাচ্ছি যে, তুমি আমাকে পথভ্রষ্ট করো না। তুমি ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই। তুমিই সেই চিরঞ্জীব যাঁর মৃত্যু নেই। আর দানব ও মানব মৃত্যুবরণ করবে। ⁵²
অবশ্য তাদের গড় আয়ু কত, সে বিষয়ে কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ইবলীস সম্বন্ধে মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, সে কিয়ামত অবধি জীবিত থাকবে। যেহেতু অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হওয়ার পর সে তা চেয়েছিল এবং তা পেয়েছেও। সে বলেছিল,
فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
'পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।'⁵³ মহান আল্লাহ বলেছিলেন,
إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ
'যাদের অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। '⁵⁴ কিন্তু সে ছাড়া অন্য জ্বিনেরা কত বছর বাঁচে, তা আমাদের জানা নেই। তবে অবশ্যই তারা মানুষের চাইতে বেশি দিন জীবনধারণ করে।
তারা যে মরে এবং তাদেরকে হত্যা করা যায়, তার প্রমাণ খালেদ বিন অলীদ উয্যার শয়তানাকে হত্যা করেছেন এবং মদীনার এক সাহাবী সাপরূপী এক জ্বিনকে হত্যা করেছেন। যথাস্থানে তা উল্লেখ করা হবে-- ইনশা-আল্লাহ।
টিকাঃ
৫১. সূরা আর রহমান-৫৫:২৬-২৭
৫২. মুসলিম, মাশা হা/৭০৭৪, মিশকাত, হাএ. হা/২৪৬৩
৫৩. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১৪, সূরা আল হিজ্বর-১৫:৩৬, সূরা সোয়া-দ-৩৮:৭৯
৫৪. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১৫
📄 জ্বিন ও শয়তানদের বাসা
জ্বিন ও শয়তান এই পৃথিবীতেই বসবাস করে, যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করি। অবশ্য তারা পোড়ো বাড়ি ও জনশূন্য স্থানে বাস করে। নোংরা ও অপবিত্র জায়গায় বাস করে শয়তান জ্বিনরা। প্রস্রাব-পায়খানার জায়গা, নোংরা ফেলার জায়গা, কবরস্থান-শাশান, গায়রুল্লাহ পূজার জায়গা ইত্যাদি এদের পছন্দনীয় জায়গা।
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন, এই সকল জায়গা, যেখানে শয়তান বসবাস করে, সেখানে সেই তথাকথিত বুযুর্গরাও স্থান গ্রহণ করে, যাদের সাথে শয়তানদের যোগাযোগ আছে। কিছু হাদীসে বাথরুমে স্বলাত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। যেহেতু তা অপবিত্রতার জায়গা এবং যেহেতু তা শয়তানদের বাসস্থান। আর কবরস্থানেও স্বলাত নিষিদ্ধ। যেহেতু তা শির্কের ছিদ্রপথ। ⁵⁵
সে সকল স্থানেও শয়তানদের উপস্থিতি বেশি থাকে, যেখানে তাদের ফাসাদ সৃষ্টি সহজ হয়। যেমন বাজারে তাদের আড্ডা জমে। যেহেতু বাজার সাধারণতঃ নানা পাপের জায়গা। এই জন্যই মহান আল্লাহর নিকট পৃথিবীর সব চাইতে ঘৃণ্যতম জায়গা হল বাজার। নবী বলেছেন,
أَحَبُّ البِلادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا ، وَأَبْغَضُ البِلَادِ إِلَى اللَّهِ أَسْوَاقُهَا
"আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে পছন্দনীয় স্থান হল মসজিদ। আর সবচেয়ে ঘৃণ্য স্থান হল বাজার।”⁵⁶
যেহেতু বাজার হল খাস দুনিয়াদারদের জায়গা। সেখানে সাধারণতঃ দুনিয়াদারী চলে। লোভ-লালসা ও অর্থলোলুপতার বিশেষ স্থান বাজার। খিয়ানত, ভেজাল, সূদী কারবার, মিথ্যা কথন, মিথ্যা আশ্বাস, মিথ্যা আশা ও লোভ ইত্যাদির বেসাতির বেশ জোরদার জায়গা বাজার। ধোঁকাবাজি, ঠকবাজি, মিথ্যা হলফবাজি, অসৎ মানুষদের আড্ডাবাজি, বেপর্দা প্রসাধিকা মহিলা, বেশ্যা মহিলা, মস্তান ও লম্পটদের প্রধান জায়গা বাজার।
বাজারের চাকচিক্য, হৈচৈ, ঝামেলা-ঝঞ্চাট, প্রসাধিকাদের বেপর্দা হয়ে বেলেল্লাপনা চলাফেরা, গান-বাজনা ইত্যাদি আল্লাহর যিক্র থেকে বিস্মৃতি আনে, ঔদাসীন্য আনে।
সালমান ফারেসী বলেন, 'তুমি যদি পার, তাহলে সর্বপ্রথম বাজারে প্রবেশকারী হবে না এবং সেখান থেকে সর্বশেষ প্রস্থানকারী হবে না। কারণ, বাজার শয়তানের আড্ডাস্থল; সেখানে সে আপন ঝান্ডা গাড়ে। '⁵⁷
এই জন্যই বাজারে গিয়ে বিশেষ দু'আ পড়লে মিলিয়ন সওয়াবের উপহার পাওয়া যায়। যেহেতু সেখানে শয়তানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে তা পড়তে হয়। কেননা তারা তা পড়তে ভুলিয়ে দেয়।
শয়তান জ্বিন মানুষের ঘরে এসেও বাসা বাঁধে। তবে 'বিসমিল্লাহ', আল্লাহর যিক্র, কুরআন তিলাওয়াত---বিশেষ করে সূরা বাক্বারাহ ও তার মধ্যে আয়াতুল কুরসী ও শেষাংশের দু'টি আয়াত পাঠ করলে শয়তান ঘরে বাসা বাঁধতে পারে না।
হাদীসে আছে, শয়তানেরা কোথাও বিশ্রাম নেয়। অতঃপর অন্ধকার ছেয়ে এলে তারা ছড়িয়ে পড়ে। এই জন্য নবী সেই সময় শিশুদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দিতে নিষেধ করেছেন। ⁵⁸
শয়তান আযানের শব্দ শুনে পলায়ন করে। শয়তানদেরকে রমযান মাসে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
অর্ধেক দেহ রোদে ও অর্ধেক দেহ ছায়াতে রেখে বসতে শয়তান ভালোবাসে। এই জন্য নবী আমাদেরকে অনুরূপ বসতে নিষেধ করেছেন। ⁵⁹
টিকাঃ
৫৫. মাজমূ' ফাতাওয়া ১৯/৪১
৫৬. মুসলিম, মাশা হা/১৫৬০
৫৭. মুসলিম, মাশা হা/৬৪৬৯
৫৮. বুখারী তাও. হা/৩২৮০, আপ্র. হা/৩০৩৮, ইফা, হা/৩০৪৭, মুসলিম মাশা. হা/৫৩৬৮
৫৯. আহমাদ, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা, হা/৮৩৮
📄 জ্বিনদের সওয়ারী ও পশু
ইবনে মাসউদ বলেন, একদা রসূলুল্লাহ কে আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অতঃপর তাঁকে পাওয়া গেলে তার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, "আমার কাছে এক জ্বিনের আহবায়ক এসেছিল। আমি তার সঙ্গে গিয়ে তাদের কাছে কুরআন পড়লাম।" অতঃপর তিনি আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তাদের বিভিন্ন চিহ্ন ও তাদের আগুনের চিহ্ন দেখালেন। তারা তাঁর নিকট খাদ্য চেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন,
لَكُمْ كُلُّ عَظْمٍ ذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ يَقَعُ فِي أَيْدِيكُمْ أَوْفَرَ مَا يَكُونُ لَحْمًا وَكُلُّ بَعَرَةٍ عَلَفٌ لِدَوَابِّكُمْ
"আল্লাহর নাম উল্লেখ করে যে কোন হাড্ডির উপর তোমাদের হাত পড়বে, তা তোমাদের জন্য পর্যাপ্ত গোশ্তে পরিণত হবে। আর প্রত্যেক গোবর হবে তোমাদের পশুখাদ্য। "⁶⁰
উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায়, জ্বিনদের গবাদি পশু ও সওয়ারী আছে। আর তাদের খাদ্য হল মানুষের গবাদি পশুদের ত্যক্ত মল। শয়তানের ঘোড়া আছে, সে কথা আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ শয়তানকে বলেছিলেন,
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الأَمْوَالِ وَالأَوْلادِ وَعِدُهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا
"তোমার আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্যে যাকে পার সত্যচ্যুত কর, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যাও ও তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও। আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ছলনা মাত্র।”⁶¹
টিকাঃ
৬০. মুসলিম মাশা. হা/১০৩৫
৬১. সূরা বানী ইসরাঈল-১৭:৬৪
📄 এমন পশু, যার সাথে শয়তান থাকে
এমন একটি পশু উট। তার মধ্যে শয়তানী আচরণ আছে। নবী বলেছেন,
إِنَّ الإِبلَ خُلِقَتْ مِنَ الشَّيَاطِينَ وَإِنَّ وَرَاءَ كُلِّ بَعِيرٍ شَيْطَاناً
"নিশ্চয় উট শয়তানী উপাদান থেকে সৃষ্ট এবং নিশ্চয় প্রত্যেক উটের পশ্চাতে শয়তান থাকে।"⁶² এই জন্যই নবী বলেছেন,
لا تُصَلُّوا فِي مَبَارِكِ الإِبِلِ فَإِنَّهَا مِنَ الشَّيَاطِينِ وَصَلُّوا فِي مَرَابِضِ الْغَنَمِ فَإِنَّهَا بَرَكَةٌ
"তোমরা উটের আস্তাবলে স্বলাত পড়ো না, কারণ উট শয়তানী উপাদান থেকে সৃষ্ট। আর ছাগল-ভেড়ার গোয়ালে স্বলাত পড়, কারণ তা হল বর্কত।”⁶³
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, উক্ত শ্রেণীর হাদীসে এ কথার প্রমাণ রয়েছে যে, উটের আস্তাবলে স্বলাত নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ, তার মল-মূত্রের অপবিত্রতা নয়। যেহেতু সঠিক মতে হালাল পশুর মল-মূত্র অপবিত্র নয়।
"উট শয়তানী উপাদান থেকে সৃষ্ট।” অথচ উটের জন্ম উট থেকেই। অনুরূপ হাদীসে আছে, "কালো কুকুর শয়তান।" অথচ তারও জন্ম কুকুর থেকেই। তাহলে এ সকল কথার অর্থ কী?
আবুল ওয়াফা ইবনে আকীল বলেছেন, এ কথা উট ও কুকুরকে শয়তানের সাথে তুলনা করে বলা হয়েছে। যেহেতু কালো কুকুর সবচেয়ে বেশি বদমাশ কুকুর এবং উপকারিতার দিকে সবার চাইতে কম। আর কঠোরতা লাফা-ঝাঁপার দিকে থেকে উট জ্বিনের মতো। যেমন বলা হয়, 'অমুক শয়তান।' যখন সে কঠোর ও বদমাশ হয়।
ইবনে আকীল যা বলেছেন, তার সঠিকতার সমর্থক এই যে, আমাদের এই পৃথিবীর সকল জীব পানি থেকে সৃষ্ট। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيَّ
"আমি প্রত্যেকটি সজীব বস্তুকে পানি হতে সৃষ্টি করেছি।”
আর শয়তান হল আগুন থেকে সৃষ্টি। মোট কথা, উট ও কালো কুকুরের মধ্যে শয়তানী আচরণ আছে বলেই উভয়কে শয়তান বা শয়তান থেকে সৃষ্ট বলা হয়েছে।
টিকাঃ
৬২. সুনান সাঈদ বিন মানসূর, সহীহুল জামে' লিল আলবানী, মাশা, হা/১৫৭৯
৬৩. মুসনাদে আহমাদ মাশা, হা/১৮৫৩৮, আবু দাউদ আলএ. হা/১৮৪, ৪৯৩