📄 জ্বিনদের বিবাহ-শাদী ও বংশবৃদ্ধি
জ্বিনদের মধ্যে বিবাহ-শাদী ও বংশবৃদ্ধি হয়ে থাকে। এ বিষয়ে উলামাগণ পেশ করে থাকেন একটি আয়াত, যা মহান আল্লাহ বেহেস্তী স্ত্রীদের জন্য বলেছেন,
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ
"তাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি।”⁴³ আরবী ভাষায় 'ত্বাম' বলা হয় সঙ্গমকে। বলা হয়েছে, সেই সঙ্গম যাতে রক্তপাত হয়। তার মানে প্রথম সঙ্গম।
কাতাদাহ থেকে উল্লেখ করা হয় যে, "জ্বিনদের সন্তান হয়, যেমন মানুষের হয়। আর সংখ্যায় তারাই বেশি। "⁴⁴
অবশ্য আমাদের জন্য কুরআনের আয়াতই দলীলের জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, শয়তানের বংশধর আছে। তিনি বলেছেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاء مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا
"(স্মরণ কর,) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা আদমকে সিজদা কর', তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদা করল; সে ছিল জ্বিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল; তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে; অথচ তারা তোমাদের শত্রু? সীমালংঘনকারীদের পরিবর্ত কত নিকৃষ্ট!”⁴⁵
টিকাঃ
৪৩. সূরা আর রহমান-৫৫:৭৪
৪৪. ইবনে আবী হাতেম, হা/১৩৯০৪, আবুশ শায়খ, হা/১১৩৮৫৮
৪৫. সূরা আল কাহাফ-১৮:৫০
📄 জ্বিন-ইনসানের আপোসে মিলন কি সম্ভব?
এ কথা শোনা যায় যে, অমুকের স্বামী জ্বিন, অমুকের স্ত্রী জ্বিন্নিয়াহ। এ ব্যাপারে ইমাম সুয়ূতী অনেক আছার ও সলফদের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। যাতে বুঝা যায় যে, জ্বিন-ইনসানের মাঝে বিবাহ ও মিলন সম্ভব।⁸⁸
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ؒ বলেছেন, “জ্বিন-ইনসানের মাঝে কখনো কখনো বিবাহ ও মিলন ঘটতে পারে এবং তাদের সন্তানও হতে পারে। আর এমন ঘটনা অনেক ও প্রসিদ্ধ।”⁸⁹
পক্ষান্তরে অন্য কিছু উলামা বলেন, জ্বিন-ইনসানের মাঝে বিবাহ ও মিলন সম্ভব নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ মানুষের নিজেদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করে অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।”⁹⁰
সুতরাং যদি জ্বিন-ইনসানের বিবাহ হয়, তাহলে তাদের আপোসে শান্তিলাভ ও ভাব-ভালোবাসা লাভ হবে না। আর তাতে বিবাহের উদ্দেশ্যই বিফল হবে।
তবুও আমরা বলি, যদি তা কখনো ঘটে, তাহলে তা বিরল। জ্বিন মানুষের আকার ধারণ করে মানুষ সঙ্গীর সাথে সহাবস্থান করতে পারে। অনেক সময় মানুষ সে কাজে বাধ্য হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ
“সে সবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না; যাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি।"⁴⁹
মহান আল্লাহর উক্ত বাণীও এ কথার দলীল হতে পারে যে, জ্বিন- ইনসানের মাঝে মিলন সম্ভব। যেহেতু জান্নাতের হুরী জ্বিন-ইনসান উভয়ের স্ত্রী, উভয়ের জন্য উপযুক্ত।
উভয়ের মধ্যে বিবাহ ও মিলন বিরলভাবে সম্ভব হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে জ্বিনকে বিবাহ করা মাকরূহ। যেমন কুমারীর গর্ভবতী হয়ে এই বলা যে, 'আমার স্বামী জ্বিন।' যেহেতু তাতে ফ্যাসাদ বৃদ্ধি পাবে। ⁵⁰
টিকাঃ
৮৮. শুয়ূয়ুল মারজান ৬৯পৃঃ
৮৯. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৯/৩৯
৯০. সূরা আর রূম-২০:২১
৪৯. সূরা আর রহমান-৫৫:৫৬
৫০. মাজম্' ফাতাওয়া ১৯/৩৯
📄 জ্বিনদের বয়স ও মৃত্যু
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জ্বিন ও শয়তানের মৃত্যু আছে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ - وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
"ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)। "⁵¹ নবী তাঁর এক প্রার্থনায় বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِعِزَّتِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَنْ تُضِلَّنِي، أَنْتَ الْحَيُّ الَّذِي لَا يَمُوْتُ وَالْجِنُّ وَالْإِنسُ يَمُوتُونَ
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি তোমারই নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, তোমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তোমারই উপর ভরসা রেখেছি, তোমারই প্রতি অভিমুখ করেছি এবং তোমারই সাহায্যে বিতর্ক করেছি। হে আল্লাহ! অবশ্যই আমি তোমার ইজ্জতের অসীলায় পানাহ চাচ্ছি যে, তুমি আমাকে পথভ্রষ্ট করো না। তুমি ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই। তুমিই সেই চিরঞ্জীব যাঁর মৃত্যু নেই। আর দানব ও মানব মৃত্যুবরণ করবে। ⁵²
অবশ্য তাদের গড় আয়ু কত, সে বিষয়ে কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ইবলীস সম্বন্ধে মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, সে কিয়ামত অবধি জীবিত থাকবে। যেহেতু অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হওয়ার পর সে তা চেয়েছিল এবং তা পেয়েছেও। সে বলেছিল,
فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
'পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও।'⁵³ মহান আল্লাহ বলেছিলেন,
إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ
'যাদের অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। '⁵⁴ কিন্তু সে ছাড়া অন্য জ্বিনেরা কত বছর বাঁচে, তা আমাদের জানা নেই। তবে অবশ্যই তারা মানুষের চাইতে বেশি দিন জীবনধারণ করে।
তারা যে মরে এবং তাদেরকে হত্যা করা যায়, তার প্রমাণ খালেদ বিন অলীদ উয্যার শয়তানাকে হত্যা করেছেন এবং মদীনার এক সাহাবী সাপরূপী এক জ্বিনকে হত্যা করেছেন। যথাস্থানে তা উল্লেখ করা হবে-- ইনশা-আল্লাহ।
টিকাঃ
৫১. সূরা আর রহমান-৫৫:২৬-২৭
৫২. মুসলিম, মাশা হা/৭০৭৪, মিশকাত, হাএ. হা/২৪৬৩
৫৩. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১৪, সূরা আল হিজ্বর-১৫:৩৬, সূরা সোয়া-দ-৩৮:৭৯
৫৪. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১৫
📄 জ্বিন ও শয়তানদের বাসা
জ্বিন ও শয়তান এই পৃথিবীতেই বসবাস করে, যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করি। অবশ্য তারা পোড়ো বাড়ি ও জনশূন্য স্থানে বাস করে। নোংরা ও অপবিত্র জায়গায় বাস করে শয়তান জ্বিনরা। প্রস্রাব-পায়খানার জায়গা, নোংরা ফেলার জায়গা, কবরস্থান-শাশান, গায়রুল্লাহ পূজার জায়গা ইত্যাদি এদের পছন্দনীয় জায়গা।
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন, এই সকল জায়গা, যেখানে শয়তান বসবাস করে, সেখানে সেই তথাকথিত বুযুর্গরাও স্থান গ্রহণ করে, যাদের সাথে শয়তানদের যোগাযোগ আছে। কিছু হাদীসে বাথরুমে স্বলাত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। যেহেতু তা অপবিত্রতার জায়গা এবং যেহেতু তা শয়তানদের বাসস্থান। আর কবরস্থানেও স্বলাত নিষিদ্ধ। যেহেতু তা শির্কের ছিদ্রপথ। ⁵⁵
সে সকল স্থানেও শয়তানদের উপস্থিতি বেশি থাকে, যেখানে তাদের ফাসাদ সৃষ্টি সহজ হয়। যেমন বাজারে তাদের আড্ডা জমে। যেহেতু বাজার সাধারণতঃ নানা পাপের জায়গা। এই জন্যই মহান আল্লাহর নিকট পৃথিবীর সব চাইতে ঘৃণ্যতম জায়গা হল বাজার। নবী বলেছেন,
أَحَبُّ البِلادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا ، وَأَبْغَضُ البِلَادِ إِلَى اللَّهِ أَسْوَاقُهَا
"আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে পছন্দনীয় স্থান হল মসজিদ। আর সবচেয়ে ঘৃণ্য স্থান হল বাজার।”⁵⁶
যেহেতু বাজার হল খাস দুনিয়াদারদের জায়গা। সেখানে সাধারণতঃ দুনিয়াদারী চলে। লোভ-লালসা ও অর্থলোলুপতার বিশেষ স্থান বাজার। খিয়ানত, ভেজাল, সূদী কারবার, মিথ্যা কথন, মিথ্যা আশ্বাস, মিথ্যা আশা ও লোভ ইত্যাদির বেসাতির বেশ জোরদার জায়গা বাজার। ধোঁকাবাজি, ঠকবাজি, মিথ্যা হলফবাজি, অসৎ মানুষদের আড্ডাবাজি, বেপর্দা প্রসাধিকা মহিলা, বেশ্যা মহিলা, মস্তান ও লম্পটদের প্রধান জায়গা বাজার।
বাজারের চাকচিক্য, হৈচৈ, ঝামেলা-ঝঞ্চাট, প্রসাধিকাদের বেপর্দা হয়ে বেলেল্লাপনা চলাফেরা, গান-বাজনা ইত্যাদি আল্লাহর যিক্র থেকে বিস্মৃতি আনে, ঔদাসীন্য আনে।
সালমান ফারেসী বলেন, 'তুমি যদি পার, তাহলে সর্বপ্রথম বাজারে প্রবেশকারী হবে না এবং সেখান থেকে সর্বশেষ প্রস্থানকারী হবে না। কারণ, বাজার শয়তানের আড্ডাস্থল; সেখানে সে আপন ঝান্ডা গাড়ে। '⁵⁷
এই জন্যই বাজারে গিয়ে বিশেষ দু'আ পড়লে মিলিয়ন সওয়াবের উপহার পাওয়া যায়। যেহেতু সেখানে শয়তানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে তা পড়তে হয়। কেননা তারা তা পড়তে ভুলিয়ে দেয়।
শয়তান জ্বিন মানুষের ঘরে এসেও বাসা বাঁধে। তবে 'বিসমিল্লাহ', আল্লাহর যিক্র, কুরআন তিলাওয়াত---বিশেষ করে সূরা বাক্বারাহ ও তার মধ্যে আয়াতুল কুরসী ও শেষাংশের দু'টি আয়াত পাঠ করলে শয়তান ঘরে বাসা বাঁধতে পারে না।
হাদীসে আছে, শয়তানেরা কোথাও বিশ্রাম নেয়। অতঃপর অন্ধকার ছেয়ে এলে তারা ছড়িয়ে পড়ে। এই জন্য নবী সেই সময় শিশুদেরকে ঘরের বাইরে যেতে দিতে নিষেধ করেছেন। ⁵⁸
শয়তান আযানের শব্দ শুনে পলায়ন করে। শয়তানদেরকে রমযান মাসে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
অর্ধেক দেহ রোদে ও অর্ধেক দেহ ছায়াতে রেখে বসতে শয়তান ভালোবাসে। এই জন্য নবী আমাদেরকে অনুরূপ বসতে নিষেধ করেছেন। ⁵⁹
টিকাঃ
৫৫. মাজমূ' ফাতাওয়া ১৯/৪১
৫৬. মুসলিম, মাশা হা/১৫৬০
৫৭. মুসলিম, মাশা হা/৬৪৬৯
৫৮. বুখারী তাও. হা/৩২৮০, আপ্র. হা/৩০৩৮, ইফা, হা/৩০৪৭, মুসলিম মাশা. হা/৫৩৬৮
৫৯. আহমাদ, সিলসিলা আহাদীসুস সহীহা মাশা, হা/৮৩৮