📄 শয়তান জ্বিন
এ কথা আমরা জানি যে, মনুষ্য জাতির মতোই জ্বিন জাতির মধ্যে ভালো-মন্দ আছে। তবে তাদের মন্দের গুরু হল শয়তান, যার কথা আমরা বহু বলে থাকি ও শুনে থাকি। যার কথা কুরআন-হাদীসেও বহুবার আলোচিত হয়েছে।
শয়তান শুরুতে মহান প্রতিপালকের ইবাদতগুযার ছিল। আসমানে ফিরিশতার সঙ্গে বাস করেছে, জান্নাতেও ঢুকেছে। কিন্তু মহান আল্লাহ যখন তাকে আদমকে সিজদা করার আদেশ করলেন, তখন সে হিংসা ও অহংকারবশতঃ অবাধ্যতা করে বসল। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁকে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত করলেন।
আরবী ভাষায় 'শায়ত্বান' অবাধ্য বিদ্রোহীকে বলা হয়। যেহেতু সে নিজ প্রতিপালকের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ করেছে, তাই তাকে 'শয়তান' বলা হয়। তাকে 'তাগূত'ও বলা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءِ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
"যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে এবং যারা অবিশ্বাসী তারা তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। নিশ্চয় শয়তানের কৌশল দুর্বল।"¹⁷ 'তাগূত' মানে নিজ সীমা লংঘনকারী, নিজ প্রতিপালকের বিদ্রোহী এবং আল্লাহ ব্যতিরেকে পূজ্য ব্যক্তি। আর শয়তানের মধ্যে উক্ত সকল গুণ বিদ্যমান।
তাকে 'ইবলীস'ও বলা হয়। আরবী ভাষায় 'ইবলীস' মানে কল্যাণশূন্য ব্যক্তি, নিরাশ ও হতাশ ব্যক্তি। শয়তান আসলেই কল্যাণহীন বরং অকল্যাণময় সৃষ্টি এবং নিজের আচরণের ফলে মহান প্রতিপালকের করুণা থেকে নিরাশ।
যাঁরা কুরআন-হাদীস পড়েন ও বুঝেন, তাঁরা জানেন ও মানেন যে, শয়তান একটি এমন সৃষ্টি, যার জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, নড়াচড়া ও চলাফেরা করে। শয়তান কোন কু-আত্মা বা কুপ্রবৃত্তি নয়, যা মনুষ্য জীবের প্রকৃতিতে অবস্থান করে এবং হৃদয়ে প্রবল হয়ে তাকে উন্নত আধ্যাত্মিকতা থেকে ফিরিয়ে দেয়।¹⁸
টিকাঃ
১৭. সূরা আন নিসা-৪:৭৬
১৮. দায়েরাতুল মাআরিফিল হাদীষাহ ৩৫৭পৃঃ
📄 শয়তানের আসলত্ব
আমরা পূর্বেই জানতে পেরেছি যে, শয়তান জ্বিন জাতিভুক্ত। কিন্তু অনেকে কিছু অশুদ্ধ বর্ণনার উপর ভিত্তি করে বলেছেন, শয়তান ফিরিস্তা জাতিভুক্ত ছিল। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
"আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বললাম, 'আদমকে সিজদাহ কর।' তখন সকলেই সিজদাহ করল; কিন্তু ইবলীস সিজদাহ করল না; সে অমান্য করল ও অহংকার প্রদর্শন করল। সুতরাং সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হল।”¹⁹
লক্ষণীয় যে, সিজদার জন্য আদিষ্ট ছিলেন ফিরিস্তাদল। তাঁদের মধ্যে সকলেই সিজদা করলেন ইবলীস ছাড়া। আর তার মানে ইবলীস ফিরিস্তা জাতিভুক্ত। আরবী ব্যাকরণ অনুসারে ইস্তিঘ্নাতে 'মুস্তাম্রা' 'মুস্তান্না মিনহু'র শ্রেণীভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে 'মুস্তাফ্রা মিনহু' হল ফিরিস্তাবর্গ, আর 'মুস্তাম্রা' হল ইবলীস। সুতরাং ইবলীস ফিরিস্তারই শ্রেণীভুক্ত।
কিন্তু উক্ত যুক্তি দ্বারা এ প্রমাণ হয় না যে, ইবলীস ফিরিস্তার জাতিভুক্ত। যেহেতু উক্ত বাক্যে আছে 'ইস্তিঘ্না মুক্বাতে'। আর তাতে 'মুস্তাম্রা' 'মুস্তাফ্রা মিনহু'র শ্রেণীভুক্ত হয় না। তার প্রমাণ হল কুরআনের অন্য আয়াত, যাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইবলীস জ্বিন জাতিভুক্ত ছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ
"(স্মরণ কর,) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা আদমকে সিজদা কর', তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদা করল; সে ছিল জ্বিনদের একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল।”²⁰
তাছাড়া তার সৃষ্টির মূল উপাদান লক্ষ্য করলেও আমরা জানতে পারি, ইবলীস আগুন থেকে সৃষ্ট। আর ফিরিস্তা জ্যোতি থেকে। সে যে আগুন থেকে সৃষ্ট, সে কথা সে নিজেই বলেছে। মহান আল্লাহ যখন তাকে আদমকে সিজদা না করার কারণ দর্শাতে বললেন, তখন সে বলল,
أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ
'আমি তার (আদম) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং ওকে সৃষ্টি করেছ কাদামাটি দ্বারা।'²¹ সুতরাং আগুন থেকে সৃষ্ট হলে নিশ্চিতরূপে সে জ্বিন ছিল। যেহেতু জ্বিন আগুন থেকে সৃষ্ট। নবী বলেছেন,
خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
"ফিরিশতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নিশিখা হতে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। (অর্থাৎ, মাটি থেকে)। "²² হাসান বাসরী বলেছেন, 'ইবলীস নিমেষের জন্যও ফিরিস্তা ছিল না।'²³
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন, 'শয়তান ফিরিপ্তার দলভুক্ত ছিল বাহ্যদৃষ্টিতে। প্রকৃতদৃষ্টিতে সে তাঁদের জাতিভুক্ত নয় এবং প্রতিকৃতি হিসাবেও নয়।'²⁴
টিকাঃ
১৯. সূরা আল বাক্বারাহ-২:৩৪
২০. সূরা আল কাহাফ-১৮:৫০
২১. সূরা আল আ'রা-ফ-৭:১২, স্বাদ ৭৬
২২. মুসলিম মাশা. হা/৭৬৮৭, মিশকাত, হাএ. হা/৫৭০১
২৩. আল-বিদায়াহ অন্-নিহায়াহ ১/৭৯,
২৪. মাজমু' ফাতাওয়া ৪/৩৪৬
📄 ইবলীস কি জ্বিন জাতির আদি পিতা?
আদম যেমন মনুষ্য জাতির মূল ও আদি পিতা, তেমনি ইবলীসও কি জ্বিন জাতির মূল ও আদি পিতা?
আমাদের নিকট এমন কোন স্পষ্ট দলীল নেই, যাকে ভিত্তি করে বলা যেতে পারে যে, ইবলীস জ্বিন জাতির আদি পিতা অথবা সে তাদের বংশধর। যদিও শেষোক্ত রায়ের দলীল স্বরূপ নিম্নের আয়াত পেশ করা যায়,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ
"(স্মরণ কর,) আমি যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, 'তোমরা আদমকে সিজদা কর', তখন ইবলীস ছাড়া সবাই সিজদা করল; সে ছিল জ্বিনদের একজন।”²⁵
অবশ্য ইবনে তাইমিয়্যাহ মনে করেন, শয়তান জ্বিন জাতির আদি পিতা, যেমন আদম মানুষ জাতির আদি পিতা। ²⁶ আর আল্লাহই ভালো জানেন।
টিকাঃ
২৫. সূরা আল কাহাফ-১৮:৫০
২৬. মাজম্' ফাতাওয়া ৪/২৩৫/৩৪৬
📄 শয়তানের আকৃতি
শয়তানের আকৃতি কুৎসিত ও বিশ্রী। এত বিশ্রী যে, জাহান্নামীদের এক প্রকার খাদ্য যাক্কুম গাছ, সেই গাছের ফলকে শয়তানের মাথার সাথে তুলনা করেছেন মহান আল্লাহ। তিনি বলেছেন,
أَذْلِكَ خَيْرٌ نُزُلاً أَمْ شَجَرَةُ الزَّقُومِ إِنَّا جَعَلْنَاهَا فِتْنَةً لِلظَّالِمِينَ - إِنَّهَا شَجَرَةٌ تَخْرُجُ في أَصْلِ الْجَحِيمِ - طَلْعُهَا كَأَنَّهُ رُءُوسُ الشَّيَاطِينِ - فَإِنَّهُمْ لَآ كِلُونَ مِنْهَا فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ - ثُمَّ إِنَّ لَهُمْ عَلَيْهَا لَشَوْباً مِنْ حَمِيمٍ - ثُمَّ إِنَّ مَرْجِعَهُمْ لِإِلَى الْجَحِيمِ
"আপ্যায়নের জন্য কি এটিই উত্তম, না যাক্কুম বৃক্ষ? সীমালংঘনকারীদের জন্য আমি এ সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ; এ বৃক্ষ জাহান্নামের তলদেশ হতে উদ্গত হয়, এর মোচা শয়তানের মাথার মত। সীমালংঘনকারীরা তা ভক্ষণ করবে এবং তা দিয়ে উদর পূর্ণ করবে। তার উপর অবশ্যই ওদের জন্য ফুটন্ত পানির মিশ্রণ থাকবে, অতঃপর অবশ্যই ওদের প্রত্যাবর্তন হবে জাহান্নামের দিকে।²⁷
মধ্যযুগের খ্রিস্টানরা শয়তানের ছবি অঙ্কন করত, একটি কৃষ্ণবর্ণ লোক, যার আছে ছুঁচাল দাড়ি, উপর দিকে উঠে থাকা ভ্রূ, তার মুখ থেকে অগ্নিশিখা বের হচ্ছে। তার পায়ে আছে খুর, পাছায় আছে লেজ! ²⁸
শয়তানের আকৃতি যেমন কুৎসিত, তেমনি শক্তিতেও সে জ্বিনদের মধ্যে সবার চাইতে বেশি বলবান। উবাই বিন কা'ব হতে বর্ণিত, তাঁর এক খেজুরের খামার ছিল। সেখান হতে খেজুর কম হয়ে যাচ্ছিল। তাই এক রাত্রিতে তিনি পাহারা দিয়ে থাকলেন। হঠাৎ তিনি নব্য তরুণের ন্যায় এক জন্তু দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সালাম দিলেন, সে তাঁর সালামের উত্তরও দিল। তিনি তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'কে তুমি? জ্বিন অথবা ইনসান?' সে বলল, 'আমি জ্বিন।' তিনি বললেন, 'কৈ তোমার হাতটা আমাকে দেখতে দাও।' সে তার হাত দেখতে দিল। তার হাত ছিল ঠিক কুকুরের পায়ের মত। তার দেহের লোমও ছিল কুকুরের মতো। তিনি সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, 'জ্বিনের সৃষ্টিগত আকৃতি কি এটাই?' সে বলল, 'জ্বিনরা জানে যে তাদের মধ্যে আমার চেয়ে অধিক বলবান পুরুষ আর কেউ নেই।' তিনি বললেন, 'এখানে কী জন্য এসেছ?' সে বলল, 'আমরা খবর পেলাম যে, তুমি দান করতে ভালোবাস। তাই তোমার খাদ্যসম্ভার হতে কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি।' তিনি বললেন, 'আচ্ছা, তোমাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় কী?' সে বলল, '(উপায়) সূরা বাক্বারার এই আয়াত পাঠ (আল্লাহু লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম)। যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তা পাঠ করবে সে সকাল অবধি আমাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে। আর যে ব্যক্তি সকালে তা পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে।'
অতঃপর সকাল হলে তিনি আল্লাহর রসূল এর নিকট এসে রাত্রের বৃত্তান্ত উল্লেখ করলেন। তা শুনে তিনি বললেন, “খবীস সত্যই বলেছে।”²⁹
টিকাঃ
২৭. সূরা আস স-ফফাত-৩৭:৬২-৬৮
২৮. দায়েরাতুল মাআরিফিল হাদীষাহ ৩৫৭পৃঃ
২৯. নাসাঈ, ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব, মাশা. হা/৬৬২