📄 নিঃসঙ্গতার সময় যা বলতে হবে
আল ওয়ালিদ বিন আল ওয়ালিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নিঃসঙ্গতা বোধ করছি। তিনি বললেন: যখন তুমি ঘুমাতে যাবে তখন বলবে: “আউযু বি কালিমাতিল্লাহি তাম্মাতি, মিন গাদাবিহি ওয়া ই'কাবিহি, ওয়া শাররি ইবাদিহি, ওয়া মিন হামায়াতিш শায়াতিন, ওয়া আইয়াহদুরুনা।” (আমি আল্লাহর কাছে তাঁর উত্তম কথা দিয়ে তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে, তাঁর বান্দার ক্ষতি থেকে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি) তাহলে শয়তান তোমার কোনো ক্ষতি করতে অথবা তোমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না।
আল বারাআ’ বিন আযিব (রাদি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক লোক আল্লাহর রাসূলের (সাল্লা.) কাছে এসে তার নিঃসঙ্গতার কথা বলল। তিনি বললেন: বার বার এ দোয়া পাঠ করবে: “সুবহানাল মালিকিল কুদ্দুসি, রব্বিল মালাইকাতি ওয়ার রুহ, জাল্লাতাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা বিল ই'যযাতি ওয়াল জাবারুত।” (সকল মহিমা সার্বভৌম আল্লাহ তা’আলার, তিনি মহান, ফেরেশতাগণ ও আত্মাদের (রূহ) তিনি প্রতিপালক, (হে আল্লাহ) আপনি আপনার ক্ষমতা ও শক্তি দিয়ে আসমান ও জমিন পরিবেষ্টিত করে রেখেছেন।” লোকটি এ দোয়া পাঠ করল এবং তার একাকীত্ব ঘুচে গেল। নিঃসঙ্গতার সময়ে সর্বোত্তম দোয়া হল, 'আউযু বিল্লাহিস সামিউল আলিমী মিনাশ শায়তানির রাজীম'। (আমি সর্বজ্ঞাতা, সর্বশ্রোতা মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে অভিশপ্ত শয়তানের হাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)
আল্লাহ বলছেন: “শয়তানের পক্ষ থেকে যদি তুমি কুমন্ত্রণা অনুভব কর, তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সর্বজ্ঞাতা সর্বশ্রোতা।” (আল ফুসসিলাত: ৪১/৩৬)
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলবে: “এটা, ওটা, এগুলো কে সৃষ্টি করেছে?” এভাবে বলতে বলতে এক পর্যায়ে সে বলবে: “তোমার সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছে?” যখনই শয়তান এ চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দেবে, তখনই সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং এ চিন্তা মাথা থেকে বাদ দেবে।”
আল-সহীহদ্বয়ে বর্ণিত এ হাদীসের আরেক সংস্করণে এসেছে, “মানুষ তোমাকে প্রশ্ন করতে থাকবে, 'এটা আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' যদি কোনো ব্যক্তিকে তোমরা এটা বলতে শোন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলে দেবে, আমি আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি।”
আয়শা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “যে ব্যক্তি এ ধরনের ওয়াসওয়াসা দেখবে বা প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন ওই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে তিনবার বলে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তাহলে এ চিন্তা তোমার মাথা থেকে দূর হয়ে যাবে।”
উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন, আমি বললাম: হে আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ), শয়তান আমার ও আমার সালাত এবং তেলাওয়াতের মাঝে হস্তক্ষেপ করেছে এবং এর মাধ্যমে আমাকে বিভ্রান্ত করেছে।” আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) বললেন: “এটাকে (শয়তান) বলে খিনজাব। তুমি যখন এর মুখোমুখি হও তখন তার হাত থেকে আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং তোমার বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে।” অতএব আমি এটা করলাম এবং আল্লাহ্ আমার নিঃসঙ্গতা দূর করে দিলেন。
আবু জামেল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি ইবনে আব্বাসকে (রাঃ) বললাম: “আমি আমার হৃদয়ে কিছু একটা অনুভব করছি।” তিনি বললেন: “কী সেটা?” আমি বললাম: ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।’ তিনি বললেন: ‘এটা কি কোনো ধরনের সন্দেহ?’ তিনি স্মিত হাসলেন এবং বললেন: আল্লাহ্ তা’আলা নিম্নোক্ত এ আয়াত নাজিল করা পর্যন্ত কেউই এটা থেকে মুক্ত হতে পারত না: “আমি তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তুমি সন্দেহ পোষণ কর তাহলে তোমার পূর্বে থেকে যারা কিতাব পাঠ করে আসছে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে প্রকৃত সত্য এসেছে। কাজেই তুমি কখনো সন্দেহ পোষণকারীদের মধ্যে শামিল হয়ো না।” (সুরা ইউনুস ১০:৯৪)
তিনি আমাকে আরও বললেন, যখনই তুমি তোমার হৃদয়ে কিছু অনুভব করবে তখনই বলবে: “তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনি প্রকাশিত আবার গুপ্ত, তিনি সকল বিষয় পূর্ণরূপে জ্ঞাত।” (সূরা আল হাদীদ ৫৭:৩)
সহীহ মুসলিমে আবুল কাশিম আল কুশাইরির পত্রে ইমাম মুসলিমের সনদে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আহমাদ বিন আতা আল রাওয়াবাযী আল সাইয়িদ আল জালীল আমাকে বলেন: পবিত্রতার বিষয়ে আমি ওয়াসওয়াসা অনুভব করছি; এক রাত্রে আমি এত বেশি পানি ব্যবহার করলাম যে, আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম, এবং আমার হৃদয়ে কোনো প্রশান্তি ছিল না, কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছিল। তখন আমি বললাম: হে প্রতিপালক, আপনার ক্ষমা, আপনার ক্ষমা চাচ্ছি। তখন আমি একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, কেঁদে কেঁদে বলছে, জ্ঞানের মাঝেই ক্ষমা রয়েছে। অতএব আমার সেই চিন্তা দূর হয়ে গেল。
আলিমগণের মধ্যে একজন বলেছেন যে, যখন কারো অযু অথবা সালাতের বিষয়ে ওয়াসওয়াসা অনুভব হবে, তখন তার জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) এ যিকির করা মুস্তাহাব, কারণ শয়তান আল্লাহর যিকির শোনামাত্রই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে পালায়। আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হলো সর্বোত্তম যিকির।
এছাড়াও আলিমগণ (স্কলারগণ) বলেছেন, ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য সর্বোত্তম ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা।
ইমামদের মধ্য থেকে একজন বলেছেন, যাদের ঈমান বেশি খাঁটি তাদেরকেই ওয়াসওয়াসা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, কারণ চোর কখনো জীর্ণকুটির টার্গেট করে না。
আল সাইয়িদ আল জালীল আহমাদ বিন আবুল হাওয়ারি বলেন: আমি আবু সুলাইমান আল দারানির কাছে ওয়াসওয়াসার বিষয়ে অভিযোগ করলাম, তিনি বললেন: তুমি যদি এটা বন্ধ করতে চাও তাহলে যখনই এর মুখোমুখি হবে তুমি এটা উপভোগ করবে, এটা উপভোগ করতে শুরু করলেই এটা বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ শয়তানের কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর ও কষ্টকর বিষয় হলো মু'মিনের সুখ, মু'মিনের আনন্দ।
টিকা:
১৬৭. ইবনে আবী সুন্নী: মা ইয়াকুলু ইয়াইয়াখাফা মানাজায়াহ. পৃ-২০১, নং-৭০৪
১৬৮. ফাতহুল বারী, বাব সিফাতি ইবলিস, ৪/১৪৯
১৬৯. ইবনে আল সুন্নি, বাব মা ইয়াফকুল মান উভবুলিয়ালি ফীল ওয়াসওয়াসা, পৃ-১৯১, নং-৬২৬
১৭০. সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম, বাবুত তাওয়াযু মিনাশ শায়তানুল ওয়াসওয়াসা ফীল সালাত, ৪/১৭২৬, নং-৬৮
📄 শয়তানের কারণে ভয় পেলে কী করা উচিত
আল্লাহ তা'আলা বলেন: “শয়তানের পক্ষ থেকে যদি তুমি কুমন্ত্রণা অনুভব কর, তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সর্বতোভাবে সর্বজ্ঞ।” (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৬)
“তুমি যখন কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার আর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের মাঝে একটা অদৃশ্য পর্দা স্থাপন ক'রে দিয়েছি।” (সূরা আল ইসরা ১৭:৪৫)
যার কাছে শয়তান উপস্থিত হয় তার নিম্নোক্ত আয়াত অনুসরণ করা উচিত:
১- প্রথমেই তাকে বলতে হবে: 'আউযুবিল্লাহিস সামি’ইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজীম'। (আমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
২- তাকে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত শুনতে হবে。
৩- তাকে নিয়মিত সালাতের জন্য আযান দিতে হবে।
আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সালাতের জন্য উঠে দাঁড়ালেন, এবং তখন আমরা তাঁকে বলতে শুনলাম: “আমি আল্লাহর কাছে তোমার হাত থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” অতঃপর তিনি তিনবার বললেন: “আমি আল্লাহর অভিশাপে তোমাকে অভিশম্পাত করছি।” অতঃপর তিনি তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন, মনে হলো তিনি কিছু একটা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রার্থনা শেষ হলে আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ), দোয়ার মাঝে আপনি এমন কিছু কথা বলেছেন যা আমরা ইতোপূর্বে আপনার মুখ থেকে শুনিনি এবং আমরা লক্ষ্য করলাম, আপনি আপনার হাত সামনে প্রসারিত করেছেন।” তখন তিনি বললেন: “আল্লাহর শত্রু ইবলিস আগুনের একটি কুণ্ডলি নিয়ে এসেছিল আমার মুখে নিক্ষেপ করার জন্য এবং আমি তিনবার বললাম: “আমি আল্লাহর কাছে তোমার হাত থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” অতঃপর আমি তিনবার বললাম: “আমি আল্লাহর অভিশাপে তোমাকে অভিশম্পাত করছি।” এরপর সে তিনবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করল। আর আমি তাকে আটক করতে চাইলাম, সেজন্যই হাত প্রসারিত করেছি, আল্লাহর শপথ, এটা যদি আমার ভাই সুলায়মানের দু'আ প্রার্থনা না হতো, তাহলে এ সকালে আমি তাকে বেঁধে ফেলতাম এবং মদীনার শিশুরা তাকে নিয়ে খেলা করত।”
সাহল বিন আবু সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার পিতা আমাকে বন্ধু হারিসায় প্রেরণ করলেন, আমার সঙ্গে আমাদের কিছু দাস অথবা বন্ধু ছিল। পথিমধ্যে দেয়ালের পেছন থেকে কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকল, ডাক শুনে আমার সঙ্গীদের একজন দেয়ালের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল, কিন্তু কিছু দেখতে পেল না। আমি এ ব্যাপারে আমার পিতাকে বললাম এবং তিনি বললেন: 'আমি যদি বুঝতে পারতাম যে, তোমার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটবে তাহলে আমি তোমাকে সেখানে পাঠাতাম না। কিন্তু তুমি যদি কোনো কষ্টকর আওয়াজ শুনতে পাও, তাহলে আযান দিবে, কারণ আমি আবু হুরায়রাহকে (رضي الله عنه) বর্ণনা করতে শুনেছি, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “আযান দেওয়া হলে শয়তান দৌড়ে পালায়।”
টিকা:
১৭১. সহীহ মুসলিম, বাব জায়া লা'নাহ শায়তান, ১/১৮৫, নং-৪০০
১৭২. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল সালাহ, বাবুল ফাদলুল আযান ওয়া হুরুবুশ শায়তান, ১/২৯০-২৯১
📄 পোষা মোরগ, গাধা ও কুকুরের ডাক শুনলে কী বলা উচিত
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন: “তুমি যদি গাধার ডাক শুনতে পাও, তাহলে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে, কারণ এ গাধা শয়তান দেখতে পেয়েছে। তুমি যদি পোষা মোরগের ডাক শুনতে পাও, তাহলে আল্লাহর দয়া ও রহমত কামনা করবে, কারণ এটা ফেরেশতা দেখতে পেয়েছে।”
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন: “তুমি যদি রাতে কুকুর ও গাধার ডাক শুনতে পাও, তাহলে আল্লাহর কাছে শয়তানের হাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে, কারণ এরা যা দেখতে পায়, তোমরা তা দেখতে পাওনা।”
টিকা:
১৭৩. সহীহ আল বুখারী, কিতাবুল বাদা’ল খালক, ৪/১৫৫
১৭৪. সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, ৫/৩৬২, নং-৫১০৩
📄 যদি কারো কাছে ওল জিন উপস্থিত হয় তখন তার কী বলা উচিত
ওল (আরবি গুল, বহুবচন গিলাম) হলো এক ধরনের জিন, এবং বলা হয়ে থাকে এরা হলো জিনদের জাদুকর। তারা বিভিন্ন রূপে হাজির হতে পারে, কিন্তু তাদের অনিষ্টতা আযান দিলেই দূর হয়ে যাবে।
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত: “তোমার কাছে যদি ওল জিন হাজির হয়, তাহলে তুমি সঙ্গে সঙ্গে আযান দেবে।” কারণ আযান শয়তানকে পালাতে বাধ্য করে।
টিকা:
১৭৫. ইবনে আল সুন্নি, বাব ইয়া তাগাওয়ালত আল গীলান, ৭-১৬০, নং-৫২৪