📄 কুনজর বাস্তব
১. কুরআনের দলীল
(ক) সূরা ইউসুফ ১২:৬৭
“পিতা বলল, ‘হে আমার সন্তানেরা! তোমরা এক দ্বার দিয়ে (মিসরে) প্রবেশ কর না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে (মানুষের সন্দেহ কিংবা কুদৃষ্টি এড়ানোর জন্য)। আমি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে তোমাদের কোনই উপকার করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া হুকুম দাতা কেউ নেই, আমি তার উপরই নির্ভর করি, যারা নির্ভর করতে চায়, তারা তার উপর নির্ভর করুক।'”
অধিকাংশ মুফাসসির একমত হয়েছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইয়েরা ছিলেন সুদর্শন, আর এ কারণে হযরত ইয়াকুব (আঃ) আশঙ্কা করতেন, লোকেরা কুনজর দিয়ে তার ছেলেদের ক্ষতি করতে পারে, সুতরাং বোঝা গেল কুনজরের অস্তিত্ব আছে, এটা সত্য। [১১৫]
(আ) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলছেন: “কাফিররা যখন কুরআন শুনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়ে ফেলবে। আর তারা বলে, “সে তো অবশ্যই পাগল।” অথচ এ কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। (সুরা ক্বলাম ৬৮: ৫১-৫)
ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও অন্যান্যরা বলেন: এখানে বলা হয়েছে, তারা তোমার ওপর কুনজর দেবে। কুনজর ও এর প্রভাব যে সত্যি এ আয়াতই তার প্রমাণ। [১১৬]
২. হাদীস থেকে প্রমাণ
(ক) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন: “কুনজর সত্যি এবং তিনি উল্কি আঁকা নিষিদ্ধ করেছেন।” [১১৭]
(খ) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেন, “কুনজর থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর, কারণ কুনজরের অস্তিত্ব আছে, এটা সত্য।” [১১৮]
(গ) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “কুনজর সত্য এবং তাকদিরের লিখনকে ডিঙিয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো যদি কিছু থাকত তাহলে সেটা হত কুনজর। কেউ যদি তোমার কাছে কুনজরের প্রভাব দূর করার জন্য আসে তুমি তা করে দাও।” [১৯৮]
ইমাম আন নাববী (রহ.) বলেন: এ হাদীস তাকদীর ও কুনজর দুটোকেই সত্য ঘোষণা করছে; এটা খুবই শক্তিশালী, কিন্তু একমাত্র আল্লাহর ডিক্রি ব্যতীত কুনজর অথবা অন্য কোনো কিছুই কারো জন্য কোনো ক্ষতি অথবা ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারবে না। [১৯৯]
(ঘ) আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), জা'ফরের ছেলেরা বদনজরে আক্রান্ত; আমি কি তাদের জন্য রুকিয়া তেলাওয়াত করব? আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “হ্যাঁ, কারণ আল্লাহর ডিক্রি বা আদেশকে অতিক্রম করার মতো যদি কিছু থাকত তবে তা হত কুনজর।” [২০০]
(ঙ) হযরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “কুনজর একজন মানুষকে আল্লাহর অনুমতিক্রমে অনুসরণ করতে পারে, যতক্ষণ না সে কোনো পর্বতে আরোহণ করে এবং সেখান থেকে নিচে পড়ে না যায়।” [২০১]
এসব প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জিন জগতের অস্তিত্ব রয়েছে। জিন আছে এবং জীবিত অবশ্যই আছে; তাদেরও বোঝার ক্ষমতা রয়েছে, তারাও আদেশ ও নিষেধের অধীন। সুতরাং যে মুমিন তাওহীদের ঘোষণা দেবেন, তাকে অবশ্যই জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হবে।
টিকা:
১১৫. তাফসীর ইবনে কাসীর-আল তাবারী-আল কুরতুবী-আল আলূসি-আল সুয়ূতি-আল ফাতহুল আল রাযী।
১১৬. ইবনে কাসীর, ৪/৪০৮
১১৭. ফাতহুল বারী, ১০/২৩৩; সহীহ মুসলিম, বাবুল তিব্ব, আবূ দাউদ, নং-৩৮৭৯。
১১৮. ইবনে কাসীর。
১৯৮. ইবনে মাজাহ, বাবুল তিব্ব, আল হাকীম আল মুস্তাদরাক, আল আলবানী (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন。
১৯৯. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল সালাম, বাবুল তিব্ব ওয়াল মারাদ ওয়াল রুক্বা। আত-তিরমিযী হাদীস নং-৩৫৩০, আল আলবানী (রহ.) সহীহুল জামি'তে হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন。
二百. সহীহ মুসলিম ফি শরহে আল নববী
২০১. আত-তিরমিযী ২০২৯, আল তিব্ব; মুসনাদ আল ইমাম আহমাদ, ৬/৪০৮; ইবনে মাজাহ, আল তিব্ব; আল আলবানী (রহ.) সহীহুল জামি'তে হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; ৫/৬৭, হাদীস নং-৫৬৬২।
📄 বদনজর ও হিংসার মধ্যে পার্থক্য
অর্থগত দিক থেকে ‘আইন (যিনি অন্যের ওপর কুনজর দেন) শব্দটির চেয়ে হাসিদ (হিসাকারী) শব্দটি আরও সাধারণ। এ কারণেই সূরা ফালাকে হিসাকারীর ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে।
হাসিদ (হিসাকারী) হলেন এমন ব্যক্তি যিনি চরম অসন্তুষ্টির সঙ্গে হিংসা করেন, সুতরাং তিনি কামনা করেন, তার টার্গেটকৃত ব্যক্তির ওপর থেকে যেন রহমত সরিয়ে নেওয়া হয়, অন্যদিকে একজন ‘আইন (অন্যের ওপর যিনি কুনজর দেন) ব্যক্তি শুধু একটি জিনিস পছন্দ করেন। সে কারণে কুনজর কোনো সৎ পুরুষ ও নারী থেকে আসতে পারে, এবং একজন মানুষ না বুঝেই তার নিজের সম্পদ, পরিবার অথবা সন্তানের ওপরও বদনজর দিতে পারেন। তবে কুনজর ও হিসার একইরকম প্রভাব রয়েছে, উভয়ক্ষেত্রে পছন্দকৃত জিনিসটির ক্ষতি করা হয়।
📄 হিংসা (হাসাদ)
হিসা বা হাসাদ মানে হলো কারো ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বা রহমত বর্ষণে অন্য কারো অসন্তুষ্ট হওয়া, এ জন্য তার প্রতি হিসা পোষণ করা এবং তার ওপর থেকে যেন এ রহমত সরিয়ে নেওয়া হয় তার ইচ্ছা পোষণ করা। অন্য কথায়, হিসাকারী মনে মনে কামনা করে, সে যার প্রতি হিসা পোষণ করছে তার ওপর থেকে যেন আল্লাহর অনুগ্রহ বা রহমত চলে যায়, তাতে এ রহমত তার প্রতি আসুক বা না আসুক。
সুতরাং: হিসাকারী সবসময় আল্লাহর রহমতে অসন্তুষ্ট হয় এবং এ রহমত চলে যাওয়ার কামনা করে, এবং কখনো কখনো সে নিজেই এ অনুগ্রহ নষ্ট করার চেষ্টা চালায়।
হিসার ব্যাপারে প্রমাণ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “গ্রন্থধারীদের অনেকেই তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তাদের অন্তরে পোষিত হিংসার দাহনে ইচ্ছে পোষণ করে যে, যদি তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর কুফুরীতে ফিরিয়ে নিতে পারত।” (সূরা আল বাকারা ২:১০৯)
“কিংবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে লোকেদেরকে যেসব নি'মাত দান করেছেন, সেজন্য কি এরা তাদের হিংসা করে, আমি ইবরাহীমের বংশধরদেরকেও তো কিতাব ও হিকমাত দিয়েছিলাম, তাদেরকে সুবিশাল রাজ্যও প্রদান করেছিলাম।” (আন-নিসা ৪:৫৪)
“এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে।” (সূরা আল ফালাক ১১৩:৫)
হাদীস থেকে প্রমাণ
১. আত্ব-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, আল যুবাইরের আজাদকৃত দাস বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রোগ তোমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, সেগুলো হলো: ঈর্ষা ও ঘৃণা। এটাই তোমাদের জন্য 'শেবার' (ক্ষতসায়ননকারী); আমি বলব না এটা তোমাদের চুল শেভ করে, বরং এটা তোমাদের ঈমান শেভ (ক্ষয়) করে। যার হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার শপথ করে বলছি, যতক্ষণ না তোমরা ঈমান গ্রহণ করবে, ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ততক্ষণ ঈমান গ্রহণ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না কোন জিনিস তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করবে? তোমাদের মধ্যে বেশি বেশি সালামের প্রচলন কর।” [১২৯]
২. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন: “আমার উম্মাত অন্যান্য জাতির রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যাবে।” তারা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), অন্যান্য জাতির রোগগুলো কী কী? আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন: “ধৃষ্টতা, ঔদ্ধত্য, সম্পদ পুঞ্জিভূত করা, দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক ঘৃণা ও হিংসা-বিদ্বেষ, যতক্ষণ পর্যন্ত না আছে গর্হিত কাজ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে ততক্ষণ এ হিংসা-বিদ্বেষ চলতে থাকবে।” [১৩০]
টিকা:
১২৯. আত তিরমিযী-২৫১০:
১৩০. আল তাবারানী, আল আওসাত; ইবনে আবুল দুনিয়া
📄 হিংসাকারীর বৈশিষ্ট্য জানা যাতে তাকে এড়িয়ে চলা যায়
কুনজরের মধ্যে সব ধরনের মানুষই অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনকি যারা আল্লাহভীরুতাও দ্বারাও এর দ্বারা আক্রান্ত হবে যদি না তারা এর প্রতি সঠিক মনোযোগ প্রদান করে, যদিও হিংসার বিষয়টি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হিংসুক মানুষের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো দিয়ে তাকে চেনা যায়, অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করা যায়। যেমন—তার তাকানো ও হাসির ধরন, মুখের অভিব্যক্তি এবং তার কথা বলার ধরন দেখেই তাকে আলাদা করা যাবে। আর এসব বৈশিষ্ট্যই বলে দেবে তার মনে কী আছে। মানুষ যা কিছুই গোপন করুক না কেন তার বহিঃপ্রকাশ তার চেহারায় ফুটবেই, মুখ ফসকে বের হয়ে যাবে তার মনের কুটিলতা। তার তাকানোর ধরন, তার হাসি এবং তার পুরো গতিবিধি থেকেই তার মনের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হবে।