📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 বদ নজর, হিংসা (হাসাদ): সুরক্ষা ও প্রতিকার

📄 বদ নজর, হিংসা (হাসাদ): সুরক্ষা ও প্রতিকার


অধ্যায়: ৩
বদ নজর, হিংসা (হাসাদ): সুরক্ষা ও প্রতিকার

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 বদ নজর

📄 বদ নজর


যখন কোনো ব্যক্তি চোখের মাধ্যমে অন্য কারো ক্ষতি করে তখন তাকে বলা হয় বদ নজর।

ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: বদ নজরের উৎপত্তি ঘটে কাউকে পছন্দ করার মাধ্যমে, অতঃপর মন্দ আত্মা একে অনুসরণ করে, তার পশ্চাদ্ধাবন করে এবং এর ক্ষতি করার চেষ্টা করে, অবশেষে বস্তুর দিকে তাকিয়ে এরা এদের বিষ প্রয়োগ করে। [১১১]

ইবনে মানযুর বলেন: বলা হয়ে থাকে “অমুক অমুক বদনজর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন” যদি কোনো শত্রু অথবা কোনো হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি তার দিকে মন্দ দৃষ্টিতে তাকায় এবং সে এর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায়, এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে, হলে এটাই বদ নজর। [১MT]

আল হাফিজ বিন হাজার বলেন: বদ নজর মানে হলো, কারো দিকে হিংসামিশ্রিত বিস্ময় নিয়ে কোনো মন্দ লোকের তাকিয়ে থাকা এবং এর ফলে তার ক্ষতি হওয়া। [১১৩]

টিকা:
১১১. ইবনুল কাইয়্যিম, জা‘দা আল মায়াদ, ৪/১৬৭;
১MT. ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, ১০/৩০১;
১১৩. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, ১০/২০০;

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 কুনজর বাস্তব

📄 কুনজর বাস্তব


১. কুরআনের দলীল
(ক) সূরা ইউসুফ ১২:৬৭
“পিতা বলল, ‘হে আমার সন্তানেরা! তোমরা এক দ্বার দিয়ে (মিসরে) প্রবেশ কর না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে (মানুষের সন্দেহ কিংবা কুদৃষ্টি এড়ানোর জন্য)। আমি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে তোমাদের কোনই উপকার করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া হুকুম দাতা কেউ নেই, আমি তার উপরই নির্ভর করি, যারা নির্ভর করতে চায়, তারা তার উপর নির্ভর করুক।'”

অধিকাংশ মুফাসসির একমত হয়েছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইয়েরা ছিলেন সুদর্শন, আর এ কারণে হযরত ইয়াকুব (আঃ) আশঙ্কা করতেন, লোকেরা কুনজর দিয়ে তার ছেলেদের ক্ষতি করতে পারে, সুতরাং বোঝা গেল কুনজরের অস্তিত্ব আছে, এটা সত্য। [১১৫]

(আ) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলছেন: “কাফিররা যখন কুরআন শুনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়ে ফেলবে। আর তারা বলে, “সে তো অবশ্যই পাগল।” অথচ এ কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। (সুরা ক্বলাম ৬৮: ৫১-৫)

ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও অন্যান্যরা বলেন: এখানে বলা হয়েছে, তারা তোমার ওপর কুনজর দেবে। কুনজর ও এর প্রভাব যে সত্যি এ আয়াতই তার প্রমাণ। [১১৬]

২. হাদীস থেকে প্রমাণ
(ক) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন: “কুনজর সত্যি এবং তিনি উল্কি আঁকা নিষিদ্ধ করেছেন।” [১১৭]

(খ) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেন, “কুনজর থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর, কারণ কুনজরের অস্তিত্ব আছে, এটা সত্য।” [১১৮]

(গ) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “কুনজর সত্য এবং তাকদিরের লিখনকে ডিঙিয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো যদি কিছু থাকত তাহলে সেটা হত কুনজর। কেউ যদি তোমার কাছে কুনজরের প্রভাব দূর করার জন্য আসে তুমি তা করে দাও।” [১৯৮]

ইমাম আন নাববী (রহ.) বলেন: এ হাদীস তাকদীর ও কুনজর দুটোকেই সত্য ঘোষণা করছে; এটা খুবই শক্তিশালী, কিন্তু একমাত্র আল্লাহর ডিক্রি ব্যতীত কুনজর অথবা অন্য কোনো কিছুই কারো জন্য কোনো ক্ষতি অথবা ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারবে না। [১৯৯]

(ঘ) আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), জা'ফরের ছেলেরা বদনজরে আক্রান্ত; আমি কি তাদের জন্য রুকিয়া তেলাওয়াত করব? আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “হ্যাঁ, কারণ আল্লাহর ডিক্রি বা আদেশকে অতিক্রম করার মতো যদি কিছু থাকত তবে তা হত কুনজর।” [২০০]

(ঙ) হযরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “কুনজর একজন মানুষকে আল্লাহর অনুমতিক্রমে অনুসরণ করতে পারে, যতক্ষণ না সে কোনো পর্বতে আরোহণ করে এবং সেখান থেকে নিচে পড়ে না যায়।” [২০১]

এসব প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জিন জগতের অস্তিত্ব রয়েছে। জিন আছে এবং জীবিত অবশ্যই আছে; তাদেরও বোঝার ক্ষমতা রয়েছে, তারাও আদেশ ও নিষেধের অধীন। সুতরাং যে মুমিন তাওহীদের ঘোষণা দেবেন, তাকে অবশ্যই জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে হবে।

টিকা:
১১৫. তাফসীর ইবনে কাসীর-আল তাবারী-আল কুরতুবী-আল আলূসি-আল সুয়ূতি-আল ফাতহুল আল রাযী।
১১৬. ইবনে কাসীর, ৪/৪০৮
১১৭. ফাতহুল বারী, ১০/২৩৩; সহীহ মুসলিম, বাবুল তিব্ব, আবূ দাউদ, নং-৩৮৭৯。
১১৮. ইবনে কাসীর。
১৯৮. ইবনে মাজাহ, বাবুল তিব্ব, আল হাকীম আল মুস্তাদরাক, আল আলবানী (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন。
১৯৯. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল সালাম, বাবুল তিব্ব ওয়াল মারাদ ওয়াল রুক্বা। আত-তিরমিযী হাদীস নং-৩৫৩০, আল আলবানী (রহ.) সহীহুল জামি'তে হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন。
二百. সহীহ মুসলিম ফি শরহে আল নববী
২০১. আত-তিরমিযী ২০২৯, আল তিব্ব; মুসনাদ আল ইমাম আহমাদ, ৬/৪০৮; ইবনে মাজাহ, আল তিব্ব; আল আলবানী (রহ.) সহীহুল জামি'তে হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; ৫/৬৭, হাদীস নং-৫৬৬২।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 বদনজর ও হিংসার মধ্যে পার্থক্য

📄 বদনজর ও হিংসার মধ্যে পার্থক্য


অর্থগত দিক থেকে ‘আইন (যিনি অন্যের ওপর কুনজর দেন) শব্দটির চেয়ে হাসিদ (হিসাকারী) শব্দটি আরও সাধারণ। এ কারণেই সূরা ফালাকে হিসাকারীর ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে।

হাসিদ (হিসাকারী) হলেন এমন ব্যক্তি যিনি চরম অসন্তুষ্টির সঙ্গে হিংসা করেন, সুতরাং তিনি কামনা করেন, তার টার্গেটকৃত ব্যক্তির ওপর থেকে যেন রহমত সরিয়ে নেওয়া হয়, অন্যদিকে একজন ‘আইন (অন্যের ওপর যিনি কুনজর দেন) ব্যক্তি শুধু একটি জিনিস পছন্দ করেন। সে কারণে কুনজর কোনো সৎ পুরুষ ও নারী থেকে আসতে পারে, এবং একজন মানুষ না বুঝেই তার নিজের সম্পদ, পরিবার অথবা সন্তানের ওপরও বদনজর দিতে পারেন। তবে কুনজর ও হিসার একইরকম প্রভাব রয়েছে, উভয়ক্ষেত্রে পছন্দকৃত জিনিসটির ক্ষতি করা হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px