📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 ফারাওদের অভিশাপের রহস্য

📄 ফারাওদের অভিশাপের রহস্য


জادুটোনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট এবং মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে এমন একটি বিষয় হলো “ফারাওদের অভিশাপ”। উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ফারাওদের কবর খনন করেছে অথবা তাদের দেহাবশেষে পরিবহনে নূন্যতম ভূমিকাও রেখেছে তাদের প্রত্যেকই কোনো না কোনো দুর্যোগের মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে এবং অনেক লোক মনে করেন ফারাওদের দেহের সঙ্গে এসব অভিশাপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যারাই এর কাছে আসে তারাই এ অভিশাপ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ অভিশাপের পেছনের রহস্য সম্পর্কে দীর্ঘদিনের গভীর গবেষণা শেষে জার্মান লেখক ফিলিপ জ্যানডারবার্গ তাঁর ‘দ্যা কার্স অব দ্যা ফারাও’ বইয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন:

১- এ অভিশাপ কি আসলে এক ধরনের আণবিক তেজষ্ক্রিয়তা অথবা ফারাওরা কি কোনো তেজষ্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করেছিলেন, যাতে করে যারা তাদের সমাধি উন্মুক্ত করবে তারাই এর দ্বারা আক্রান্ত হবে?
২- এটা কি কোনো বিষাক্ত গ্যাস যা সমাধি উন্মুক্ত করার পর এর ভেতরে গজানো ঘাস ও উদ্ভিদ থেকে নির্গত হয়?
৩- যারা ফারাওদের সমাধি আবিষ্কার করেছেন তাদের সবার কাছ থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ কিছু কি পাওয়া গেছে?
৪- অথবা এটা কোনো যুগপৎ ঘটনা কি না, যখনই লোকেরা সমাধি উন্মুক্ত করতে গেছেন, ঠিক তখনি তাদের মৃত্যু হয়েছে?
৫- মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষগুলোর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগ পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে যা কিছু ঘটছিল তার পেছনে বিভিন্ন উপকক্ষে থাকা বাদুড়গুলোর কোনো ভূমিকা আছে কি না?
৬- রহস্যজনক পরিস্থিতিতে যেসব বিদেশী ডাকাত মারা গিয়েছিল তারা কি তেজষ্ক্রিয় ধূলা বা বিষাক্ত উদ্ভিদ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল?

মিশরের ফারাওদের সমাধিতে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে এ লেখক তার সংশয় ও বিস্ময় বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি মন্তব্য করেন এভাবে: যখনই কোনো স্থানে কোনো ফারাওর মমি পাওয়া গেছে সেখানেই দুর্যোগ অনিবার্য, এটাকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? মানুষের নির্মিত এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় জাহাজ টাইটানিক ডুবে গেল একটি বরফখণ্ডের আঘাতে, কারণ ওই জাহাজে ফারাওদের একটি মমি চুরি করে আনা হয়েছিল। আর একের পর এক মিশরের ডাক্তার ও স্কলারদের ভাগ্যেই বা কী ঘটেছিল? [১০৪]

একই সংশয় ও বিস্ময়ের সুরে আনিস মানসুর তার বই ‘লা'নাতুল ফারাইনাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: অনেক স্কলার মনে করেন, মিশরের পিরামিড ও ফারাওদের সমাধিতে এমনকিছু রয়েছে যা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, কিন্তু এ জিনিসটি কী? সেটা কেউ জানে না।

অতএব তিনি বলেন: থুরুশ্চেভ নামে এক ব্যক্তি একটি টেলিগ্রাম পান, এ টেলিগ্রামে তাকে পিরামিডে প্রবেশের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে, সে কারণে সে শেষ মুহূর্তে গিয়ে পিরামিডে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানাল। এ আশ্চর্যজনক ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেবেন তা বিজ্ঞানীরাও জানেন না। আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা অথবা অন্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া পর্যন্ত এমনটা ঘটতেই থাকবে। [১০৫]

ফারাওদের তথাকথিত অভিশাপের পেছনের মূল রহস্য কী? এটা কীভাবে শুরু হলো? যারা মিশরের প্রাচীন ফারাও রাজাদের মৃতদেহ ও গহ্বরের অনুসন্ধানে অংশ নিয়েছিল তাদের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তার ব্যাখ্যা কী?

মিশরের ফারাওদের তথাকথিত অভিশাপের সূত্রপাত হয় ৯ নভেম্বর, ১৯২২ সালে। যখন হাওয়ার্ড কার্টার লর্ড কার্নারভনের কাছে একটি টেলিগ্রাম পাঠান এ বলে যে, "আমি কিংস উপত্যকায় আশ্চর্যজনক কিছুর সন্ধান পেয়েছি। আমি আপনি না আসা পর্যন্ত সমস্ত দরজা ও ডল্ট সিল করে দিয়েছি। আপনি নিজে এসে দেখবেন।"

২৩ নভেম্বর লর্ড কার্নারভন তার মেয়েকে সঙ্গে করে লুক্সরে আসেন। কার্টার এগিয়ে গিয়ে সমস্ত দরজার সিল ভেঙে ফেলেন এবং ভিতরে রাজা তুতানখামেনের মৃতদেহ দেখতে পান, এ রাজা এখানে ৩৫ শতাব্দী ধরে শায়িত আছেন। চরম উত্তেজনায় পত্রিকাগুলো এ খবর লুফে নিল, তাদের কল্যাণেই খবরটি সাধারণ মানুষের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এরপরই কার্টারের হৃদকম্পন দ্রুত বাড়তে লাগল, তিনি খুবই ভীত হয়ে পড়লেন। কিন্তু গুপ্তধন, স্বর্ণ ও খ্যাতির লোভে তিনি তার এ শারীরিক সমস্যা বেমালুম ভুলে গেলেন।

যেইদিন রাজাদের সমাধি উন্মুক্ত করা হয়, সেইদিন কার্টারের বাইশজন সম্মানিত অতিথিকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে গেল। কার্টারের আমন্ত্রিত বাইশজন অতিথির মধ্যে তেরোজন একের পর এক আশ্চর্যজনক এক পরিস্থিতিতে মারা গেলেন। লর্ড কার্টার নিজেও হঠাৎ মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি, তারা আমাকে এ মরুর তপ্ত বালিতে বেলনাকারে পাকাতে যাচ্ছে এবং আমার মুখে তারা আগুন পুরে দেবে।”

কার্টারের ছেলে সুদূর ভারত থেকে ছুটে এসেছিল বাবাকে দেখতে, কিন্তু তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই কায়রোর কন্টিনেন্টাল হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর আমেরিকান মিউজিয়াম থেকে আগত কার্টারের সহকারী ওয়াটার মিসও তীব্র দহনে পুড়ে মারা গেলেন। আনিস মানসুর বলেন: মানুষের মুখে মুখে এরকম অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে, এসব থেকে জানা যায়, যারাই সমাধি খননে অংশ নিয়েছিলেন তাদের প্রত্যেকেই আক্রান্ত হয়েছিলেন এ ভয়াবহ দুর্যোগে。

ডা. মোহাম্মদ জাফর এসব কাহিনী তার ‘আল সিহর’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন: ব্রিটিশ মিউজিয়ামে মিশরের একটি মমির সারকোফ্যাগাস (শবাধাগার) ছিল, মমির এ লোকটি ছিল মিশরের রাজ পরিবারের সদস্য। মিউজিয়ামের রেকর্ড অনুসারে এ সারকোফ্যাগাসটির গল্প খুবই বিস্ময়কর। ডগলাস মৌরি নামে জনৈক ব্যক্তি এটি মিশর থেকে লন্ডনে তার বাড়ির জন্য ক্রয় করে আনেন, কিন্তু তিনি সহ যারা যারা এ সারকোফ্যাগাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন প্রত্যেকেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েন, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এটি জমা দিয়ে তারা কোনো মতে রক্ষা পেলেন。

সারকোফ্যাগাসটি ক্রয়ের দিন মি. ডগলাস তার রিভলভারটি পরিষ্কার করছিলেন, হঠাৎ রিভলভার থেকে একটি বুলেট বের হয়ে তার বাম উরুতে আঘাত করল। এরজন্য অপারেশনের দরকার হলো, এবং তিনি অপারেশন টেবিলে মারা যান। অপারেশনে যাওয়ার আগে তিনি তার বন্ধুদের মধ্যে মি. হোপলি নামে একজনকে—যিনি মিশরে তার সঙ্গী ছিলেন—নির্দেশনা দিলেন যে, অপারেশন টেবিলে তার যদি কিছু হয় তাহলে তিনি যেন সার্কোফ্যাগাসটি লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে তার বোনের বাড়িতে পৌঁছে দেন। মি. হোপলি বন্ধুর কথামতো সার্কোফ্যাগাসটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। লন্ডনে শিপিং করার জন্য তিনি এটিকে পোর্ট সৈয়দ-এ নিয়ে যান।

কিন্তু তিনি পোর্ট সৈয়দ যাওয়া মাত্রই লন্ডন থেকে একটি টেলিগ্রাম পেলেন, টেলিগ্রামের বার্তায় তাকে জানানো হলো তার ভাই নিহত হয়েছে। লন্ডনে পৌঁছে তিনি সার্কোফ্যাগাসটি ডগলাসের বোনের হাতে তুলে দিলেন, তিনি এটিকে নিয়ে তার বাড়ির এক কোণে রেখে দিলেন। কিন্তু সার্কোফ্যাগাসটি রুমে ঢোকানোর পর থেকেই শুরু হলো একটার পর একটা দুর্ভোগ। যেদিন এটি লন্ডনে পৌঁছল, সেদিনই তার মেয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপায় মারা গেল। সপ্তাহ খানেক পরে তার স্বামী মেয়ের শোকে কাতর হয়ে আত্মহত্যা করল। তারও আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ল, এবং তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। তিনি জ্যোতিষী, সংবাদকর্মী ও ধর্মীয় নেতাদের তার বাড়িতে ডাকলেন, তারা সবাই একমত হলেন, বাড়িতে সার্কোফ্যাগাসটি আনার কারণেই তার জীবনে এতসব বিপর্যয় ঘটে গেছে। এতে তিনি খুবই ভীত হয়ে পড়লেন এবং উপায়ান্তর না পেয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে খবর দিলেন এটিকে তার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সার্কোফ্যাগাসটিকে যখন এর নতুন ঠিকানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন এর একজন বাহক তার ইংরেজ সহকর্মীদের ফারাওদের পুরাণে বিশ্বাস এবং ফারাওরা যা রেখে গেছেন তার প্রতি অতি যত্নশীল হওয়া, মিউজিয়ামে এর জন্য বিশেষ জায়গা খালি রাখা এবং এর দেখাশোনায় জন্য আলাদা লোক নিয়োগের বিষয় নিয়ে কৌতুক করছিল। কিন্তু যখনই এটিকে যথাস্থানে রাখা হল, তখনই ওই বাহক (মুটে) তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে শুরু করল, ব্যথার নিদারুণ যন্ত্রণায় কয়েক মিনিট ছটফট করল, কাতর চিৎকার করল, অতঃপর সে সার্কোফ্যাগাসটির পাশেই মৃত্যুর কোলে ঢله পড়ল। যেসব ইংল্যান্ডের জাদুঘরে যেসব লোক মিশরীয় নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করত সবার মনেই এ সার্কোফ্যাগাসের বিষয়ে আগ্রহ জন্মাত। সমস্যাটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য তারা একটি গবেষণা কমিটিও গঠন করল। গবেষণা কর্মের অংশ হিসেবে কমিটি এইচ.এ, মানসেল ফটোগ্রাফিক কোম্পানিকে নিয়োগ করল বিভিন্ন দিক থেকে সার্কোফ্যাগাসটির ধারাবাহিক কিছু চিত্র ধারণ করার জন্য。

কোম্পানি এর একজন প্রতিনিধিকে পাঠালো চিত্র ধারণ করার জন্য এবং ওই প্রতিনিধি তার মিশন সম্পন্ন করে আবার কোম্পানিতে ফিরে গেলেন তার অন্য আরেকটি কাজ করার জন্য। ওই কাজটি করতে যাওয়ার পথে তিনি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন এবং তার ডান হাতের একটি আঙ্গুল কাটা পড়ল এতে। ফলে তিনি চিত্র ধারণ করতে অসমর্থ হয়ে পড়লেন। সার্কোফ্যাগাসটির ছবিগুলো যখন ডেভেলপ করানো হল, তখন তারা একটি ছবিতে যাজিকার পোশাকে এক তরুণীর অগ্নিমূর্তি দেখতে পেল, তার চোখে মুখে তীব্র ক্ষোভ। এটা দেখে তারা সার্কোফ্যাগাসটি যারা দেখেছে তাদেরকে ডেকে আনলেন এবং তাদের কাছে জানতে চাইলেন যে ছবি তোলার আগে তারা এটিটিতে কোনো ছবি দেখতে পেয়েছিল কি না। তারা সবাই একমত হয়ে বলল, না তারা এ ধরনের কোনো ছবি দেখেনি। [১০৯]

সত্যিকার অর্থে, এ ধরনের অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে, এসব গল্পে বলা হয়েছে যারাই মিশরের ফারাওদের প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কারের খনন কাজে অংশ নিয়েছে তাদের ওপরেই এসব দুর্ভোগ এসে পড়েছে। এরকম একটি উদাহরণ হলো ইংরেজ পল ব্রিটেনের গল্প, তিনি রাজা যাফুর চেম্বারে সারা রাত আটকা পড়েছিলেন। সকালে তিনি সারা বিশ্বকে জানালেন যে, সারা রাত তিনি অনেক ভূত দেখেছেন, এ ছাড়া তিনি একটি বিশাল শবযাত্রা দেখেছেন, যেখানে তিনিই ছিলেন শব। তিনি যা দেখেছেন, শুনেছেন ও অনুভব করেছেন তা ঠিক সম্মোহক ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তির মতো; এমনকি রাতে তার মনে হয়েছিল তিনি শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাবেন।

এরকম আরেকটি গল্প আছে ইংরেজ নাগরিক ইমেরির। ১ মার্চ, ১৯৭১ সালে তিনি সাক্কারায় খননকাজের তদারকির দায়িত্ব পালন করছিলেন। কাজের এক পর্যায়ে হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠলেন এবং এরপরেই তিনি বিড়ালের মতো মিউ মিউ, কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ ও নেকড়ের মতো গর্জন শুরু করলেন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ওই বছরেরই ১১ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসপাতালে তার সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী。

আরেকটি গল্প আছে জোর্জ উমটিশের, তিনি দেয়ালের শতশত খোন্দাই-কর্মের অনুলিপি তৈরি করেন এবং এগুলোর অর্থ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি হঠাৎ চিত্তবিক্ষিপ্ত আক্রান্ত হন, মনোবিজ্ঞানীরা তার এ সমস্যাকে ব্যক্তিত্বের বিভাজন হিসেবে নির্ণয় করেন। ফরাসি স্কলার চ্যাম্পোলিওন পাথরের এ খোদাই-কর্মের অর্থোদ্ধার করেন: কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর তিনিও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন, পরবর্তীতে এটাও রূপ নেয় চিত্তবিক্ষিপ্ততে, এক পর্যায়ে তিনি চলে যান কোমায়। [১০৭]

যদিও ফারাওদের অভিশাপ হিসেবে পরিচিত এ ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে, প্রায় সত্তর বছর আগে, কিন্তু প্রাচীন লোকেরাও ঠিক একই কথা বলেছেন। প্রায় সাতশো বছর আগে শিহাব আল দিন বিন আবদুল ওহাব আল মুয়াহিরি (মৃত্যু ৭৩১) তার বই ‘নিহাইয়াতুল আরব ফি ফুনুন আল আদ্দাব’তে পিরামিড নির্মাণ ও এ সম্পর্কিত বিস্ময়কর গল্পের কথা উল্লেখ করেছেন এবং কিছু বিস্ময়কর ঘটনার বিবরণও দিয়েছেন।

তিনি বলেন: এর মধ্যে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, আল মা'মুন যখন একটি পিরামিড উন্মুক্ত করলেন, তখন জনসাধারণ দলে দলে এখানে আসতেন এবং পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করতেন, এভাবে আসা-যাওয়ার ফলে ভেতরে একটি সংকীর্ণ ঢালু পথের সৃষ্টি হয়। যারা এখানে এসেছিলেন তাদের কেউ কেউ সুস্থ সবলই রইলেন, বাকিরা মারা যান। বিশ জনের একটি তরুণ দল সিদ্ধান্ত নিল, তারা পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করবে এবং তারা তাদের সাধ্যমতো ভেতরে অনুসন্ধান করবে এবং কোনো কূল কিনারা না করে সেখান থেকে বের হবে না।

দীর্ঘদিন থাকার পরিকল্পনা হিসেবে তারা সঙ্গে দুই মাসের খাবার, পানি ও রসদ সঙ্গে নিল, এ ছাড়াও তারা সুতা, রশি, মোমবাতি, জ্বালানি তেল, কুঠার ও মুড়ি সঙ্গে নিল। অতঃপর তারা পিরামিডে প্রবেশ করল এবং অধিকাংশই প্রথম ও দ্বিতীয় টানে অবতরণ করল। পিরামিডের ভেতরে অনেক অন্ধকার গলি ও গোলকধাঁধা ছিল। তারা একটির পর একটি প্রকোষ্ঠ পার হচ্ছিল। সেখানে তারা বাদুড়দের কিচিরমিচির শুনতে পেল। বাদুড়গুলো তাদের চেহারায় বারবার আঘাত করছিল। এক পর্যায়ে তারা একটি সরু সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যেতে শুরু করল এবং সেখান থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছিল যা তাদের শ্বাসরোধ করে দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে তাদের এক সঙ্গী চিৎকার করে বলল, ‘আমি আর বাঁচব না।’ এবং সেখানে পড়ে মারা গেল। কিছুক্ষণ পর আরেক সঙ্গীর দেহ নিশ্চল হয়ে গেল। ভয়ে তারা সেখানে আর বেশিক্ষণ থাকল না এবং হাতের মশালগুলো নিভিয়ে বাকিরা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল। তারা টানেল পার হওয়ার পথে গর্তের মধ্যে তাদের ঐ দুই মৃত সঙ্গী ও অন্যান্য রসদসামগ্রী পড়ে থাকতে দেখল।

একবার কিছু মানুষ মিশরের মরুভূমিতে পিরামিডের পাশে বসে গল্প করছিল। তাদের মধ্যে একজন উঠে পিরামিডের ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ভেতর থেকে কোনো একটা জিনিস নিয়ে বের হয়ে এল। এটি একটি ছোট হীরা ছিল। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, হীরাটি তার হাতে থাকার সময় সে কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। পরবর্তীতে সে হীরাটি ফেলে দিল এবং সাথে সাথে তার শ্রবণশক্তি ফিরে পেল।

এভাবে তিনি পিরামিডের নির্মাণ, জাদুকর ও রাজাদের সম্পর্কে বিভিন্ন বিস্ময়কর ও অদ্ভুত ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যেগুলো আমরা এখানে উল্লেখ করব না। [১০৮]

এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যেগুলো বর্ণনাকারীর সংখ্যার কারণে তাওয়াতুর পর্যায়ে পৌঁছেছে (অর্থাৎ এগুলো এতবার এত লোকের কাছে বলা হয়েছে যে, তারা সবাই একটি মিথ্যার ওপর একমত হয়েছে এটা অবিশ্বাস্য)। এ কারণেই অনেক মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এসব মৃতদেহে অভিশাপ রয়েছে, যারাই ফিরাউনদের এসব মৃতদেহ, গুপ্তধন ও দেহাংশের নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের চেষ্টা করে, তারাই এর কবলে পড়ে। কিন্তু তাদের এ ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ মিথ্যা। স্বভাবতই এখানে একটি প্রশ্ন এসে যায়, মৃতব্যক্তিদের কি তাদের চারপাশের মানুষ ও পরিবেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করার কোনো ক্ষমতা আছে? মৃতব্যক্তিদের তাদের চারপাশের মানুষদের কোনো ধরনের ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই, মৃতদেহ কারো জন্য কোনো ক্ষতি বা উপকার বয়ে নিয়ে আসতে পারে না, তা ওই মৃতদেহ ফিরাউনদের হোক অথবা সাধারণ মানুষেরই হোক। জাহিলিয়াতের যুগে মুশরিকরা যেসব মূর্তি ও মৃতব্যক্তির উপাসনা করেছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদেরকে ডাকে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না, তারা (নিজেরাই) সৃষ্ট। তারা প্রাণহীন, জীবিত নয়, তাদের কোনই চেতনা নেই কবে তাদেরকে (পুনর্জীবিত করে) উঠানো হবে।” (আল-নাহল ১৬:২০-২১)

এবং তিনি বলেন: “এ হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। রাজত্ব তাঁরই। তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো খেজুরের আঁটি সংলগ্ন (অত্যন্ত পাতলা ও দুর্বল) আবরণেরও মালিক নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না আর যদি শুনও, তবুও তোমাদের (ডাকে) সাড়া দিতে পারবে না। আর তোমরা যে তাদেরকে (আল্লাহর) অংশীদার গণ্য করতে, কিয়ামতের দিন তা তারা অস্বীকার করবে। কেউই তোমাদেরকে সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত খবর জানাতে পারবে না।” (সূরা আল ফাতির ৩৫:১৩-১৪)

“বল, ‘ তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে কর তাদেরকে ডাক, (ডাকলেও দেখতে পাবে) তারা তোমাদের দুঃখ-বেদনা দূর করতে বা বদলাতে সক্ষম নয়।” (আল ইসরা ১৭:৫৬)

“আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্টি হয়েছে। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের ওপর।” (আল ফুরকান ২৫:৩)

“বল, আকাশ ও যমীনের প্রতিপালক কে? বল, আল্লাহ। বল, তোমরা কি তাঁকে বাদ দিয়ে এমন অভিভাবক গ্রহণ করেছ যাদের নিজেদের কোন লাভ-লোকসান করার ক্ষমতা নেই।” (আল রা‘দ ১৩:১৬)

“তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদেরকে ডাকে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না, তারা (নিজেরাই) সৃষ্ট। তারা প্রাণহীন, জীবিত নয়, তাদের কোনই চেতনা নেই কবে তাদেরকে (পুনর্জীবিত করে) উঠানো হবে।” (আল-নাহল ১৬:২০-২১)

যদিও অনেক তাফসীরবিদ এগুলোকে মূর্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব আয়াতে আল্লাহর পরিবর্তে যেসব বস্তুর উপাসনা করা হয় সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে, উপাসনার এ বস্তুটি পাথর, কবর অথবা গাছও হতে পারে। মুহাম্মাদ নাসির আল রিফায়ী বলেন, এগুলো নিষ্প্রাণ বস্তু ও পাথরের গুণ নয়, বরং এগুলো হলো ওইসব মৃত সৎলোকদের গুণাবলি, কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্রিয়ার বহুবচন (ওয়া মা ইয়াশ‘উরূনা আইয়্যানা ইউবা‘সুন) রূপ ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তিবাদী ও বুদ্ধিমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আর তারা যদি নিষ্প্রাণ জড় পদার্থ হতো, তাহলে আল্লাহ এখানে একবচন ব্যবহার করতেন, কিন্তু তিনি বলছেন, “এবং তারা জানে না, কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে”। সুতরাং বোঝা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা এখানে এর দ্বারা ওইসব সৎলোকদেরকে নির্দেশ করেছেন, যাদের ছবি দিয়ে বা যাদেরকে মডেল করে এসব মূর্তি বানানো হয়েছে। আমাদের এ সময়ের মুশরিকরা তখনকার মুশরিকদের চেয়ে ভালো নয়, তারা মূর্তির স্থূলত্বকে বসিয়েছে এবং কবর দ্বারা বিপথগামী হওয়া মূর্তির চেয়ে আরও বেশি ভয়ংকর। [১০১]

আমি বলব: এসব সৎলোকদের মৃতদেহের ক্ষেত্রেই এটা করতে হবে, তাহলে যারা নিজেদেরকে ঈশ্বর দাবি করেছে এবং তাদের লোকজনকে উপাসনা করার নির্দেশ দিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কী হবে? মৃত ব্যক্তির কারো জন্য উপকার বা ক্ষতি বয়ে আনার কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাদীসে বলেন: “যখন কোনো আদম সন্তান মারা যায়, তখন তার সকল আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়।”

সুতরাং ফিরাওনদের মৃতদেহের সঙ্গে অভিশাপ রয়েছে অথবা যারা তাদের মৃতদেহের নিকটে আসে তারা তাদের ক্ষতি করতে সক্ষম এরকম দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কুরআন ও হাদীসে এ ধরনের দাবিকে নাকচ করা হয়েছে। আর খবরের কাগজে এসব মিথ্যা প্রচারকারীরা বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

সুতারাং ফিরাওনদের সমাধি খননকারীদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল তার পেছনের ব্যাখ্যা কী?

জাদুটোনা অধ্যায়ে আমরা উল্লেখ করেছি যে, কিছু জাদুটোনা আছে যেগুলো কয়েকদিন স্থায়ী হয়, আবার এমন কিছু জাদু আছে যেগুলোর মন্ত্র বাতিল করা না হলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অথবা মাসের পর মাস অথবা শতাব্দীর পর শতাব্দী অথবা কখনো সহস্রাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। জাদুটোনা কতটা সময় স্থায়ী হবে তা নির্ভর করে যে বস্তু বা পদার্থের ওপর মন্ত্র লেখা হয়েছে সেটি কতদিন টিকবে তার ওপর। যদি কোনো কাগজের টুকরো বা কাপড় অথবা কোনো মানুষের ছবির ওপর মন্ত্র লেখা হয় এবং এ কাগজ বা কাপড় পুড়িয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে জাদুর কার্যকারিতাও নষ্ট হয়ে যায়।

সে কারণেই আপনি খেয়াল করে দেখবেন, জাদুকররা (তাদের ওপর আল্লাহর লা'নাত) অনেকসময় তামার কন্টেইনারের মধ্যে কবচ রেখে এর মুখ সীসা গলিয়ে বন্ধ করে দেয়, যাতে করে তার জাদু সুরক্ষিত থাকে। আর প্রাচীন ফিরাওনরা ছিল জادুটোনায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। তারা মূসার عَلَيْهِ السَّلَام বিরুদ্ধে যেসব জাদু ব্যবহার করেছিল, আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে ‘বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “সে বলল, 'তোমরাই ছুঁড়।' যখন তারা বান ছুঁড়ল তখন লোকজনের চোখ যাদুগ্ৰস্ত হয়ে গেল, তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা বড়ই সাংঘাতিক এক জাদু দেখাল।” (আল আ'রাফ ৭:১১৬)

ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট ও প্রমাণিত যে, ফিরাওনরা জادুটোনার ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শী ছিল। এ বিষয়টি কুরআনের কিছু আয়াত থেকেও স্পষ্ট, যেখানে মূসার عَلَيْهِ السَّلَام সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া ফিরাওনদের জادুকরদের সম্পর্কে বিবৃত করা হয়েছে, ওইসব জادুকরদের কোনো ধর্ম ছিল না, তারা নিজেদেরকে ঈশ্বর দাবিদারী ফিরাও ও রাজাদেরই উপাসনা করত। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “সে বলল, 'আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রব'।” (আন-নাযি'আত ৭৯:২৪)

“ফিরাউন বলল- ‘হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না।” (আল ক্বাসাস ২৮:৩৮)

এসব জادুকররা তাদের জادুটোনার দক্ষতাকে ফারাও রাজাদের জীবদ্দশায় ও তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের সেবায় নিয়োজিত রেখেছিল, আর রাজারাও বিভিন্ন উপহার উপঢৌকন দিয়ে এসব জادুকরদের কাছে টানার চেষ্টা করত। রাজা রামসেস (৩) (খ্রিস্টপূর্ব ১১৯৭-১১৮৬) তার আমলের সেরা পুরোহিতকে উপহার হিসেবে ৮৮৬৮ জন বন্দিকে দিয়েছিল, পুরোহিত্যের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল এ বন্দিদেরকে, সে চাইলে তাদেরকে বিক্রি করতে পারবে অথবা ভোগ করতে পারবে, কেউ এসে তার এহেন কাজের জন্য কৈফিয়ত চাইবে না। এছাড়াও রাজা রামসেস তাকে ৩২ টন স্বর্ণ দিয়েছিল উপঢৌকন হিসেবে। [১১৩] খ্রিস্টপূর্ব ১১৪৪ শতাব্দীতে, নিজেকে ঈশ্বর দাবিদারী রাজা আমুননের পুরোহিতদেরকে ২ হাজার ৪০০ ফার্ম, ৮০ টি জাহাজ, ৪৬টি হার্ড ও ৫ লাখ ভেড়া দেওয়া হয়েছিল উপহার হিসেবে। [১১৪]

সুতরাং বোঝা গেল যে, এসব জادুকর ও রাজাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। এ কারণেই আল্লাহ নবী হযরত মুসাকে যে মু‘জেযা দেওয়া ওই এলাকার জন্য যথাযথ ছিল, যেখানের লোকেরা জাদুতে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিল।

মূসার প্রতি তাদের চ্যালেঞ্জ এবং আল্লাহ প্রদত্ত মু‘জেযার সামনে তাদের পরাজয়ের কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। ফারাও রাজারা পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবনে বিশ্বাস করত এবং তারা আরও বিশ্বাস করত যে, তাদেরকে মৃত্যু থেকে পুনরায় জীবিত করা হবে তাদের অবদান, তাদের সম্পদ ও চাকরদের খুঁজে পাওয়ার জন্য, আর এ বিশ্বাস থেকেই তারা তাদের জادুকরদের নির্দেশ দিয়েছিল ফারাও রাজাদের দেহ মমি করে সংরক্ষণ করার জন্য, তাদের নির্দেশ ছিল, জادুকররা যেন তাদের মন্ত্রবলে রাজাদের দেহ, সমাধিক্ষেত্র ও সম্পদ রক্ষা করে এবং এসব যেন বছরের পর বছর স্থায়ী থাকে। এ কারণেই জادুকররা কঠিন পাথরের গায়ে তাদের মন্ত্র খোদাই করল। আমার মনে হয়—আল্লাহই ভালো জানেন—ফারাও রাজাদের সমাধিক্ষেত্রের দেওয়ালে খোদাই করা যেসব মন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো করা হয়েছে সমাধি অথবা তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করার জন্যই। এছাড়াও জادুকররা লোহার গায়েও খোদাই করে তাদের মন্ত্র লিখে রাখত। সার্কোফ্যাগির মধ্যে প্রাপ্ত ফারাওদের দেহের মাথার কাছে অথবা সমাধিতে প্রাপ্ত ওখন ও মনিমুক্তার মধ্যে লোহার তাবিজও পাওয়া গেছে। রাজা তুতানখামুনের দেহ যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন এর সঙ্গে ১৪০টি অতি মূল্যবান রত্ন-পাথর পাওয়া গিয়েছিল। এ ওখনের মধ্যে একটি অদ্ভুতাকৃতির লোহার টুকরো পাওয়া গিয়েছিল, যার গায়ে হায়ারোগ্লিফিকস দিয়ে খোদাই করা ছিল, আর এটা নিয়েই বিজ্ঞানীরা চিন্তার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।

hieroglyphics-এ রচিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বই থেকে যখন এর অর্থ উদ্ধার করা হলো, তখন দেখা গেল এ লোহার টুকরোতে একটি সতর্কবাণী লেখা, “যেসব হাত আপনাকে স্পর্শ করবে সেগুলোকে কেটে ফেলা হবে; যেসব নাক আপনার ঘ্রাণ গ্রহণ করবে, সেগুলোকে ধ্বংস করা হবে। যেসব চোখ আপনাকে দেখবে সেগুলোকে অন্ধ করে দেওয়া হবে; শান্তভাবে জেগে উঠুন, হে জাহান্নাম!”

এখানে থেকেই স্পষ্ট, ফারাওদের কথিত অভিশাপ আসলে এসব মৃতদেহ ও ধন-সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য শক্তিশালী জাদু-মন্ত্র দিয়ে বশ করা জিনের কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়, এবং যেসব জিন তাদের পিতৃপুরুষ থেকে এসব দায়িত্ব পেয়েছে, তারা কাউকেই এসবের কাছাকাছি আসতে দেয় না, আসলেই তার ক্ষতি করবে।

যারা ফারাওদের সমাধি আবিষ্কার ও খননের কাজে অংশ নিয়েছিল তাদের ক্ষেত্রে যা যা ঘটেছিল সেগুলোকে চিকিৎসকরা কোমা, হ্যালুসিনেশন, ব্যক্তিত্ব বৈকল্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু সত্যিকারের অর্থে এগুলো ঘটেছে জিনের আক্রমণে।

টিকা:
১০১. মুহাম্মাদ নাসির আল রিফায়ী, তাইসিরুল আলি আল কাদির, ২/৫৭৭।
১০৪. ফিলিপ দানজারবার্গ, লা'নাতুল ফারাইনাহ, ৫-২২
১০V. ফিলিপ দানজারবার্গ, লা'নাতুল ফারাইনাহ, ৫-১২
১০৭. আনিস মানসুর, লা'নাতুল ফারাইনা
১০৮. আল-মুয়াইরী প্রণীত নিহায়াতুল-ইরাব ১৫/১৯-২০, প্রকাশনায়: দারুল কুতুব মিশরীয়্যাহ, কায়রো。
১০৯. ড. উমর আল আশকার, আলিম আল সিহ্র ওয়াল শাওয়ায়াহ্, পৃ-১১৩, তিনি মুহাম্মাদ জাফরের উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
১১৩. আনিস মানসূর, লা‘নাতুল ফারা‘নিয়্যাহ, ৫৬
১১৪. প্রাগুক্ত。

ফন্ট সাইজ
15px
17px