📄 জাদুটোনা থেকে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন?
কোনো কারণ নেই, কারণ ইসলাম আমাদের বলে দিয়েছে কীভাবে বিভাজিত শয়তানের হাত থেকে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে হবে। মুসলমানরা জাদু টোনার কুপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করবেন।
(১) ঈমানকে আরো শক্তিশালী করা
একজন মুসলমানকে অবশ্যই নিজেকে ও তাওহীদের প্রতি তার বিশ্বাস আরো দৃঢ় করতে হবে। একজন মুসলিম এভাবে তার ঈমান জোরদার করেন এবং আল্লাহর ভয় ব্যতীত অন্য সব কিছুর ভয়কে হৃদয় থেকে দূর করেন এবং কারো উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে এ বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করে তোলেন। মুসলিমকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এসব উপায় হলো বাতাসের গতিবিধির মতো, যা তাদের নিয়ন্ত্রক ও সৃষ্টিকর্তার হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং আল্লাহর আদেশ বা ইচ্ছা ব্যতীত এগুলো কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। জادুকরদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “মূলতঃ তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না।” (আল বাকারা ২:১০২)
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই, আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই।” (ইউনুস ১০:১০৭)
যারা আল্লাহর সত্যিকারের বান্দাহ, বিপদ ও সুখ উভয় সময়েই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলেন, যাদের সব ধরনের ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র আল্লাহ তা'আলা, তাদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে: “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?” (আল-যুমার ৩৯:৩৬)
আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও দাসত্ব প্রয়োগ করার মাধ্যমে আসে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা, তাদের ওপর শয়তানের কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আমার প্রকৃত বান্দাদের ওপর তোমার কোন আধিপত্য চলবে না,” (সুরা আল হিজর ১৫:৪২) যার ঈমান শক্তিশালী, সে আল্লাহর দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে এবং তারই তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং তার জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর জادুকররা নিজেরাও একথা ভালোভাবেই জানে যে, তাদের মন্ত্র দ্বারা একমাত্র দুর্বল ঈমানের ব্যক্তিরাই আক্রান্ত হবে।
(২) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আযকার তেলাওয়াত করা
জادুটোনা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আযকার তেলাওয়াত করা। কারণ এ আযকার জادুটোনা করার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এর হাত থেকে রক্ষা করে, এর প্রভাব থেকে রোগীকে বাঁচায় এবং সকল মন্দ প্রভাব দূর করে, এবং জادুটোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলে তার প্রতিকার করে। ইবনে কাইয়ুম (রহ.) বলেন:
জادুটোনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর আল্লাহ প্রদত্ত উপায়, একটি মাত্র পদ্ধতি যা সকল মন্দ প্রভাব দূর করে এবং এগুলোকে প্রতিহত ও প্রতিরোধ করে, সেটি হলো যিকির, কুরআনের আয়াত ও দুআ, এসব তেলাওয়াতের ফলে জادুটোনার কার্যকারিতা বাতিল হয়ে যায়। এগুলো যত শক্তিশালী হবে, তত দ্রুত এরা ছড়িয়ে পড়বে। এটা দুটি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার মতো, যেভাবে উভয় বাহিনী অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সজ্জিত, উভয়েরই বিপুল ক্ষমতা রয়েছে; দুই বাহিনীর মধ্যে যারা বিপক্ষ বাহিনীকে পরাভূত করতে পারবে, তারাই বিজয়ী ঘোষিত হবে। হৃদয় ও মন যদি আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকে, নিয়মিত যদি দুআ, যিকির পাঠ করা হয়, ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় এবং পূর্ণ মনোযোগে বিরদ পাঠ করে, তাহলে জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে এটাই হবে জادুটোনার প্রভাব দূর করার সর্বোৎকৃষ্ট ও শক্তিশালী উপায় এবং আক্রান্ত হওয়ার পরে এটাই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিকার ব্যবস্থা। জادুকররা জানে যে, তাদের জادুটোনার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব একমাত্র তাদের ওপরই পড়তে সক্ষম যাদের হৃদয় দুর্বল এবং যারা সহজেই প্রভাবিত হয়, যারা নিজ ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যারা সবসময় তুচ্ছ ও সামান্য বিষয় নিয়ে মেতে থাকেন। এ কারণেই যারা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাদের অধিকাংশই নারী, শিশু, অজ্ঞ ব্যক্তিগণ এবং যারা দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন অথবা আল্লাহ ও তাওহীদের প্রতি যাদের বিশ্বাস দুর্বল তারা আক্রান্ত হন এবং যারা নিয়মিত যিকির, কুরআনের আয়াত ও দুআ পাঠ করেন না তারাও। শেষকথা, জادুটোনার কুপপ্রভাবে তারাই আক্রান্ত হন, যারা দুর্বল, সহজেই প্রভাবিত হন এবং সর্বসময়ে তুচ্ছ বিষয় নিয়েই মেতে থাকেন।
তারা বলেন: ভিকটিম নিজেই জادুটোনার আক্রমণের সুযোগ করে দেন, কারণ আমরা জানি, কোনো মানুষ যে বিষয়ের ওপর বেশি মনোযোগ দেয়, সেটির প্রতিই তার মন লেগে থাকে। সুতরাং, ব্যক্তির ঝোঁক যে দিকে, সেই দিকের তাড়নাতেই সে তার মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেসব আত্মা পরাভূত হতে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকে, শয়তানের আত্মা কেবল সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কারণ তাদের হৃদয়সমূহ ইতোমধ্যেই এমন কিছুর দিকে ঝুঁকে গেছে যা মন্দ আহ্বানদের কার্যসাধনে খুবই সহায়ক, তারা সহজেই শয়তান ও বদ জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায়। এর কারণ হলো এসব মানুষের মধ্যে কোনো আত্মিক শক্তি নেই, তারা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত নয়। সুতরাং আপনি খেয়াল করে দেখবেন, এসব মানুষের হৃদয় অন্তঃসারশূন্য, মনে কোনো শক্তি নেই, সংগ্রাম করার ক্ষমতা নেই, তাদের মন আগেই থেকেই এমন কিছুর দিকে ঝুঁকে থাকে, যার কারণে জিনেরা সহজেই তাদেরকে পরাভূত করে এবং জادুকররা জادুটোনা করে।
ইমাম আহমাদ ও আত-তিরমিযী আল হারিস আল আশআরী থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন, এ হাদীসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন: “....আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ দিচ্ছি, কারণ আল্লাহর যিকির হলো ওই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যাকে শত্রু ধাওয়া করেছে, শক্তি ধাওয়া করেছে, আর সেও বাঁচার জন্য অবশেষে একটি দুর্গের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বাঁচালো। একইভাবে এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর যিকির ব্যতীত অন্য কোনো কিছু দিয়ে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।”
(৩) খালি পেটে আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাওয়া
ইমাম বুখারী (র.) তার সহীহ হাদীস গ্রন্থে আমীর বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা সাদ (র.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেন: “যে ব্যক্তি সকালে একটি আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, রাত্রি না আসা পর্যন্ত ওই দিনে সে আর কোনো বিষ অথবা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হবে না।” অন্য একজন এ সম্পর্কে বলেন, “সাতটি খেজুর”। আরেক বর্ণনায় এসেছে, “যে ব্যক্তি সকালে সাতটি আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, সে ওই দিনে কোনো বিষ বা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হবে না।”
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) কথার প্রতি পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস রেখে নিয়মিত খালি পেটে আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, তার জন্য এ খেজুর এমন ভাবে কাজ করবে, যেন তাকে জادুটোনার টিকা দেয়া হয়েছে, জادুটোনা অথবা কোনো বিষই তাকে ক্ষতি করতে পারবে না। কিছু আলিম এ খেজুরের একটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, এটি খুবই গরম এবং এটি রোগ দূর করার জন্য যথেষ্ট, তবে নবী করিম (স.) জادুটোনা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন, ওই খেজুরে হয়তো এমন কোনো উপাদান রয়েছে যা মানুষকে বিষ ও জادুটোনা থেকে সুরক্ষা দান করে। আমরা আল্লাহর রাসূলের (স.) সব কথা বিশ্বাস করি, এমনকি আমরা যদি নাও জানি, সেটি কীভাবে কাজ করে তারপরেও। মদিনার খেজুরের যে বিশেষ গুণাগুণ থাকতে পারে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কিন্তু মদিনার খেজুর যদি পাওয়া না যায় তাহলে ইনশাআল্লাহ যে কোনো খেজুরেই কাজ হবে。
(৪) জادুটোনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জادুকরের কাছে না যাওয়া
যেহেতু যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তার জন্য কোনো উপকার জادুকরের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না আর যার কোনো সমস্যা নেই, তিনিও তাদের ক্ষতি থেকে নিরাপদ নন। যেসব শয়তান ও বদ জিন জادুকরের সঙ্গে কাজ করে, তারাও বেশ ভালো করেই জানে যে, যেসব মুসলমান জادুকরের দরজায় কড়া নাড়ে, তাদের ঈমান দুর্বল এবং আল্লাহর উপর তাদের কোনো আস্থা নেই, সুতরাং তাদের ক্ষতি করা বা তাদের উপর আছর করা খুবই সহজ।
টিকা:
৯৩. যাদ আল মা'আদ, ৩/১০৫
১১১. আল মুসনাদ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত, ৪০৮/২০২; আত-তিরমিযী: ২৮৬৭, হাদীসটি সহীহ。
১১২. আওয়াআজ্ব: মদিনায় উৎপাদিত এক ধরনের খেজুর (অনুবাদক)
১১৩. ফাতহুল বারী, ১০/২৯৮
📄 জাদুটোনার চিকিৎসা
যদি কেউ জادুটোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে আল্লাহকে ভয় করতে হবে, তাঁর ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং সবকিছু তাঁর দায়িত্বে ছেড়ে দিতে হবে। তিনি ধৈর্যের পথে অটল থেকে ক্রমাগত দোয়া করতে থাকবেন এবং ইসলামী শরীয়াহ নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোন না কোন পথ বের করে দিবেন। আর তাকে রিযুক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।” (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)
শরীয়াহ নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, চিকিৎসার জন্য এমন ব্যক্তির কাছে যেতে হবে যার দ্বীনি প্রতিজ্ঞা ও দয়ার ওপর আস্থা রাখা যায়, যিনি রোগীর জন্য কুরআনের আয়াত দিয়ে রুকইয়া পাঠ করবেন।
প্র্যাকটিশনারকে অবশ্যই নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে:
১- তিনি যে স্থানে বসে চিকিৎসা করাবেন, সেই স্থান থেকে আল্লাহর অবাধ্যতাকারী বা আওয়াজ সৃষ্টিকারী সব বস্তু সরিয়ে ফেলবেন。
২- শুরুতেই রোগীকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, তার কাছে কোনো তাবিয-কবচ আছে কি না অথবা তিনি কোনো জادুকরের কাছে গিয়েছিলেন কি না। যদি তার সঙ্গে কোনো তাবিয কবচ থাকে তবে তা পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং তিনি যদি কোনো জادুকরের কাছে গিয়ে থাকেন তাহলে তাকে বলতে হবে যে, কত বড় ভুল তিনি করেছেন এবং এর প্রভাব কত মারাত্মক হতে পারে, এটা তার আত্মিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর。
৩- তাকে অবশ্যই রোগ নির্ণয় করতে হবে। এর এটা করা হয় রোগীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে। রোগীকে কেমন ধরনের প্রশ্ন করতে হবে সেক্ষেত্রে প্র্যাকটিশনারের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিবাহিত লোকের প্রশ্ন অবিবাহিত থেকে আলাদা হবে। প্রশ্ন নিম্নরূপ হতে পারে:
১. রোগী কী ধরনের যন্ত্রণা ভোগ করছেন
২. এ সমস্যা শুরু হয়েছে কখন
৩. রোগী কি কোনো স্বপ্ন দেখেন, আর দেখলে তা কী ধরনের?
৪. তিনি কি পেটে ব্যথা অনুভব করেন? এ ব্যথার শুরু কখন?
৫. তার কি মাথা ব্যথা আছে অথবা তিনি কি মাথা অথবা দেহে ভারী কিছু অনুভব করেন?
৬. তিনি কি তার বুকে সঙ্কুচতা অনুভব করেন?
রোগ নির্ণয়ের জন্য করা প্রশ্ন ঘটনাক্রমে বিভিন্ন রকম হয়। এসব প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তি করে প্র্যাকটিশনার আরো চিন্তা ভাবনা করে পুনরায় প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন পর্ব শেষে তিনি রোগীর ওপর নিম্নোক্ত রুকিয়া পাঠ করবেন:
১. (সূরা আল ফাতিহা: ১-৭)
২- আয়াতুল কুরসী (বাকারা ২:২৫৫)
৩. (আল-আ'রাফ: ১১৭-১২২)
৪. (সূরা-ইউনূস: আয়াত ৮১-৮২)
৫. (সূরা ত্ব-হা: আয়াত ৬৯)
৬. (সূরা ইখলাস, ফালাক্ব ও নাস)
📄 জাদুটোনার চিকিৎসায় সোনামুখীর রস পান
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে বর্ণিত ওষুধগুলোর মধ্যে সানামুখী রেচক সবচেয়ে উপকারী। জادুটোনায় ব্যবহৃত জিনিসপত্র বা তাবিজ-কবচ যদি রোগীর পেটের মধ্যে থেকে থাকে তাহলে সম্ভব হলে এগুলো দ্রুত রোগীকে বমি করানোর মাধ্যমে বের করে আনতে হবে। আর রোগী যদি বমি করতে না পারে, তাহলে তাকে সানামুখীর রস পান করতে দিতে হবে। জادুটোনায় আক্রান্ত অনেকেই এটা পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো উপকার পেয়েছেন।
সানামুখীর গুণাগুণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আসমা বিনতে উমাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন: “রেচক ওষুধ হিসেবে তুমি কী ব্যবহার করো?” তিনি বললেন: “শাবরুম।” আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন: “এটা গরম, গরম” তিনি বললেন: এরপর আমি রেচক হিসেবে সানামুখীর রস ব্যবহার করলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ সম্পর্কে বলেন: “মৃত্যু থেকে নিরাময় লাভের জন্য যদি কোনো ওষুধ থাকত, তাহলে তা হত সানামুখী।”
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, “তোমরা যেসব ওষুধ ব্যবহার কর, তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হলো, যা তোমরা মুখের পাশ দিয়ে লাগাও, নাকের ড্রপ, কাপিং ও রেচক।”
মুখের পাশ দিয়ে ওষুধ লাগানো (লাদুদ): এর মানে হলো হাতের আঙুল দিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করা। আরবি শব্দ লাদুদ এসেছে লাদীদুল ওয়াদি (উপত্যকার পাশ থেকে) বাক্য থেকে। নাকের ড্রপ মানে হলো, যে ওষুধ নাকের মধ্যে লাগানো হয় অথবা যা মুখের ভেতর দিয়ে টেনে নেয়া হয়। আর রেচক ওষুধ প্রয়োগ করা হয় মলত্যাগ স্বাভাবিক করার জন্য。
আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর রাসূল (সা.) তার গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি স্পার্জ গাছের পাতা পিঠিয়েছিলেন। তখন এটা দেখে আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন: “ওটা দিয়ে তুমি কী তৈরি করেছ?” তিনি বললেন: এটা আমরা পান করি। রাসূল (সা.) বললেন: “মৃত্যুকে দূরে সরানো বা মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য যদি কোন ওষুধ থাকত, তাহলে তা হত সোনামুখী পাতা।” আল হাকিম বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। আল যাহাবি তার সঙ্গে একমত হয়েছেন।
ইবনে মাজাহ তার সুনানের কিতাবুল তিব্বে (ওষুধ অধ্যায়) বর্ণনা করেছেন, ইবরাহিম বিন আবূ আবাল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ উবাই বিন উম্মে হারামকে বলতে শুনেছি, তিনি আল্লাহর রাসূলের (সা.) সঙ্গে সালাত আদায় করেছিলেন, তারা উভয়েই কিবলামুখী ছিলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “তোমরা সোনামুখী পাতা ও মধু ব্যবহার করবে, কারণ এ দুটোতে আল সাম ব্যতীত সব রোগের জন্য নিরাময় রয়েছে।” তখন বলা হল: হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আল সাম কী? তিনি বললেন: ‘আল মাউত’ “মৃত্যু”。
টিকা:
৩৪. আত-তিরমিযী, ৬/২৫৪, ২৬৬। আল আলবানি বলেন: এই হাদীসটি যায়ীফ। যায়ীফুল জামি, হাদীস নং-৪৮০৭।
৩৫. ইমাম আত-তিরমিযী হাদীসটি হাসান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল তিব্ব আল নববী গ্রন্থে আল হাকিম ও আবু নাঈম কর্তৃক হাসান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে。
১১. মুসতাদরাক আল হাকিম, ওমর বিন আল খাত্তাব (রা.) বর্ণিত হাদিস থেকে নেয়া।
📄 যেভাবে পানীয় তৈরি করবেন
অসুস্থ ব্যক্তি কিছু সোনাযুখী পাতা সংগ্রহ করে আনবেন এবং এগুলোকে এক লিটার পানি ভর্তি পাত্রে রাখবেন। অতঃপর পাত্রটি উনুনে বসিয়ে আগুনে সেদ্ধ করবেন এবং পরে ছেঁকে নিয়ে ঠান্ডা করবেন। এরপর রোগী এখান থেকে খালি পেটে তিন কাপ পান করবেন। মিষ্টি স্বাদের জন্য এর সঙ্গে মধু মিশ্রিত করা যেতে পারে। এটি পান করার পর রোগী তার অঙ্গে একটি ঢিলেঢালাভাব অনুভব করবেন। পানীয়ের কার্যকারিতা টের পাওয়া যাবে সাত ঘন্টার মধ্যে এবং এর কার্যকারিতা থাকবে বাইশ ঘণ্টা পর্যন্ত। এ সময় পেটে মৃদু ব্যথা হতে পারে, তবে অন্ত্রে কোনো ইনফেকশন হবে না। সোনাযুখীর রসের কার্যকারিতা শুরু হলে অন্ত্র এর সকল দূষিত পদার্থ বের করে দেবে এবং আল্লাহর চাইলে একই সঙ্গে জাদুটোনার সকল তাবিজ-কবচও বের হয়ে যাবে। এটি অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করা হয়েছে এবং আল্লাহর রহমতে ভালো উপকার পাওয়া গেছে。
ড. আলী আল বার হাদীস অনুসারে সোনাযুখী পাতা ও এর গুণাগুণের উপর একটি নিবন্ধ লিখেছেন এবং এ নিবন্ধে তিনি সোনাযুখী পাতার অনেক ফায়াজ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
সোনাযুখী পাতাকে মল নরম করার রেচক হিসেবে ব্যবহার করা? এবং এটি মোটেও ক্ষতিকর নয়। এটা সরাসরি মলাশয়ে কাজ করে সোনাযুখী উত্তম রেচক, উৎকৃষ্ট মানের ওষুধ, এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং এটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শুদ্ধ। এর উপকারি গুণাগুণগুলো হল, বিষণ্ণতা আনয়নকারী চিন্তার বিরুদ্ধে কাজ করে, পা ফাটা, পেশীর প্রসারণ বা টান, চুলের স্ফীতি, উকুন, খোস-পাঁচড়া, ফুসকুড়ি ও শরীরে চুলকানির বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে। জলপাইয়ের তেলের সঙ্গে গরম করে এটি পান করা হয় এবং এটি শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে দেয়। এছাড়া এটি পিঠের ও কটিদেশের ব্যথার বিরুদ্ধেও কাজ করে। সোনাযুখীর আরেকটি ভালো গুণ হল এটি কালো পাচক রস ও কাশির শ্লেষ্মা বের করে দেয় এবং হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী করে। দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র মাথা ব্যথা এবং মৃগীরোগের ক্ষেত্রেও এটি কাজ করে। এটা হেমোরয়েড দূর করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে এটিকে ব্যবহার করা হয় পায়খানা নরমকারক রেচক হিসেবে। পায়খানা নরমকারক এমন কোনো ওষুধ পাওয়া যাবে না, যাতে উপাদান হিসেবে সোনামুখীর রস নেই। সোনামুখী সর্বোৎকৃষ্ট রেচক এতে কোনো সন্দেহ নেই。
টিকা:
১৭. ড. মুহাম্মাদ আলী আল বার, আল সিনা ওয়াল সানুত