📄 যেসব লক্ষণ দিয়ে জাদুকরকে চেনা যায়
১- সে কারো নাম ও মায়ের নাম জানতে চাইবে।
২- সে একটি প্রাণী অথবা পাখি যবেহ করতে বলবে, এ প্রাণীর বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য থাকুক বা না থাকুক অথবা এ প্রাণীর রক্ত শরীরে মালিশ করা হোক বা না হোক।
৩- সে রোগীকে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল ধরে নির্দিষ্ট ধরনের খাবার অথবা পানীয় পান করার নির্দেশ দেবে এবং এ সময়কালে তাকে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকার কক্ষে বসবাস করতে বলবে।
৪- সে রোগীকে কিছু কাগজ দেবে পোড়ানোর জন্য এবং তাকে এ কাগজ পোড়ানোর ধোঁয়ার গন্ধ শুঁকতে বলবে অথবা একে কোথাও ঝুলিয়ে অথবা পুঁতে রাখার পরামর্শ দেবে।
৫- যারা নামের অক্ষর বা সংখ্যা লেখে অথবা আল্লাহর বাণী সম্বলিত কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন তারা প্রত্যেকেই জাদুকর।
৬- যারা দুর্বোধ্য সব শব্দ উচ্চারণ করে অথবা আরবী ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ করে, তারা প্রত্যেকেই জাদুকর。
📄 জাদুকরের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা
আমরা বুঝতে পারলাম যে, জাদুকররা কাফির এবং ইসলামে তাদের জন্য শাস্তির বিধান হলো তলোয়ার দিয়ে শিরচ্ছেদ। ইসলাম মুসলিমদেরকে জادুকরের কাছে যেতে নিষেধ করেছে, আমরা এখন এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করব। হাসান সনদে আল বায়ান থেকে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যারা পাখির সংকেতকে শুভ অথবা অশুভ হিসেবে মেনে চলে, অথবা যারা ভবিষ্যৎ বলে অথবা নিজের ভবিষ্যৎ কাউকে দিয়ে বলায়, যারা জادুটোনা করে অথবা নিজের জন্য জادুটোনা করায়। যে ব্যক্তি জادুকরের কাছে যায় এবং তার কথা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মাদের (ﷺ) কাছে অবতীর্ণ হওয়া আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করে।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন: “তোমরা সাতটি পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ, যা মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।” তারা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেই গুনাহগুলো কী কী? তিনি বললেন: “আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার করা, জادুটোনা করা, ইসলামী শারীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত হওয়া ব্যতীত এমন আত্মাকে হত্যা করা যা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন, সুদ খাওয়া, এতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা এবং নির্দোষ মু’মিন নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।”
এবং তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি ভবিষ্যতবক্তার শরণাপন্ন হবে এবং এবং তার কথা বিশ্বাস করবে, মুহাম্মাদের (ﷺ) প্রতি অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাব দ্বারা তার আর কিছু করার থাকবে না, অর্থাৎ এর মাধ্যমে সে কুরআনকেই অস্বীকার করবে। আর যে ব্যক্তি জادুকরের কাছে যাবে, কিন্তু তার কথা বিশ্বাস করবে না, তার চল্লিশ দিনের ইবাদাত কবুল হবে না।”
অনেকে বলতে পারেন: আমি তো কারো কোনো ক্ষতি করার জন্য জادুকরের কাছে যাই না, আমি যাই আমার ওপর যে জادুটোনা করা হয়েছে তা নিরাময়ের জন্য। আমরা তাদেরকে বলব: আপনাদের অবস্থা ওই ব্যক্তির মতো, যে নিজেকে আগুনে নিক্ষেপ করে মরুভূমির তাপদাহ থেকে বাঁচার প্রার্থনা করে।
অনেক সময় জিনরাও জادুকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে এবং তাকে এমন অসুস্থ বানিয়ে দেয়, যার জন্য কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না. জিন ও শয়তান মিলে অনেক সময় জادুকরকে চরম বিপদে ফেলে দেয় এবং তাকে কোনো সাহায্য করে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন: “শয়তান মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতক।” (সূরা আল ফুরকান ২৫:২৯)
জিনরা অনেক সময় জادুকরকে তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসা নারীর সঙ্গে অনৈতিক কাজ করতে বলে অথবা ওই নারীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে রক্ত দিয়ে লেখাতে বলে। জادুটোনা অনেক সময় ঈপ্সিত ফলাফলের বিপরীত ফল এনে দেয়। তাই দেখা যায় অনেকে জادুটোনা করান নিজের উপকারের জন্য, কিন্তু এর পরিসমাপ্তি ঘটে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, সে নিজেই এ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায়। অনেক নারী তাদের স্বামীদের ওপর জادুটোনা করান, যাতে স্বামীরা তাদেরকে ভালোবাসেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ না করেন, কিন্তু জادুটোনার ফল হয় বিপরীত, দেখা যায় জادুটোনার প্রভাবে স্বামী তাকে ভালোবাসার পরিবর্তে তালাক দিয়ে দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “কু-চক্রও তাকেই ঘিরে ধরবে যে তা করবে।” (সূরা ফাতির ৩৫:৪৩)
অনেক সুস্থ সবল নারী-পুরুষও জادুকরের কাছে যান, আর তখন জادুকর জিনকে দিয়ে তাদের মাঝে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে, যাতে করে এর মাধ্যমে সে তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে।
জিন ও শয়তানের দাবি থাকে অনেক এবং তাদের এসব দাবি মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। অনেক সময় তারা একটি নির্দিষ্ট প্রাণী উৎসর্গ করার দাবি করে, পোষা মোরগ অথবা কবুতর জবেহ করতে বলে, আবার এ জবহের ক্ষেত্রে থাকে কঠিন কিছু শর্ত, এ প্রাণীর রক্ত রোগীর দেহে মালিশ করতে বলা হয়। অথবা তারা অসুস্থ রোগীকে এমন এক নির্জন কক্ষে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখার দাবি করে, যেখানে চল্লিশ দিনেও সূর্যের আলো প্রবেশ করবে না অথবা নির্দিষ্ট একটি সময় ধরে রোগীকে পানি স্পর্শ না করার পরামর্শ দেয়, এভাবে তাদের চাহিদার কোনো শেষ নেই। প্রত্যেক অঞ্চলে জিন তার নিজস্ব দাবি তুলে ধরে, ওই দাবি ওই এলাকায় অদ্বিতীয়। মিশরে আবু হাশিমাহ নামে একটি পরিত্যক্ত কূপ রয়েছে, জادুকররা বন্ধ্যা নারীদেরকে জুমআর দিন মাগরিবের পরে এখানে গোসল করার জন্য পাঠায়। এ পরিত্যক্ত কূপে অনেক জিন রয়েছে, যারা নারীদের গোসল করার দৃশ্য উপভোগ করে। এক্ষেত্রে কোনো জিন কোনো নারীর দ্বারা আকৃষ্ট হতে পারে এবং তার সঙ্গে यौन মিলনও করতে পারে। যে দরিদ্র লোকটি তার স্ত্রীকে বন্ধ্যাত্ব থেকে নিরাময়ের জন্য এ কূপে নিয়ে আসেন, তিনি আসলে ভুলে যান যে, প্রজনন ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “যাকে চান কন্যা-সন্তান দেন, যাকে চান পুত্র সন্তান দেন। অথবা তাদেরকে দেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছে বন্ধ্যা করেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত ও ক্ষমতাবান。” (সূরা আল-শুরা ৪২:৪৯-৫০) শয়তান ও জিনের চাহিদা সীমাহীন। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেন: “আরো এ যে, কতক মানুষ কতক জিনের আশ্রয় নিত, এর দ্বারা তারা জিনদের গর্ব অহঙ্কার বাড়িয়ে দিয়েছে।” (সূরা জিন ৭২:৬) শায়খ হাফিজ আল হুকামি (রহ.) বলেন: জادুটোনা করে জাদুর ক্রিয়া নষ্ট করাও হারাম, কারণ এটা জادুটোনাকে সমর্থন ও সহায়তা করার শামিল, এবং ভিকটিমের ওপর থেকে শয়তানের কার্যকারিতা নষ্ট করার জন্য এভাবেই মানুষ শয়তানের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। এ কারণেই আল হাসান বলেন: জادুকর ছাড়া আর কেউই জادুটোনাকে সমর্থন করেন না。
টিকা:
৬৬. ফাতহুল বারি, ৫/৩০. মুসলিম-১/১২২।
৬৭. আল তাবারানি, আল বাজার থেকে জায়িদ সনদে
📄 জাদুটোনা থেকে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন?
কোনো কারণ নেই, কারণ ইসলাম আমাদের বলে দিয়েছে কীভাবে বিভাজিত শয়তানের হাত থেকে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে হবে। মুসলমানরা জাদু টোনার কুপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করবেন।
(১) ঈমানকে আরো শক্তিশালী করা
একজন মুসলমানকে অবশ্যই নিজেকে ও তাওহীদের প্রতি তার বিশ্বাস আরো দৃঢ় করতে হবে। একজন মুসলিম এভাবে তার ঈমান জোরদার করেন এবং আল্লাহর ভয় ব্যতীত অন্য সব কিছুর ভয়কে হৃদয় থেকে দূর করেন এবং কারো উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে এ বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করে তোলেন। মুসলিমকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এসব উপায় হলো বাতাসের গতিবিধির মতো, যা তাদের নিয়ন্ত্রক ও সৃষ্টিকর্তার হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং আল্লাহর আদেশ বা ইচ্ছা ব্যতীত এগুলো কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। জادুকরদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “মূলতঃ তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না।” (আল বাকারা ২:১০২)
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই, আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই।” (ইউনুস ১০:১০৭)
যারা আল্লাহর সত্যিকারের বান্দাহ, বিপদ ও সুখ উভয় সময়েই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলেন, যাদের সব ধরনের ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র আল্লাহ তা'আলা, তাদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে: “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?” (আল-যুমার ৩৯:৩৬)
আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও দাসত্ব প্রয়োগ করার মাধ্যমে আসে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা, তাদের ওপর শয়তানের কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আমার প্রকৃত বান্দাদের ওপর তোমার কোন আধিপত্য চলবে না,” (সুরা আল হিজর ১৫:৪২) যার ঈমান শক্তিশালী, সে আল্লাহর দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে এবং তারই তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং তার জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর জادুকররা নিজেরাও একথা ভালোভাবেই জানে যে, তাদের মন্ত্র দ্বারা একমাত্র দুর্বল ঈমানের ব্যক্তিরাই আক্রান্ত হবে।
(২) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আযকার তেলাওয়াত করা
জادুটোনা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আযকার তেলাওয়াত করা। কারণ এ আযকার জادুটোনা করার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এর হাত থেকে রক্ষা করে, এর প্রভাব থেকে রোগীকে বাঁচায় এবং সকল মন্দ প্রভাব দূর করে, এবং জادুটোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলে তার প্রতিকার করে। ইবনে কাইয়ুম (রহ.) বলেন:
জادুটোনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর আল্লাহ প্রদত্ত উপায়, একটি মাত্র পদ্ধতি যা সকল মন্দ প্রভাব দূর করে এবং এগুলোকে প্রতিহত ও প্রতিরোধ করে, সেটি হলো যিকির, কুরআনের আয়াত ও দুআ, এসব তেলাওয়াতের ফলে জادুটোনার কার্যকারিতা বাতিল হয়ে যায়। এগুলো যত শক্তিশালী হবে, তত দ্রুত এরা ছড়িয়ে পড়বে। এটা দুটি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার মতো, যেভাবে উভয় বাহিনী অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সজ্জিত, উভয়েরই বিপুল ক্ষমতা রয়েছে; দুই বাহিনীর মধ্যে যারা বিপক্ষ বাহিনীকে পরাভূত করতে পারবে, তারাই বিজয়ী ঘোষিত হবে। হৃদয় ও মন যদি আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকে, নিয়মিত যদি দুআ, যিকির পাঠ করা হয়, ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় এবং পূর্ণ মনোযোগে বিরদ পাঠ করে, তাহলে জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে এটাই হবে জادুটোনার প্রভাব দূর করার সর্বোৎকৃষ্ট ও শক্তিশালী উপায় এবং আক্রান্ত হওয়ার পরে এটাই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিকার ব্যবস্থা। জادুকররা জানে যে, তাদের জادুটোনার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব একমাত্র তাদের ওপরই পড়তে সক্ষম যাদের হৃদয় দুর্বল এবং যারা সহজেই প্রভাবিত হয়, যারা নিজ ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যারা সবসময় তুচ্ছ ও সামান্য বিষয় নিয়ে মেতে থাকেন। এ কারণেই যারা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাদের অধিকাংশই নারী, শিশু, অজ্ঞ ব্যক্তিগণ এবং যারা দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন অথবা আল্লাহ ও তাওহীদের প্রতি যাদের বিশ্বাস দুর্বল তারা আক্রান্ত হন এবং যারা নিয়মিত যিকির, কুরআনের আয়াত ও দুআ পাঠ করেন না তারাও। শেষকথা, জادুটোনার কুপপ্রভাবে তারাই আক্রান্ত হন, যারা দুর্বল, সহজেই প্রভাবিত হন এবং সর্বসময়ে তুচ্ছ বিষয় নিয়েই মেতে থাকেন।
তারা বলেন: ভিকটিম নিজেই জادুটোনার আক্রমণের সুযোগ করে দেন, কারণ আমরা জানি, কোনো মানুষ যে বিষয়ের ওপর বেশি মনোযোগ দেয়, সেটির প্রতিই তার মন লেগে থাকে। সুতরাং, ব্যক্তির ঝোঁক যে দিকে, সেই দিকের তাড়নাতেই সে তার মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেসব আত্মা পরাভূত হতে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকে, শয়তানের আত্মা কেবল সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কারণ তাদের হৃদয়সমূহ ইতোমধ্যেই এমন কিছুর দিকে ঝুঁকে গেছে যা মন্দ আহ্বানদের কার্যসাধনে খুবই সহায়ক, তারা সহজেই শয়তান ও বদ জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায়। এর কারণ হলো এসব মানুষের মধ্যে কোনো আত্মিক শক্তি নেই, তারা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত নয়। সুতরাং আপনি খেয়াল করে দেখবেন, এসব মানুষের হৃদয় অন্তঃসারশূন্য, মনে কোনো শক্তি নেই, সংগ্রাম করার ক্ষমতা নেই, তাদের মন আগেই থেকেই এমন কিছুর দিকে ঝুঁকে থাকে, যার কারণে জিনেরা সহজেই তাদেরকে পরাভূত করে এবং জادুকররা জادুটোনা করে।
ইমাম আহমাদ ও আত-তিরমিযী আল হারিস আল আশআরী থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন, এ হাদীসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন: “....আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ দিচ্ছি, কারণ আল্লাহর যিকির হলো ওই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যাকে শত্রু ধাওয়া করেছে, শক্তি ধাওয়া করেছে, আর সেও বাঁচার জন্য অবশেষে একটি দুর্গের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বাঁচালো। একইভাবে এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর যিকির ব্যতীত অন্য কোনো কিছু দিয়ে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।”
(৩) খালি পেটে আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাওয়া
ইমাম বুখারী (র.) তার সহীহ হাদীস গ্রন্থে আমীর বিন সাদ থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা সাদ (র.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেন: “যে ব্যক্তি সকালে একটি আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, রাত্রি না আসা পর্যন্ত ওই দিনে সে আর কোনো বিষ অথবা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হবে না।” অন্য একজন এ সম্পর্কে বলেন, “সাতটি খেজুর”। আরেক বর্ণনায় এসেছে, “যে ব্যক্তি সকালে সাতটি আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, সে ওই দিনে কোনো বিষ বা জادুটোনা দ্বারা আক্রান্ত হবে না।”
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) কথার প্রতি পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস রেখে নিয়মিত খালি পেটে আওয়াআজ্ব১১২ খেজুর খাবে, তার জন্য এ খেজুর এমন ভাবে কাজ করবে, যেন তাকে জادুটোনার টিকা দেয়া হয়েছে, জادুটোনা অথবা কোনো বিষই তাকে ক্ষতি করতে পারবে না। কিছু আলিম এ খেজুরের একটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন, এটি খুবই গরম এবং এটি রোগ দূর করার জন্য যথেষ্ট, তবে নবী করিম (স.) জادুটোনা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন, ওই খেজুরে হয়তো এমন কোনো উপাদান রয়েছে যা মানুষকে বিষ ও জادুটোনা থেকে সুরক্ষা দান করে। আমরা আল্লাহর রাসূলের (স.) সব কথা বিশ্বাস করি, এমনকি আমরা যদি নাও জানি, সেটি কীভাবে কাজ করে তারপরেও। মদিনার খেজুরের যে বিশেষ গুণাগুণ থাকতে পারে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কিন্তু মদিনার খেজুর যদি পাওয়া না যায় তাহলে ইনশাআল্লাহ যে কোনো খেজুরেই কাজ হবে。
(৪) জادুটোনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো জادুকরের কাছে না যাওয়া
যেহেতু যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তার জন্য কোনো উপকার জادুকরের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না আর যার কোনো সমস্যা নেই, তিনিও তাদের ক্ষতি থেকে নিরাপদ নন। যেসব শয়তান ও বদ জিন জادুকরের সঙ্গে কাজ করে, তারাও বেশ ভালো করেই জানে যে, যেসব মুসলমান জادুকরের দরজায় কড়া নাড়ে, তাদের ঈমান দুর্বল এবং আল্লাহর উপর তাদের কোনো আস্থা নেই, সুতরাং তাদের ক্ষতি করা বা তাদের উপর আছর করা খুবই সহজ।
টিকা:
৯৩. যাদ আল মা'আদ, ৩/১০৫
১১১. আল মুসনাদ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত, ৪০৮/২০২; আত-তিরমিযী: ২৮৬৭, হাদীসটি সহীহ。
১১২. আওয়াআজ্ব: মদিনায় উৎপাদিত এক ধরনের খেজুর (অনুবাদক)
১১৩. ফাতহুল বারী, ১০/২৯৮
📄 জাদুটোনার চিকিৎসা
যদি কেউ জادুটোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে আল্লাহকে ভয় করতে হবে, তাঁর ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং সবকিছু তাঁর দায়িত্বে ছেড়ে দিতে হবে। তিনি ধৈর্যের পথে অটল থেকে ক্রমাগত দোয়া করতে থাকবেন এবং ইসলামী শরীয়াহ নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোন না কোন পথ বের করে দিবেন। আর তাকে রিযুক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।” (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)
শরীয়াহ নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, চিকিৎসার জন্য এমন ব্যক্তির কাছে যেতে হবে যার দ্বীনি প্রতিজ্ঞা ও দয়ার ওপর আস্থা রাখা যায়, যিনি রোগীর জন্য কুরআনের আয়াত দিয়ে রুকইয়া পাঠ করবেন।
প্র্যাকটিশনারকে অবশ্যই নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে:
১- তিনি যে স্থানে বসে চিকিৎসা করাবেন, সেই স্থান থেকে আল্লাহর অবাধ্যতাকারী বা আওয়াজ সৃষ্টিকারী সব বস্তু সরিয়ে ফেলবেন。
২- শুরুতেই রোগীকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, তার কাছে কোনো তাবিয-কবচ আছে কি না অথবা তিনি কোনো জادুকরের কাছে গিয়েছিলেন কি না। যদি তার সঙ্গে কোনো তাবিয কবচ থাকে তবে তা পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং তিনি যদি কোনো জادুকরের কাছে গিয়ে থাকেন তাহলে তাকে বলতে হবে যে, কত বড় ভুল তিনি করেছেন এবং এর প্রভাব কত মারাত্মক হতে পারে, এটা তার আত্মিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর。
৩- তাকে অবশ্যই রোগ নির্ণয় করতে হবে। এর এটা করা হয় রোগীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে। রোগীকে কেমন ধরনের প্রশ্ন করতে হবে সেক্ষেত্রে প্র্যাকটিশনারের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিবাহিত লোকের প্রশ্ন অবিবাহিত থেকে আলাদা হবে। প্রশ্ন নিম্নরূপ হতে পারে:
১. রোগী কী ধরনের যন্ত্রণা ভোগ করছেন
২. এ সমস্যা শুরু হয়েছে কখন
৩. রোগী কি কোনো স্বপ্ন দেখেন, আর দেখলে তা কী ধরনের?
৪. তিনি কি পেটে ব্যথা অনুভব করেন? এ ব্যথার শুরু কখন?
৫. তার কি মাথা ব্যথা আছে অথবা তিনি কি মাথা অথবা দেহে ভারী কিছু অনুভব করেন?
৬. তিনি কি তার বুকে সঙ্কুচতা অনুভব করেন?
রোগ নির্ণয়ের জন্য করা প্রশ্ন ঘটনাক্রমে বিভিন্ন রকম হয়। এসব প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তি করে প্র্যাকটিশনার আরো চিন্তা ভাবনা করে পুনরায় প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন পর্ব শেষে তিনি রোগীর ওপর নিম্নোক্ত রুকিয়া পাঠ করবেন:
১. (সূরা আল ফাতিহা: ১-৭)
২- আয়াতুল কুরসী (বাকারা ২:২৫৫)
৩. (আল-আ'রাফ: ১১৭-১২২)
৪. (সূরা-ইউনূস: আয়াত ৮১-৮২)
৫. (সূরা ত্ব-হা: আয়াত ৬৯)
৬. (সূরা ইখলাস, ফালাক্ব ও নাস)