📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জাদুটোনার অস্তিত্বের প্রমাণ

📄 জাদুটোনার অস্তিত্বের প্রমাণ


১. পবিত্র কুরআন থেকে প্রমাণ
“এবং সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত, মূলত: সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু'জন ফেরেশতা হারুত ও মারুতের উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফেরেশतাদ্বয় কাউকেও (তা) শিখাতো না যে পর্যন্ত না বলত, 'আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না,' এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যদ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করত, মূলত: তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না, বস্তুত: এরা এমন বিদ্যা শিখত, যদ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হত আর এদের কোন উপকার হত না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি এ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না, আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত!” (আল বাকারা ২:১০২)

“তারা যখন নিক্ষেপ করল, তখন মূসা বলল, ‘তোমরা যা নিয়ে এসেছ তাতো যাদু, আল্লাহ এখনই তা ব্যর্থ করে দেবেন, আল্লাহ বিশ্বশৃঙ্খলকারীদের কাজকে সংশোধন করেন না’। আল্লাহ তাঁর বাণীর সাহায্যে প্রকৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেনই, অপরাধীদের কাছে তা যতই অপ্রীতিকর হোক না কেন。” (সূরা ইউনুস ১০:৮১-৮২)

“বল, 'আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকাল বেলার রব-এর, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে, আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট হতে যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এবং (জাদু করার উদ্দেশ্যে) গিরায় ফুঁৎকারকারিনীদের অনিষ্ট হতে, এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে。” (আল ফালাক ১১৩:১-৫)

২. হাদীস থেকে প্রমাণ
আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলকে (ﷺ) বুনা যুরায়ক গোত্রের লাবীদ বিন আল আ'সাম নামক এক ব্যক্তি জাদু টোনা করেছিল। একদিন অথবা এক রাতে—তিনি আমার সঙ্গে ছিলেন—দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন, অতঃপর তিনি বললেন: ‘হে আয়শা আল্লাহ আমাকে আমার নিরাময়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। দু’ জন লোক আমার কাছে আসল; একজন বসল আমার মাথার কাছে, অপর জন বসল পায়ের কাছে। অতঃপর একজন অন্যজনকে বলল, এ লোক আঘাত পাচ্ছেন কিসের দ্বারা? ওই লোকটি বলল: ‘তাকে জাদু টোনা করা হয়েছে’। সে বলল: কে তাকে জাদু টোনা করেছে? ওই লোকটি বলল: লাবিদ বিন আল আ’সাম। সে বলল: কিসের দ্বারা? অপরজন বলল: চুলে জড়ানো একটি চিরুনি এবং পুরুষ খেজুর বৃক্ষের পরাগার বাইরের ত্বক দিয়ে। লোকটি বলল: কোথায় আছে এটা? সে বলল: যারওয়ান নামে এক কূপে। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেলেন, ফিরে এসে বললেন: আয়শা, কূপটির পানি অনেকটা মেহেদি পাতার নির্যাস এর মতো এবং ওই খেজুর গাছটির মাথা শয়তানের মাথার মতো। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি কি ওটা বের করে আনেননি? তিনি বললেন: আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেছেন এবং আমি চাই না মন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ওই কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করার নির্দেশ দিলেন।’ [৭৬]

টিকা:
৭৬. ফাতহুল বারি, ১০/২২২।

১. পবিত্র কুরআন থেকে প্রমাণ
“এবং সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত, মূলত: সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু'জন ফেরেশতা হারুত ও মারুতের উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফেরেশतাদ্বয় কাউকেও (তা) শিখাতো না যে পর্যন্ত না বলত, 'আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না,' এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যদ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করত, মূলত: তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহর বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না, বস্তুত: এরা এমন বিদ্যা শিখত, যদ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হত আর এদের কোন উপকার হত না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি এ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না, আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত!” (আল বাকারা ২:১০২)

“তারা যখন নিক্ষেপ করল, তখন মূসা বলল, ‘তোমরা যা নিয়ে এসেছ তাতো যাদু, আল্লাহ এখনই তা ব্যর্থ করে দেবেন, আল্লাহ বিশ্বশৃঙ্খলকারীদের কাজকে সংশোধন করেন না’। আল্লাহ তাঁর বাণীর সাহায্যে প্রকৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেনই, অপরাধীদের কাছে তা যতই অপ্রীতিকর হোক না কেন。” (সূরা ইউনুস ১০:৮১-৮২)

“বল, 'আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকাল বেলার রব-এর, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে, আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট হতে যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এবং (জাদু করার উদ্দেশ্যে) গিরায় ফুঁৎকারকারিনীদের অনিষ্ট হতে, এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে。” (আল ফালাক ১১৩:১-৫)

২. হাদীস থেকে প্রমাণ
আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলকে (ﷺ) বুনা যুরায়ক গোত্রের লাবীদ বিন আল আ'সাম নামক এক ব্যক্তি জাদু টোনা করেছিল। একদিন অথবা এক রাতে—তিনি আমার সঙ্গে ছিলেন—দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন, অতঃপর তিনি বললেন: ‘হে আয়শা আল্লাহ আমাকে আমার নিরাময়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। দু’ জন লোক আমার কাছে আসল; একজন বসল আমার মাথার কাছে, অপর জন বসল পায়ের কাছে। অতঃপর একজন অন্যজনকে বলল, এ লোক আঘাত পাচ্ছেন কিসের দ্বারা? ওই লোকটি বলল: ‘তাকে জাদু টোনা করা হয়েছে’। সে বলল: কে তাকে জাদু টোনা করেছে? ওই লোকটি বলল: লাবিদ বিন আল আ’সাম। সে বলল: কিসের দ্বারা? অপরজন বলল: চুলে জড়ানো একটি চিরুনি এবং পুরুষ খেজুর বৃক্ষের পরাগার বাইরের ত্বক দিয়ে। লোকটি বলল: কোথায় আছে এটা? সে বলল: যারওয়ান নামে এক কূপে। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেলেন, ফিরে এসে বললেন: আয়শা, কূপটির পানি অনেকটা মেহেদি পাতার নির্যাস এর মতো এবং ওই খেজুর গাছটির মাথা শয়তানের মাথার মতো। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি কি ওটা বের করে আনেননি? তিনি বললেন: আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেছেন এবং আমি চাই না মন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ওই কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করার নির্দেশ দিলেন।’ [৭৬]

টিকা:
৭৬. ফাতহুল বারি, ১০/২২২।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জাদুটোনা প্রসঙ্গে বিখ্যাত আলিমগণের মতামত

📄 জাদুটোনা প্রসঙ্গে বিখ্যাত আলিমগণের মতামত


আল কুরতুবী বলেন: কুরআনের একাধিক আয়াতে এবং রাসূলের (ﷺ) একাধিক হাদীসে জাদু টোনার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, যাকে জাদু টোনা করা হয় তার উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। যারা এটা অস্বীকার করবে তারা কাফির, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের (ﷺ) কথাকে অবিশ্বাস করে এবং সর্বজনবিদিত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। যারা গোপনে এটা অস্বীকার করে, তারা খারেজি। আর যারা প্রকাশ্যে অস্বীকার করবে, তারা ধর্মত্যাগী বলে গণ্য হবে। মানুষের মনে জাদু টোনার বিশাল প্রভাব রয়েছে, এ প্রভাবের মাধ্যমে এটি মানুষের মনে ভালোবাসা ও ঘৃণা তৈরি করে, খারাপ চিন্তার খোরাক এনে দেয়, একপর্যায়ে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে মানসিক জটিলতা, শারীরিক ব্যথা ও অসুস্থতা তৈরি করে। জাদু টোনার এ প্রভাব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এর সবকিছুই মানুষের বাস্তব জীবনে ঘটে এবং একে অস্বীকার করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। [১১]

ইবনে কাসীর বলেন: জাদু টোনার বিষয়টি সত্য। এবং আল্লাহ তা'আলা যে কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারেন, তিনি যখনই এর ইচ্ছা করেন তখনই তা সংঘটিত হয়ে যায়। তবে তার এ মতামত মু'তাযিলাহ এবং শাফেয়ীদের মধ্যে আবু ইসহাক আল ইসফারাইনির মতামতের বিপরীত। তারা এ জাদু টোনাকে দৃষ্টিবিভ্রম ও কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি বলেন: কিছু জাদু হলো হাতের ভেল্কিবাজি, আর কিছু আছে মন্ত্র যা মুখস্থ করা যায় এবং আছে আল্লাহর নামসমূহ দিয়ে গঠিত রুকিয়া। এ জাদু শয়তান বা মন্দ লোকের কাছ থেকে শেখা যায় এবং এটা মেডিসিন ও ধূঁপও হতে পারে।

イবনে কুদামা বলেন: জাদু হলো একটি বাস্তব বিষয়; কিছু জাদু হত্যাকাণ্ড করতে পারে, আবার কিছু জাদু মানুষের অসুস্থতা তৈরি করে, আবার কিছু জাদু একজন স্বামীকে তার স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা করে দেয় এবং তাদের মধ্যে সহবাসে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। [১২]

টিকা:
১১. শরহ আল্লা কুরতুবি আলা সহিহ মুসলিম, ৬/৬
১২. আল মুগনি, ১০/১০৯

আল কুরতুবী বলেন: কুরআনের একাধিক আয়াতে এবং রাসূলের (ﷺ) একাধিক হাদীসে জাদু টোনার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, যাকে জাদু টোনা করা হয় তার উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। যারা এটা অস্বীকার করবে তারা কাফির, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের (ﷺ) কথাকে অবিশ্বাস করে এবং সর্বজনবিদিত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। যারা গোপনে এটা অস্বীকার করে, তারা খারেজি। আর যারা প্রকাশ্যে অস্বীকার করবে, তারা ধর্মত্যাগী বলে গণ্য হবে। মানুষের মনে জাদু টোনার বিশাল প্রভাব রয়েছে, এ প্রভাবের মাধ্যমে এটি মানুষের মনে ভালোবাসা ও ঘৃণা তৈরি করে, খারাপ চিন্তার খোরাক এনে দেয়, একপর্যায়ে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে মানসিক জটিলতা, শারীরিক ব্যথা ও অসুস্থতা তৈরি করে। জাদু টোনার এ প্রভাব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এর সবকিছুই মানুষের বাস্তব জীবনে ঘটে এবং একে অস্বীকার করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। [১১]

ইবনে কাসীর বলেন: জাদু টোনার বিষয়টি সত্য। এবং আল্লাহ তা'আলা যে কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারেন, তিনি যখনই এর ইচ্ছা করেন তখনই তা সংঘটিত হয়ে যায়। তবে তার এ মতামত মু'তাযিলাহ এবং শাফেয়ীদের মধ্যে আবু ইসহাক আল ইসফারাইনির মতামতের বিপরীত। তারা এ জাদু টোনাকে দৃষ্টিবিভ্রম ও কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তিনি বলেন: কিছু জাদু হলো হাতের ভেল্কিবাজি, আর কিছু আছে মন্ত্র যা মুখস্থ করা যায় এবং আছে আল্লাহর নামসমূহ দিয়ে গঠিত রুকিয়া। এ জাদু শয়তান বা মন্দ লোকের কাছ থেকে শেখা যায় এবং এটা মেডিসিন ও ধূঁপও হতে পারে।

イবনে কুদামা বলেন: জাদু হলো একটি বাস্তব বিষয়; কিছু জাদু হত্যাকাণ্ড করতে পারে, আবার কিছু জাদু মানুষের অসুস্থতা তৈরি করে, আবার কিছু জাদু একজন স্বামীকে তার স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা করে দেয় এবং তাদের মধ্যে সহবাসে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। [১২]

টিকা:
১১. শরহ আল্লা কুরতুবি আলা সহিহ মুসলিম, ৬/৬
১২. আল মুগনি, ১০/১০৯

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জাদুটোনার প্রকারভেদ

📄 জাদুটোনার প্রকারভেদ


প্রখ্যাত আলেমগণ কয়েক ধরনের জাদু টোনার তালিকা করেছেন। আবু আবদুল্লাহ ফখর আল রাযী আট ধরনের জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে খালদুন তার আল মুকদ্দিমা-তে কয়েক ধরনের জাদুর কথা লিখেছেন এবং আল রাগিব চার ধরনের জাদুর কথা বর্ণনা করেছেন, যা ইবনে হাজার তার আল ফাতহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এসব প্রকারভেদ ও শ্রেণিবিন্যাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে বলা যেতে পারে যে, জাদু আসলে এক ধরনের। এটাই সত্যিকারের জাদু এবং এ জাদুর চর্চার জন্য মানুষ জিন ও শয়তানের উপর নির্ভর করে। এ একধরনের জাদুর আবার কয়েক ধরনের রূপ রয়েছে। আর সাধারণ মানুষ যাকে জাদু বলে জানে, তা জাদুকরের হাতের কৌশল ব্যতীত আর কিছুই নয়।

প্রখ্যাত আলেমগণ কয়েক ধরনের জাদু টোনার তালিকা করেছেন। আবু আবদুল্লাহ ফখর আল রাযী আট ধরনের জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে খালদুন তার আল মুকদ্দিমা-তে কয়েক ধরনের জাদুর কথা লিখেছেন এবং আল রাগিব চার ধরনের জাদুর কথা বর্ণনা করেছেন, যা ইবনে হাজার তার আল ফাতহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এসব প্রকারভেদ ও শ্রেণিবিন্যাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে বলা যেতে পারে যে, জাদু আসলে এক ধরনের। এটাই সত্যিকারের জাদু এবং এ জাদুর চর্চার জন্য মানুষ জিন ও শয়তানের উপর নির্ভর করে। এ একধরনের জাদুর আবার কয়েক ধরনের রূপ রয়েছে। আর সাধারণ মানুষ যাকে জাদু বলে জানে, তা জাদুকরের হাতের কৌশল ব্যতীত আর কিছুই নয়।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 গ্রহ ও নক্ষত্রের জাদু

📄 গ্রহ ও নক্ষত্রের জাদু


যারা এ ধরনের জাদুর অনুশীলন করেন তারা মূলত আসমানের সাতটি জিনিসের উপাসনা করেন, সেগুলো হলো—সূর্য, চন্দ্র, শনি, জুপিটার, মঙ্গল, ভেনাস ও মারকারি। তারা প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পোশাক পরিধান করেন, নির্দিষ্ট দিনে উপবাস করেন, মাথা মুড়ান এবং ধূপ জ্বালান। অতঃপর তারা চাঁদের দিকে তাকিয়ে একে সম্বোধন করেন নতো: মঙ্গলের গ্রহ-তারকা আকাঙ্ক্ষাগুলোকে একত্রিত হতে আহবান জানান—একরকমটাই তারা দাবি করেন。

প্রাচীনকালে এসব জ্যোতিষীর ঘরে যদি কোনো সন্তান আসত তাহলে তারা প্রথমেই সন্তানের মাঝে জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় চিহ্ন তালাশ করত এবং এ চিহ্ন অনুসারেই তাদের নামকরণ করত এবং তারা দাবি করত এ চিহ্ন তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎও নির্দেশ করছে। আর আমাদের সময়ে আমরা বিভিন্ন পত্রিকায় জ্যোতির্বিদদের লেখা দেখতে পাই। ‘আপনার তারকা বা আপনার রাশি’ એ শিরোনামে তারা মানুষকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। তারা বলেন, একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কোনো সন্তান জন্ম নিলে তার রাশি হবে কর্কট, আর অন্য কোনো তারিখে জন্ম নিলে তার রাশি হবে তুলা; আবার কর্কটের মধ্যে যদি চন্দ্র আরোহণ করে তাহলে তারা বলেন, এ রাশির লোকজন ভ্রমণে বের হতে পারেন অথবা ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন, অথবা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর চন্দ্র যদি তুলার রাশিতে অবতরণ করে, তাহলে তারা এর উল্টো করার পরামর্শ দেন। এগুলো সবই ফটকাবাজি, আর এটাই হলো জ্যোতির্বিদ্যা。

জ্যোতির্বিদ্যাও এক ধরনের জাদুটোনা ও গণকী, কারণ আকাশের গ্রহ-তারকা আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু, তাই এসবের অন্যান্য সৃষ্টি জিনিসের ওপর কোনো প্রভাব নেই; এরা কোনো সুখ বা দুঃখ আনতে পারে না অথবা আনতে পারে না জীবন ও মৃত্যু। গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র সবই আল্লাহর নিদর্শন, যা তারই মহিমা ও গৌরবের সাক্ষ্য দান করে এবং তাঁকেই সিজদা করে এবং তারই হুকুমের অধীন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তুমি কি দেখ না যে আল্লাহকে সেজদা করে যারা আকাশে আছে, আর যারা পৃথিবীতে আছে আর সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতসমূহ, বৃক্ষরাজি, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকে?” (আল-হজ্জ ২২:১৮)

“তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন, তারা অনুগত হয়ে নিজ পথে চলছে। আর তিনি রাত ও দিনকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন।” (সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৩)

“সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তারই আজ্ঞাবহ।” (আল-আ'রাফ ৭:৫৪)

“আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন যা আছে আকাশে আর যা আছে যমীনে সেগুলোর সব কিছুকে।” (আল জাথিয়াহ ৪৫:১৩)

আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাঁর কিতাবে বলে দিয়েছেন, গ্রহ-তারকারাজি হলো নিম্ন আসমানের জন্য সজ্জা, এরা রাতের আঁধারে জমিনে ও সমুদ্রে মানুষকে পথ চলতে সাহায্য করে, আবার এক ধরনের নক্ষত্র রয়েছে যা দিয়ে শয়তানকে আক্রমণ করা হয়, যখন শয়তান আকাশ থেকে খবর চুরির জন্য আড়ি পাতার চেষ্টা করে। এ নক্ষত্রগুলো আকাশে নির্দিষ্ট করে দেওয়া তারকা থেকে আলাদা, এরাও তারকার (নূজুম) নামেই পরিচিত হয়। যেমনভাবে দাব্বাহ শব্দ দ্বারা মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে。

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এটা প্রমাণিত হয়েছে, যায়েদ বিন খালিদ বলেন: আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হুদায়বিয়ার প্রান্তরে আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সে রাতে বৃষ্টি হওয়ার পর তিনি এ ভাষণ দেন, তিনি বলেন: “তোমরা কি জান তোমাদের প্রতিপালক এ রাতে কী বলেছেন?” আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন: “এ প্রত্যুষে আমার কিছু বান্দাহ সত্যিকারের মু'মিন হয়েছে, আর কিছু বান্দাহ অবিশ্বাসী রয়ে গেছে। যারা বলেছে এ বৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর দয়া ও বরকতে, তারা প্রকৃত মু'মিন, তারাই আমাকে বিশ্বাস করে আর তারকারাজিকে অবিশ্বাস করে, আর যারা বলেছে এ বৃষ্টি হয়েছে অমুক তারকার কারণে, তারা আমাকে অবিশ্বাস করে এবং তারকারাজিকে বিশ্বাস করে।” [৭৯]

সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে কোনো বরকত ও রহমত পাঠান আর কিছু লোক এর কারণেই কাফির হয়ে যায়। আল্লাহ যদি বৃষ্টি নামান, তাহলে তারা বলে, এ বৃষ্টি হয়েছে অমুক অমুক তারকার কারণে।”

এখানে মূলকথা হলো, কোনো ঘটনার উপরে অথবা মানুষের সুখ ও দুঃখের উপর এসব গ্রহ-নক্ষত্রের কোনো প্রভাব নেই। তাই এ ধরনের জ্ঞানের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এক ধরনের ফটকাবাজি ও প্রতারণা।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “আমি একবার দামেস্কে জ্যোতির্বিদদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেছিলাম, তখন তাদের কিছু নেতা আমার কাছে এসেছিল, আমি তাদেরকে তাদের কাজের কোথায় কোথায় ভুল তা যুক্তিনির্ভর প্রমাণের আলোকে তুলে ধরলাম, তারাও এ ভুল স্বীকার করে নিল। তাদের নেতা বললেন: আমরা একটি মিথ্যা বলি, তার মধ্যে একটি সত্য হতে পারে। এর কারণ হলো তাদের জ্ঞান ও জানাশোনার ভিত্তি হলো মিথ্যা ধারণা, তারা মনে করে আসমানের গ্রহ-তারা মানুষের জীবনের নানা ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করে। এটা তাদের কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান, কিন্তু এর পাশাপাশি তাদের আক্রান্ত বা প্রভাবিত বস্তু সম্পর্কেও জানা থাকতে হবে। আর সেটা কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব হবে, যখন কোনো একটি ঘটনা ঘটার পেছনের কারণদের সবগুলো দিক উপলব্ধি করা যাবে, যেখানে ফলাফল সবসময়ই নির্দিষ্ট থাকে। এসব লোকদের মধ্যে অধিকাংশই এসব কারণের মাত্র কয়েকটি সম্পর্কে জানে, তারা বাকি কারণগুলো অথবা শর্তাবলি ও প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কিছুই জানে না। এটি ঠিক ওই ব্যক্তির মতো, যিনি জানেন যে, গ্রীষ্মে সূর্য মাথার ওপর থাকে এবং তার তীব্রতা অনেক বেশি থাকে। তার এ জ্ঞান থেকে জানা যায় যে, এ তাপে আঙ্গুর শুকিয়ে কিশমিশে পরিণত হয়। যদিও এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে, তবু এ একটি কারণের ওপর খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে, সূর্য শুধুই মহা অজ্ঞতার নির্দেশক, কারণ আঙ্গুর থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। আঙ্গুর থেকে ফল নাও ধরতে পারে, অথবা ফল ধরলেও তা কিশমিশ হওয়ার আগেই আঙ্গুর হিসেবে খাওয়া হতে পারে অথবা এগুলো দিয়ে জুস বানানো হতে পারে অথবা ক্ষেত থেকে আঙ্গুর চুরি হয়ে যেতে পারে, আবার আঙ্গুর দিয়ে কিশমিশ বানানোও হতে পারে।” [৮০]

এছাড়াও এটাও বলা যেতে পারে, আপনি যদি জ্যোতির্বিদদের মূলনীতির দিকে খেয়াল করেন যে, ভাগ্যবানকে দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যবান, গরমকে ঠান্ডা এবং ঠান্ডাকে গরম, পুরুষকে নারী এবং নারীকে পুরুষ বানানো, এবং আপনিও যদি এ মূলনীতি প্রয়োগ করেন, দেখবেন আপনার ফলাফলও তাদের সমান হবে; কখনো আপনি সঠিক হবেন, আবার কখনো আপনি ভুল করবেন。

ইমাম আলী বিন আবু তালিব (রা.) যখন খাওয়ারিজদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যেতে চাইলেন তখন তার কাছে এক জ্যোতির্বিদ এসে বলল: হে আমীরুল মোমেনীন, আপনি এ সময়ে বের হবেন না, কারণ চন্দ্র এখন বৃশ্চিকের ওপর, আর এ অবস্থায় যদি আপনি যুদ্ধে বের হন, তাহলে আপনার বাহিনী পরাজিত হবে। আলী (রা.) বললেন, আমি আল্লাহর উপর আস্থা রেখে, তাঁর উপর ভরসা করে এবং তুমি যা বলেছ তা প্রত্যাখ্যান করেই তবে যুদ্ধের জন্য বের হব। তিনি জ্যোতিষীর কথা উপেক্ষা করেই বের হলেন এবং তাঁর সেই যাত্রা বরকতময় হলো, তিনি ওই যুদ্ধে অনেক খাওয়াজিকে হত্যা করলেন। যদি কেউ বিশ্বাস করেন যে, অমুক তারা মানুষের জন্য সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য নিয়ে আসছে, তাহলে তার এ বিশ্বাস কুফরিও এবং তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর পরিবর্তে এ তারকাটি তার জীবনের ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে তিনি কাফির হয়ে যাবেন। এছাড়াও তিনি যদি ওই তারকাটির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন, এর উপাসনা করেন তাহলে তার এ কর্ম কুফরি এবং খাঁটি শিরক। যারা গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থান, তাদের গুণাগুণ, আকার ও গতিবিধি নির্ণয় করা এবং দিন, মাস ও বছর হিসাব করার জন্য জ্যোতির্বিদ্যাকে ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে বলতে হবে, এটা মূলত যুক্তিহীনতার জ্ঞান। তবে এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন。

টিকা:
৭৯. [বুখারী ১০০৮, মুসলিম ৭১]
৮০. মাজমুয়া ফাতাওয়া, ৩৫/১৭২-১৭Check3

যারা এ ধরনের জাদুর অনুশীলন করেন তারা মূলত আসমানের সাতটি জিনিসের উপাসনা করেন, সেগুলো হলো—সূর্য, চন্দ্র, শনি, জুপিটার, মঙ্গল, ভেনাস ও মারকারি। তারা প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পোশাক পরিধান করেন, নির্দিষ্ট দিনে উপবাস করেন, মাথা মুড়ান এবং ধূপ জ্বালান। অতঃপর তারা চাঁদের দিকে তাকিয়ে একে সম্বোধন করেন নতো: মঙ্গলের গ্রহ-তারকা আকাঙ্ক্ষাগুলোকে একত্রিত হতে আহবান জানান—একরকমটাই তারা দাবি করেন。

প্রাচীনকালে এসব জ্যোতিষীর ঘরে যদি কোনো সন্তান আসত তাহলে তারা প্রথমেই সন্তানের মাঝে জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় চিহ্ন তালাশ করত এবং এ চিহ্ন অনুসারেই তাদের নামকরণ করত এবং তারা দাবি করত এ চিহ্ন তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎও নির্দেশ করছে। আর আমাদের সময়ে আমরা বিভিন্ন পত্রিকায় জ্যোতির্বিদদের লেখা দেখতে পাই। ‘আপনার তারকা বা আপনার রাশি’ એ শিরোনামে তারা মানুষকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। তারা বলেন, একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কোনো সন্তান জন্ম নিলে তার রাশি হবে কর্কট, আর অন্য কোনো তারিখে জন্ম নিলে তার রাশি হবে তুলা; আবার কর্কটের মধ্যে যদি চন্দ্র আরোহণ করে তাহলে তারা বলেন, এ রাশির লোকজন ভ্রমণে বের হতে পারেন অথবা ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন, অথবা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর চন্দ্র যদি তুলার রাশিতে অবতরণ করে, তাহলে তারা এর উল্টো করার পরামর্শ দেন। এগুলো সবই ফটকাবাজি, আর এটাই হলো জ্যোতির্বিদ্যা。

জ্যোতির্বিদ্যাও এক ধরনের জাদুটোনা ও গণকী, কারণ আকাশের গ্রহ-তারকা আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু, তাই এসবের অন্যান্য সৃষ্টি জিনিসের ওপর কোনো প্রভাব নেই; এরা কোনো সুখ বা দুঃখ আনতে পারে না অথবা আনতে পারে না জীবন ও মৃত্যু। গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র সবই আল্লাহর নিদর্শন, যা তারই মহিমা ও গৌরবের সাক্ষ্য দান করে এবং তাঁকেই সিজদা করে এবং তারই হুকুমের অধীন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: “তুমি কি দেখ না যে আল্লাহকে সেজদা করে যারা আকাশে আছে, আর যারা পৃথিবীতে আছে আর সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতসমূহ, বৃক্ষরাজি, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকে?” (আল-হজ্জ ২২:১৮)

“তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন, তারা অনুগত হয়ে নিজ পথে চলছে। আর তিনি রাত ও দিনকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন।” (সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৩)

“সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তারই আজ্ঞাবহ।” (আল-আ'রাফ ৭:৫৪)

“আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন যা আছে আকাশে আর যা আছে যমীনে সেগুলোর সব কিছুকে।” (আল জাথিয়াহ ৪৫:১৩)

আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাঁর কিতাবে বলে দিয়েছেন, গ্রহ-তারকারাজি হলো নিম্ন আসমানের জন্য সজ্জা, এরা রাতের আঁধারে জমিনে ও সমুদ্রে মানুষকে পথ চলতে সাহায্য করে, আবার এক ধরনের নক্ষত্র রয়েছে যা দিয়ে শয়তানকে আক্রমণ করা হয়, যখন শয়তান আকাশ থেকে খবর চুরির জন্য আড়ি পাতার চেষ্টা করে। এ নক্ষত্রগুলো আকাশে নির্দিষ্ট করে দেওয়া তারকা থেকে আলাদা, এরাও তারকার (নূজুম) নামেই পরিচিত হয়। যেমনভাবে দাব্বাহ শব্দ দ্বারা মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে。

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এটা প্রমাণিত হয়েছে, যায়েদ বিন খালিদ বলেন: আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হুদায়বিয়ার প্রান্তরে আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সে রাতে বৃষ্টি হওয়ার পর তিনি এ ভাষণ দেন, তিনি বলেন: “তোমরা কি জান তোমাদের প্রতিপালক এ রাতে কী বলেছেন?” আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন: “এ প্রত্যুষে আমার কিছু বান্দাহ সত্যিকারের মু'মিন হয়েছে, আর কিছু বান্দাহ অবিশ্বাসী রয়ে গেছে। যারা বলেছে এ বৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর দয়া ও বরকতে, তারা প্রকৃত মু'মিন, তারাই আমাকে বিশ্বাস করে আর তারকারাজিকে অবিশ্বাস করে, আর যারা বলেছে এ বৃষ্টি হয়েছে অমুক তারকার কারণে, তারা আমাকে অবিশ্বাস করে এবং তারকারাজিকে বিশ্বাস করে।” [৭৯]

সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে কোনো বরকত ও রহমত পাঠান আর কিছু লোক এর কারণেই কাফির হয়ে যায়। আল্লাহ যদি বৃষ্টি নামান, তাহলে তারা বলে, এ বৃষ্টি হয়েছে অমুক অমুক তারকার কারণে।”

এখানে মূলকথা হলো, কোনো ঘটনার উপরে অথবা মানুষের সুখ ও দুঃখের উপর এসব গ্রহ-নক্ষত্রের কোনো প্রভাব নেই। তাই এ ধরনের জ্ঞানের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এক ধরনের ফটকাবাজি ও প্রতারণা।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “আমি একবার দামেস্কে জ্যোতির্বিদদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেছিলাম, তখন তাদের কিছু নেতা আমার কাছে এসেছিল, আমি তাদেরকে তাদের কাজের কোথায় কোথায় ভুল তা যুক্তিনির্ভর প্রমাণের আলোকে তুলে ধরলাম, তারাও এ ভুল স্বীকার করে নিল। তাদের নেতা বললেন: আমরা একটি মিথ্যা বলি, তার মধ্যে একটি সত্য হতে পারে। এর কারণ হলো তাদের জ্ঞান ও জানাশোনার ভিত্তি হলো মিথ্যা ধারণা, তারা মনে করে আসমানের গ্রহ-তারা মানুষের জীবনের নানা ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করে। এটা তাদের কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান, কিন্তু এর পাশাপাশি তাদের আক্রান্ত বা প্রভাবিত বস্তু সম্পর্কেও জানা থাকতে হবে। আর সেটা কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব হবে, যখন কোনো একটি ঘটনা ঘটার পেছনের কারণদের সবগুলো দিক উপলব্ধি করা যাবে, যেখানে ফলাফল সবসময়ই নির্দিষ্ট থাকে। এসব লোকদের মধ্যে অধিকাংশই এসব কারণের মাত্র কয়েকটি সম্পর্কে জানে, তারা বাকি কারণগুলো অথবা শর্তাবলি ও প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কিছুই জানে না। এটি ঠিক ওই ব্যক্তির মতো, যিনি জানেন যে, গ্রীষ্মে সূর্য মাথার ওপর থাকে এবং তার তীব্রতা অনেক বেশি থাকে। তার এ জ্ঞান থেকে জানা যায় যে, এ তাপে আঙ্গুর শুকিয়ে কিশমিশে পরিণত হয়। যদিও এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে, তবু এ একটি কারণের ওপর খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে, সূর্য শুধুই মহা অজ্ঞতার নির্দেশক, কারণ আঙ্গুর থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। আঙ্গুর থেকে ফল নাও ধরতে পারে, অথবা ফল ধরলেও তা কিশমিশ হওয়ার আগেই আঙ্গুর হিসেবে খাওয়া হতে পারে অথবা এগুলো দিয়ে জুস বানানো হতে পারে অথবা ক্ষেত থেকে আঙ্গুর চুরি হয়ে যেতে পারে, আবার আঙ্গুর দিয়ে কিশমিশ বানানোও হতে পারে।” [৮০]

এছাড়াও এটাও বলা যেতে পারে, আপনি যদি জ্যোতির্বিদদের মূলনীতির দিকে খেয়াল করেন যে, ভাগ্যবানকে দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যবান, গরমকে ঠান্ডা এবং ঠান্ডাকে গরম, পুরুষকে নারী এবং নারীকে পুরুষ বানানো, এবং আপনিও যদি এ মূলনীতি প্রয়োগ করেন, দেখবেন আপনার ফলাফলও তাদের সমান হবে; কখনো আপনি সঠিক হবেন, আবার কখনো আপনি ভুল করবেন。

ইমাম আলী বিন আবু তালিব (রা.) যখন খাওয়ারিজদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যেতে চাইলেন তখন তার কাছে এক জ্যোতির্বিদ এসে বলল: হে আমীরুল মোমেনীন, আপনি এ সময়ে বের হবেন না, কারণ চন্দ্র এখন বৃশ্চিকের ওপর, আর এ অবস্থায় যদি আপনি যুদ্ধে বের হন, তাহলে আপনার বাহিনী পরাজিত হবে। আলী (রা.) বললেন, আমি আল্লাহর উপর আস্থা রেখে, তাঁর উপর ভরসা করে এবং তুমি যা বলেছ তা প্রত্যাখ্যান করেই তবে যুদ্ধের জন্য বের হব। তিনি জ্যোতিষীর কথা উপেক্ষা করেই বের হলেন এবং তাঁর সেই যাত্রা বরকতময় হলো, তিনি ওই যুদ্ধে অনেক খাওয়াজিকে হত্যা করলেন। যদি কেউ বিশ্বাস করেন যে, অমুক তারা মানুষের জন্য সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য নিয়ে আসছে, তাহলে তার এ বিশ্বাস কুফরিও এবং তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর পরিবর্তে এ তারকাটি তার জীবনের ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে তিনি কাফির হয়ে যাবেন। এছাড়াও তিনি যদি ওই তারকাটির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন, এর উপাসনা করেন তাহলে তার এ কর্ম কুফরি এবং খাঁটি শিরক। যারা গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থান, তাদের গুণাগুণ, আকার ও গতিবিধি নির্ণয় করা এবং দিন, মাস ও বছর হিসাব করার জন্য জ্যোতির্বিদ্যাকে ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে বলতে হবে, এটা মূলত যুক্তিহীনতার জ্ঞান। তবে এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন。

টিকা:
৭৯. [বুখারী ১০০৮, মুসলিম ৭১]
৮০. মাজমুয়া ফাতাওয়া, ৩৫/১৭২-১৭Check3

ফন্ট সাইজ
15px
17px