📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জিন যদি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এবং আবার ফিরে আসে, তাহলে যে যে আয়াত পাঠ করতে হবে

📄 জিন যদি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এবং আবার ফিরে আসে, তাহলে যে যে আয়াত পাঠ করতে হবে


যদি জিন তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে আবার ফিরে আসে, তবে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পাঠ করা ফলপ্রসূ হবে:

'এবং আমি তোমার নিকট সুস্পষ্ট আয়াত নাজিল করেছি, ফাসিকরা ছাড়া অন্য কেউ তা অস্বীকার করে না। এটা কি নয় যে তারা যখনই কোনো অঙ্গীকার করে, তখনই তাদের কোনো না কোনো দল সেই অঙ্গীকারকে বর্জন করে? বরং তাদের অধিকাংশই ঈমান আনে না। আর যখন তাদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে এমন একজন রসূল আসলেন যিনি তাদের নিকট যা আছে তার সত্যায়নকারী, তখন আহলে কিতাবদের একদল আল্লাহর কিতাবকে তাদের পিঠের পেছনে ফেলে দিল, যেন তারা কিছুই জানে না।' (সূরা আল বাকারা ২:৯৯-১০১)

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জিন ও মানুষের ভালোবাসার চিকিৎসা

📄 জিন ও মানুষের ভালোবাসার চিকিৎসা


প্রথমে সূরা ফাতিহা, বাকারা, ইউসুফ, নূর, আস-সাফ্ফাত, আল ইখলাস, ফালাক ও নাস রেকর্ড করতে হবে। রোগী এ সূরাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং কুরআন পাঠ করা হয়েছে এমন পানি পান করবেন এবং শরীরে যয়তুন তেল মালিশ করবেন, নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত এভাবে করতে থাকবেন। অতঃপর সকাল-সন্ধ্যা শরীরের সামনের ও পেছনের দ্বারে কস্তুরি দিয়ে মালিশ করতে হবে।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জিনের ক্ষতি এড়ানো এবং শয়তান থেকে রক্ষার দশটি উপায়

📄 জিনের ক্ষতি এড়ানো এবং শয়তান থেকে রক্ষার দশটি উপায়


১. শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।
২. সূরা ফালাক্ব ও নাস তেলাওয়াত করা, কারণ বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ দুটি সূরা নাযিল না হওয়া পর্যন্ত জিনের ক্ষতি ও মানুষের কুনজর থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন。
৩. আয়াতুল কুরসী তেলাওয়াত করা।
৪. সূরা বাকারা তেলাওয়াত করা।
৫. সূরা বাকারার শেষ দু' আয়াত তেলাওয়াত করা।
৬. সূরা গাফিরের প্রথম অংশ তেলাওয়াত করা।
৭. বার বার নিম্নোক্ত দুয়া পাঠ করা: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আ'লা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।’
৮. বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা, বিভিন্ন অবস্থায় আযকার পাঠ করা, যেভাবে এ বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯. অযু করা ও সালাত আদায় করা。
১০. অপ্রয়োজনীয় তাকানো, কথা বলা, খাওয়া এবং মানুষের সঙ্গে মেশা থেকে বিরত থাকা, কারণ এ চারটি বিষয় অমান্য করলে মানুষের আধ্যাত্মিকতা দুর্বল হয়ে যায় এবং এ অবস্থায় জিন বা শয়তানের তার উপর ক্ষমতা অর্জন করা সহজ হয়ে যায়।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 চিকিৎসা পদ্ধতির সংশোধন

📄 চিকিৎসা পদ্ধতির সংশোধন


মানুষ মহিমান্বিত আল কুরআনের মাধ্যমে অসুস্থতার চিকিৎসা বিষয়ে আলোচনা করছে, আর যারা এ চিকিৎসা পদ্ধতির অনুশীলন করছেন তারা এর প্রশংসা ও সমালোচনা উভয়টাই করছেন। নিম্নোক্ত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই এ প্রশংসা ও সমালোচনা আবর্তিত হয়:
১- এ বিষয়ের উপর লিখিত বইসমূহ
২- এ পদ্ধতির কিছু প্রাকটিশনার দ্বারা সংঘটিত ভুল এবং তারা এ চিকিৎসা পদ্ধতিকে যেভাবে অতিরঞ্জিত করেছেন。

সতর্কতার জন্য এসব মন্তব্য ও ভুল থেকে কিছু যদি আমরা উল্লেখ করি, তাহলে আমরা বলব যে, তাদের মধ্যে কিছু লোক আমাদের ঈমানি ভাই-তাদের কাছ থেকে অনেক লোক উপকার লাভ করেছেন-ইসলাম ও এর আক্বীদাহ রক্ষায় তারা গ্যাপ পূরণ করেছেন। তারা ভণ্ড বৈদ্য-কবিরাজ, মিথ্যাবাদী ও গণকদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন, এদের ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক করেছেন, তারা লুপ্ত প্রায় সুন্নাহকে পুনर्जাগরিত করেছেন, পুনর্জীবন দান করেছেন। তাদের কর্ম মূলত দুটি অপরিহার্য শর্তের ওপর। একটি হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে গ্রহণযোগ্যতা অর্থাৎ আন্তরিকতা, অন্যটি হলো সুন্নাহ অনুসরণ করা। কারণ নিয়ত বা উদ্দেশ্য যদি আন্তরিক না হয় তাহলে তাদের কর্ম হয়ে যাবে লোক দেখানো এবং শিরক, আর কেউ যদি সঠিকভাবে সুন্নাহ অনুসরণ না করেন তাহলে তিনি নিমজ্জিত হবেন পাপ ও বিদয়াতে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ তাদেরকে আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি (জিনের) পীড়ন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সঠিক পথ অনুসরণ করবেন, ঠিক যেভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে করবেন; তাহলে তিনি তাদের সঙ্গে ভুল বা অনৈতিক কিছু করবেন না, বরং তিনি যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে তাকে সহায়তা করার মাধ্যমে, অভাবীকে সাহায্য করা এবং যন্ত্রণায় কাতর ব্যক্তির যন্ত্রণা লাঘব করার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেরই (ﷺ) আনুগত্য করেছেন, আর এ কাজটি তিনি করেছেন ইসলামে নির্দেশিত উপায়ে, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্ব (শিরক) নেই, যে পদ্ধতিতে কারো সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয় না।

“এ ধরনের একজন মানুষ কখনো জিন দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না, এর কারণ হলো, হয় জিন জানে যে এ ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ ও সৎ অথবা জিনরা এ ব্যক্তির কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। কিন্তু জিন যদি ইফরিত হয় এবং ওই ব্যক্তি যদি দুর্বল হয় তাহলে তারা ক্ষতি করতে পারবে। সেক্ষেত্রে এ দুর্বল ব্যক্তি নির্দিষ্ট কিছু আয়াত যেমন-আয়াতুল কুরসী, আল মু'আফফিয়াত (সূরা নাস ও ফালাক) ও নির্দিষ্ট কিছু দোয়া তেলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে নিজের সুরক্ষার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারেন। এছাড়াও ঈমান বৃদ্ধিকারী কিছু আয়াতও তেলাওয়াত করতে পারেন এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবেন, যেগুলোর কারণে জিনেরা মানুষের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করার সুযোগ পায়। কারণ তিনি এমন আল্লাহর পথে সংগ্রামরত, আর এটাই হলো সর্বোৎকৃষ্ট জিহাদ।” [৬৮]

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সংখ্যা অনেক বেশি-আল্লাহ এদের সংখ্যা কমিয়ে দিক-তাদের উদ্দেশ্য ও অভিসন্ধি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা শরমের পর্দা সরিয়ে ফেলেছে এবং কপট বেশের মুখোশ-পোশাক পরিধান করেছে। তারা প্রচুর সংখ্যক প্রতিকারের বই প্রকাশ অথবা চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে এ সুন্নাহকে পরিণত করেছে অশালীন বাণিজ্যে。

এ বিষয়ের উপর আমরা কত বই দেখেছি, একটার পর একটা প্রকাশিত হচ্ছে, এসবের অধিকাংশই এখান থেকে সেখান থেকে সংগ্রহ করা উদ্ধৃতির সংকলন মাত্র। যারা এসব বই লেখেন তাদের এ বিষয়ে কোনো জ্ঞানই নেই, তারা এর মাধ্যমে নিজেদের কৃতিত্বই জাহির করতে চান। তাই তারা আরেকজনের লেখা চুরি করেন, আরেকজনের প্রচেষ্টাকে অর্থের বিনিময়ে কিনে নেন এবং বই তৈরি করেন। যে বইয়ের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় লেখা থাকে, অমুক কর্তৃক রচিত, তিনি অমুকের ছেলে ইত্যাদি, আসলে তার এ সম্পর্কিত কোনো জ্ঞানই নেই। তাদের বইগুলো ভুল তথ্যে বা বর্ণনায় পরিপূর্ণ থাকে, শরীয়াহ বিরোধী ছবি ও বিষয় দিয়ে বই তৈরি করা হয়। আবার এসব বই পড়েছি আর এত এত এ সম্পর্কে শুনেছি যে, তার পুনরাবৃত্তি করা এখন দুঃসাধ্য মনে হয়। এসব কপটরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলি দিয়ে বই রচনা করেন, আর দাবি করে বসেন, এ গ্রন্থ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, পাশাপাশি এর ভিত্তি সম্পর্কেও বড় বড় দাবি করে বসেন। পরবর্তীতে দেখা যায় কপটদের রচিত এসব বই লোকজ গল্পের প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়, অথচ দেখে মনে হবে পাঠকরা এমন কিছু বই পড়েছেন, যেগুলো জ্ঞানে পরিপূর্ণ।

অন্যান্য দিকে এতে করে বিদ্বান ব্যক্তিরা খুব হতাশ, কারণ এ কপটতার মাধ্যমে ফিতনার দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আমাদের সম্মানিত শায়খ বকর বিন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ সুন্দর বাচনভঙ্গীতে এসব প্র্যাকটিশনার ও কপট শেখদের কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে:
“আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, কিছু মানুষ জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক, কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা অর্জন করার আগেই বিখ্যাত হতে চান, অর্থাৎ তারা হাঁটতে শেখার আগেই দৌড়াতে চান।” [৫৯]

তাদের রচিত বইসমূহে যেসব অদ্ভুত বিষয় পাওয়া যায় সেগুলো হলো: কাউকে কোনো একটি আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়ার নির্দেশ দেওয়া, যেমন-৩৩৩ বার অথবা ১০০২ বার; রোগীর দেহের উপর কুরআনের আয়াত লেখার নির্দেশ দেওয়া, যেমন রোগীর নাভির নিচে অথবা কপালে লিখতে বলা।

একজনের হাতের তালুতে রেখে কুরআন তেলাওয়াত করা, অতঃপর রোগীকে তার হাতের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখছে কি না তা জিজ্ঞেস করা। তাদের মধ্যে অনেকে আবার জিনের উপস্থিতি আছে কি না তা জানার জন্য রোগীকে পাঁচ মিনিট ধরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ‘বিসমিল্লাহি আউযুবিল্লাহ ওয়া আ’রিরিহি’ পাঠ করতে বলেন।

কিছু লোক আবার বলেন, একটি সাদা কাগজের উপর বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে কুরআনের আয়াত লেখার জন্য, অতঃপর আয়াত লেখা ও কাগজ জিনে আক্রান্ত ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করার পরামর্শ দেন। এর ফলে জিন পালিয়ে যাবে এবং এ বৃত্তের ফাঁদে আটকা পড়বে。

অনেকে বলেন, আপনি যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ের চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই তাকে রক্ষা করতে হবে এ কথা বলে, “পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, হে মেয়ে তোমার সম্মান ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হোক।” এর কারণ হিসেবে তারা বলে থাকেন, জিন যাতে এ মেয়ের যোনীপথ থেকে প্রস্থান করে তার সতী পর্দা ভেঙে না দিতে পারে, সেজন্য তারা এটা করে থাকেন।

তারা আবার অনেক নারী রোগীকে নির্দেশ দেন, তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে, আর প্র্যাকটিশনার তাকিয়ে থাকেন রোগীর দিকে, তারা এ চোখাচোখিকে বলে থাকেন শয়তান তাড়ানোর জন্য “তাকানোর মাধ্যমে রোগ আবিষ্কার” পদ্ধতি।

তাদের মধ্যে অনেকে কুরআন তেলাওয়াত করার সময় রোগীকে হাত উত্তোলন করার নির্দেশ দেন, আর বলেন, রোগীর হাত যদি ডান দিকে নড়ে বা হেলে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে তাকে জিন স্পর্শ করেছে, আর হাত যদি বাম দিকে হেলে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে রোগী বৈদ্য-কবিরাজের যাদুঘটন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।

শায়খ ও জিনদের মধ্যকার দীর্ঘ কথোপকথনও প্রকাশিত হয়েছে, আমি জানি না আসলে কিসের ভিত্তিতে এ ধরনের কথোপকথন প্রকাশ করা হলো, এটা শায়খের কৃতিত্বের প্রচার ব্যতীত কিছু নয়, তিনি যে জিনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সেটা মানুষকে জানানোই এর উদ্দেশ্য। তাদের মধ্যে অনেকে আবার বলেন, জিন ইসলাম গ্রহণ করেছে অথবা জিন তওবা করেছে এবং রোগীর দেহ ত্যাগ করেছে। আমরা অনেক শুনেছি যে, জিনদের রাজা ও রাণী তাদের বিশেষ দেহরক্ষীসহ মুসলিম হয়েছে, আরো শুনেছি নারীর দেহে অবস্থান নেয়া অসংখ্য জিন প্রাকটিশনারের হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং দেহ ত্যাগ করে চলে গেছে, আর প্রস্থান করানোর সময় তাদের মধ্যকার মজার ও মুখরোচক কথোপকথনও আমরা শুনেছি। এরকম আরো অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে, এগুলো আদৌ সত্যি কি না, কারণ এসব কথোপকথন হয়েছে রোগীর ঠোঁটে, আমরা তো জিনকে বা অন্য কাউকে দেখতে পাইনি। এমন হতে পারে যে, এটা এমন এক জিন যে তার কণ্ঠ পরিবর্তন করতে পারে, অথবা এমনও হতে পারে, এ জিন গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়, অর্থাৎ রাজা বা মন্ত্রী নয়; অথবা এমনও হতে পারে যে, রোগীই মানসিকভাবে অসুস্থ।

এসব শায়খরা জিন থেকে প্রতিকারের বিষয়ে যা বর্ণনা করেছেন সে ব্যাপারে বলব, একজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে দ্বিধাগ্রস্ত ও হতাশ করার জন্য এ বর্ণনাই যথেষ্ট। তাদের মধ্যে অনেকে আবার নিজেকে ডাক্তার হিসেবে দাবি করেন এবং বিভিন্ন রোগের জন্য ওষুধের পরামর্শ দেওয়াও শুরু করেছেন, যেমন-বাইল (পাচক রস), অ্যাসাহিটিডা ও “ড্রাগনের রক্ত” [১০]।

অভিজাত-নীচ, জ্ঞানী ও মূর্খ, বিশ্বাসী ও নীতিহীন প্রত্যেকেই এ ক্ষেত্রে জ্ঞান আছে বলে দাবি করেছেন এবং এ বিষয়ে কথাও বলেছেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব উৎস রয়েছে এবং তারা নিজেকে শায়খ হিসেবেও দাবি করেন। কোনো ধরনের জ্ঞান অথবা নির্দেশনা অথবা কোন স্পষ্ট কিতাব হাদিস ছাড়াই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে আল্লাহকে নিয়ে কথা বলার মতো স্পর্ধা দেখান। আর এ অনুমান হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তারা দাবি করেন, রোগীর দেহে কারীন অবস্থান নিয়েছে, এ কারীনই তার ওপর অন্যায় অবিচার করেছে (কিন্তু তাদের এ দাবি নতুন আইডিয়া, এর জন্য স্পষ্ট প্রমাণ দরকার), তারা আরও দাবি করেন যে, এ রোগী যদুটোনার কবলে পড়েছে এবং তার দেহে উম্মুল সুবিয়ান অবস্থান নিয়েছে। আর তাদের সকল প্রচেষ্টা যদি ব্যর্থ হয় এবং জিন কথা না বলে, তাহলে তারা বলতে শুরু করেন যে, এ লোকটির ওপর কারো বদনজর পড়েছে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, তারা অতি দ্রুত রোগ নির্ণয় করে ফেলেন এবং পুরো কাহিনী বোঝার আগেই চিকিৎসা শুরু করে দেন, এমনকি ইসলামের নীতিবান শায়খগণ যেসব আলোচনা থেকে বিরত থাকতেন, তারা দিব্যি সেসব আলোচনা করছেন।

তাদের অনেকেই কুরআনের আয়াতসমূহকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাই আপনি দেখবেন, অনেকেই রোগীকে সমুদ্র তীরে নিয়ে যান এবং রোগীকে সেই পানিতে নিমজ্জিত করে এ আয়াত পাঠ করছেন: “আরকুয বিরিজলিকা হাজা মুগতাসালুন বারাদুও ওয়া শারাব” (আমি তাকে নির্দেশ দিলাম) তুমি তোমার পা দিয়ে যমীনে আঘাত কর, এ তো ঠান্ডা পানি, গোসলের জন্য আর পানের জন্য। (সা’দ ৩৮: ৪২)

আবার অনেককে দেখবেন, রোগীকে আঘাত করছেন আর নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করছেন: “যুক ইন্নাকা আনতাল আযীযুল কারীম” (বলা হবে) গ্রহণ কর স্বাদ-তুমি তো ছিলে ক্ষমতাশালী, সম্মানী। (আল দুখান ৪৪:৪৮)

অনেকে আবার দেখবেন রোগীর গায়ে বরফ শীতল পানি ঢালছেন এবং নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করছেন: “ছুম্মা ছুব্বু ফাওকা রা'সিহি মিন আজাবিল হামীম” (অতঃপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে 'আযাব দাও)। (আল দুখান ৪৪:৪৮)

বর্তমানে সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিরা এসব কপটদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। এটা মুসলিমদের অধিকার যে, তাদের শায়খরা এসব ভণ্ড হাতুড়ে বৈদ্য-কবিরাজদের যুক্তি খণ্ডন করবেন, তাদেরকে অমূলক বলে প্রমাণ করবেন, প্রত্যেক ভুলকারী ও তার ভুল, জ্ঞানী লোকদের ভুল ও বাজে কৌশলকে যুক্তির তরবারিতে খণ্ডন করবেন, যাতে করে এ ধরনের বাতিল ও অনৈতিক অভিলাষ মুসলমানদের সাধারণ চেতনাকে কলুষিত করতে না পারে।

এ ধরনের অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত গল্পের অনুরাগী হওয়া এবং এগুলোর অনুসন্ধান করা খুবই বিপজ্জনক। জ্ঞানী ব্যক্তিরা সবসময়ই সতর্ক করেছেন যে, শয়তান বিদ্বান ব্যক্তিদের ওপরও সওয়ার হতে পারে।
যিয়াদ বিন যাদিরের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে বলেন: “তুমি কি জান, ইসলামের অধঃপতন হবে কিভাবে? আমি বললাম: না। তিনি বললেন: ইসলামের অধঃপতন হবে স্কলার বা আলেমদের ভুলে, বকধার্মিকদের কুরআনকে ভুলের উপর ভিত্তি করে করা যুক্তি-তর্কে এবং বিপথগামী শাসকদের শাসনে।” [১১]

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর একটি অন্যতম প্রশংসনীয় গুণ হলো-কুরআন ও সুন্নাহ, এ উম্মাহর সালাফিদের নির্দেশিত পথে তাদের অটল থাকা। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর লোকেরা যেসব কাজ সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে প্রমাণিত নয় সেগুলোকে বিদায়াত হিসেবে গণ্য করেন, তাদের যুক্তি হলো, এ কাজগুলো যদি ভালোই হতো, তাহলে আমাদের আগেই সাহাবারা এ কাজগুলো করতেন। কারণ তারা ভালোর কোনো বৈশিষ্ট্য তো ছাড়তেনই না, বরং এগুলো করার জন্য তারা তাড়াতাড়ি করতেন। [১২]

সে অনুযায়ী সালাফিগণ রাসুলের (ﷺ) সুন্নাহ-তে নতুন কোনো কিছু সংযোজন ও প্রবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বর্ণিত আছে, আবুদ দারদা (রাঃ) যখন সুন্নাহর মধ্যে নতুন কিছু প্রবর্তন খেয়াল করলেন, যেগুলোর এখনো বিদায়াতের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তিনি বললেন: আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যদি তোমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতেন তাহলে তিনি ও তাঁর সাহাবাগণ যেসব কাজ করেছেন তার মধ্যে থেকে সালাত ব্যতীত তোমাদের আর কোনোটিকেই স্বীকৃতি দিতেন না। আল আওযায়ী বলেন: তিনি যদি আজ উপস্থিত থাকতেন? ঈসা বিন ইউনুস বলেন: আল আওযায়ী যদি আজ আমাদের মাঝে থাকতেন তাহলেই বা কী হতো?

আরও বর্ণিত আছে, উম্মে দারদা বলেন: এরপর আবুদ দারদা রাগান্বিত হয়ে গেলেন এবং আমি বললাম: কী কারণে আপনি রাগান্বিত হলেন? তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ, জামায়াতে সালাত আদায় করা ব্যতীত মহানবী (ﷺ) সম্পর্কিত তাদের আর কোনো বিষয়কেই আমি স্বীকৃতি দেব না。

সাহল বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তার পিতা বলেন: সাহাবারা যেসব কাজ করতেন তার মধ্য থেকে সালাত ব্যতীত তাদের আর কোনোটিকেই আমি স্বীকৃতি দেব না।

মাইমুন বিন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালাফিদের মধ্যে কাউকে যদি তোমাদের মাঝে নিয়ে আসা হতো, তাহলে তারা ক্বিবলাহ ব্যতীত তোমাদের আর কোনো কিছুই মেনে নিতেন না।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তোমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তোমরা যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল এটা ব্যতীত আর কোনো কিছুই স্বীকৃতি দেব না, যেগুলোর সঙ্গে আমি রাসূলের (ﷺ) যুগে পরিচিত ছিলাম। আমরা বললাম: কেন হে আবূ হামজা? তিনি বললেন: তোমরা সালাতকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিলম্বিত কর, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কি এভাবে সালাত আদায় করতেন?

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: প্রাথমিক যুগের কোনো মানুষকে যদি বর্তমান যুগে ফিরিয়ে আনা হতো, তাহলে তিনি ইসলামের কোনো কিছুকেই স্বীকৃতি দিতেন না। এবং তিনি আমার উরুর ওপর আঙুল নির্দেশ করে বললেন: “শুধু এ সালাত ব্যতীত।”

অতঃপর তিনি বলেন: আল্লাহর শপথ, এমন এক ব্যক্তি যিনি সালাফিদের যুগে জন্মলাভ করেননি, তিনি যদি দেখেন নবপ্রবর্তনকারীরা তাদের প্রবর্তনের মাত্রা বাড়িয়েই চলেছেন এবং তারা এ জাগতিক কাজের জন্য নিজের সব সময় ব্যয় করেছেন এবং অন্যদেরকেও তার সঙ্গে এ পথে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, কিন্তু আল্লাহ তাকে এ পথ থেকে রক্ষা করেছেন এবং সত্য পথের অনুসারী সালাফিদের জন্য তার হৃদয়কে দীর্ঘ করে দিয়েছেন, তাই তিনি সালাফিদের অনুসৃত পথ সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করেন এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাহলে তাকে আল্লাহ তা'আলা উত্তম প্রতিদান দেবেন। সুতরাং এ ব্যক্তির মতো হওয়ার চেষ্টা করব আমরা, ইনশাআল্লাহ। [৩০]

বেশ কিছু সনদে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন: “আমি তোমাদের জন্য এমন কিছু রেখে যাইনি যা তোমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসবে বা ঘনিষ্ঠ করে তুলবে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে সরিয়ে নেবে, আমি তোমাদেরকে এর সবকিছু নির্দেশ দিয়েছি। একইভাবে, আমি তোমাদেরকে এমন কিছু রেখে যাইনি যা তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনের কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে, আমি এর সবকিছু তোমাদের জন্য নিষেধ করেছি।”

সুতরাং ইসলামী শরীয়াহর নিয়ম-কানুনে কোনো ধরনের নবপ্রবর্তন ও সংযোজন-বিয়োজন করার কোনো সুযোগ কারো নেই, যতই ছোট আর গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন এ সংযোজন অথবা বিয়োজন। বর্ণিত আছে যে, মাদীনার ইমাম ইমাম মালিক (রহঃ) যারা এ উম্মার প্রাথমিক পর্যায়ের প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত এমন কোনো নবপ্রবর্তন করেছেন তাদেরকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো বিধান সংযোজন করবেন, নবপ্রবর্তন করবেন, হোক না তা ভালো মনে করেই, তার এ কাজ হবে এ দাবি করার শামিল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তার আনিত বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আপনার যদি ইচ্ছা হয় তাহলে তেলাওয়াত করুন, ‘আজ আমি তোমার জন্য তোমার ধর্মকে (দ্বীনকে) পরিপূর্ণ করে দিলাম, আর আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট এবং ইসলামকেই তোমার একমাত্র ধর্ম হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (আল-মায়িদা ৫:৩)”

ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন: এ উম্মাহর সবচেয়ে প্রাজ্ঞরা তাদের পূর্বপুরুষ বা প্রাথমিক পর্যায়ের প্রজন্ম যে নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথের অনুসারী হয়েছিলেন, তা ব্যতীত অন্য কোনো নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারবে না, সঠিক পথের দিশা লাভ করতে পারবে না। যা কখনোই ধর্মের অংশ ছিল না, তা এখনো ধর্মের অংশ হতে পারে না। [৩৪]

এটা সর্বজন বিদিত যে, যেসব কাজ মূলত শরীয়াহ অনুসারে অনুমোদিত, সেগুলোকোও অননুমোদিত করা যেতে পারে, যদি কাজগুলোকে বিদয়াতি কায়দায় প্রবর্তন করা হয়ে থাকে। বর্ণিত আছে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এক মহিলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলেন, ওই মহিলা তাসবীহ জপছেন, তিনি তাসবীহদানা ভেঙে দূরে ছুঁড়ে মারলেন। এরপর তার সঙ্গে আরেক পুরুষের দেখা হলো, সেই পুরুষটি কঙ্করদানা দিয়ে তাসবীহ জপছিলেন, এটা দেখে ইবনে মাসউদ (রাঃ) পা দিয়ে কঙ্করদানাগুলোতে লাথি মারলেন এবং বললেন: “তুমি দ্বীনের মধ্যে নব্যপ্রবর্তন করছ। অথবা তুমি কি মনে কর আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) সাহাবাদের থেকেও তোমার বেশি জ্ঞান রয়েছে?”

সুতরাং দ্বীনের মধ্যে নব্য প্রবর্তনের অথবা দুর্বল মতামত ও প্রমাণের উপর নির্ভর করার ব্যাপারে সতর্ক হোন। ভিন্ন মতামত দুর্বল প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে, এটি কিছু মুজতাহিদের একটি বড় ভুল। এ ভ্রান্ত ও কলুষিত আইডিয়া, যা অনেক অজ্ঞ লোকও গ্রহণ করেন, মানুষকে আল্লাহর দ্বীন পরিবর্তন, শয়তানের আনুগত্য করা এবং সারা বিশ্বজাহানের মালিকের অবাঞ্ছিত হওয়ার পথে পরিচালিত করে। যদি মিথ্যার সঙ্গে ভ্রান্ত আইডিয়া যুক্ত করা হয়, আর কারো শক্তিশালী বাতিক ও অভিলাষ দ্বারা যদি সেই আইডিয়া সমর্থিত হয়, তাহলে আর জিজ্ঞেস করবেন না যে, এর পরে দ্বীন কতটা পরিবর্তিত হবে অথবা একজন মানুষ ইসলামের বাইরে গিয়ে কতটা নিঃশেষিত হবে। [৬৫]

আর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কিছু বলার ব্যাপারেও সতর্ক হোন, এমন কিছু বলবেন না যার ভিত্তি হবে শিরক ও কুফরি, বিদআত ও পাপ। পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কিছু বলা সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ড, পাপ ও নীতিভ্রষ্টতার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ। এর প্রমাণস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন: “বল, ‘আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায়, বিরোধিতা, আল্লাহ্ অংশীদার স্থির করা যে ব্যাপারে তিনি কোন প্রমাণ নাযিল করেননি, আর আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের অজ্ঞাতপ্রসূত কথাবার্তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।’” (আল-আ'রাফ ७:৩৩)

উপরোক্ত আয়াতে চারটি বিষয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ভয়াবহতার ক্রমানুসারে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: (বল) হে মুহাম্মাদ ﷺ , আমার প্রতিপালক যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলো হল- আল ফাওয়াহিশ (বড় ধরনের ভয়ঙ্কর পাপ এবং যে কোনো ধরনের অবৈধ যৌনতা), হোক না তা প্রকাশ্যে অথবা গোপনে।” এটা হলো ওই চারটি বিষয়ের প্রথমটি। অতঃপর আল্লাহ তা'আला আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেন, যা প্রথমটির চেয়ে আরো ভয়াবহ, আল্লাহ তা'আলা বলেন: “অनैतिक নিপীড়ন”। অতঃপর তিনি এর চেয়েও ভয়াবহ আরেকটি অপরাধের কথা উল্লেখ করেন, এবং আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা, অথচ যার জন্য তাকে কোনো ক্ষমতা বা অধিকার দান করা হয়নি।” অতঃপর আল্লাহ এর চেয়েও ভয়ঙ্কর অপরাধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন: “আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই”।

পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে কিছু বলা শিরক, কুফরি, বিদআত ও ফিতনার ভিত্তি। [৬৬]

না জেনে আল্লাহ্ সম্পর্কে কিছু বলা থেকে বিরত থাকতে এবং এর পরিণাম থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দরকার মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন করা, মানুষ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ অনুভূতি অর্জন করা, যাতে করে আপনি বলতে পারেন, অসুস্থ দাবিকারী ব্যক্তি সত্য বলছে না মিথ্যা বলছে। এছাড়াও আপনার মানসিক অসুস্থতা এবং মানব দেহের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিসমূহের (পিটুইটারী, থাইরয়েড ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি) কার্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে, কারণ এসব গ্রন্থির ভারসাম্যতাও আচরণগত বিশৃঙ্খলা ও চিত্তবৈকল্য দেখা দিতে পারে, যা দেখে কেউ মনে করতে পারে যে, তাকে শয়তানে স্পর্শ করেছে。

প্রকৃতপক্ষে জিন বিষয়টির ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, অবশ্য এটাই উপযুক্ত। প্রচুর সংখ্যক মানুষ যারা চিকিৎসার জন্য প্রাকটিশনারের শরণাপন্ন হন, তারা আসলে মানসিকভাবে অসুস্থ। কলহে লিপ্ত সব দম্পতিও কিন্তু যাদুতোনায় আক্রান্ত নয়। জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সকল নারী ও পুরুষই জিনের কবলে পড়েননি। যে ছাত্র পড়ালেখায় অবহেলা এবং সঠিক সময়ে পড়ালেখা না করার কারণে অকৃতকার্য হয়েছে, তার ওপর কারো বদনজর লাগেনি। তাই এ বিষয়টিতে দরকারের চেয়ে একটু বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হলো তা জানতে ড. আলী বিন নাঈফ আল আলিয়ানী’র বক্তব্য শুনতে হবে, তিনি বলেন:
“মানুষের বিরুদ্ধে শয়তানের চক্রান্ত অনেক বড়, কিন্তু সেটা একমাত্র তারা বুঝতে পারেন যাদের আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে ভালো জানাশোনা রয়েছে। লোকেরা দল বেঁধে পাঠকের কাছে যান, তার কাছে যাওয়ার জন্য পাড়ি দেন অনেক পথ, শুধুমাত্র তাকে ঘিরে সর্বত্র প্রচলিত গল্প-কাহিনীর কারণে, যেমন-বদ জিনরা কিভাবে এ পাঠকের কাছে মানসিক রোগীর ঠোঁটে কথা বলে, এবং এ কপট শায়খরা কিভাবে জিনদের কাছ থেকে পুনরায় ফিরে না আসার ওয়াদা আদায় করে নেন। সত্যি এটাই যদি হয় বাস্তবতা এবং এরকমভাবেই ঘটতে থাকে, সত্যিকার অর্থেই এটা যদি অলৌকিক হয়ে থাকে, তাহলে পাঠককে অবশ্যই এর পরিণামের বিষয়ে ভয় পেতে হবে।” [৬৭]

হায়রাত রামি (رحمه الله) তার ছাত্রকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তার মাধ্যমেই আমরা উপসংহার টানতে পারি, এ উপদেশমালা তিনি তার আ’খালাকুল তাবীব (চিকিৎসকের দৃষ্টিভঙ্গি) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
“জেনে রাখ, হে আমার বৎস, একজন চিকিৎসককে মানুষের প্রতি দয়ালু হতে হবে, তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের নেতিবাচক কিছু উল্লেখ করা এবং তাদের একান্ত বিষয়গুলো গোপন করা যাবে না, কারণ কিছু মানুষের এমন কোনো ব্যক্তিগত রোগ থাকতে পারে যা তার অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যেমন-তার পিতা বা মাতা অথবা ছেলের কাছেও গোপন করেছে, কিন্তু এ রোগের কথাই সে প্রয়োজনে তাগিদে ডাক্তারের কাছে খুলে বলে। ডাক্তার যদি কোনো নারী অথবা তরুণী বা বালকের চিকিৎসা করেন, তাহলে তাকে অবশ্যই তার দৃষ্টি নিম্নগামী করতে হবে, এবং শরীরের যে অংশে সমস্যা তা ব্যতীত অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি দেয়া যাবে না। ওয়াইজ গ্যালেন তার ছাত্রদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, অবশ্য তিনি সত্যই বলেছেন: ডাক্তারকে অবশ্যই তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি একনিষ্ঠ হতে হবে, তার দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে এবং নারীর সৌন্দর্য উপভোগ থেকে বিরত থাকতে হবে।

তাকে অবশ্যই রোগীর দেহের যে কোনো অংশ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তিনি যদি তার চিকিৎসা করতে চান তাহলে তার দৃষ্টি নিম্নগামী রাখতে হবে, শুধু যেখানে সমস্যা সেখানেই দৃষ্টি দিতে হবে, দেহের বাকি অংশে দৃষ্টি ঘোরানো যাবে না।

এ ছাড়া তিনি চিকিৎসকদেরকে আত্ম-গৌরবে নিমজ্জিত হতে নিষেধ করেছেন। আমি অনেক মেডিক্যাল ছাত্রকে দেখেছি, তারা যদি কোনো রোগীর চিকিৎসা করেন এবং সেই রোগী যদি নিরাময় লাভ করেন, তাহলে আত্ম-গৌরবে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন এবং অহংকারী মানুষের মতো কথা বলতে শুরু করেন। আর সত্যি যদি ঘটনা এরকম হয়, তাহলে তারা কখনোই সফল হতে পারবে না এবং সঠিক নির্দেশনাও পাবেন না, সুতরাং তাদেরকে বিনয়ী ও নম্র হওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে, এ পেশায় কিছু এটিকেট ও সৌন্দর্য রয়েছে, কিছু মৌলিক জ্ঞানও থাকা দরকার এ পেশায়, কিন্তু ডাক্তারকে হতে হবে নিরহংকার, তার থাকতে হবে সুন্দর বাচনভঙ্গী, কথায় হতে হবে ভদ্র ও শান্ত, রোগীর প্রতি হতে হবে দয়ালু এবং রোগীদের সঙ্গে কর্কش ব্যবহার পরিহার করতে হবে। এগুলো করতে পারলেই ওই ডাক্তার সফল হতে পারবেন এবং সঠিক পথের দিশা পাবেন। এছাড়াও তিনি ডাক্তারদেরকে দরিদ্র লোকদেরও চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছেন, তিনি বলেন: ডাক্তারকে ধনী লোকদের পাশাপাশি গরিবেরও চিকিৎসা করতে হবে।” [১০]

টিকা:
৬৮. ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমুয়া আল ফাতওয়া, ১৯/৩০
৫十九. বকর আবদুল্লাহ আবু যায়েদ, আল তা'আলুম, পৃ-১১২
১১. [সুনান আদ-দারিমী ১/৭৯]
১২. ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআন, ৪/১৮৮
৩০. আল শাতিবী, আল-মুওয়াফফাকাত, ১/১৪
৩৪. ইবনে ওয়াহাব, আল বিদা, ৭-৮
৬৫. ইগাসাতুল লাহफान, ২/১৪৬
৬৬. ড. বকর বিন আবদুল্লাহ্ আবু যায়েদ, আল তা'আলুম, পৃ-১১২
৬৭. [আর রুক্বা ফি দা-, আক্বীদাতু আহলি সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আহ্- ড. আলী আল-আলাইয়ানী ৭. ৮০-৮১]
১০. ড. আহমদ তু-বা, আত তিব্ব আল ইসলামী, পৃ-১০৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px