📄 যেসব কারণে জিনরা মানুষের ওপর প্রভাব খাটাতে পারে
এটা জেনে রাখা উচিত যে, জিনদের পক্ষে মানুষের ক্ষতি করা বা তার মধ্যে উপস্থিত হওয়া খুব সহজ কাজ নয়, কারণ এটা করতে গেলেই সে কুরআনের শাস্তির মুখে পড়ে যায়, মানুষের দেহের মধ্যে আটকে পড়ে যায় বলেই তার এ শাস্তি। আর জিন যখন অন্য কোনো রূপে বা বেশে আবির্ভূত হয় তখন সে পড়ে যায় ধ্বংস ও মৃত্যুর মুখে, কারণ তখন সে ওই নিয়ম-কানুনের অধীন হয়ে যায়, যা তার ধারণ করা বেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সুতরাং জিন কোনো মানুষের ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি করে না, যতক্ষণ সে নিশ্চিত হতে না পারে যে, ওই ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ, আর এটা নিশ্চিত হতে পারলেই, অর্থাৎ কোনো মানুষ যখন আল্লাহয় বিমুখ হয়, তখনই কেবল জিনেরা তার ক্ষতি করতে পারে।
(১) বৈদ্য বা জাদুকর এবং যারা তার কাছে বার বার যান: জিন তার জীবদ্দশায় বৈদ্য বা ডাকিনিবিদের ওপর প্রচুর ক্ষমতা অর্জন করে। তারা অনেক জাদুকরকে অসুস্থ বানিয়ে দেয় এবং অনেককে হত্যাও করে, অতঃপর ওই ডাকিনিবিদের সন্তান-সন্ততির উপর ভর করে জিন, তাদেরকেও বশ করে নেয়, কারণ জিনেরা ভালো করেই জানে যে, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই।
(২) যার চক্র এবং যারা প্রায়শ্চিত্ত এটা করে: যারা প্রায়শ্চিত্তে যার চক্র আয়োজন করে তাদেরও ওপর জিন ও শয়তান সহজেই কর্তৃত্ব অর্জন করে এবং তাদের বিভিন্নভাবে ক্ষতি করে, যারা এ চক্রে অংশগ্রহণ করে তারাও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হন। এ ধরনের জলসার আয়োজন করা হয় মূলত রোগ নিরাময়ের নাম করে, মহিলারা একটি স্থানে একত্রিত হন, তখন জিনরা যার চক্র আয়োজনকারীদের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে।
(৩) নবপ্রবর্তিত বৈরাগ্য ও ইবাদাত: মানুষের ওপর জিনের কর্তৃত্ব লাভ করার আরেকটি কারণ হলো নবপ্রবর্তিত বিরুদ্ধ ও ফিক্র করা, যার জন্য আল্লাহ তা'আলা কোনো নির্দেশনা অবতীর্ণ করেননি।
(৪) জিনের ভুল মানুষকে টার্গেট করা: জিন কখনো কখনো কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই ভুল মানুষকে টার্গেট করতে পারে, যেমনটি করে থাকে বোকা লোকেরা।
(৫) জিনের মানুষের প্রেমে পড়া: কখনো জিন মানুষের প্রেমে পড়তে পারে এবং তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও করতে পারে, ঠিক যেমনটি ঘটে মানুষের মাঝে, সুতরাং এ কারণেও জিন মানুষের ওপর প্রভাব খাটাতে পারে。
(৬) মানুষকে জিনের শাস্তি দেওয়া: অনেক সময় মানুষ না বুঝে কোনো জিনের ক্ষতি করতে পারে, যেমন-জিনের উপর পড়ে যাওয়া, জিনকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা, জিনের উপর প্রস্রাব করা অথবা জিনের দেহে গরম পানি ঢেলে দেওয়া। এসব কারণে মানুষকে জিন তার প্রাপ্যেরও অধিক মাত্রায় শাস্তি দিয়ে থাকে。
টিকা:
৩৪. মাজমূয়া ফাতাওয়া, খণ্ড ১১。
৭১. ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমূ আল ফাতাওয়াহ, ১৯/৪১
📄 জিন ভর করার লক্ষণ
যারা এ বিষয়ের উপর লিখেছেন তারা মানুষের উপর জিন ভর করার বিভিন্ন লক্ষণের তালিকা করেছেন। এসব লক্ষণ সত্যি বা বাস্তব হতে পারে, তবে আমরা এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, কিছু লক্ষণ অন্য কোনো কারণেই দেখা দিতে পারে, যেমন সারা রাত জেগে থাকা অথবা দ্বিধা ও সংশয়ের কারণেও হতে পারে। সুতরাং এ লক্ষণগুলোর তালিকা পাঠ করার সময় শয়তান আমাদের মনে যেসব প্ররোচনা দিতে পারে সেগুলো থেকে অবশ্যই নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে。
এসব লক্ষণ দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে: কিছু লক্ষণ জাগ্রত অবস্থায় ঘটতে পারে, আবার কিছু লক্ষণ ঘুমন্ত অবস্থায়ও ঘটতে পারে।
◆ জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ:
১- আল্লাহ তা'আলার স্মরণ (যিকির), তাঁর আনুগত্য ও ইবাদাত, কুরআন তেলাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।
২- কথা, কাজে ও চাল-চলনে ত্রুটিপূর্ণ আচরণ।
৩- স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের কোনো কারণ ছাড়াই হৃদরোগের আক্রমণ।
৪- স্বাস্থ্যগত স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের কোনো অঙ্গ নিশ্চল হয়ে যাওয়া。
৫- স্পষ্ট কোনো কারণ ব্যতীত দ্রুত রেগে যাওয়া বা কান্না করা。
৬- দীর্ঘসময় ট্যাবলেট সেবন করা এবং কারো সঙ্গে কথা বলা。
৭- সর্বক্ষণ মাথা ব্যথা (মাথার একদিকে বা উভয়দিকে), যার কোনো মেডিক্যাল কারণ নেই, এমনকি ব্যথানাশক ওষুধও এক্ষেত্রে কাজ করে না。
৮- মহিলাদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব।
৯- স্বামী-স্ত্রী শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং প্রজনন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো সন্তান জন্ম দিতে না পারা。
◆ ঘুমন্ত অবস্থার লক্ষণ:
১- ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন যেমন- ঘুমের মধ্যে ভূত-প্রেত্নি বা অপচ্ছায়া দেখা, অনেক উঁচু স্থান থেকে হঠাৎ পড়ে যাওয়া, মানুষকে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর আকৃতিতে দেখা, সাপ দেখা ইত্যাদি।
২- অনিদ্রা, উদ্বিগ্নতা এবং জাগ্রত হওয়ার ভয়。
৩- ঘুমের মধ্যে উচ্চঃস্বরে কথা বলা অথবা গোঙানি ও আর্তনাদ করা。
টিকা: উপরোক্ত কোনো একটি লক্ষণ দেখা গেলেও কাউকে জিনে ধরেছে বলে মনে করা যাবে না। তার উপর কুরআন তেলাওয়াত না করা পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে তাকে জিনে ধরেছে।
📄 কুরআনিক নিরাময় ব্যবস্থার অনুশীলনকারী সম্পর্কিত বর্ণনা ও শর্তাবলী
(১) শেফার ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতা এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা: কুরআনিয় নিরাময় ব্যবহার অনুশীলনকারীদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে, এ নিরাময় ব্যবহার জ্ঞানার্জন শুধুমাত্র জাগতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়।
(২) জ্ঞান: জ্ঞান দু' ধরনের। ইসলামী জ্ঞান: তাওহীদের জ্ঞান, হালাল ও হারাম সম্পর্কে জ্ঞান; জাগতিক জ্ঞান: মানুষের সাধারণ জ্ঞান এবং তাদের স্বভাবগত জ্ঞান।
(৩) অভিজ্ঞতা: মানুষের চিকিৎসা করার যোগ্যতা হিসেবে তার মধ্যে থাকতে হবে অভিজ্ঞতা।
(4) সচেতনতা ও ধার্মিকতা: যিনি অন্যের চিকিৎসা করতে চান তাকে হতে হবে সচেতন ও ধার্মিক, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় ক্ষেত্রেই তাকে হতে হবে সৎ।
(৫) গোপনীয়তা: তাকে অবশ্যই গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। কারণ চিকিৎসার সূত্রে মানুষ তার কাছে তাদের গোপন ও একান্ত ব্যক্তিগত অনেক তথ্য জানাবে।
(৬) মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কিত জ্ঞান: মানসিক অসুস্থতা জিনের কারণে সৃষ্ট অসুস্থতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, তাই অনেকেই পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে দুটোকে গুলিয়ে ফেলেন।
টিকা:
৩৭. সহীহ। শাইখ আলবানী (র.), সহীহ আল জামি ৬১৫৪。
📄 কিভাবে অসুস্থতা সনাক্ত করা হয়?
জিন দ্বারা সংঘটিত অসুস্থতার ক্ষেত্রেও চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেভাবে রোগ সনাক্ত করা হয়, ঠিক সেভাবে সমস্যা নির্ণয় করতে হবে, কী কারণে এমনটা হলো তা খুঁজে বের করতে হবে। প্র্যাকটিশনার একবার যদি জানতে পারেন যে, কেন তাকে জিন এ ক্ষতি করেছে, তাহলেই তিনি এর ভিত্তিতে তার চিকিৎসা করতে পারবেন।
কারণ নির্ণয় করার জন্য অবশ্যই তাকে স্থান নির্বাচন করতে হবে, যেসব স্থান আল্লাহর অবাধ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেসব স্থান পরিহার করতে হবে। চিকিৎসার স্থানে দেওয়ালে যদি কোনো ছবি টাঙানো থাকে, তাহলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে, বাদ্যযন্ত্র থাকলে তা সরিয়ে নিতে হবে। অতঃপর রোগীকে সংক্ষেপে উপদেশ ও পরামর্শ প্রদান করার মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। আর রোগী মহিলা হলে তাকে অবশ্যই হিজাব পরাতে হবে এবং সঙ্গে মাহরাম পুরুষ রাখতে হবে。
সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্র্যাকটিশনারের অভিজ্ঞতাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর এ রোগ নির্ণয়ের কাজটি করা হয় রোগীর পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়ার মাধ্যমে। রোগীর অবস্থা বা তার যে ক্ষতি হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন বিভিন্ন হবে, তবে কিছু সাধারণ প্রশ্ন সব রোগীকেই করার দরকার হবে।
এসব প্রশ্ন করার পর প্র্যাকটিশনার হয় সমস্যার কারণ দ্রুত নির্ণয় করতে পারবেন অথবা বিষয়টি নিয়ে তিনি দ্বিধা-সংশয়ে পড়তে পারেন। যদি সমস্যা নির্ণয় করতে পারেন, তবে উপযুক্ত পদ্ধতিতে চিকিৎসা করবেন। আর যদি সংশয়ে থাকেন তবে রুকইয়া (ঝাড়ফুঁকের বিভিন্ন দোয়া ও আয়াত) তেলাওয়াত করবেন।