📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 মানুষের উপরে জিনদের কিছু ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব রয়েছে

📄 মানুষের উপরে জিনদের কিছু ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব রয়েছে


যেমন আগুন দিয়ে মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা, ঘরের আসবাবপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, মানব বেশ ধারণ করে কিছু শারীরিক ক্ষতি করা যেমন-কোনো অঙ্গ অবশ বা নিশ্চল করে দেওয়া, বুক চেপে ধরা, স্থায়ী মাথা ব্যথা অথবা অন্য যে কোনো ধরনের জটিল রোগ যার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো নিরাময় ব্যবস্থা নেই, বরং চিকিৎসা করতে গেলে এর প্রকোপ আরো বৃদ্ধি পায় অথবা মস্তিষ্কের ক্ষতি করে কাউকে উন্মাদ করে দেয়া ইত্যাদি, তবে মানুষের ওপর জিনের এসব ক্ষমতা খুবই সীমিত।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 পাগলামি ও মৃগী রোগ জিন দ্বারা সংঘটিত হয়

📄 পাগলামি ও মৃগী রোগ জিন দ্বারা সংঘটিত হয়


আল্লাহ তা'আলা বলেন: “যারা সুদ খায়, তারা সেই লোকের মত দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা বেহুঁশ করে দেয়।” (সূরা বাকারাহ ২:২৭五)

ইমাম কুরতুবী বলেন, এ আয়াতে দেখানো হয়েছে, মৃগী রোগ জিন দ্বারা সংঘটিত হয় যারা এ কথা অস্বীকার করেন, এবং মনে করেন এটা শুধুমাত্র শারীরিক কারণেই হয় এবং যারা মনে করেন শয়তান মানুষের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না অথবা পাগল বানাতে পারে না, তাদের ধারণা ভুল।

イমাম তাবারি উক্ত আয়াতে ব্যাখ্যায় বলেন: (যারা সুদ খায়) তাদেরকে পরকালে কবর থেকে ওঠানো হবে ওই ব্যক্তির মতো করে, যাকে শয়তান পৈশাচিক পোটাতো পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এর মানে হলো, এই পৃথিবীতে শয়তান তাকে পিটিয়ে পাগল বানিয়ে দেয়।

আল হাফিজ বিন কাসীর (রহ.) বলেন: “যারা সুদ খায়....” এ আয়াতের মানে হলো, যারা সুদ খায় তাদেরকে কবর থেকে মৃগী রোগীর মতো করে ওঠানো হবে এবং তার অবস্থা হবে শয়তান কর্তৃক প্রহৃত ব্যক্তির মতো। অর্থাৎ সুদখোর ব্যক্তিকে খুবই নিকৃষ্ট অবস্থায় ওঠানো হবে。

ইমাম আলূসী বলেন: যারা সুদ খায় তাদেরকে পরকালে কবর থেকে উঠানো হবে দুনিয়ার মৃগী রোগীদের মতো করে। আরবী তখব্বুত শব্দের অর্থ হলো, শরীরের বিভিন্ন অংশে অবিরত আঘাত করা। আর শয়তানের স্পর্শ মানে হলো পাগলামি বা উন্মাদনা রোগ。

জিনদের অস্তিত্ব সম্পর্কে হাদীসের প্রমাণ
১. মুত’র বিন আবদুর রহমান আল আ’নাক্ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উম্মা আ’বান বিনতে আল ওয়াফি বিন ইয়ারি বিন আমীর আল আ’বাদি তার পিতা থেকে আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, তার দাদা আল ইয়ারি তার অথবা তার বোনের এক ছেলেকে আল্লাহর রাসূলের (সা.) কাছে নিয়ে আসলেন। আমার দাদা বলেন, আমরা মদিনায় আল্লাহর রাসূলের (সা.) কাছে এসে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমার সঙ্গে আমার অথবা আমার এক বোনের ছেলে রয়েছে, তার মস্তিষ্ক বিকৃত। আমি তাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি, যাতে আপনি আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করতে পারেন।

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন: “তাকে আমার কাছে নিয়ে এস।” “তাকে আমার কাছে নিয়ে আস” “তার মুখ খোল”
সে তার মুখ খুলল, এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) তার মুখে থুথু নিক্ষেপ করলেন, অতঃপর বললেন: “দূর হও, হে আল্লাহর শত্রু, কারণ আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) বলছি।”
এ কথা তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন: “এবার তোমার ছেলেকে নিয়ে যাও, তার মধ্যে খারাপ কিছু নেই, এবং সে যে সমস্যায় ভুগছিল তা আর কখনো ফিরে আসবে না।”

আল হাসামী বলেন: হাদীসটি তাবারানী কর্তৃক আল আওসাতে বর্ণিত হয়েছে, আর আল বাযার এটির সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন। হাদীসটির সনদের মধ্যে আব্দুল হাকিম বিন সুফিয়ান রয়েছেন, তাকে উল্লেখ করেছেন ইবনে আবূ হাতিম, তবে কেউ তার সমালোচনা করেননি, আর এ হাদীসের বাকি বর্ণনাকারীরাও সিকাত নির্ভরযোগ্য。

২. সাফিয়া বিন হুয়াই থেকে বর্ণিত, নাবী (ﷺ) বলেন: “শয়তান আদম সন্তানের মাঝে তার দেহের রক্তের মতো প্রবাহিত হয়।”

যৌক্তিক প্রমাণ:
শায়খ মুহাম্মাদ আল হামিদ বলেন, যেহেতু জিনদেরও হালকা দেহ রয়েছে, সেহেতু তাদের আদম সন্তানের দেহে প্রবেশের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না, এবং এ কথা বা বক্তব্যের বিরোধিতা করবে এমন কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায় না। সে কারণে হালকা কোনো কিছু ঘন বা ভারী কোনো কিছুর মধ্য দিয়ে অনায়াসে প্রবাহিত হতে পারে, যেমন- মানুষের শরীরের ভিতরে বায়ু প্রবেশ করতে পারে অথবা কয়লার মধ্যে দিয়ে আগুন প্রবাহিত হয় অথবা তাদের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়。

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহঃ) বলেন: জিন মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে এ তথ্যটি আহলুস সুন্নাহ-এর সম্মতিক্রমে প্রমাণিত। যারা এর সত্যতা যাচাই করেছেন, এটা পরীক্ষা করেছেন তারা নিজ চোখে এ সত্য দেখেছেন এবং প্রত্যক্ষ করেছেন। জিন মৃগীরোগীর দেহে প্রবেশ করে এবং তার মুখ দিয়ে এমনসব কথা বলে যে সম্পর্কে ওই ব্যক্তি সচেতন নন এবং পরবর্তীতে তিনি তা স্মরণও করতে পারেন না।

টিকা:
১১. [তাফসীরে আল কুরতুবী, ৩/২৩৪]
১২. [তাফসীরে আল তাবারি, ৩/১৩১]
১৩. তাফসীর ইবনু কাসীর, ۱/৩২৬
১৪. ওয়াহিদ বালি, উইকাইয়াহ্ আল-ইনসান, ৫৭ থেকে উদ্ধৃত।
১৫. মাসماউত্ব জাওয়াঈদ, ৯/৯
১৬. ফাতহুল বারী, ৪/২৫২; মুসলিম বি শারহে আল নববী, ৪/১৫৫
১৭. ফাতহুল আল আরাবাতীন, ২/১০৫।
১৮. ইগাইছাল আল ইনসান মিনাল জিন ওয়াশ শায়তান, পৃ-৫৮-৫৮।
১৯. আত তিব্বুন-নাবাবী, ৫২。
২০. রিসালাত আল জিন, ৮。
২১. মুকতাসার আল ফাতাওয়া, ৫৬৪。

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 জিন দ্বারা সংঘটিত রোগ ও ক্ষতির ধরণ

📄 জিন দ্বারা সংঘটিত রোগ ও ক্ষতির ধরণ


জিন মানুষের বিভিন্ন ধরনের রোগ সৃষ্টি ও ক্ষতি করতে পারে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, মেজাজ, দেহ, সম্পদ, অবস্থান, ব্যবসা, সম্পর্ক ও পড়া-লেখার ক্ষতি করতে সক্ষম।

আমরা এখানে যে অসুস্থতার কথা আলোচনা করব, তা মানুষের ওপর জিনের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ অথবা ডাকিনিবিদ্যার কারণে সংঘটিত হতে পারে। আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এসব রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এসব অসুস্থতা হলো নিম্নরূপ:
১. তীব্র ভয়
২. মানসিক ও স্নায়ু রোগ (উন্মাদ রোগ, বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা, মৃগীরোগ, ওয়াসওয়াসা, ব্যক্তিত্বের ঘাটতি)
৩. শারীরিক অসুস্থতা (যেসব অসুস্থতা মানুষের তৈরি ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা করা যায় না, এবং যার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানেও কোনো নিরাময় নেই)।
৪. হ্যালুسینেশন বা দৃষ্টিবিভ্রম
৫. মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শত্রুতা ও বিভাজন তৈরি করা, যেমন-স্বামী ও স্ত্রী, ব্যবসায়িক অংশীদার, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের মাঝে।
৬. স্ত্রীরোগ (বন্ধ্যাত্ব, অতিরিক্ত রক্তপাত, অনিয়মিত রজচক্র, ইনফেকশন ইত্যাদি)
7. যৌন সমস্যা (অক্ষমতা, অপরিণত বয়সে বীর্যপাত)
8. মানুষের বাড়িঘর ও ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতি করা (ঘরের আসবাবপত্র চারদিকে ছুঁড়ে ফেলা, ঘরের চালে পাথর নিক্ষেপ করা)।

📘 জিন এবং জিনকেন্দ্রিক অসুস্থতা ও প্রতিকার 📄 যেসব কারণে মানুষ জিনকে ভয় পায়

📄 যেসব কারণে মানুষ জিনকে ভয় পায়


জিনের কারণে ভয় পাওয়ার দুটি দিক রয়েছে। একটি সঠিক, অন্যটি সঠিক নয়। সঠিক দিকটি হল, কিছু জিন মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এর মাধ্যমে তারা মানুষকে বিভিন্ন কণ্ঠস্বর শোনায়, কিছু দেখায় এবং তার মধ্যে এমন একটি অনুভূতি তৈরি করে দেয় যে, তার মনে হবে কেউ যেন তার পিছু পিছু আসছে বা তাকে অনুসরণ করছে এবং এই অনুভূতি তৈরির মাধ্যমে তারা মানুষকে তার নিজ বাড়িতেও ভয় পাইয়ে দেয়। এই ভয় দূর করার জন্য নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে, সকালে ও সন্ধ্যায় আযকার করতে হবে, আর এই ভয়ের কারণে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অনুসরণ করতে হবে বিশেষ কর্মসূচি。

আর ভুল দিকটি হল জিনকে নিয়ে মানুষের মনে প্রোথিত গভীর আতঙ্ক। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব ভয় যাচাই করার কোনো উপায় নেই। তাই এখন আমরা একটি রূপরেখা তৈরি করব যে, কেন মানুষ জিনকে এত ভয় পায়, জিনের নাম উল্লেখ করলেই কেন তারা আতঙ্কে শিউরে ওঠে, তাহলেই আমরা এ সমস্যাটি ধরতে পারব এবং এর প্রতিকারও করতে পারব।

যেসব কারণে মানুষ জিনকে ভয় পায়:
১. ভয় পাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধানতম হল তাওহীদ সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা। কোনো স্থানে যদি তাওহীদ সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব থাকে, তাহলে সেখানে অজ্ঞতা বিস্তার লাভ করে। পুরাণ বিজয়ী হয়, মন্দরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। হাতুড়ে বৈদ্যরা তাদের মিথ্যা জ্ঞান চর্চার জন্য পাবে উর্বর ভূমি এবং শয়তানও তাদের কাজে সহায়তা করবে। আর এ কারণেই মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে, জিনরা অদৃশ্যর খবর জানতে সক্ষম, তারা সুবিধা বয়ে আনতে পারে এবং ক্ষতি প্রতিহত করতে পারে, অথচ এসব গুণাবলী একমাত্র আল্লাহ তা'আলার। এ কারণে জিনের নামোল্লেখ মাত্রই মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে যায়।
২. বানোয়াট গল্পের ব্যাপক প্রসার। লোকেরা এ ধরনের গল্প শুনতে বেশ পছন্দ করে এবং শোনার পর তারা এগুলোকে বিস্ময়কর গতিতে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এসব গল্প নারী, শিশু ও দুর্বলচিত্তের মানুষের মাঝে সহজেই ভয় তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে。
৩. জাদুকররাও এ ভয়, এসব গল্প ও পুরাণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে。
৪. শরীয়াতে নির্দেশিত আয়াতগুলো তেলাওয়াত ও ব্যর্থতার কারণে অনেক সময় মানুষের মাঝে জিন অবস্থান নেয়, অনেক ক্ষেত্রে এর কারণে মানুষ জিনের ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px