📄 শয়তানের কব্জায় মানুষ কখন যায়
(হাদীস) হযরত কাতাদাহ বিন আইয়াশ্ আল্-জার্শী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
لَنْ يَزَالَ الْعَبْدُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَالَمْ يَشْرَبِ الْخَمْرَ ، فَإِذَا شَرِبَهُ خَرَقَ اللهُ عَنْهُ سِتَرَهُ ، وَكَانَ الشَّيْطَانُ وَلِيَّةُ وَسَمْعُهُ وَبَصَرُهُ وَرِجُلُهُ ، يَسُوقُهُ إِلَى كُلِّ شَرٌّ، وَيَصْرِفُهُ عَنْ كُلِّ خَيْرٍ -
কোন মানুষ মদপান না করা পর্যন্ত আপন দ্বীনদারীর ক্ষেত্রে উন্নতি করতে থাকে, কিন্তু যখন সে মদপান করে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে আপন হিফাযতের দায়িত্ব সরিয়ে নেন ও শয়তান তার বন্ধু হয়ে যায়। শুধু তাই নয় শয়তান তখন তার চোখ, কান ও পা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাকে সবরকমের মন্দকাজের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় ও যাবতীয় সৎকাজ থেকে তাকে বঞ্চিত করে দেয়। (৪৭)
টিকাঃ
(৪৭) তবারানী, কাবীর, ১৯: ১৫। আল-জামিই আস্সগীর, ৭৩৮৯। ফাইযুল কুদীর, ৫ : ৩০২।
📄 প্রতারণার এক আজব কাহিনী
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন: আমাদের এক বন্ধু রাতের বেলায় নিজের বাড়িতে নফল নামায পড়তেন। যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে তাক্বীরে তাহ্রীমা বলতেন, সেই সময় সাদা পোশাক পরে এক আগন্তুক তার কাছে এসে নামায শুরু করে দিত।
সেই আগন্তুকের রুকূ-সাজদা আমাদের বন্ধুটির রুকূ-সাজদার চাইতে ভালো হত। আগন্তুক বন্ধুটিকে (তার সুন্দর নামায দেখিয়ে) অবাক করে দেয়।
বন্ধুটি সে কথা তার অন্য এক বন্ধুকে বলেন। সেই দ্বিতীয় বন্ধু কথাটা আমার কাছে উল্লেখ করে জানতে চান অমনটা কেমন করে হয়?
আমি বলি, আপনি সেই নামাযীকে বলুন (নামাযে) সূরাহ্ বাকারাহ্ পড়ে দেখতে। তা সত্ত্বেও যদি সেই আগন্তুক দাঁড়িয়ে থাকে তবে সে বুঝতে হবে এটা ফিরিশতা এবং এটা তার জন্য ভাল। (আর সূরা বাকারা শুনে) পালিয়ে গেলে বুঝতে হবে সে শয়তান।
দ্বিতীয় বন্ধু কথাটা সেই প্রথম বন্ধুকে বললেন। যথাসময়ে তিনি নামায শুরু করলেন। আগন্তুকও এসে নামাযে দাঁড়িয়ে গেল তার সাথে। তারপর তিনি সূরা বাকারা পড়া শুরু করলেন। অমনি সেই শয়তান পিঠটান দিল। (৪৮)
টিকাঃ
(৪৮) হিকায়াতুস সুফিয়্যাহ্, আবূ আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মদ বিন বাকুবাহ্, শীরাযী।
📄 রাস্তা ভুলিয়ে দেওয়া শয়তান
(হাদীস) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
إِنَّ لِا بَلِيسَ مَرَدَةٌ مِنَ الشَّيَاطِينِ يَقُولُ لَهُمْ : عَلَيْكُمْ بِالْحُجَّاجِ وَالْمُجَاهِدِينَ فَأَضَلُّوهُمْ عَنِ السَّبِيلِ - -
ইবলীসের শয়তান-বাহিনীতে কিছু মারাদাহ্ (নামের অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির শয়তান) আছে। ইব্ল্লীস তাদের বলে, তোমরা হাজী ও মুজাহিদদের কাছে যাও এবং তাদের রাস্তা ভুলিয়ে দাও। (৪৯)
টিকাঃ
(৪৯) জামিউল কাবীর, ১: ২৫৪। মাজমাউয যাওয়াঈদ, ৩: ২১৫। আতহাফুস্ সাদাতিল মুত্তাকীন, ৭: ২৮৮। ত্ববারানী কাবীর, ১১: ১৬২। কানযুল উম্মাল, ১১৭৯৪, ১১৮৫৪।
📄 শয়তানের এক বন্ধুর চারটি বিস্ময়কর ঘটনা
(এক)
মুহাম্মদ বিন ইস্স্নাত (রহঃ) বলেছেন: আমি বাগ্দাদে জনৈক শায়খের মুখে। আব্দুল্লাহ্ বিন হিলাল (কুফার এক জাদুকর)-এর এই ঘটনা শুনেছি: একদিন সে কুফার এক গলি দিয়ে যায়। সেখানে কোন এক মানুষের মধু পড়ে গড়িয়ে গিয়েছিল। ছেলেরা জড়ো হয়ে তা চাটছিল। এবং বলছিল, 'আল্লাহ ইব্ল্লীসকে ঘৃণিত করুন! আল্লাহ্ ইব্ল্লীসকে ঘৃণিত করুন।' আব্দুল্লাহ্ বিন হিলাল ছেলেদের বলে, তোমরা ওরকম বলো না এবং বলো, 'আল্লাহ আমাদের তরফ থেকে ইল্লীসকে পুরস্কৃত করুন, সে মধু ফেলিয়েছে এবং আমাদের তা চাটার ভাগ্য হয়েছে।'
কথিত আছে, সেই সময় ইব্ল্লীস আব্দুল্লাহ বিন হিলালের কাছে এসে তাকে বলে- 'তুমি আমার উপকার করেছ। কেননা তুমি বাচ্চাদেরকে আমাকে গালি দিতে মানা করেছ। আমি তোমাকে এর প্রতিদান দিতে চাই।' এরপর ইল্লীস তার একটা আংটি নিয়ে আবদুল্লাহ বিন হিলালকে বলে, 'তোমার যে প্রয়োজনই পড়ুক, এর দ্বারা তা পূরণ করে নিও।' সুতরাং আব্দুল্লাহ বিন হিলালের কোনও কিছুর দরকার পড়লে সেই শয়তানী আংটির মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ হয়ে যেত। (৫০)
(দুই)
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (জালিম প্রশাসক)-এর এক বাঁদী ছিল, যাকে তিনি খুব অলোবাসতেন। একদিন এক শ্রমিক হাজ্জাজের অন্দরমহলে কাজ করে। শ্রমিকটার চোখ পড়ে যায় সেই বাঁদীর দিকে। ফলে সে পড়ে যায় তার প্রেমে। এরপর শ্রমিকটা যায় আবদুল্লাহ্ বিন হিলালের কাছে। লোকটা আবদুল্লাহ্ বিন হিলালেরও সেবাযত্ন করত। ওর কাছে গিয়ে সে তার মনের কথা খুলে বলল। ইবনু হেলাল বলল, আজই আমি সেই বাঁদীকে তোমার কাছে এনে দেব। সুতরাং রাতের অন্ধকারে ইবনু হিলাল সেই বাঁদিকে নিয়ে লোকটার কাছে পৌছেদিল। বাঁদীর কাছে রাতভর থাকল। এরপর থেকে ইবনু হিলাল রোজ রাতের বেলায় সেই বাঁদীকে লোকটার কাছে এনে দিত।
ক্রমশ ভয়ে-ভাবনায় আর রাত জাগার কারণে বাঁদীর রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একদিন সে হাজ্জাজের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলল, যখন মানুষ-জন ঘুমিয়ে পড়ে (অর্থাৎ গভীর রাতে), আমার কাছে একজন লোক আসে এবং আমাকে নিয়ে এক যুবকের ঘরে যায়। রাতভর আমি তার ঘরে থাকি। কিন্তু সকাল হলে নিজেকে নিজের মহলেই দেখি।
কথিত আছে, হাজ্জাজ একটা জাফরানী রঙের সুগন্ধি থালা আনিয়ে সেটা বাঁদীর হাতে দিয়ে বললেন, তুমি সেই লোকটার ঘরে পৌঁছে গেলে এই থালাটা তার দরজায় লাগিয়ে দিও।
বাঁধী ওরকমই করল।
এদিকে হাজ্জাজ কিছু পাহারাদারও পাঠিয়ে দিলেন। তারা এক সময় সেই যুবককে ধরে আনল। হাজ্জাজ তাকে বললেন, আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি, সত্যি কথা বল, ব্যাপারটা কী?
সে তখন সমস্ত ঘটনা শোনাল।
হাজ্জাজ, আবদুল্লাহ বিন হিলালকে তলব করে বললেন, ওরে আবদুল্লাহ! সারা দুনিয়া ছেড়ে কেবল আমার সাথে এই পাঁয়তারা করার দরকার পড়েছিল তোর? এরপর হাজ্জাজ (আবদুল্লাহ্ বিন হিলালকে কতল করার জন্য) তলোয়ার ও চামড়ার ফরাশ আনার হুকুম দিলেন।
কথিত আছে, আবদুল্লাহ সেই সময় সুতোর একটা গুলি বের করে এবং সুতোর একটা কিনারা হাজ্জাজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, আমাকে কতল করার আগেই আমি আপনাদের একটা ম্যাজিক দেখাচ্ছি। এরপর সে নিজেকে সেই সুতোয় জড়িয়ে সুতোর গুলিটা উপরের দিকে ছুঁড়ে দেয়। অমনি সে উপরে উঠতে থাকে। উঠতে উঠতে সে মহলের সবচেয়ে উপরের তলার সমান উঁচুতে পৌঁছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে, 'ওহে হাজ্জাজ! তুমি আমার কিচ্ছু করতে পারবে না!' এরপর সে ফেরার হয় যায়। (৫১)
(তিন)
হাজ্জাজ একবার ঘটনাচক্রে আব্দুল্লাহ বিন হিলালকে গ্রেফতার করে জেলখানায় বন্ধি করে দেয়। জেলের ভিতর দিয়ে আবদুল্লাহ্ মাটিতে একটা নৌকার ছবি আঁকে। তারপর অন্যান্য কয়েদীদের বলে, যারা বসরায় যেতে চাও তারা আমার সাথে এই নৌকায় সওয়ার হয়ে যাও। কিছু লোক কথাটা তামাশা ভেবে উড়িয়ে দেয়। আবার কিছু লোক সত্যি সত্যি সেই নৌকায় উঠে পড়ে। তারপর কেউ তাদেরকে সেই জেলে আর দেখতে পায়নি। (৫২)
(চার)
আহমাদ বিন আব্দুল মালিক (রহঃ) বলেছেন: আবদুল্লাহ বিন হিলাল ছিল শয়তানের বন্ধু। শয়তানের খাতিরে সে আসরের নামায পড়ত না। ওই সময়ে তার কাজ সম্পূর্ণ হত। একবার একটা লোক তার কাছে এসে বলে, আমার এক ধনী প্রতিবেশী আছেন। তিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি উপকার করেন। তাঁর একটি সুন্দরী মেয়ে আছে। মেয়েটিকে আমি ভালোবাসি। আমি চাইছি, তুমি আমার জন্য ইবলিশের কাছে সুপারিশ লিখে দাও। যাতে সে কোনও শয়তানকে আমার জন্য ওই মেয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠায়।
কথিত আছে, আব্দুল্লাহ্ বিন হিলাল' ইল্লীসকে এরকম চিঠি লেখে 'যদি তুমি তোমার ও আমার চাইতেও বেশি নিকৃষ্ট কাউকে দেখতে চাও, তবে এই পত্রবাহককে দেখে নাও এবং এর কাজটা করে দাও।'
এরপর আবদুল্লাহ বিন হিলাল সেই লোকটাকে এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বলে, তুমি এই জায়গায় দেখ। তারপর তার চারদিকে একটা বৃত্ত এঁকে দিয়ে বলে, যখন তুমি কাউকে দেখতে পাবে, তাকে এই চিঠিটা দেবে।
সুতরাং লোকটা ওরকম করল। এক সয় তার সামনে দিয়ে শয়তানদের একটা দল গেল। অবশেষে তার সামনে বসে থাকা এক পাকা বুড়ো এল। আসনটা চারটে শয়তান উঁচু করে ধরে রেখেছিল। লোকটা শয়তান (বুড়ো)-কে দেখতে পেয়ে দূর থেকে চিঠিটা দেখাল। শয়তান তার কর্মীদের দিয়ে চিঠিটা নিয়ে নিল। তারপর সেটা পড়ল। পড়ার পর তাতে চুমু দিয়ে মাথার উপর রাখল। ফের সেটা পড়ল। তারপর চিৎকার করে উঠল। বুড়ো শয়তানের চিৎকার শুনে আগে চলে যাওয়া শয়তানরাও তার কাছে ফিরে এল এবং পিছনের শয়তানরাও এসে জড়ো হল। সবাই জানতে চাইল, ব্যাপার কী?
শয়তান বলল, এটা আমার এক বন্ধুর চিঠি। সে এতে লিখেছে: 'যদি তুমি তোমার ও আমার চাইতেও বেশি নিকৃষ্ট কাউকে দেখতে চাও, তবে এই পত্রবাহককে দেখে নাও এবং এর কাজটা করে দাও।' সুতরাং তোমার আমার কাছে একটা বোবা, কালা ও অন্ধ শয়তানকে নিয়ে এসো এবং তাকে সেই (ধনী) ব্যক্তির বাড়িতে পাঠাও, যাতে সে তার মেয়েকে বিয়ের পয়গাম দিয়ে আসে। (৫৩)
টিকাঃ
(৫০) কিতাবুল আজায়িব, মুহাম্মদ বিন মুন্যর। লিসানুল মীযান, ইবনু হাজার আস্কালানী, ৩ঃ৩৭২।
(৫১) কিতাবুল আজায়িব, আবু আব্দুর রহমান মুহাম্মদ ইবনুল মুন্যির হারাবী। লিসানুল মীযান, ৩ঃ ৩৭৩।
(৫২) কিতাবুল আজায়িব। লিসানুল মীযান, ৩ঃ ২৭৩।
(৫৩) কিতাবুল আজায়িব। লিসানুল মীযান, ৩ঃ ২৭৩, ২৭৪।