📄 নবীজীর বিরুদ্ধে শয়তানের প্রোপাগান্ডা
জনৈক সাহাবীর বর্ণনা: আমরা যখন 'লাইলাতুল আকাবা'য় রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) নিই, সেই সময় শয়তান আকাবার এক টিলার উপর থেকে এমন জোরে চিৎকার করে যে, অমন জোরালো আওয়াজ আমি কখনও শুনিনি। সে চিৎকার করে বলে- 'ওহে মক্কার বাসিন্দারা! তোমরা মুযাম্মাম (কাফিরদের দেওয়া নবীজীর বিকৃত নাম) ও তার বিধর্মী সাথীদের জব্দ করতে পারছ না! ওরা যে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য একতাবদ্ধ হচ্ছে।'
তখন নবীজী বলেন- এটা 'আযাব্বুল আকাবা' (শয়তান)-এর আওয়াজ। এরপর নবীজী শয়তানকে সম্বোধন করে বলেন-ওহে উযাইবাল আকাবাহ্! ওরে আল্লাহর দুশমন। আমার কথা মন দিয়ে শুনে রাখ, আমিও তোর সাথে অবশ্যই হেস্তনেস্ত করব। (৯)
টিকাঃ
(৯) দালায়িলুন নুবুওয়ত, বায়হাকী, ২৪ ৪৪৮। সীরাত, ইবনু হিশাম, ২:৫৭। ইবনু ইস্হাক।
📄 নবীজীর বিরুদ্ধে চক্রান্তে শয়তান শামিল
বর্ণনা করেছেন হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ): কুরাইশদের সব গোত্রের সর্দাররা একবার তাদের পরামর্শসভায় জমা হয়। অভিশপ্ত ইবলীসও একজন বয়স্ক মুরুব্বির রূপ ধরে তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। কুরাইশের সর্দাররা তাকে দেখার পর জানতে চায়, আপনি কে?
শয়তান বলে, আমি নজদ এলাকার এক বুজুর্গ। আপনারা যে উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছেন, তা আমি শুনেছি। তাই আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আপনারা আমার কাছ থেকে পাবেন বড়ই গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও মতামত।
কাফিররা বলে- ঠিক আছে, আপনি এই সভায় শরীক হয়ে যান। সুতরায় শয়তান সেই সভায় প্রবেশ করে এবং বলে, আপনারা ওই ব্যক্তি (নবীজী)-র বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন। আল্লাহর কসম! সেই সময় কাছাকাছি এসে গেছে, যখন ও আপনাদের ওপর প্রবল হয়ে যাবে।
কুরাইশদের এক সর্দার বলে- ও (নবীজী)-কে প্রথমে মজবুতভাবে বন্দী করতে হবে। তারপর কষ্ট দিতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না মারা যায়। যেমন ওর আগের নবীরা মারা গিয়েছিল তেমনই এই যুহাইরার পরিণতিও ওদের মতো হবে। (নাউযুবিল্লাহ।)
আল্লাহর দুশমন নজদের শায়খরূপী শয়তান বলে- আল্লাহর কসম! এটা কোনও কাজের কথা নয়। কেননা ও (নবীজী)-র কথা কয়েদখানা থেকে বের হয়ে ওর সঙ্গী সাথী (সাহাবী)-দের কাছে পৌঁছাবে এবং ওরা সঙ্গে সঙ্গে এসে আপনাদের উপর হামলা করে ওকে আপনাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। ফলে আপনাদেরকে আপনাদের এলাকা থেকে বহিষ্কার করে দেবে কিনা সে বিষয়ে আমি কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারি না। সুতরাং আপনারা অন্য কোন পন্থা ভাবুন।
তখন অন্য এক সর্দার বলল- ও (মুহাম্মদ (সাঃ))-কে দেশ থেকে বের করে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা হোক। কারণ ও এদেশ থেকে চলে গিয়ে অন্য কোথাও যা খুশি করুক গে, তাতে আপনাদের কোনও ক্ষতি হবে না। আপনাদের থেকে ওর অনিষ্ট দূর হয়ে যাবে এবং আপনারা সুখে-স্বস্তিতে থাকতে পারবেন। আর ওর অনাচার অন্যদের সামনেই হবে।
শয়তান তখন ফের বলে- আল্লাহর কসম! আপনার এই প্রস্তাবও কোনও গুরুত্ব রাখে না। আপনারা কি ও (নবীজী)-র কথার মাধুর্য আর ভাষার কারুকার্য লক্ষ্য করেননি! আপনারা কি দেখেননি ওর কথাবার্তা শ্রোতাদের মন-মগজে কেমনভাবে সাড়া ফেলে! তাই আমি আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আপনারা যদি অমন করেন, তবে ও অন্য অঞ্চলে গিয়ে সেখানকার মানুষজনকে ডাক দিতে শুরু করবে এবং তারা ওর ডাকে সাড়া দেবে। তারপর এক সময় তাদের নিয়ে ও আপনাদের উপর চড়াও হবে এবং আপনাদের দেশছাড়া করবে ও আপনাদের সর্দারদের কতল করবে।
তখন কুরাইশের সর্দাররা বলে হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এই শায়খ (শয়তান) ঠিকই বলেছে। অতএব আপনারা অন্য কোনও উপায়ের কথা চিন্তা ভাবনা করুন।
আবূ জাহল বলে- আমিও একটা প্রস্তাব পেশ করছি, যা আমার মাথায় আসছে। আশা করি আপনারা আমার প্রস্তাবটা বিবেচনা করবেন। এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হতেই পারে না।
কাফির সর্দাররা বলল- কী সেই প্রস্তাব?
আবূ জাহল বলল- প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী ও সাহসী যুবক নিয়ে একটা টিম গড়তে হবে এবং তাদের হাতে থাকবে একটা করে ধারালো তলোয়ার। তারা সবাই ও (নবীজী)-র উপর এককোপে খুন করার মতো তলোয়ার চালাবে। এভাবে ওকে হত্যা করা হলে, তার দায় সমস্ত গোত্রের উপর পড়বে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এভাবে হত্যা করলে (নবীজীর গোত্র) বনী হাশিম বদলা নেবার জন্য কুরাইশের সমস্ত গোত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না। তা সত্ত্বেও যদি ওরা আমাদের সাথে যুদ্ধ বাধায়, তবে আমরা ওদেরকে কতল করে দেব এবং এভাবে ওদের হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যাব।
শয়তান বলে- আল্লাহর কসম! এই হল একটা প্রস্তাব। যা ওই যুবক বলেছে। আমারও এই মত। এছাড়া অন্য কিছু নয়।
ওই প্রস্তাবে সবাই একমত হবার পর সভা বরখাস্ত হয়।
এবং ঠিক সেই সময় জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে হযরত জিব্রাঈল গিয়ে নিবেদন করেন- আজ আপনি আপনার বিছানায় আরাম করবেন না। তারপর তিনি কাফিরদের চক্রান্তের কথাও তাঁকে বলেন এবং আল্লাহ তাঁকে সেই সময় হিজরতের নির্দেশ দেন। (১০)
টিকাঃ
(১০) ইবনু ইস্হাক। ইবনু জারীর। ইবনু মুনযির। ইবনু আবী হাতিম। ابو নুআইম। দালায়িলুন নুবুওঅত, বায়হাকী।
📄 বদর যুদ্ধে শয়তানের অংশ নেওয়া ও পালিয়ে যাওয়া
বর্ণনা করেছেন হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ): বদর যুদ্ধে শয়তান এসেছিল তার এক বাহিনী নিয়ে, ঝাণ্ডা উঁচিয়ে, মুল্লিজ্ গোত্রীয় মানুষদের রূপ ধরে। সেদিন সে নিজে ছিল সারাক্কহ্ বিন মালিক বিন জাশামের ছদ্মবেশে। মক্কার কাফির বাহিনীর উদ্দেশে সে বলছিল-আজ মুসলমানদের কেউ-ই তোমাদের উপর জয়ী হতে পারবে না। আজ আমি তোমাদের মদদ্গার (সাহায্যকারী)।
সেই সময় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) শয়তানের দিকে ফেরেন। শয়তান যখন তাঁকে দেখতে পায়, তখন তার হাত ছিল এক মুশরিকের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে শয়তান নিজের হাত টেনে নিয়ে পিছন ফিরে পালাতে লাগে। তার শয়তানী সেনাবাহিনীও পালাতে শুরু করে।
তখন সেই মুশরিক বলে- ওহে সারাক্কহ্! তুমি তো আমাদের মদদ্গার (অথচ এখন পাল্লাচ্ছ কোথায়)?
শয়তান পালাতে পালাতে বলে- আমি যা কিছু দেখছি, সেসব তোমরা দেখতে সক্ষম হবে না, অবশ্যই আমি আল্লাহকে ভয় করি। আল্লাহ বড়ই কঠিন শাস্তিদানকারী। (১১)
টিকাঃ
(১১) তাফসীর, ইবনু জারীর (সূরা আল্-আনফাল)। ইবনু মুনযির। ইবনু আবী হাতিম। ইবনু মারদাবিয়াহ্। দুররুল মানসুর, ৩: ১৬৯। দালায়িলুন নুবুওয়ত, বায়হাকী, ৩ঃ ৭৯-৭৯।
📄 বদর যুদ্ধে ইবলীসের ব্যাকুলতা
হযরত রিফাআহ্ বিন রাফিই আনসারী (রাঃ) বলেছেনঃ বদর যুদ্ধে ফিরিস্তাদেরকে মুশরিকদের হত্যা করতে দেখে ইল্লীস ভয়ের চোটে জান বাঁচানোর জন্যে পালাতে শুরু করে। হারিস বিন হিশাম (আবু জাহল) ইবলীসকে সারাক্কহ্ বিন মালিক ভেবে ধরতে যায়। ইল্লীস তখন আবূ জাহলের বুকে এমন এক ঘুসি মারে যে, সে পড়ে যায়। তারপর ইবলীস ওখান থেকে পালিয়ে নিজেকে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফেলে এবং হাত তুলে এই দুআ চায় - اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ نَظْرَتَكَ إِيَّايَ হে আল্লাহ! (কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার) যে অবকাশ আমাকে দেওয়া হয়েছে, আমি তা ভিক্ষা চাইছি আপনার কাছে। (১২)
হযরত মা'মার (রহঃ) বলেছেনঃ (যুদ্ধশেষে) মক্কার কাফিররা সারাক্কহ্ বিন মালিকের কাছে গিয়ে তার উপর হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে আসার অভিযোগ চাপালে সে তা অস্বীকার করে বলে, অমন কোনও কথা তো আমি বলিনি। (১৩)
টিকাঃ
(১২) তবারানী। আবূ নুআইম।
(১৩) আবদুর রায্যাক।