📄 কাঁকরের আঘাতে যমীনে পুঁতে গেছে ইবলীস
(হাদীস) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, জনাব রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন :
إِنَّ جِبْرِيلَ ذَهَبَ بِإِبْرَاهِيمَ إِلَى جَمْرَةِ الْعَقَبَةِ فَعَرَضَ لَهُ الشَّيْطَانُ فَرَمَاهُ بِسَبْع حَصَبَاتٍ فَسَاحَ ثُمَّ أَتَى بِهِ الْجَمْرَةَ الْوُسْطَى فَعَرَضَ لَهُ الشَّيْطَانُ فَرَمَاهُ بِسَبْع حَصَيَاتٍ فَسَاحَ ثُمَّ إِلَى بِهِ الْجَمْرَةَ الوسطى فَعَرَضَ لَهُ الشَّيْطَانُ فَرَمَاهُ بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ فَسَاخَ -
হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হযরত ইবরাহীমকে নিয়ে জামরাতুল আকাবায় পৌঁছলে শয়তান তাঁকে বাধা দেয়। তখন তিনি তাকে সাতবার কাঁকর ছুঁড়ে জামরায় গিয়ে পৌঁছেন। সেখানেও শয়তান বাধা দেয়। হযরত ইব্রাহীম ফের তাকে সাতবার কাঁকর ছুঁড়ে মারেন। এবং ফের সে যমীনে পুঁতে যায়। এরপর জিব্রাঈল তাঁকে নিয়ে আরেকটি 'জামরায় আসেন। সেখানেও শয়তান তাঁদের বাধা দেয় এবং ফের তিনি সাতবার কাঁকর ছুঁড়ে মারেন। সুতরাং ফের শয়তান মাটির মধ্যে পুঁতে যায়। (২২)
টিকাঃ
(২২) মুস্লাদে আহমাদ, ১ঃ ৩০৬। মাজমাউয যাওয়াইদ, ৩ঃ ২৫৯। কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ১২১৫৪।
📄 হযরত যুলকিফলের মোকাবিলায় শয়তান
হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারিস (রহঃ) বলেছেন: এক নবী তাঁর সাহাবীদের সম্বোধন করে বলেছিলেন তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে কখনও রাগ করবে না বলে কথা দেবে এবং (এই গুণের বদৌলতে) আমার মতো মর্যদায় পৌছবে, আর আমার ইন্তিকালের পর আমার কওমের মধ্যে আমার দায়িত্ব পালন করবে?
এক যুবক বলেন, আমি কথা দিচ্ছি।
সেই নবী ফের একবার সেই প্রস্তাব দিলেন।
যুবকটিও একই কথা বললেন।
সুতরাং সেই নদীর ইতিকালের পর যুববতি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। সেই সময় শয়তানও তাঁকে রাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। তখন তিনি একটি লোককে শয়তানকে ধরতে বললেন। লোকটি ফিরে এসে বলল যে, সে তাঁকে দেখতে পায়নি। শয়তান ফের এসে তাঁকে রাগাতে লাগল। তিনি আরেকজন লোককে বললেন শয়তানকে ধরতে। সেও বলল যে, সে কাউকে দেখতে পায়নি। ফের যখন শয়তান তাঁকে রাগাতে এল, অমনি তিনি নিজেই (রাগ না করে) শয়তানের হাত ধরে ফেললেন। শয়তান তখন (রাগানোর কাজে ব্যর্থ হয়ে) হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে যায়। এই ঘটনার ভিত্তিতে তাঁর নাম হয় ‘যুল কিফল’। কেননা তিনি কখনও রাগ প্রকাশ করেন নি। (২০)
টিকাঃ
(২০) যামুল গদ্বব, ইবনু আবিদ দুনইয়া। ইবনু জারীর। ইবনু মুনযির। ইবনু আবী হাতিম।
📄 হযরত আইয়ুবের (আঃ) ধৈর্য ও শয়তানের নির্যাতন
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত: শয়তান আল্লাহর দরবারে আবেদন করেছিল, হে প্রভু! আমাকে (হযরত) আইয়ুব (আঃ)-এর উপর প্রভাব বিস্তার করার অনুমতি দিন। আল্লাহ বললেন, তাঁর সম্পদ-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততির উপর প্রভাব বিস্তার করার অনুমতি তোকে দেওয়া হল কিন্তু তাঁর দেহের উপর নয়।
সুতরাং শয়তান তাঁর বাহিনীকে জড়ো করে বলল, আমাকে (হযরত) আইয়ুব (আঃ)-এর উপর কর্তৃত্ব করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা তোমাদের কৃতিত্ব দেখাও। তখন শয়তান বাহিনী আগুনের রূপ ধরে সামনে এল। তারপর পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত পানি হয়ে বয়ে গেল। শয়তান তখন তার একটা বাহিনীকে পাঠাল হযরত আইয়ুবের ক্ষেতের দিকে। একটা বাহিনীকে পাঠাল তাঁর উটগুলোর কাছে। একটা বাহিনী পাঠাল তাঁর গরুর পালের উপর। একটা বাহিনী পাঠাল ছাগলপালে। তারপর তাদের উদ্দেশ্যে শয়তান বলল, কেবলমাত্র ধৈর্য সবর ছাড়া (হযরত) আইয়ুব তোমাদের হাত থেকে হিফাযতে থাকতেই পারবে না।
সুতরাং শয়তানের দলবল এরপর হযরত আইয়ুবকে বিপদের পর বিপদে ফেলতে লাগল। ক্ষেতের তত্ত্বাবধায়ক এসে বলল, আপনি দেখেননি, আল্লাহ আপনার ফসলের উপর আগুন নামিয়ে দিয়েছেন, যা আপনার ক্ষেতের ফল ফসলগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। এরপর হযরত আইয়ুবের কাছে উটচালক এসে বলল, আপনি কি দেখেছেন, আল্লাহ আপনার উট পালের উপর মুসীবত নামিয়েছেন, যার কারণে উটগুলো সব মারা গেছে।
তারপর গরু ছাগলের দেখভালকারীরাও হযরত আইয়ুবের কাছে এসে বলল, আপনি দেখবেন চলুন, আল্লাহ আপনার গরু-ছাগলের উপর দুশমন পাঠিয়েছেন, তারা ওগুলোকে সাবাড় করে দিয়েছে।
অর্থাৎ হযরত আইয়ুবের তখন সম্পদ-সম্পত্তি শেষ হয়ে গেল। রইলেন কেবল তিনি আর তাঁর সন্তান-সন্ততি।
শয়তান একদিন হযরত আইয়ুবের সব ছেলেকে একটা বড় বাড়িতে জড়ো করল। তারপর তারা সবাই যখন একসাথে খানা-পিনায় ব্যস্ত হল, সেই সময় শয়তান এমন জোরে বাতাস (ঝড়) চালাল যে, বাড়িটার থামগুলো উপড়ে গেল এবং গোটা বাড়িটাকে হযরত আইয়ুবের ছেলেদের উপর ফেলল।
এরপর শয়তান একটা ছেলের রূপ ধরে, কানে বালা পরে, হযরত আইয়ুবের কাছে গিয়ে বলল, আপনি কি আপনার পালনকর্তার ব্যবহার দেখেছেন? আপনার ছেলেরা সবাই যখন বাড়িতে একত্রিত হয়ে খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত ছিল, সেই সময় উনি এমন জোরে ঝড় চালিয়েছেন যে, বাড়ির খুঁটিগুলো পর্যন্ত উপড়িয়ে দিয়েছেন এবং গোটা বাড়িটা আপনার ছেলেদের উপর হুড়মুড় করে ভেঙে ফেলিয়েছেন। আপনি যদি ওদেরকে খাবার জিনিসপত্র আর রক্তে মাখামাখি অবস্থায় দেখতেন, তাহলে না-জানি আপনার কী অবস্থা হত।
হযরত আইয়ুব জিজ্ঞাসা করেন, তুমি তখন কোথায় ছিলে? শয়তান বলে, আমি তো ওদের সাথেই ছিলাম।
হযরত আইয়ুব বলে, তা তুমি কীভাবে বেঁচে গেলে? শয়তান বলল, এই এমনিই।
হযরত আইয়ুব বলেন, তাহলে তুই শয়তান। এরপর হযরত আইয়ুব বলেন, আমি এখন সেই অবস্থায় আছি, যখন আমার মা আমাকে প্রসব করেছিলেন। একথা বলে তিনি উঠে পড়েন। মাথা ন্যাড়া করান। তারপর নামাযের মুসল্লায় দাঁড়িয়ে যান।
সেই সময় শয়তান (নিজের ব্যর্থতা আর হযরত আইয়ুবের ধৈর্য সবর দেখে) এমনভাবে কেঁদেছিল যে, তার সেই কান্না আকাশ পৃথিবীর সবাই শুনেছিল।
এরপর শয়তান আসমানে গিয়ে (সেই সময় শয়তানের পক্ষে আসমানে যাবার অনুমোদন ছিল) আল্লাহকে বলে, হে প্রভু! (হযরত) আইয়ুব তো আমার হাত থেকে নিরাপদে বেরিয়ে গেল। এবার আপনি আমাকে খোদ ওর শরীরের উপর হামলা করার অনুমতি দিন। কেননা আপনার অনুমতি ছাড়া আমি ওর উপর চড়াও হতে পারব না।
আল্লাহ বলেন, ঠিক আছে, যা, আমি তোকে ওর শরীরের উপর হামলা করার অনুমতি দিলাম।
শয়তান তখন ফের হযরত আইয়ুবের কাছে এল এবং তাঁর পায়ের তলায় এমনভাবে ফুঁক দিল যে তাঁর আপাদমস্তক কেঁপে উঠল। তারপর তাঁর সারা গায়ে ফোঁড়া হল, একসময় তাঁকে ছাইয়ের গাদায় রাখা হল। শেষ পর্যন্ত তাঁর পেটের নাড়ি-ভুঁড়িও বের হয়ে পড়ল।
সেই কঠিন সময়ে একজন স্ত্রীই তাঁর সেবা-যত্ন করতেন। একদিন তাঁর সেই স্ত্রী তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনার সেবা যত্ন করার ও অনাহারে থাকার কারণে আমার অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। আমার যাবতীয় দামি জিনিসপত্র অন্নের বিনিময়ে বেচে দিয়ে আপনাকে খাইয়েছি। আপনি দুআ করুন না, যেন আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করেন। কিন্তু ধৈর্য সবরের মূর্তপ্রতীক হযরত আইয়ুব বলেন, আমরা সত্তর বছর যাবত আল্লাহর নিঅমাতে (আরাম-আয়েশে) ছিলাম। এখন ধৈর্য সবর করো, যাতে দুঃখ কষ্টের মধ্যেও সত্তর বছর কাটাতে পারি। সুতরাং সেই অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের পরীক্ষার মধ্যেও তিনি সত্তর বছর কাটিয়ে দেন। (২৪)
টিকাঃ
(২৪) কিতাবুয যুহদ, ইমাম আহমাদ। তাফসীর, ইবনু আবী হাতিম। আকامুল মারজান।
📄 হযরত আইয়ুবের (আঃ) যন্ত্রণায় শয়তানের আনন্দ
হযরত তালহা বিন মুসররফ, (রহঃ) বলেছেন: অভিশপ্ত ইবলীস বলেছে- (হযরত) আইয়ুবকে দেখে আমি একটুও খুশি হতাম না, কেবল যখন সে যন্ত্রণায় কারাতো তখনই আমার ভালো লাগত। ভাবতাম, আমি ওকে ভালই কষ্ট দিতে পেরেছি। (২৫)
টিকাঃ
(২৫) যাওয়াইদুয যুহদ, عبدالله বিন আহমাদ। মাকায়িদুশ শায়তান, ইবনু আবিদ্ দুনইয়া। দুররুল মানসুর, ৪ঃ ৩৩০।