📄 ইবলীস বসেছে নৌকার বাঁশে
বর্ণনায় হযরত আত্বা (রহঃ) ও হযরত যাহহাক (রহঃ) : নূহের জাহাজে বসার জন্য ইবলীস এলে হযরত নূহ তাকে হাটিয়ে দেন। শয়তান বলে, হে নূহ! আমাকে তো (কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার) সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমার উপর আপনার কোনও ক্ষমতা চলবে না (অর্থাৎ আপনি আমাকে আটকাতে পারবেন না)। হযরত নূহ ভাবলেন, ও তো ঠিক কথাই বলেছে। তাই ওকে জাহাজের মাস্তলে বসার অনুমতি দেন। (১১)
টিকাঃ
(১১) তারীখ, ইবনু আসাকির।
📄 নূহের (আঃ) নৌকা, শয়তান ও আঙুর
হযরত মুসলিম বিন ইয়াসার (রহঃ) বলেছেনঃ হযরত নূহ (আঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিল যে, তিনি যেন নিজের সাথে (জাহাজে) এক জোড়া করে প্রতিটি সৃষ্টিবস্তু তুলে নেন। সেগুলির সাথে একজন ফিরিস্তাও থাকবেন। সুতরাং তিনি জোড়ায়-জোড়ায় প্রত্যেক সৃষ্টিকে জাহাজে তোলেন, বাদ পড়ে গিয়েছিল কেবল আঙুর। ইবলীস সেই সময় আঙুর নিয়ে এসে বলল, এগুলোর সবই আমার। হযরত নূহ ফিরিস্তার দিকে তাকালেন। সুতরাং আপনি এর সঙ্গে সুন্দরভাবে ভাগাভাগি করে নিন। হযরত নূহ বললেন, খুব ভালো! তাহলে আঙুরের তিনভাগের দু'ভাগ আমার আর একভাগ ওর। ফিরিস্তাটি বললেন, 'আপিন এর চাইতেও সুন্দরভাবে ভাগ করুন।' তখন হযরত নূহ বলেন, 'অর্ধেক আমার, অর্ধেক ওর।' ইবলীস বলে, 'না, সবই আমার। হযরত নূহ তখন ফিরিস্তার দিকে তাকান। ফিরিস্তা বলেন, এ আপনার অংশীদার। হযরত নূহ বলেন, খুব ভালো। তিনভাগের এক ভাগ আমার এবং তিনভাগের দুভাগ ওর। ফিরিস্তা বলেন, খুবই সুন্দর ভাগ করেছেন আপনি। আপনি পরোপকারী। আপনি এ জিনিস খাবেন আঙুর রূপে। আর ও খাবে তিনদিন ধরে কিশমিস বানিয়ে ও নির্যাস বের করে। (১২)
ইমাম মুহাম্মদ বিন সীরীন (রহঃ)-এর সূত্রেও এরকম বর্ণনা আছে। তবে শেষে এ রকম আছে আপনি এ (আঙুর) কে জ্বাল দেবেন, যার দ্বারা তিনভাগের দুভাগ মন্দজিনিস বেরিয়ে যাবে, সেটা হবে শয়তানের, আর বাকি তিনভাগের একভাগ হবে আপনার (অর্থাৎ মানুষের) পান করার জন্য। (১৩)
হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছেঃ শয়তান আঙুরের গোছা নিয়ে হযরত নূহের সাথে ঝগড়া করে এবং বলে, এটা আমার। হযরত নূহ বলেন, না এটা আমার। অবশেষে এভাবে মীমাংসা হয় যে এক তৃতীয়াংশ হযরত নূহের এবং দুই তৃতীয়াংশ শয়তানের। (১৪)
টিকাঃ
(১২) ইবনু আবী হাতিম।
(১৩) তাফসীর, ইবনু মুনযির।
(১৪) সুনানু নাসায়ী।
📄 হযরত মূসার (আঃ) সাথে শয়তানের সাক্ষাৎ
হযরত ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন: হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথেও শয়তান সাক্ষাৎ করেছিল। এবং সে বলেছিল হে মূসা! আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাঁর রসূল হিসাবে মনোনীত করেছেন। এবং আপনার সঙ্গে তিনি কথাও বলেছেন। তা, আমি তো আল্লাহর এক সৃষ্টি। আমি একটা গুনাহ করে ফেলেছি। এখন তাওবা করতে চাইছি। আপনি আল্লাহর দরবারে আমার জন্য সুপারিশ করুন, যাতে তিনি আমার তাওবা কবুল করেন।
হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর উদ্দেশে দুআ করেন। আল্লাহ বলেন, ওহে মুসা! আমি তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছি।
সুতরাং হযরত মুসা (আঃ) ইবলীসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এবং তাকে বলেন, আমাকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তুই যদি হযরত আদমের কবরে সাজদা করিস, তবে তোর তাওবা কবুল করা হবে।
শয়তান তখন অহংকারে উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকে, আমি যাকে বেঁচে থাকাকালে সাজদা করিনি, মারা যাবার পর তাকে কীভাবে সাজদা করতে পারি!
এরপর ইবলীস বলে, হে মুসা! আপনি যেহেতু আমার জন্য সুপারিশ করেছেন, সেহেতু আমার উপর আপনার হক এসে গেছে। তাই বলছি, আপনি তিনটি ক্ষেত্রে আমার কথা স্মরণ করবেন। (অর্থাৎ আমার বিষয়ে হুঁশিয়ার থাকবেন।) ধ্বংসের সেই ক্ষেত্র বা পরিস্থিতি তিনটি হল এইঃ
(১) যখন রাগ হবে, মনে করবেন, ওটা আমার প্রভাবে হয়েছে, যা আপনার অন্তরে পড়েছে। আমার চোখ সেই সময় আপনার চোখে বসানো থাকে। এবং আমি সেই সময় আপনার রক্তের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকি।
(২) যখন দু'দল সৈন্য পরস্পর যুদ্ধ করতে থাকে, সেই সময় আমিই মুজাহিদের কাছে আসি। এবং তাকে তার বিবি-বাচ্চার কথা মনে পড়িয়ে দিতে থাকি, যতক্ষণ না সে পিছনে ফিরে পালায়।
(৩) না-মাহ্রম (যার সঙ্গে বিয়ে অবৈধ নয় এমন) মহিলার সঙ্গে বসা থেকেও বাঁচবেন। কেননা সেই সময় আমি পরস্পরের দূত হিসাবে কাজ করি। (১৫)
টিকাঃ
(১৫) ইবনু আবিদ দুনয়া, মাকায়িদুশ শায়তান (৪৪) তালবীসুল ইবলীস। ইহইয়াউল উলুম, ৩ঃ ৩১। দুররুল মানসুর, ১ঃ ৪৫১। মাসায়িবুল ইন্সান।
📄 হযরত মূসার (আঃ) সাথে শয়তানের বাক্যালাপ
হযরত মূসা (আঃ) একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। সেই সময় অভিশপ্ত ইবলীস তাঁর কাছে আসে। তার মাথায় তখন ছিল একটা রঙচঙের টুপি। হযরত মূসার কাছাকাছি এসে শয়তান টুপিটা খুলে বলে, আস্ সালামু আলাইকা ইয়া মুসা!
হযরত মূসা জানতে চান, তুমি কে হে? - আমি ইবলীস।
আল্লাহ্ তোর সর্বনাশ করুন। কেন এসেছিস এখানে?
- আপনার হাতে মুসলমান হবার জন্যে। কারণ আপনার মান-মর্যাদা অনেক বেশি আল্লাহর দরবারে।
তোর মাথায় একটু আগে কী যেন দেখছিলাম? - ওটা দিয়ে আমি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করি।
মানুষ কী কাজ করলে তুই ওকে কাবু করে ফেলিস? - যখন মানুষ আত্মপ্রশংসায় ডুবে যায় এবং নিজের কাজকে খুব বড় করে দেখে। - আপনাকে আমি তিনটি বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি।
(১) যে মহিলা আপনার জন্য বৈধ নয়, তার সঙ্গে নির্জনে থাকবেন না। কারণ যখন কোনও মানুষ না-মাহরাম মহিলার সঙ্গে নির্জনে থাকে, সেই সময় আমিও সেখানে উপস্থিত থাকি এবং তাদেরকে পাপকাজে জড়িয়ে দিয়ে তবেই ছাড়ি।
(২) আল্লাহর সঙ্গে আপনি কোনও অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করবেন। কেননা যে মানুষ আল্লাহর কাছে কোনও অঙ্গীকার করে, আমি তার পিছনে লেগে যাই এবং শেষ পর্যন্ত তাকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়েই ছাড়ি।
(৩) আর আপনি যখন দান-খায়রাতের জন্য টাকা পয়সা বের করবেন, তা অবশ্যই খরচ করবেন। কেননা, যে ব্যক্তি দান-খায়রাতের জন্য টাকা-পয়সা বের করে, আমি তার পিছনে লেগে যাই, যাতে সে ওই টাকা-পয়সাগুলো হকদারদের না দেয়।
এরপর শয়তান তিনবার ধ্বংস ধ্বংস ধ্বংস বলে চিৎকার করে চলে যায়। আর হযরত মূসাও জেনে যায় শয়তানের বিষয়ে মানুষকে কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। (১৬)
টিকাঃ
(১৬) মাকায়িদুশ শাইতান (৭৪), ইবনু আবিদ দুনয়া। তালবীসুল ইবলীস। ইহইয়াউল উলুম, গাযালী, ৩ঃ ৩১-৯৭।