📄 ‘বিসমিল্লাহ্’র বিস্ময়কর ক্ষমতা
বর্ণনায় হযরত ইবনু উমর (রাঃ): একবার হযরত উমর বিন খত্তাব (রাঃ) জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহাবীদের সঙ্গে মসজিদে বসেছিলেন। এবং নিজেদের মধ্যে কোরআনের ফাযায়িল সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলেন, সূরা 'বারাআত'-এর শেষাংশ সর্বোত্তম। আরেকজন বলেন, 'কা-ফ-হা-ইয়া-আইন-সোয়াদ' ও 'ত্ব-হা সর্বোত্তম। এভাবে প্রত্যেকে আপন আপন জানা তথ্য অনুসারে বিভিন্ন উক্তি ব্যক্ত করেন। ওঁদের মধ্যে হযরত উমর বিন মাদী কারব আয-যুবাইদী (রাঃ)ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ওঁদের মধ্যে হযরত উমর বিন মাদী কারব আয-যুবাইদী (রাঃ)-ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, হে আমীরুল মুমেনীন! আপনার 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'-এর বিস্ময়র্কে বিস্মারিত হলেন দেখছি! আল্লাহ্র কসম! 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'-এর মধ্যে এক অত্যাশ্চর্য বিষয় রয়েছে।
একথা শুনে হযরত উমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) সোজা-হয়ে বসলেন। তারপর বললেন, হে আবূ মাসূর! আপনি আমাদের 'বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম'-এর বিস্ময়কর বিষয়টি বলুন সুতরাং হযরত উমর বিন মাদী কাব্ (রাঃ) বর্ণনা শুরু করলেন:
হে আমিরুল মুমেনীন! জাহিলিয়্যাতের জামানায় (মহানবী (সাঃ) কর্তৃক ইসলাম প্রচারের পূর্বযুগে) একবার আমরা কঠিন দুর্ভিক্ষের শিকার হই। সেই সময় একদিন আমি রুজির সন্ধানে জঙ্গলে ঘোড়া নিয়ে যাই। ওই অবস্থায় আমি যাচ্ছিলাম। এমন সময় আমার সামনে একটা ঘোড়া, কিছু গবাদি পশু ও একটা তাঁবু নজরে পড়ে। তাঁবুর কাছে পৌঁছতে সেখানে একজন খুবই সুন্দরী মহিলাকে দেখতে পাই এবং এক বৃদ্ধকে তাঁবুর সামনে হেলান দিয়ে পড়ে থাকতে দেখি। আমি তাঁকে বলি, 'তোমার কাছে যা কিছু আছে, আমাকে দিয়ে দাও। তোমার মা তোমাকে ধ্বংস করুক।
সে বলে, 'তুমি যদি আতিথেয়তা চাও, তো নেমে এসো। এবং সাহায্য চাও তো বলো, আমরা তোমাকে সাহায্য করব।'
আমি বললাম, 'তোমার মা তোমাকে ধ্বংস করুক! এগুলো সব আমাকে দিয়ে দাও।'
তখন সে এমন দুর্বল বুড়োর মত উঠল, যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তারপর 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলতে বলতে আমার দিকে এগিয়ে এল। এবং আমাকে ধরে টানতে লাগল। ক্রমশ আমি নীচে চলে গেলাম এবং সে আমার উপরে চড়ে বসল। সেই সময় সে বলল, 'তোমাকে মেরে ফেলব না ছেড়ে দেব'।
আমি বললাম, 'ছেড়ে দাও।'
সুতরাং সে আমার উপর থেকে উঠে গেল।
আমি মনে মনে বললাম, 'ওহে উমর! তুমি হলে আরবের এক নামকরা বীর। তাই এই বুড়োর থেকে পালানোর চাইতে তোমার মরে যাওয়াই ভালো।' সুতরাং আমার মন-মগজ আমাকে লড়াই করার জন্য ফের উত্তেজিত করল। আমি সেই বুড়োকে বললাম, 'তোমার মা তোমাকে বরবাদ করুক! এই জিনিসগুলো আমাকে দিয়ে দাও।'
তখন ফের সে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলতে বলতে আমার দিকে এগিয়ে এল। এবং আমাকে এমন জোরে টানল যে, আমি তার নীচে চলে গেলাম এবং সে আমার বুকের উপর চড়ে বসল। বলল, 'তোমাকে হত্যা করব না ক্ষমা করব?' আমি বললাম, 'ক্ষমা করো।' (সুতরাং সে আমাকে ছেড়ে দিল।) ফের আমি বললাম, 'তোমার মা তোমাকে খতম করে দিক! তোমার যাবতীয় মালসম্পদ আমাকে দিয়ে দাও।'
সে ফের 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলতে বলতে আমার কাছে এল। তো আমার গা শিউরে উঠল। এবং সে আমাকে এমনভাবে টান মারল যে, আমি একেবারে তার নীচে গিয়ে পড়লাম। তখন আমি বললাম, 'এবারেও আমাকে ছেড়ে দাও।'
সে বলল, 'এই তিন বারের মাথায় তোমাকে তো আমি ছাড়ব না।' এরপর সে বলল, 'ওহে বাঁদী! ধারালো তলোয়ার নিয়ে এসো।' বাদী তলোয়ার নিয়ে বুড়োর কাছে এল, বুড়োর তখন আমার টিকি কেটে দিল। তারপর আমার উপর থেকে উঠে গেল।
হে আমীরুল মুমেনীন! আমাদের এই রীতি ছিল যে, টিকি কেটে দিলে পুনরায় তা না উঠা পর্যন্ত আমরা বাড়ি ফিরতে লজ্জা বোধ করতাম। এজন্য আমি এক বছর যাবৎ সেই বুড়োর সেবা করতে রাজী হয়ে গেলাম।
একবছর পূর্ণ হওয়ার পর সেই বুড়ো আমাকে বলল, 'ওহে উমর, আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে জঙ্গলে চলো।'
তো আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। সে এক জঙ্গলের কাছে পৌঁছে, সেখানকার বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে, 'বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম'-এর আওয়াজ দিল। ফলে সমস্ত পাখ-পাখালি আপনা আপনী বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তারপর দ্বিতীয় আওয়াজ দিতে খেজুর গাছের মতো লম্বা পশমের পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে দেখা যেতে লাগল। যাকে দেখে আমার গা শিউরে উঠল। সেই বুড়ো তখন আমাকে বলল, 'ওহে উমর! ঘাবড়িও না। আমরা হেরে যাওয়ার মুখোমুখি হলেও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমের বদৌলতে জিতে যাব।' কিন্তু মোকাবিলায় আমরাই হেরে গেলাম। আমি তখন বললাম, 'আমার মনিব লাত ও উয্যার কারণে হেরে গেছেন।' একথা শুনে বুড়ো আমাকে এমন এক থাপ্পড় মারল যে আমার মাথা উপড়ে যাবার যোগাড় হলো। বললাম, 'আর কখনও এমন কথা বলব না।' তারপর মোকাবিলা আমরা জিতে গেলাম। তখন আমি বললাম, 'আমার মালিক 'বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীমের দৌলতে জিতে গেছেন।'
বুড়ো তখন পরাজিত প্রতিদ্বন্দীকে তুলে ধরে চারাগাছ পোঁতার মতো মাটিতে পুঁতে দিল। তারপর তার পেট চিরে তার ভিতর থেকে কালো লণ্ঠনের চিমনির মতো কোনও জিনিস বের করল। তারপর বলল, 'ওহে উমর! এই হল এই দুশমনের প্রতারণা ও কুফ্র।'
আমি বললাম, 'আপনার সাথে এই হতভাগার দ্বন্দ্বটা কী নিয়ে?' সে বলল, 'ওই যে, মেয়েকে তুমি তাঁবুর মধ্যে দেখেছ, ও হল নারিআহ্ বিন্তে মারদ। জ্বিনদের কাছে আমার এক ভাই বন্দী আছে। সে হযরত ঈসা মাসীহ্ (আঃ)-এর দ্বীনের অনুসারী। মেয়েটি ওই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ওদের মধ্যে থেকে একটা করে জ্বিন প্রতি বছর আমার সাথে লড়াই করতে আসে। এবং আল্লাহ আমাকে 'বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম' এর বরকতে ওদের বিরুদ্ধে জিতিয়ে দেন।
এরপর আমরা ময়দানে-প্রান্তরে চলতে লাগলাম, একসময় সেই বুড়ো আমার হাতে ভর দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি তখন তার খাপ থেকে তলোয়ার টেনে নিয়ে, তার উপর আঘাত করে, হাটুর নীচ থেকে কেটে দিলাম। সে তখন আমাকে বলে উঠল, 'ওরে গাদ্দার! তুই এত ভয়ানক ধোঁকা দিলি। বুড়োর আর্তনাদে কর্ণপাত না করে আমি তখন টুকরো টুকরো করতে লাগলাম। তারপর তাঁবুর কাছে গেলাম। মেয়েটি আমার সামনে এল। বলল, 'ওহে উমর! বুড়ো শায়খ কী করল?' বললাম, 'জ্বিন তাকে কতল করে ফেলেছে!' সে বলল, 'তুমি মিথ্যা কথা বলছ! ওহে বিশ্বাসঘাতক! তুমিই ওকে হত্যা করেছ।' এরপর সে তাঁবুর ভিতরে ঢুকে কাঁদতে লাগল। এবং কিছু কবিতা বলল। আমি তখন তাকেও খুন করার জন্য তাঁবুর মধ্যে গেলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। মনে হল যমীন তাকে গিলে নিয়েছে। (২১)
টিকাঃ
(২১) আল্-মাজালিসাহ্, দীনূরী।
📄 বাচ্চাচোর জিন
বর্ণনায় সাদ বিন নাসর : একদল জ্বিন বনী আসাদের সর্দারের কাছে (বাইরের মানুষের রূপ ধরে) এসে বলল, 'আমাদের একটা উটনী হারিয়ে গেছে। তা, আপনি যদি (উটনী খোঁজার সুবিধার্থে) সাকীফ গোত্রের কাউকে আমাদের সঙ্গে দেন, তো বড় ভাল হয়।
তিনি এক বালককে ওদের সাথে পাঠালেন। ওদের মধ্যে একজন বাচ্চাটিকে তার পিছনে সওয়ার করে নিল। তারপর রওয়ানা দিল। যাবার পথে তারা একটা ডানাভাঙা ঈগল পাখি দেখতে পেল। বাচ্চাটি তা দেখে কাঁদতে লাগল। জ্বিনেরা জিজ্ঞেস করল, 'কী হল তোমরা, কাঁদছ কেন?' সে বলল, 'একটা ডানা আমি ভেঙেছি, আর অন্যটা হটিয়ে দিয়েছি। আমি জোর গলায় আল্লাহর কসম করে বলছি- তোমরা মানুষ নও এবং তোমরা উটনী খুঁজতেও বের হওনি!' একথা শুনে জ্বিনরা ছেলেটিকে সেখানেই ছেড়ে দেয় এবং সে ঘরে ফিরে আসে। (২২)
টিকাঃ
(২২) আল্-মাজালিসাহ্, দীনূরী।
📄 জিনদের পানি খাওয়ানোর সওয়াব
(হাদীস) বর্ণনায় হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) জনাব রসূল (সাঃ) বলেছেন:
مَنْ حَفَرَ مَاءً لَمْ يَشْرَبُ مِنْهُ كَبْ حَرِيٌّ مِنْ إِنسِ وَجِنِّ وَلَا سَبُعُ وَلَا طَائِرٍ إِلَّا أَبَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে ব্যক্তি কূপ খনন করে এবং তার পানি দিয়ে কোনও মানুষ বা জ্বিন কিংবা পশু বা পাখির পিপাসা নিবারণ করে, তার প্রতিদান বা পুরস্কার আল্লাহ্ তাকে প্রদান করবেন কিয়ামতে।(২৩)
টিকাঃ
(২৩) ফাওয়াইদে সামিাবিয়াহ্, মুগ্ধারাহ্, যিয়া মুকদ্দিসী। আল্-জামিই আল্-কাবীর, সুয়ূত্বী, ১৪ ৭৭২। কানযুল উম্মাল, ১৫:৪৩১৮৯। ইনু খুযাইমাহ্। তারগীব অ তারহীব, ১: ১৯৪; ২ঃ ৭৪।
📄 শয়তানের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা নিষেধ
বর্ণনায় ইমাম ইবনু আসীর (রহঃ) মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর দরবারে একবার আরবের এক গোত্রের প্রতিনিধিদল আসে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমরা কোন্ গোত্রের অন্তর্গত? তারা বলে, 'বানু নাহম।' নবীজী বলেন, 'নাহম তো শয়তান, নাহম তো শয়তানের নাম। (তোমরা শয়তানের বান্দা নও, বরং) তোমরা আল্লাহর বান্দাদের বংশধর।' (২৪)
টিকাঃ
(২৪) নিহায়াহ্, ইবনু আসীর।