📄 হযরত যুবাব ইবনুল হারিসের মুসলমান হবার কারণ
বর্ণনায় হযরত যুবাব ইবনুল হারিস (রাঃ) ইবনু অকাশা'র একটি বশীভূত জ্বিন ছিল। জ্বিনটি ইব্নু অকাশাহকে কিছু কিছু অগাম খবর জানিয়ে দিত। একদিন জ্বিনটি এসে ইবনু অকাশকে একটি কথা বলে। ফলে ইব্দু অকাশাহ্ আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-
يَاذُبَابُ يَا ذُبَابُ - اِسْمَعِ الْعَجَبَ الْعُجَابَ
بُعِثَ مُحَمَّدٌ بِالْكِتَابِ - يَدْعُو مَكَّةَ فَلَا يُجَابُ
: বঙ্গায়ন : ওহে যুবাব যুবাব গো? ভারি আজব কথা শোনো- নবী করা হল মুহাম্মদকে কিতাব-সহ, ডাক দিচ্ছেন মক্কায় তিনি, সাড়া তাতে দেয় না কেহ।
আমি (হযরত যুবাব) ইব্দু অকাশাকে বললাম, 'একথার মানে-মতলব কী?' সে বলল, 'আমি জানি না। আমাকে (জ্বিনের তরফ থেকে) এরকমই বলা হল। (৬)
টিকাঃ
(৬) ইবনু ইস্হাক। দালায়িলুন নুবুওয়ত্, বায়হাকী। আল্-বিদায়াহ্ অন্-নিহায়াহ্।
📄 উম্মে মাখবাদের কাছে নবুওয়াতের খবর
বর্ণনায় ইবনু ইস্হাক (রহঃ) আমাকে হযরত আসমা বিনতে আবী বক্র (রাঃ)-এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা হয়েছে যে, যখন মহানবী (সাঃ) ও হযরত আবূ
বাকর (রাঃ) হিজরতের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেন, তখন তিনরাত পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি যে, তাঁরা কোন দিকে গিয়েছেন। অবশেষে মক্কার নিম্নভূমির দিক থেকে এক জ্বিন বের হয়, যে একটি আরবী গীতিকাব্য গাইছিল। লোকেরা তার পিছনে পিছনে যাচ্ছিল। এবং তার আওয়াজ শুনছিল কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। সে গাইছিল:
جَزَى الله رَبِّ النَّاسِ خَيْرَ جَزَائِهِ - رَفِيقَيْنِ قَالَا خِيْمَتَى أَمْ مَعْبَدٍ
هُمَا نَزَلَا بِالْبَرِ ثُمَّ تَرَحَلاً - فَأَفْلَحَ مَنْ أَمْسَى رَفِيقَ مُحَمَّد
لَيْهِنَّ بَنِي كَعْبٍ مَقَامَ فَتَاتِهِمْ - وَمَقْعَدُهَا لِلْمُؤْمِنِينَ بِمَرْصَد
: বঙ্গায়ন: মানুষের প্রভু আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার প্রদান করুন ওই দুই সঙ্গীকে, যাঁরা অপরাহ্নে বিশ্রাম নিয়েছেন উম্মে মাত্মবাদের শিবিরে। এঁরা উভয়ে ময়দানে অবতরণ করেছেন, ফের আরোহণ করেছেন। তাই সফল হয়েছেন সেই ব্যক্তি, যিনি সন্ধ্যায় পৌঁছেছেন মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সুঙ্গী হয়ে।
হযরত আসমা (রাঃ) বলেছন: এই কবিতাটি শোনার পর আমরা জানতে পারি যে তারা কোন্দিকে গিয়েছেন। তাঁরা তখন মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গিয়েছিলেন। (৬)
টিকাঃ
(৬) ইবনু ইস্হাক। দালায়িলুন নুবুওয়ত্, বায়হাকী। আল্-বিদায়াহ্ অন্-নিহায়াহ্।
📄 দুই সাহাবী সাম্রদ (রাঃ) জিন ও ইসলাম
হযরত মুহাম্মদ বিন আব্বাস বিন জাবার বলেছেন: কুরায়শরা একবার আবূ কুবাইস পর্বতে উচ্চঃস্বরে কাউকে কবিতা বলতে শোনে-
فَإِنْ يُسْلِمُ السَّعْدَانِ يُصْبِحُ محمد بِمَكَّةَ لَا يَخْشَى خِلَافَ مُخَالِفٍ
: বঙ্গায়ন: যদি ইসলাম কবুল করেন উভয় সাদ, তবে- মক্কার কারো বিরোধিতার পরোয়া নবীর নাহি রবে।
তো, আবু সুফিয়ান এবং কুরাইশের সর্দাররা বলে, এই দু-সাদ কে কে? লোকেরা বলে, সাদ বিন আবূ বক্স ও সাদ বিন যায়েদ (মতান্তরে সাদ বিন কযাআহ্)
দ্বিতীয় রাতে কুরাইশরা ফের আবূ কুবাইস পর্বতের এই (কবিতার) আওয়াজ শোনে-
أيا سعد الأوس كُن أنْتَ نَاصِرًا - و يا سعد سعد الخَز رَجِينَ الْعَطَارِف
اجيبا إلى دَاعِى الْهُدَى وَ تَمَنَّيا - عَلَى اللَّهِ فِي الْفِرْدَوسِ زُلْفَةَ عَارِفٍ
فَإِنَّ ثَوَابَ اللَّهِ لِطَالِبِ الْهُدَى - جِنَانُ فِي الْفُردوس ذَاتَ رَفَارِف
: বঙ্গায়ন : 'আউস' গোত্রের সাদ তুমি মদদ করো নবীপাকের দানী গোত্র 'খযরয'-এর সাদ তুমিও পথিক হও ও-পথের। সুপথ প্রদর্শকের ডাকে সাড়া তোমার দাও গো দু'জন, এবং করো খোদার কাছে স্বর্গে থাকার আশা পোষণ। সুপথ-সন্ধানীদের তরে সেরা স্বর্গ ইনাম খোদার, শয্যা-সামান কুসুম কোমল রেশম দিয়ে তৈরি যাহার,
তখন কুরাইশরা বলে, 'দুই-সাদ বিন উবাদাহ্ (রাঃ) ও সাদ বিন মাআয (রাঃ)-কে বোঝানো হচ্ছে।
প্রাসঙ্গিকী : হযরত আব্দুল মাজীদ বিন আবূ আব্বাস রহ, বলেছেন, একবার রাতের কোনও অংশে মদীনা শরীফের অদৃশ্য থেকে কাউকে বলতে শোনা যায়-
خَيْرَ كَهْلَيْنِ فِي بَنِي الْخزرج الْغَرْ - يَسير واسعد بن عبادة الْمُجِيبَانِ
إِذَا دَعَا أَحْمَدُ الْخَيْرَ - فَنَا لَتْهُمَا هُنَاكَ السَّعَادَةُ
ثُمَّ عَاشَ مُهَدِّ بَيْنَ جَمِيعًا - ثُمَّ لَمَّا هُمَا الْمَلِيكُ شَهَادَةً
: বঙ্গায়ন : বানী খফ্রজের মর্যাদাবান মুরুব্বিদের সেরা যে-জন, উবাদাহ্-তনয় সাদের কাছে তোমারা সবাই করো গমণ। নবী যখন দুই রতনকে ইসলামের দিকে করেন আহ্বান, উভয়ে দেন সাড়া তাতে তাই হয়ে যান মহা ভাগ্যবান। • পরে তাঁরা ভদ্রভাবে আপনাপন জীবন কাটান, তার পরেতে দুই মনীষী শাহাদাতের মর্যাদা পান। (৭)
টিকাঃ
(৭) ইবনু আব্দুল বার। আল্-ইস্তিআব। আল্ হাওয়াতিফ।
📄 হাজ্জাজ বিন ইলাতের ইসলাম কবুলের প্রেক্ষাপট
বর্ণনায় হযরত ওয়াসিলাহ বিন আস্ক (রাঃ) হযরত হাজ্জাজ বিন ইলাতু আল-হাযারী সুল্লামী (রাঃ)-র ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এইরকম- একবার ইনি আপন গোত্রের কয়েকজন লোকের সাথে মক্কায় রওয়ানা হয়েছিলেন। যেতে যেতে এক ভয়ংকর প্রান্তরে রাত হয়ে যায়। তাঁকে তাঁর সাথীরা বলে, হে আবু কিলাব! উঠুন, আপনার এবং আপনার সঙ্গী-সাথীদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। হাজ্জাজ (রাঃ) তখন উঠলেন। সাথীদের চারদিকে চক্কর দিয়ে সীমানা বন্ধ করলেন এবং এই কবিতাটি পড়লেন-
أعِيدُ نَفْسِي وَأَعِيدُ صَحْبِي مِنْ كُلِّ مِن بِهَذَا النَّقْبِي
حَتَّى أَؤُوبَ سَالِمُ وَرَكبي
আমি নিজের এবং আমার সঙ্গী-সাথীদের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি এই উপত্যকার সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে না ফেরা পর্যন্ত।
হযরত হাজ্জাজ বিন ইলাহ্ (রাঃ) বলেন আমি (ওই কবিতা বলার পর) কাউকে এই আয়াত বলতে শুনি-
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ
হে জ্বিন ও মানব সম্প্রদায়! যদি তোমরা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করতে পার তো কর, কিন্তু আমার অনুমতি ছাড়া তোমরা তা পারবে না। (৮)
তারপর হযরত হাজ্জাজ মক্কায় পৌঁছে কুরাইশদের মজলিসে ঘটনাটি উল্লেখ করেন। শুনে কুরাইশরা বলে, ওহে আবু কিলাব! খোদার কসম! তুমি বিধর্মী হয়ে গেছ! মুহাম্মদ (সাঃ) দাবি করে যে, তার উপর নাকি এই আয়াত নাযিল হয়েছে। হযরত হাজ্জাজ বলেন, আল্লাহর কসম! শুধু আমি একাই শুনিনি, ওকথা আমার এ সঙ্গীরাও শুনেছে।
উনি (কুরাইশদের কাছে) তখনও বসে ছিলেন, এমন সময় সেখানে আসেন আস বিন ওয়াইল। তো কুরায়শী কাফিররা তাঁকে বলল, ওহে আবূ হিশাম! আবূ কিলাব যা কিছু বলেছেন, সে-সব কি আপনি শুনেছেন?
আস বিন ওয়াইল বলেন, ইনি কী বলছেন?
হাজ্জাজ তখন ফের তাঁর ঘটনা উল্লেখ করেন।
শুনে আস বিন ওয়াইল বলেন, তোমরা এতে অবাক হচ্ছো কেন! যে কথা (আয়াত) ইতিন ওই উপত্যকায় শুনেছেন তা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর (পবিত্র সুন্দর) মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে।
হযরত হাজ্জাজ বলেছেন, এরপর কুরাইশের সেই কাফিররা আমাকে নবীজীর কাছে পৌঁছতে বাধা দেয়। কিন্তু এ বিষয়ে আমার আগ্রহ-অনুসন্ধিৎসা আরো বেড়ে যায়। তখন নবীজীর এক চাচাতো ভাই আমাকে বলেন যে, তিনি মক্কা থেকে মদীনায় চলে গেছেন। আমি তখন নিজের সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে রওয়ানা হয়ে যাই। এবং এক সময় মদীনা শরীফে পৌঁছে নবীজীর খেদমতে হাজির হই। এবং যা কিছু শুনছিলাম, সে-সব তাঁকে নিবেদন করি। তখন তিনি বলেন-
سَمِعْتُ وَاللهِ الْحَقِّ هُوَ وَاللهِ مِنْ كَلَامِ رَبِّي الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيَّ وَلَقَدْ سَمِعْتَ حَقًّا يَا آبَاكِلابِ -
ওহে আবূ কিলাব, আল্লাহর কসম, তুমি যা শুনেছ, ঠিকই শুনেছ। আল্লাহর কসম, এ আমার প্রভুর বাণী, যা তিনি আমার উপর অবতীর্ণ করেছেন।
আমি (হাজ্জাজ) তখন আরজ করি, হে আল্লাহর রসূল (সাঃ)! আপনি আমাকে ইসলামের শিক্ষা দান করুন। তো তিনি আমাকে ইসলামের শপথ বাক্য (কলেমা) পাঠ করান এবং বলেন-
سرالى قَوْمِكَ فَادْعُهُمْ إِلَى مِثْلِ مَا أَدْعُوكَ إِلَيْهِ فَإِنَّهُ الْحَقُّ
তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে যাও এবং তাদেরকে আমি তোমাকে যেদিকে ডাক দিয়েছি সেই (ইসলামের) দিকে ডাক দাও, কেননা এ হল 'সত্য ধর্ম'। (৯)
টিকাঃ
(৮) সূরাহ্ আর-রাহমান (৫৫) : আয়াত ৩৩।
(৯) ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল্-হাওয়াতিফ। কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ৩৬৯৭৯।