📄 আরেকটি চোর জিনের ঘটনা
(হাদীস) হযরত উবাই ইবনু কাবে (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তাঁর কাছে এক মশক খেজুর ছিল। সেগুলি তিনি যথেষ্ট হিফাযতে রাখতেন। তা সত্ত্বেও তা ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। একরাতে তিনি সেই খেজুর পাহারা দিতে থাকেন। এমন সময় তাঁর সামনে একটি প্রাণী আসে যার আকৃতি সদ্য বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলের মতো। হযরত উবায় (রাঃ) বলেছেনঃ আমি তাকে সালাম দিতে সে সালামের জবাব দেয়। আমি জানতে চাই, 'তুমি কে? জ্বিন না মানুষ?' সে বলে, 'জ্বিন।' এরপর আমি বলি, 'তুমি নিজের হাত আমার হাতে ধরিয়ে দাও।' সে তার হাত আমার হাতে ধরিয়ে দিতে আমার মনে হচ্ছিল, তা কুকুরের হাত (পা) এবং কুকুরের লোমের মতো। আমি তখন বলি, 'জ্বিনরা কি জন্ম থেকেই এরকম হয়?' সে বলে, 'আমি জানি, জ্বিনদের মধ্যে আমার চাইতেও শক্তিশালী জ্বিন রয়েছে।' আমি বলি, 'একাজ করতে তোমাকে বাধ্য করেছে কে?' সে বলে, 'আমি জানি, আপনি দান-খয়রাত করতে পছন্দ করেন। তাই আমিও আপনার খাবার থেকে নিজের জন্য কিছু নিতে চাইলাম।' এরপর হযরত উবায় (রাঃ) প্রশ্ন করেন, 'আচ্ছা তুমি বলো তো, তোমাদের অনিষ্ট থেকে আমাদের হিফাযতে রাখতে পারে এমন আমল কী?' সে বলে, 'আয়াতুল কুরসী (আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম থেকে আয়াতটির শেষ পর্যন্ত)।' হযরত উবায় তখন তাকে ছেড়ে দেন। তারপর তিনি নবীজীর কাছে গিয়ে সবকথা বলতে, নবীজী বলেন, 'খবীস তোমাকে সত্য কথাই বলেছে।' (৩)
টিকাঃ
(৩) আবূ ইয়াত্সা। ইবনু হাব্বান। আবূ আশ্-শায়খ ফিল্-উযমাহ। হাকিম অ-সিহহাহ। আবূ নুআইম, দালায়িলুন নুবুওঅত। বায়হাক্বী, দালায়িলুন্ নুবুও ৭:১০৮,১০৯।
📄 চোর জিনের তৃতীয় ঘটনা
(হাদীস) বর্ণনায় হযরত আবুল আস্তয়াদ দুয়িলী (রহঃ) আমি হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ)-কে অনুরোধ করেছিলাম, আপনি আমাকে সেই শয়তানের ঘটনা শোনান, যাকে আপনি গ্রেফতার করেছিলেন।' তিনি বলেন, 'আমাকে একবার জনাব রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) মুসলমানদের দান-খয়রাতের সম্পদ-সামগ্রী দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমি (দান-সামগ্রীর মধ্য হতে) খেজুরগুলো একটি ঘরে রেখেছিলাম। পরে দেখলাম, খেজুর ক্রমশ কমে যাচ্ছে। একথা নবীজীকে বলতে উনি বলেন, 'খেজুর যে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, সে হল শয়তান।' এরপর আমি সেই কামরায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দেখলাম, ভীষণ এক অন্ধকার এসে দরজায় ছেয়ে গেল। তারপর সেটা হাতীর আকার ধারণ করল। পরে অন্য একটা রূপ ধরল। তারপর দরজার ছিদ্র দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। আমিও সাহস সঞ্চয় করলাম। সে যখন খেজুর খেতে শুরু করল, আমি তখন লাফ দিয়ে তাকে ধরে ফেললাম। এবং তার দিকে হাত বাড়ানোর সময় বললাম, 'ওরে আল্লাহর দুশমন!' সে বলল, 'আমাকে ছেড়ে দিন। আমি একজন বৃদ্ধ। পোষ্য অনেক অথচ দরিদ্র্য এবং আমি নাসীবাইনের জ্বিনদের অন্তর্গত। যে মহল্লায় আপনাদের নবী আবির্ভূত হয়েছেন, ওখানে আগে আমরা থাকতাম। ওঁর আবির্ভাবের পর আমাদের ওখান থেকে বহিষ্কার করা হয়। আমাকে আপনি ছেড়ে দিন। এরপর আর কক্ষণো আমি আপনার কাছে আসব না।' (ওর কথা শুনে) আমি ওকে ছেড়ে দিলাম। (ওদিকে) জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে হযরত জিব্রাঈল এসে ঘটনাটি জানিয়ে দিলেন। নবীজী ফজরের নামায পড়ালেন। তারপর একজন ঘোষক ঘোষণা করলেন-'মুআয বিন জাবাল কোথায়?' আমি উঠে দাঁড়ালাম। তখন নবীজী বললেন 'তোমার কয়েদী কি করল?" আমি তাঁকে (সমস্ত ঘটনা) নিবেদন করলাম। তিনি বললেন, 'ও ফের আসবে, তুমি তৈরি থেকো।'
সুতরাং আমি ফের (পরের রাতে) সেই কামরায় প্রবেশ করলাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম। সেও ফের এল। এবং দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকল। তারপর খেজুর খেতে শুরু করল। আমিও আগের মতোই তাকে ধরে ফেললাম। সে বলল, 'আমাকে ছেড়ে দিন। আমি এরপর আর কক্ষণো আসব না।' আমি বললাম, 'ওহে খোদার দুশমন! তুমি তো আগেও বলেছিলে যে, এরপর আর কক্ষণো আসবে না!' সে বলল, 'এরপর আর আমি কোনও মতেই আসব না। এবং এর নিদর্শন (হিসেবে আপনাকে বলছি), যে ব্যক্তি সূরাহ্ 'আল্ বাক্বারাহর শেষ অংশ পড়বে, রাতে তার ঘরে আমাদের জ্বিনদের মধ্যে কেউই ঢুকতে পারবে না।'(৪)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য: অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত মুআয বলেছেন, 'সেই জ্বিন আয়াতুল কুরসী ও সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ শেষাংশ (আমানার রসূলু থেকে শেষ পর্যন্ত) পড়ার কথা উল্লেখ করে। তখন আমি তাকে ছেড়ে দিই এবং সকালে নবীজীর কাছে হাজির হয়ে তার কথা উল্লেখ করি। তিনি (সাঃ) বলেন, 'ওই মিথ্যুক খবীস, একথাটি সত্যই বলেছে।' হযরত মুআয বলেন, আমি (রাতে) আয়াত দু'টি পড়তাম। ফলে খেজুর আর কমতে দেখতাম না।(৫)
টিকাঃ
(৪) ইবনে আবিদ দুনইয়া মাকায়িদুশ শাইত্বান, পৃষ্ঠা ৩৩। ত্ববারানী। হাকিম। আবু নুআইম। মাজমাউয যাওয়াইদ ৬: ৩২১। হাকিম অ সিহাহ্ ১ঃ ৫৬৩। দালায়িলুন নুবুওঅত্, বায়হাকী ৭: ১১০। আদ্-দুররুল মানসুর। ১ঃ ৩২৪।
(৫) প্রাগুক্ত।
📄 চোর জিনের চতুর্থ ঘটনা
(হাদীস) হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ)-এর একটি দেরাজ ছিল। তাতে তিনি খেজুর রাখতেন। একটি জ্বিন আসত। এবং সে খেজুর চুরি করে নিয়ে যেত। হযরত আবূ আউয়ুব আনসারী (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে অনুযোগ করলেন। তিনি (সাঃ) বললেন, 'তুমি যাও। এবং তাকে দেখলে বলো আল্লাহ'র নামে (বলছি), তুমি আল্লাহর রসূলের কাছে হাজির হও।' এভাবে তিনি সেই জ্বিনকে ধরে ফেললেন। তখন সেই জ্বিন শপথ করে বলল যে, সে আর কখনও আসবে না। তাই হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) তাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর নবীজীর কাছে যেতে তিনি বললেন, তোমার কয়েদী কী করল?' হযরত আবূ আইয়ুব বললেন, 'সে শপথ করেছে যে পুনরায় আর আসবে না। নবীজী বললেন, 'সে মিথ্যা বলেছে। এবং মিথ্যুক হওয়ার কারণে সে ফের আসবে। তো হযরত আবূ আইয়ুব (রাঃ) তাকে ফের ধরে ফেলেন এবং বলেন, 'এবারে তোমাকে ছাড়ছি না। চলো, নবীজীর দরবারে চলো।' সে বলে, 'আমি আপনাকে আয়াতুল কুরসীর কথা বলে দিচ্ছি। এটি আপনি আপন বাড়িতে পড়বেন। তাহলে শয়তান প্রভৃতি কেউই আপনার কাছে আসবে না।' এরপর হযরত আবূ আইয়ুব (রাঃ) নবীজীর কাছে যেতে তিনি জানতে চাইলেন, 'তোমার কয়েদী কী করল?' তো হযরত আবু আইয়ুব তাই বললেন, যা সেই জ্বিনটি বলেছিল। শুনে নবীজী বলেন, ও মিথ্যাবাদী হলেও তোমাকে সত্য কথাই বলে গেছে।(৬)
টিকাঃ
(৬) তিরমিযী, সাওয়াবুল কোরআন, বাব ও ৩, ৩০৪০। মুসনাদে আহমদ ৫:৪২৩। দালায়িলুন্ নুবুওঅত্ বায়হাকী ৭ঃ ১১১। মাকায়িদুশ শাইত্বান (১২), পৃষ্ঠা ৩১। দুররুল মানসুর ১৪ ৩২৫। বনে আবী শায়বাহ্ ১০: ৩৯৮। ত্ববারানী কাবীর ৪০১২, ৪০১৩, ৪০১৪; ১৯ঃ ২৬৩। মামমাউয যাওয়াইদ ৬: ৩২৩। হাকিম ৩: ৪৫৯। তারগীব অ তারহীব ২: ৩৭৪।
📄 আবু উসাইদ (রাঃ)-এর চোর জিন
(হাদীস) হযরত আবূ উসাইদ সাঅদী (রাঃ) পাঁচিলের কাছাকাছি গাছের ফল পেড়ে সেগুলি রাখার জন্য একটি কামরা বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জ্বিন অন্য পথ দিয়ে তাঁর ফল চুরি করত এবং নষ্ট করত। তিনি সে বিষয়ে জনাব রসূলে করীম (সাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করেন। নবীজী বলেন, ও হল জ্বিন। ওর সাড়া পেলে তুমি বলবে - بِسْمِ اللهِ اجِيبِي رَسُولَ اللهِ (আল্লাহর নাম নিয়ে (বলছি), রসূলুল্লাহ্ সামনে হাজির হও। (সুতরাং আবূ উসাইদ (রাঃ) অমন করলে) জ্বিনটি বলে, 'আমাকে মাফ করুন। নবীজীর কাছে নিয়ে গিয়ে আমাকে কষ্ট দেবেন না। আমি আপনার কাছে আল্লাহর নাম নিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করছি যে, আর কখনও আপনার ঘরে আসব না এবং আপনার খেজুর চুরি করব না। আর, আপনাকে একটি জিনিস বলে দিচ্ছি। সেটি যদি আপনি বাড়িতে পড়েন, তবে যে (জ্বিন, শয়তান) আপনার বাড়িতে আসবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তা যদি আপনি কোনও পাত্রে পড়েন (অর্থাৎ পড়ে ফুঁক দেন), তবে তার ঢাকনা (জ্বিন-শয়তানরা) খুলবে না।' এভাবে জ্বিনটি হযরত আবূ উসাইদকে এমন ভরসা দেন যে, তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যান। এবং বলেন, 'তুমি যে আয়াতের কথা বললে, সেটি কী, বলো তো শুনি।' জ্বিন বলল, সেটি হল আয়াতুল কুরসী।' তারপর সে তার নিতম্ব উঁচু করে বায়ু নিঃসরণ করল। ঘটনাটি নবীজীর কাছে নিবেদন করার পর হযরত আবূ উসাইদ (রাঃ) বলেন, 'সে ফিরে যাবার সময়েও একবার বাতকর্ম করেছে।' নবীজী বলেন, ও তোমাকে সত্য বলেছে, যদিও সে মিথ্যাবাদী।'(৭)
টিকাঃ
(৭) ত্ববারানী আবূ নুআইম। ইবনে আবিদ দুনইয়া, মাকায়িদুশ শায়ত্বান (১৩), পৃষ্ঠা ৩২। দুররুল মানসুর। ১ঃ ৩২৫। হাকিম ৩: ৪৫৮। মামমাইয যাওয়াইদ ৬: ৩২৩।