📄 শয়তানের প্রপৌত্রের বিস্ময়কর ঘটনা
হযরত উমর (রাঃ)-এর বর্ণনা: আমরা জনাব রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সাথে 'তিহামা'র পাহাড়গুলির মধ্যে একটি পাহাড়ে বসেছিলাম। এমন সময় হাতে লাঠি নিয়ে এক বৃদ্ধ আমাদের সামনে এল এবং রসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাম জানাল। তিনি সালামের জবাব দিয়ে তার ভাষাতেই তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কে? 'সে বলল, 'আমি হামাহ্ বিন হাইম বিন লাকীস বিন ইবলীস।' নবীজী বললেন, 'তোমার আর ইবলীসের মধ্যে তাহলে শুধু দুই পুরুষের ব্যবধান। আচ্ছা, তুমি কত যুগ পার করেছ? সে বলল, 'আমি দুনিয়ার আয়ু শেষ করে ফেলেছি। কেবল সামান্য কিছু বাকি আছে। কাবীল যখন হাবিলকে হত্যা করেছিল সেই সময় আমি ছিলাম কয়েক বছরের বাচ্ছা। কথা বুঝতে পারতাম। ছোট ছোট পাহাড়ে, টিলায় লাফালাফি করতাম। খাবার খারাপ করে দিতাম। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলার হুকুম দিতাম...।' সেই সময় জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, 'বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারী বৃদ্ধ এবং অলসতা সৃষ্টিকারী যুবকের কাজ বড় জঘন্য।' (সেই আগন্তুক বৃদ্ধ) অমন বলে উঠল, আমাকে এ বিষয়ে মাফ করুন।
আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি। আমি হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে তাঁর মসজিদে সেইসব লোকের সাথে ছিলাম যারা তাঁর কওমের মধ্য থেকে তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল। আমি সকল সময় হযরত নূহকে, আপন সম্প্রদায়কে দ্বীনের দাওয়াত দেবার জন্য তিরস্কার করতাম। শেষ পর্যন্ত তিনি স্বয়ং কেঁদে ফেললেন এবং আমাকেও কাঁদিয়ে ছাড়েন। তিনি বলেন, (যদি আমি তোমার কথা শুনে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া ছেড়ে দেই) তাহলে লজ্জিত অবস্থায় পতিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' আমি নিবেদন করেছিলাম, 'হে নূহ, আমি হলাম তাদের একজন, যারা কাবীল বিন আদম কর্তৃক ভাগ্যবান শহীদ হাবীলের হত্যাকার্যে শরীক ছিল। আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ্র দরবারে আমার তওবা কবুল হবে?' তিনি বলেন, 'ওহে হামাহ্, পুণ্যের সঙ্কল্প কর এবং দুঃখ-অনুতাপে ভেঙে পড়ার আগে সৎকাজে লেগে যাও। আল্লাহ তাআলা আমার উপর যা অবতীর্ণ করেছেন, তাতে আমি পড়েছি, যে ব্যক্তি পুরোপুরি দ্বীনদারীর সাথে আল্লাহ্র পথে ফিরে আসে- তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করেন। ওঠো, উযূ করে দু'রাআত নামায পড়ো।' সুতরাং তখনই আমি হযরত নূহের নির্দেশ অনুযায়ী আমল শুরু করি। অতঃপর তিনি আমাকে ডেকে বললেন, 'মাথা তোলো। তোমার তাওবা (কবুল হওয়ার খবর) আসমান থেকে নাযিল হয়েছে।' সুতারাং আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এক বছর যাবৎ সাজদায় পড়ে থাকলাম। আমি হযরত হুদ (আঃ)-এর সাথেও সাজদায় শরীক ছিলাম, যখন তিনি আপন সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে সাজদা করেছিলেন। তাঁকে আমি তাঁর (অজ্ঞ) সম্প্রদায়কে (বারবার) দ্বীনের দাওয়াত দেবার জন্য ভর্ৎসনা করতাম। শেষ পর্যন্ত আপন কওমের কথা ভেবে তিনিও কাঁদেন এবং আমাকে কাঁদান। আমি হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথেও দেখা করতাম এবং হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর দরবারে বিশ্বস্ততার পদে আসীন ছিলাম। হযরত ইল্ইয়াস (আঃ)-এর সাথে উপত্যকায় সাক্ষাৎ করতাম এবং এখনও তাঁর সাথে দেখা করি। (৮) হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথেও আমার মুলাকাত হয়েছিল। তিনি আমাকে তাওরাত শিখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, 'যদি হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়, তবে তাঁকে আমার সালাম বলবে।' তা আমি হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছি এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর সালামও তাঁকে জানিয়েছি। হযরত ঈসা (আঃ) আমাকে বলেছিলেন, 'হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথে যদি তোমার সাক্ষাৎ হয়, তবে তাঁকে আমার তরফ থেকে সালাম নিবেদন করবে।' একথা শুনে জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) অশ্রু-সজল হয়ে গেলেন এবং তিনি কাঁদতে লাগলেন। তারপর বললেন, 'ঈসা (আঃ)-এর প্রতিও দুনিয়া থাকা পর্যন্ত সালাম শান্তি নেমে আসুক এবং হে হামাহ্, আমানত পৌঁছার জন্য তোমার প্রতিও সালাম।' হামাহ তখন বলে, 'হে আল্লাহ্র রসূল, আপনি আমার সাথে
তাই করুন, যা করেছিল হযরত মূসা বিন ইম্মান (আঃ)। তিনি আমাকে তাওরাত শিখিয়েছিলেন।' তো রসূল (সাঃ) তাকে শেখালেন সূরাহ্ ওয়াক্বিআহ্, সূরাহ্ মুরসালাত, সূরাহ্ আম্মা ইয়াতাসাআলুন, সূরাহ ইয়াশ্ শামশু কুবিরত্ এবং 'মুআয়াযাতাইন' (সূরাহ্ ফালাক্ব-নাস) ও কূল হুওয়াল্লা-হু আহাদ। এবং বলেন, 'হে হামাহ্, আপন প্রয়োজনের কথা আমাকে বল আর আমার সাথে সাক্ষাৎ করা ছেড়ে দিও না।' হযরত উমারার (রাঃ) বলেছেন, পরে জনাব রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর পরলোকগমনের হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটল। এবং তার খবর আর আমরা পেলাম না। জানিনা সে জীবিত আছে না মারা গেছে। (৯)
উল্লেখিত হাদিসটি 'যাওয়াইদুয যুহদ' গ্রন্থে। হযরত আনাস (রাঃ)-এর বাচনিক গ্রথিত করেছেন হযরত আবদুল্লাহ্ বিন ইমাম আহমাদ এবং এটি উল্লেখ করেছেন আক্কীলী (কিতাবুদ্ধ দুআফা-য়), শিরাযী (কিতাবুল আলকাবে), আবূ নূআইম (দালাইলে) তথা ইবনে মারদুইয়াহ্-ও। তাছাড়া এই বর্ণনাটি আল্লামা ফাকিহী 'কিতাবে মাক্কা'-য় উদ্ধৃত করেছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বাচনিকে। হাদীসটির কয়েকটি তরক আছে, যার দরুন এটি হাসানের স্তরে পৌঁছায়। (১০)
টিকাঃ
(৮) কারও কারও মতে, হযরত ইল্লিয়াস ও হযরত খিযির এই উভয়ের রূহকে আল্লাহ্ তাঁর ইচ্ছানুসারে আকৃতি বদলানোর ক্ষমতা দিয়েছেন এবং বর্তমানেও তাঁদের রূহ্ কোনও না কোনও অলী, পুণ্যবান প্রমুখদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। (তাফসীর মাযহারী: উদ্ধৃতি, হযরত মুজাদ্দিদ আলফি সানী (রহঃ))
(৯) কিতাবুদ্ধ দ্বআফা আক্বীলী। আবূ নুআইম। বাইহাকী। দালায়িলুন্ নুবুয়াত, আবূ নুআইম আস্বাহানী, ১৩১।
(১০) আল্লামা সুয়ূতী (রহঃ)।
📄 ইবলীসের প্রপৌত্র জান্নাতে
হযরত আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
إِنَّ هَامَةَ بْنُ هَيْمِ بْنِ لَا قَبْسَ فِي الْجَنَّةِ
হামাহ্ বিন হাইম বিন লাকীস জান্নাতে যাবে। (১১)
টিকাঃ
(১১) কিতাবুস্ সুনান, আবু আলী বিন আশ্আস। তাযকিরাতুল মাউযুআত ১১১। লা আলী মাআহ্ ১:৯২।
📄 দুই নবীর প্রতি ঈমান আনয়নকারী জিন সাহাবী
হযরত সাহল বিন আব্দুল্লাহ্ তাস্তারী (রহঃ) বলেছেন- আমি 'আদ' সম্প্রদায়ের কোনও এক এলাকায় গিয়েছিলাম। ওখানে একটা গুহা দেখেছি, যেটি খনন করা হয়েছিল। সেই গুহার মাঝখানে ছিল পাথরের এক মহল, যাতে জ্বিনরা থাকত। তাতে আমি প্রবেশ করে দেখলাম, এক দৈত্যাকার বৃদ্ধ কা'বার দিকে মুখ করে নামায পড়ছেন। তাঁর গায়ে ছিল চকচকে এক পশমের জুব্বা। তাঁর বিশালকায় চেহারা আমাকে খুব বেশি অবাক করেনি, যত করেছে তাঁর জুব্বার উজ্জ্বলতা ও সজীবতা। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন- 'হে সাহল, পোশাককে শরীর পুরানো করে না বরং পোশাককে পুরানো করে পাপের দুর্গন্ধ আর হারাম খাদ্য। এই জুব্বা আমি সাতশ' বছর ধরে পরেছি। এটি পরে আমি হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছি এবং ওঁদের প্রতি ঈমান এনেছি।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম- 'আপনি কে?' তিনি বললেন- 'আমি সেই ব্যক্তি (জ্বিন)-দের অন্তর্গত, যাঁদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল কোরআনের (সূরাহ্ জ্বিনের) এই আয়াতঃ
قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ
বলুন, প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আমি অবগত হয়েছি যে, জ্বিনদের একটি দল কোরআন পাঠ শ্রবণ করেছে...।' (১২)
টিকাঃ
(১২) সিফাতুস সফওয়াহ্, ইবনে জাওযী (রহঃ)।
📄 জান্নাতে জিনদের বিয়ে
মু'মিন জ্বিনরা জান্নাতে বিয়ে-শাদীও করবে কি না, এ সম্পর্কে কোন হাদীস আমি পাইনি। কিন্তু জ্বিনদের জান্নাতে প্রবেশের স্বপক্ষে প্রমাণ দেওয়া হয়েছে কোরআন পাকের এই আয়াত দিয়ে:
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ -
ইতোপূর্বে ও (স্বর্গসুন্দরী)-দের স্পর্শ করেনি কোনও মানুষ অথবা জ্বিন। (১৩)
সুতরাং জ্বিনরা যদি জান্নাতে প্রবেশ করে, তাহলে ওদের পুরুষরাই সেইরকমই বিয়ে করবে, যে রকম বিয়ে করবে মানুষরা। কিন্তু মানুষ যেমন ডাগর-নয়না স্বর্গসুন্দরী (হুরুন ঈন)-দের বিয়ে করবে, তেমনই জ্বিন মহিলাদেরও বিয়ে করবে, অথচ মুমিন জ্বিনরা বিয়ে করবে শুধু হুরুন ঈন ও জ্বিন মহিলাদের (মানব মহিলাদের সঙ্গে নয়)। কেননা, জান্নাতে কোনও মানবী স্বামীহারা থাকবে না। অবশ্য জ্বিনের সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে জ্বিনের বিয়ে একটি বিতর্কিত বিষয়।
টিকাঃ
(১৩) সূরা আর-রাহমান, আয়াত ৫৬।