📄 সুন্দরী জিন স্ত্রীর ঘটনা
আকামুল মারজ্বানের গ্রন্থকার আল্লামা বারুদ্দীন শিবলী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন: জনাব কাযীউল কুয্যাহ্ জালালুদ্দীন আহমদ বিন কাযীউল কুযযাহ্ হিসামুদ্দীন রাযী হানাফী বলেছেন:
আমার পিতা (কাযী হিসামুদ্দীন রাযী (রহঃ)) আপন পরিবার-পরিজনবর্গকে প্রাচ্য থেকে আনার জন্য আমাকে সফরে পাঠিয়ে দেন। যখন আমি 'বীরাহ' (একটি জায়গা) পার হলাম, তো বৃষ্টি আমাদের এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। আমি এক যাত্রীদলের সাথে ছিলাম। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখি, কেউ আমাকে জাগাচ্ছে। জেগে উঠে দেখলাম, আমার কাছে মাঝারি উচ্চতার এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ছিল একটা লম্বা-লম্বি ফাটলের মতো, যা দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম! সে বলল, 'তুমি ভয় পেওনা, আমি তোমার সাথে আমার চাঁদের মতো মেয়েকে বিয়ে দিতে এসেছি।' আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, 'আল্লাহ্ ভালো করুন।' তারপর দেখলাম, কিছু মানুষ আমার দিকে আসছে। তাদের আকৃতিও ওই মহিলার মতো। তাদের চোখও লম্বা ফাটলের মতো। তাদের সাথে এক ক্বাযীও ছিল এবং ছিল সাক্ষীও। সুতরাং ক্বাযী বিয়ের পয়গাম দিল এবং বিয়ে পড়িয়ে দিল, যা আমি (বাদ্য হয়ে) কবুল করলাম। এরপর ওরা চলে গেল এবং সেই মহিলা ফের আমার কাছে এল। এবার তার সাথে এক সুন্দরী মেয়েও ছিল। তার চোখও ছিল তার মায়ের মতো। মেয়েটির মা মেয়েটিকে আমার কাছে রেখে চলে গেল। ফলে আমার ভয়-ভীতি আর আশঙ্কা আরও বেড়ে গেল। আমি আমার সঙ্গীদের জাগানোর উদ্দেশ্যে কাঁকর ছুঁড়ে মারতে লাগলাম। কিন্তু ওদের মধ্যে কেউ উঠল না। তখন অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহর দরবারে দু'আ-প্রার্থনা করতে লাগলাম। পরে, ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ার সময় এল। আমরা রওয়ানা দিলাম। কিন্তু সেই মেয়েটি আমাকে ছাড়ছিল না (সেও সঙ্গে রইল)। এই অবস্থায় তিন দিন কেটে গেল। চারদিনের মাথায় সেই আগের মহিলাটি এল এবং বলল, 'সম্ভবত এই মেয়েকে তোমার পছন্দ হয়নি। মনে হয়, তুমি এর থেকে বিচ্ছেদ চাইছ।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, আল্লাহর কসম!' সে বলল, 'তবে একে তালাক দিয়ে দাও।' আমি তাকে তালাক দিলে সে চলে গেল। পরে আমি তাকে কখনও দেখিনি।
এই ঘটনা সম্পর্কে ক্বাযী শিহাব বিন ফায়যুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়, 'ক্বাযী জালালুদ্দীন আহমাদ কি ওই জ্বিন স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করেছিলেন?' উনি বলেন, 'না'। (১৩)
টিকাঃ
(১৩) আকামুল মারজান, পৃষ্ঠা ৬৯।
📄 হিংস্র জিন মহিলার ঘটনা
হাফিজ ফাহুদ্দীন ইবনে সাইয়িদুন্ নাস (রহঃ) বলেছেন: 'আমি তাকিউদ্দীন বিন দাকীকুল ঈদ (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, শায়খ ইযযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম (রহঃ) বলেছেনঃ
ক্বাযী আবূ বাকর ইবনুল আরাবী (মালিকী) জ্বিনের সাথে (মানুষের) বিয়েকে অস্বীকার করতেন এবং বলতেন - 'জ্বিন সূক্ষ্ম আত্মাবিশেষ আর মানুষ স্থূল শরীরবিশিষ্ট, সুতরাং এরা উভয়ে একত্রিত হতে পারে না।' তিনি আরও বলেছেন যে, তিনি এক জ্বিন মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন, যে তাঁর কাছে কিছুদিন ছিল। তারপর সে তাঁকে উটের হাড় ছুঁড়ে মেরে জখমী করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তাঁর চেহারার সেই ক্ষতচিহ্নও তিনি দেখিয়েছেন। (১৪)
টিকাঃ
(১৪) তাযকিরাতুল সালাহুদ্দীন সফদী।
📄 হানাবিলাহ্ মাযহাব
ইবনুল আম্মাদ (রহঃ) বলেছেন (কবিতার মাধ্যমে):
وَهَلْ يَجُوزُ نِكَاحُنَا مِنْ جِنِّيَّةٍ - مُؤْمِنَةٍ قَدْ أَيْقَنَتْ بِالسُّنَّةِ
عِنْدَ الإِمَامِ الْبَارِزِي يُمْتَنَعُ - وَقَوْلُهُ إِلَّا بِالدَّلِيلِ يُنْدَفَعُ
অর্থাৎ জ্বিনদের ওই মেয়ে বৈধ মোদের বিয়ের তরে, যার ঈমান এবং ইয়াকীন আছে সুন্নাহ্’পরে। ইমাম বারিযীর মতে কিন্তু ও-কাজ করতে মানা। তাঁর মাসআলা প্রমাণ ছাড়া রদ করাও চলবে না। (১৫)
টিকাঃ
(১৫) আরজ্বাওয়াতু ইবনুল আম্মাদ।
📄 শাফিয়ী মাযহাব
জ্বিনদের সাথে মানুষের বিয়ে চলবে এবং এই মতই কোরআনের আয়াত দু’টির অনুকূল। পরবর্তী যুগের আলেমগণ (মুতাআখখিরীন) এই বিতর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। কতিপয় আলেম অবশ্য এ বিষয়ে মানা করেন এবং বলেন, পারস্পরিক বিয়ের ক্ষেত্রে শর্ত হল সৃষ্টিগতভাবে জাতিগত মিল থাকা। কিন্তু পরিষ্কার কথা হল জ্বিনদের সাথে বিয়ে করা জায়েয, কেননা ওরা আমাদের ভাই। (১৬)
এই মাসআলায় পরিষ্কার বুঝা যায় যে, বিয়ে বৈধ। কেননা জ্বিনদেরও ‘নাস’ লোক এবং ‘রিজাল’ পুরুষ বলা হয়। এবং ওদেরকে জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) ‘আমাদের ভাই বলেছেন। জ্বিন-মানুষের বিয়ে বৈধ হবার ক্ষেত্রে আরও একটি প্রমাণ হল সাবার রাণী বিলকীসের সাথে হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর বিবাহ। অথচ বিলকিসের মা ছিল জ্বিন। সুতরাং জ্বিনদের সাথে বিয়ে যদি জায়েয না হ’ত, তবে বিলকীসের সাথে কীভাবে জায়েয হল? কেননা যার মা বা বাপের মধ্যে কোনও একজন যদিও এমন হয় যার সাথে বিয়ে জায়েয নয়, তাহলে তার সাথেও বিয়ে হারাম হয়। (১৭)
এ বিষয়ে এ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে যে, যদি জ্বিন আসে ও কথাবার্তা বলে এবং তার শরীর আমাদের চোখে না পড়ে, এমনিতেই আমরা তার উপস্থিতি টের পাই এবং তার মুমিন হওয়ার কথাও আমরা জানতে পারি, তবে তার সাথে বিয়ে শুদ্ধ হবে সংশয়ের সাথে।
আম্মাদ বিন ইউনুস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: জ্বিনদের সাথে বিয়ে বৈধ নয়, কারণ বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে বর-কনে উভয়কে সৃষ্টিগতভাবে এক ও অভিন্ন জাতিভুক্ত (জিন্স) হওয়ার শর্ত আছে। কিন্তু জ্বিন-মানুষের বিয়ের ক্ষেত্রে ওই শর্তে সন্দেহ থাকে। তাছাড়া এ ব্যাপারে কোন দলীলও নেই।
জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) কর্তৃক জ্বিনদের সাথে বিয়ে করতে নিষেধ করা জারজ সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে। এর ব্যাখ্যা আছে এই হাদীসে:
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمْ أَوْلَادُ الْجِنِّ
তোমাদের মধ্যে জ্বিন-সন্তানের আধিক্য না ঘটা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না।
‘ফাওয়ায়িদুল আখবার’-এর গ্রন্থকার বলেছেন: ‘জ্বিন-সন্তান’-এর অর্থ জারজ সন্তান। কেননা জ্বিনদের দ্বারাও বর্বরতা হয় এবং প্রকৃতিবিরুদ্ধ কার্যকলাপ ঘটে। সুতরাং ব্যভিচারের দ্বারা জন্ম হওয়া মহিলাদের সঙ্গে বিয়ে না করার অর্থে ওই হাদীসটি গণ্য হবে।
এই পর্যন্ত সব আলোচনাই ইবনুল আম্মাদের। (১৮)
টিকাঃ
(১৬) শারহুল ওয়াজ্বাইয আল্-ইয়ুনুসী।
(১৭) তাক্বীফুল হুক্কাম আলা গওয়ামিদুল আহকাম।
(১৮) আরজ্বাওয়াতু ইবনুল আম্মাদ।