📄 জিনদের খাদ্য হাড়, কয়লা, গোবর
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেনঃ জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে জ্বিনদের এক প্রতিনিধি দল এসে বলল, হে মুহাম্মদ (সাঃ)! আপনার উম্মতরা যেন হাড়, গোবর ও কয়লা দিয়ে এসতেন্ন্জা না করে, কেননা আল্লা তা'আলা ওগুলোয় আমাদের রিযিক নির্ধারিত করে দিয়েছেন। (৭)
টিকাঃ
(৭) আবূ দাউদ, ১ঃ ৬, কিতাবুত তাহারাত, বাব ২০, সহীহ বুখারী, মানাকিবুল আন্সার, বাব ৩২।
📄 জিন দলের সাথে মহানবীর (সাঃ) সাক্ষাৎ ও খাদ্য উপহার
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন: (একবার) জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) হিযরতের আগে মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকায় গেলেন এবং আমার জন্য একটি রেখা টেনে দিয়ে বললেন, 'আমি না আসা পর্যন্ত কারও সাথে কোনও কথা বলবে না এবং কোনও কিছু দেখে একটুও ঘাবড়াবে না।' তারপর তিনি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বসলেন। তখন (দেখলাম) নবীজীর (সাঃ) সামনে একদল কালো মানুষ জমা হয়ে গেল। তারা যেন যিত্বর গোত্রের লোক (অর্থাৎ অত্যন্ত কালো)। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন- كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا - 'বহুসংখ্যক জ্বিন (কোরআন শোনার জন্য) নবীর কাছে ভীড় জমিয়েছে। (৮) 'এরপর নবীজীর কাছ থেকে চলে গেল। আমি শুনেছি, ওরা বলছিল, 'হে আল্লাহর রসূল (সাঃ)! আমাদের দেশ বহু দূরে। এখন আমরা রওনা হচ্ছি। আপনি আমাদের পাথেয় (স্বরূপ কিছু) দান করুন।' তখন নবীজী বলেন, 'তোমাদের খাদ্য হলো গোবর (অর্থাৎ উট, ঘোড়া, গাধা, ছাগল প্রভৃতির বিষ্ঠা)। এবং তোমরা যেসব হাড়ের কাছ থেকে যাবে, সেগুলোয় তোমাদের জন্য গোস্ত লাগানো পাবে এবং গোবর তোমাদের জন্য খেজুর হয়ে থাকবে (অর্থাৎ হাড় ও গোবর জ্বিনদের জন্য গোশ্ত খেজুরের মতো স্বাদবিশিষ্ট হবে) ওরা চলে যাবার পর আমি নবীজীকে নিবেদন করলাম, 'ওরা কারা?' নবীজী বললেন, ওরা ছিল নাসীবাইন (নামে বহু দূরের এক জায়গা)-র জ্বিন।(৯)
টিকাঃ
(৮) সূরা আল-জ্বিন, আয়াত ১৯।
(৯) দালায়িলুন নুবুউয়ত, আবু নাঈম।
📄 শয়তান খানা-পিনা করে বাঁ হাতে
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনাব রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেনঃ
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَاكُلْ بِيَمِينِهِ وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبُ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ
তোমাদের মধ্যে যখন কেউ আহার করে তখন যেন ডান হাত দিয়ে আহার করে এবং পান করার সময় যেন ডান হাত দিয়েই পান করে-কেননা শয়তান পানাহার করে বাম হাতে।(১০)
হাফিয ইবনে আবদুল বার (রহঃ) বলেছেনঃ এই হাদীসে প্রমাণ আছে যে, শয়তান খায় এবং পানও করে।
তবে একদল আলেম এই হাদীসকে রূপক বলে অভিহিত করেছেন, অর্থাৎ শয়তান বাম হাতে খেতে পছন্দ করে এবং এর দিকে ডাক দেয়। যেমন লাল রঙের বিষয়ে বর্ণনা আছে যে, লাল রঙ শয়তানের শোভা এবং কেবল মাথায় পাগড়ি বাঁধা হলো শয়তানের পাগড়ি। অর্থাৎ টকটকে লাল কাপড় পরা এবং 'শামলা' (পাগড়ির সেই প্রান্ত যা মাথার পিছন দিকে ঝোলে) না রেখে পাগড়ি পরা শয়তানী কাজ। শয়তান এ কাজ করতে প্ররোচনা দেয়। (এই বক্তব্যে যে বর্ণনার হাওয়ালা আছে তা অত্যন্ত দুর্বল। হাদীসটি এই গ্রন্থের শেষের দিকে দেওয়া হয়েছে।)
ইবনে আব্দুল বার বলেছেন: আমার কাছে ও কথার কোনও মূল্য নেই। যেখানে প্রকৃত অর্থ হওয়া সম্ভব সেখানে রূপক অর্থ নেওয়া অনর্থক।
টিকাঃ
(১০) আল্-খাদিম, যারকাশী।
📄 খাওয়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ্’ বললে শয়তানের খাওয়া বন্ধ
হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেছেন: রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে যখন আমরা কোনও খানার মজলিসে হাজির থাকতাম তখন তিনি শুরু না করা পর্যন্ত আমরা কেউ-ই খাবারে হাত দিতাম না। একবারের ঘটনা। আমরা (নবীজীর সঙ্গে) খাওয়ার মজলিসে হাযির আছি। এমন সময় এক বেদুঈন এল। যেন তাকে কেউ খাবারের দিকে তাড়িয়ে এনেছে। সে এসেই খাবারের দিকে হাত বাড়াল। নবীজী তার হাত ধরে ফেললেন এবং তাকে বসিয়ে দিলেন। তারপর একটি মেয়ে (বালিকা) এল, তাকেও যেন হাঁকিয়ে আনা হলো। মেয়েটি এসে খাবারের পাত্রে হাত দিতে উদ্যত হলো। নবীজী তারও হাত ধরে ফেললেন। তারপর তিনি বললেনঃ
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَيَسْتَحِلَّ الطَّعَامَ الَّذِي لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ جَاءَ بِهَذَا الأَعْرَابِي يَسْتَحِلُّ بِهِ فَأَخَذْتُ بِيَدِهِ ، وَجَاءَ بِهَذِهِ الْمَرأَة يَسْتَحِلُّ بِهَا فَأَخَذْتُ بِيَدِهَا فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ يَدَهُ فِي يَدَى مع أيديهما .
যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া (অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা) হয় না, শয়তান তা নিজের জন্য হালাল করে নেয় (মানে, শয়তান সেই খাবারে শরীক হয়ে যায়)। (আমরা খাওয়া শুরু করিনি দেখে) শয়তান এই বেদুঈনের সাথে খেতে এসেছিল। আমি তার হাত ধরে ফেললাম। (ফলে শয়তান সুযোগ পেল না।) তাই সে ফের এই মেয়েটির সাথে এল এবং এর মাধ্যমে খাবারে ভাগ বসাতে চাইলে। এর হাতও আমি ধরে ফেললাম। যাঁর আয়ত্বে আমার জীবন সেই সত্তা (আল্লাহ্)-র কসম! এই দু'জনের হাতের সাথে শয়তানের হাতও (এখন) আমার মুঠোর মধ্যে। (১১)
হযরত উমাইয়া বিন মুখশী (রাঃ) বলেছেনঃ একবার রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপস্থিতিতে এক ব্যক্তি খানা খাচ্ছিল। (খাওয়ার শুরুতে) সে বিস্মিল্লাহ্ বলেনি। শেষ পর্যন্ত সে সবই খেয়ে ফেলল, কেবলমাত্র একটি লোকমা (বা গ্রাস) বাকি ছিল। সেই শেষ গ্রাসটি মুখে তোলার সময় সে বললঃ بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَه
বিস্মিল্লাহি আওয়ালাহু অ আ-খিরাহু ভাবার্থ: এই খাবারের আগে ও পরে আল্লাহর নাম নেওয়া হলো। তখন নবীজী (সাঃ) হেসে ফেললেন এবং বললেনঃ
ما زالَ الشَّيْطَانُ يَأْكُلُ مَعَهُ فَلَمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ تَعَالَى اسْتَقَاء مَا في بطنه
শয়তান ওর সাথে খাবারে শরীক ছিল, কিন্তু যখনই ও আল্লাহর নাম নিয়েছে, অমনই শয়তান যা কিছু তার পেটে গিয়েছিল সব বমি করে দিয়েছে। (১২)
হযরত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জনাব রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَحْضُرُ أَحَدَكُمْ عِنْدَ كُلِّ شَيْ مِنْ شَانِهِ حَتَّى يَحْضُرَ طَعَامَهُ فَإِذَا سَقَطَتْ مِنْ أَحَدِكُمْ لُقْمَةٌ فَلْبُسِطُ مَا بِهَا مِنْ أَذًى ثُمَّ لِيَأْكُلُهَا وَلَا يَدَعُهَا لِلشَّيْطَانِ
শয়তান তোমাদের মধ্যে সকলের কাছে সকল সময় সকল অবস্থায় বিদ্যমান থাকে, এমনকী খাওযার সময়েও। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কারও খাদ্যের গ্রাস পড়ে গেলে তার ময়লা সাফ করার পর তা খেয়ে নিও, শয়তানের জন্য ছেড়ে দিও না যেন। (১৩)
হযরত জাবির (রাঃ) শুনেছেন যে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
إِنْ دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اسْمَ اللهَ تَعَالَى عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طعامِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ لَا مَبِيْتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ ، وَإِذَا دَخَلَ فَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ عِنْدَهُ خُولِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ أَدْرَكْتُمُ الْمَبِيتَ وَالْعَشَاءَ ..
যখন কোনও মানুষ নিজের বাড়িতে প্রবেশ করার সময় এবং খাওয়ার সময় 'বিসমিল্লাহ্' বলে, তখন শয়তান (অন্যান্য শয়তানের উদ্দেশে) বলে, তোমাদের জন্য (এখানে) থাকা-খাওয়ার কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু কোনও মানুষ বাড়িতে প্রবেশের সময় যদি আল্লাহর নাম না নেয়, তাহলে শয়তান বলে, তোমরা রাতে থাকার ও সাঁঝে খাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলে। (১৪)
টিকাঃ
(১১) মুসলিম, কিতাবুল আশ্রিবাহ্, হাদীস নং ১০৫। সুনানে আবূ দাউদ, কিতাবুল আইমাহ, বাব ১৯। সুনানে দারিমী, আত্ইমাহ্, বাব ৯। মুআত্তা, ইমাম মালিক, সিফাতুন নাবী, হাদীস নং ৬। মুসনাদে আহমাদ, ২ঃ ৩৩; ১০৬, ১২৮,১৩৫,১৪৬,৩২৫. ৫: ৩১১। সুনানে তিরমিযী, আত্ইমাহ্, বাব ৯ (?)। জামিই ছগীর, হাদীস নং ৪৮১।
(১২) সুনানে আবূ দাউদ, কিতাবুল আইমাহ্, বাব ১৫; হাদীস নং ৩৭৬৬। মুসনাদে আহমাদ ৫ঃ ৩২৮, ৩৯৮। মুসলিম শরীফ, কিতাবুল আশ্রিবাহ, হাদীস নং ১০২। জাল জাওয়ামিই, হাদীস নং ৫৭২৭। কানযুল উম্মাল, ৪০৭৩৯। কুরতুবী ১৪ ৯৮; ৬:৭৫।
(১৩) আবু দাউদ, কিতাবুল আইমাহ্, বাব ১৫। মুসনাদে আহমাদ, ৪ঃ ৩৬৬। আল্-আযকার, ২০৬।
(১৪) মুসলিম, আল্-আশ্রিবাহ্, হাদীস নং ১৩৪, ১৩৬। আবু দাউদ, আল্-আত্ইমাহ্, বাব ১৩। তিরমিযী, আল্-আত্ইমাহ্, বাব ১৩। মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৩ঃ ১০০, ১৭৭, ২৯০, ৩০১. ৩১৫, ৩৩১, ৩৬৬, ৩৯৪। জাল জাওয়ামিই, ৫৬১৯। কানযুল উম্মাল ৪১১৬১। ফাতহুল বারী, ১০ঃ ৩০৬। কামিল, ইবনে আদী, ৩: ১১৭২। মাজমাউয যাওয়াঈদ, ৫:১৩০।
(১৫) মুসলিম, আল্-আশরিবাহ, হাদীস নং ১০৩। আবূ দাউদ, আল-আত্ইমাহ্, বাব ১৫। ইবনে মাজাহ, কিতাবুদ দু'আ, বাব ১৯, হাদীস নং ৩৮৮৭। মুসনাদে আহমাদ, ৩ঃ ৩৪৬। বায়হাকী, হাদীস নং ২৭৬১। মিশকাত, ৪১৬১। আল্-আদাবুল মুফ্রাদ, ১০৯৬। দুররুল মানসুর, ৫ঃ ৫৯। ফাত্হুল বারী, ১১:৮৭. কানযুল উম্মাল, ৪১৫৩৮।