📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 সৌরবর্ষের ঋতুগুলোতে করণীয়

📄 সৌরবর্ষের ঋতুগুলোতে করণীয়


প্রথম পর্ব: বসন্তকালের আলোচনা

আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য এ ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি যে, আল্লাহ জমিনের বরকতসমূহ তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিবেন।’ জমিনের বরকত কী জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার চাকচিক্য।’ [৪৮৩] নবি ﷺ আরও বলেছেন, ‘কল্যাণ শুধু কল্যাণই বয়ে আনে। এ ধনসম্পদ তো শ্যামল সুমিষ্ট। অবশ্য বসন্ত যে সবজি উৎপাদন করে, তা ভক্ষণকারী পশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় অথবা নিকটবর্তী করে দেয়। তবে যে প্রাণী ঘাস খায়, রোদ পোহায়, জাবর কাটে, মল-মূত্র ত্যাগ করে এরপর আবার খায়, তার অবস্থা হয় ভিন্ন।’

বসন্তের সৌন্দর্য, শোভা এবং চাকচিক্যের মতোই যৌবনের পরিধিও সংক্ষিপ্ত। প্রকৃতি আমাদের আভাস দিয়ে যায়—শীতকালে সবকিছু শুকিয়ে যাওয়ার পর বসন্তকালে পুনরায় লতাপাতা গজায়, যা মৃতদের পুনরায় জীবিত করার প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভূমিকে আপনি শুষ্ক দেখতে পান, তারপর আমি তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করলে তা শস্য শ্যামলা হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয়... এটা এ কারণে যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবিত করেন।’ [৪৯৭]

দ্বিতীয় পর্ব: গ্রীষ্মকালের আলোচনা

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘জাহান্নামের আগুন আল্লাহর কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলল, ইয়া রব! আমার একাংশ আরেকাংশকে খেয়ে ফেলছে। আল্লাহ তখন তাকে দুটি নিঃশ্বাসের অনুমতি দিলেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে এবং আরেকটি নিঃশ্বাস গ্রীষ্মকালে। এ কারণেই তোমরা গ্রীষ্মের প্রখরতা ও (শীতে) ঠান্ডার তীব্রতা অনুভব করে থাকো।’ [৫০০]

গ্রীষ্মকালে গরম স্মরণ করিয়ে দেয় জাহান্নামের উত্তাপের কথা। দুনিয়ার আগুনকে আল্লাহ তাআলা আখিরাতের আগুনের নিদর্শন বানিয়েছেন। সালাফদের অনেকেই আগুন দেখলে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদতেন। উমার বলতেন, ‘জাহান্নামকে বেশি বেশি স্মরণ করো। কারণ তার উত্তাপ খুব ভয়ানক, গভীরতা অনেক বেশি।’

তৃতীয় পর্ব: শীতকালের আলোচনা

আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত আছে, নবি ﷺ বলেছেন, ‘শীতকাল মুমিনের জন্য বসন্ত।’ [৫০৩] এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, শীতকালে দিন ছোট হওয়ায় তাতে সিয়াম এবং রাত দীর্ঘ হওয়ায় তাতে কিয়াম করা সহজ হয়। শীতঋতু মুমিনের জন্য বসন্তকাল কারণ মুমিন ব্যক্তি তখন নির্বিঘ্নে ইবাদাত করতে পারে। শীতকালে কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে ওজু করা মর্যাদা বুলন্দ করে এবং গুনাহ মিটিয়ে দেয়। নবি ﷺ বলেছেন, ‘অসুবিধা এবং কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে ওজু করা... এটাই হলো রিবাত।’ [৫০৫]

শীতকালের একটা বিশেষত্ব হলো, এর মাধ্যমে জাহান্নামের হিমশীতল অবস্থার কথা স্মরণ হয় এবং তা থেকে পানাহ চাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সেখানে তারা কোনো শীতল (অবস্থা) ও পানীয় আস্বাদন করবে না, ফুটন্ত পানি ও গাসসাক ছাড়া।’ [৫১০] গাসসাক হলো অত্যন্ত তীব্র ঠান্ডা বা দুর্গন্ধযুক্ত পচা জিনিস।

টিকাঃ
[৪৮৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৬৪২৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৫২
[৪৮৪] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৯৬১
[৪৮৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২২৯৬
[৪৮৬] সূরা আদিয়াত, ১০০ : ৮
[৪৮৭] সূরা বাকারাহ, ২: ১৮০
[৪৮৮] সূরা সোয়াদ, ৩৮: ৩২
[৪৮৯] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৪৭২
[৪৯০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭৪২
[৪৯১] সূরা আলি ইমরান, ৩:১৪
[৪৯২] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১২
[৪৯৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৫৪
[৪৯৪] সূরা কাহফ, ১৮: ৪৫
[৪৯৫] সূরা ইউনুস, ১০:২৪
[৪৯৬] সূরা হাদীদ, ৫৭:২০
[৪৯৭] সূরা হাজ্জ, ২২:৫-৭
[৪৯৮] সূরা কাফ, ৫০:৯-১১
[৪৯৯] সূরা আ'রাফ, ৭: ৫৭
[৫০০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬১৮; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৩৭
[৫০১] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৭৩
[৫০২] সূরা আ'রাফ, ৭:৫০
[৫০৩] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১১৭১৬
[৫০৪] বায়হাকি, আসসুনানুল কুবরা, হাদীস নং: ৮৪৫৬
[৫০৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫১
[৫০৬] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩২৩৫
[৫০৭] সূরা নাহল, ১৬: ৫
[৫০৮] সূরা নাহল, ১৬:৮০
[৫০৯] সূরা ইনসান, ৭৬: ১৩
[৫১০] সূরা নাবা, ৭৮: ২৪-২৫
[৫১১] সূরা সোয়াদ, ৩৮: ৫৭
[৫১২] শরীর থেকে বের হয়ে আসা রক্ত, পুঁজ বা অত্যন্ত চরম ঠান্ডা জিনিস।

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 পরিশিষ্ট : তাওবার আলোচনা

📄 পরিশিষ্ট : তাওবার আলোচনা


মৃত্যুর আগেই তাওবা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাওবা সারা জীবনের আমল। ইবনু উমার থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘রূহ কণ্ঠাগত না হওয়া পর্যন্ত, বান্দার তাওবা আল্লাহ অবশ্যই কবুল করে থাকেন।’ [৫১৩] আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই সেসব লোকের তাওবা কবুল করেন, যারা মন্দ কাজ অজ্ঞতাবশত করে এরপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে নেয়।’ [৫১৪]

‘অজ্ঞতাবশত’ মন্দ কাজ করার অর্থ হলো আল্লাহর অবাধ্য হওয়া, কারণ আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি মাত্রই মূর্খ। আর ‘অনতিবিলম্বে’ বলতে মৃত্যুর পূর্বেই উদ্দেশ্য। মৃত্যু এসে গেলে এবং দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়ে গেলে তখন আর তাওবা কোনো কাজে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাওবা তাদের জন্য নয় যারা সারাজীবন মন্দ কাজ করে। অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তাওবা করছি।’ [৫১৫]

মৃত্যুর আগেই তাওবা এবং নেক আমলের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো তোমাদের কাছে আযাব আসার আগেই।’ [৫১৮] কবরে থাকা মৃত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা এটাই—কিছু সময়ের জন্য যেন তাদেরকে দুনিয়াতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা তাওবা করতে পারে।

তাওবার ক্ষেত্রে মানুষের ভিন্নতা দেখা যায়। কারও কারও খাঁটি তাওবা করার সুযোগই হয় না। আবার কেউ কেউ আমৃত্যু গুনাহে লিপ্ত থেকেও শেষ সময়ে এসে তাওবা করার সুযোগ পায়। নবি ﷺ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার কল্যাণ চাইলে তাকে মধুমিশ্রিত করে দেন।’ এর অর্থ হলো মৃত্যুর আগে তাকে কোনো ভালো কাজ করার সুযোগ দেন এবং এ অবস্থাতেই তাকে তুলে নেন। [৫২২]

মুমিনের উচিত সর্বাবস্থায় তাওবা করতে থাকা। বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ব্যক্তি হলো প্রসবের অপেক্ষারত নারীর মতো, যার সময় পূর্ণ হয়ে গেছে। সুতরাং তাওবা করুন। মৃত্যুর পালা আসার আগেই আল্লাহর দুয়ারে ধর্ণা দিন। সাইয়িদুল ইসতিগফার সকাল-সন্ধ্যায় পাঠকারী সে দিন মারা গেলে জান্নাতী হবে। [৫২৮]

টিকাঃ
[৫১৩] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫৩৭; আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৬৪০৮
[৫১৪] সূরা নিসা, ৪: ১৭
[৫১৫] সূরা নিসা, ৪: ১৮
[৫১৬] সূরা ওয়াকিআ, ৫৬: ৮৩-৮৫
[৫১৭] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ২৬
[৫১৮] সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৪-৫৬
[৫১৯] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৯৯-১০০
[৫২০] সূরা মুনাফিকূন, ৬৩: ১০-১১
[৫২১] সূরা সাবা, ৩৪: ৫৪
[৫২২] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২১৯৪৯
[৫২৩] সূরা নিসা, ৪: ৭৭-৭৮
[৫২৪] সূরা কাহফ, ১৮: ২৯
[৫২৫] সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৩
[৫২৬] সূরা মুমিন, ৪০: ১৮
[৫২৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১
[৫২৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৬৩০৬
[৫২৯] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৪৩০
[৫৩০] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00