📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 তৃতীয় পর্ব : মধ্য-রমাদান এবং শেষার্ধের আলোচনা

📄 তৃতীয় পর্ব : মধ্য-রমাদান এবং শেষার্ধের আলোচনা


আবূ সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ রমাদানের মধ্য দশকে ইতিকাফ করতেন। এক বছর তিনি এমন ইতিকাফ করলেন। অবশেষে একুশের রাত এল। যে রাতের সকালে তিনি বললেন,

'যারা আমার সঙ্গে ইতিকাফ করছে, তারা যেন শেষ দশক (অবধি) ইতিকাফ করে। আমাকে এই রাত (অর্থাৎ লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল। পরে আবার (সঠিক তারিখটি) ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আমি দেখতে পেয়েছি, ওই রাতের সকালে আমি কাদাপানির মাঝে সিজদাহ করছি। অতএব তোমরা তা শেষ দশকে এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তালাশ করো।' [২৮৫]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ রমাদান মাসের প্রথম দশকে ইতিকাফ করলেন। এরপর মাঝের দশকেও একটি ছোট তাঁবুর মধ্যে তিনি ইতিকাফ করলেন। এরপর কেউ একজন এসে আমাকে বলল, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে আছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন (শেষ পর্যন্ত) ইতিকাফ করে।' [২৮৬]

বদর-যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
রমাদানের ১৭ তারিখ নবি -এর নুবুওয়াতের সূচনা হয়েছিল। এ রাতের দিনটি হলো ইয়াওমুল ফুরকান এবং দু'দলের মুখোমুখি হওয়ার দিন। মুসলিমরা ছিলেন ৩১০ জনের কিছু বেশি। তাঁদের সাথে ছিল সত্তরটির মতো উট। আল্লাহর নবির সাথে জিহাদে অংশ নিতে না পারায় কিছু দরিদ্র সাহাবি কান্নাকাটি করেছিলেন। ১৭ই রমাদানের জুমুআর সেই রাতটি নবিজি সালাত আদায়, কান্না এবং শত্রুর বিপক্ষে সাহায্য চেয়ে দুআর মধ্যে কাটিয়ে দিলেন। [২৯১]

রমাদান মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা এবং সিয়ামের মাধ্যমে খাহেশাতের অগ্নি নির্বাপিত করা হলে প্রবৃত্তির ক্ষমতা খর্ব হয়। সহীহ বুখারিতে আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'রমাদান মাস এলে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো করে দেওয়া হয় বন্ধ। আর শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।' [২৯৮]

ইমাম তিরমিযি এবং ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেছেন যে, নবি বলেছেন,

'রমাদান মাসের প্রথম রাতেই শয়তান এবং দুষ্ট জিনদের শিকলবন্দি করে ফেলা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না। (অপরদিকে) জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এর একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে, 'হে কল্যাণকামী! সামনে অগ্রসর হও। হে পাপাচারী! থেমে যাও।' আর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক জাহান্নামীকে মুক্তি দেওয়া হয়। (রমাদানের) প্রত্যেক রাতেই এমনটা চলতে থাকে।' [৩০০]

টিকাঃ
[২৮৫] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০২৭
[২৮৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬৭
[২৮৭] সূরা হাশর, ৫৯: ৮
[২৮৮] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৯-৪০
[২৮৯] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, হাদীস নং: ৪২৯৯
[২৯০] সূরা মায়িদা, ৪: ২৪
[২৯১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১০২২
[২৯২] সূরা আনফাল, ৪: ১০
[২৯৩] সূরা আনফাল, ৮: ১৭
[২৯৪] সূরা আনফাল, ৮: ৬৬
[২৯৫] সূরা আহযাব, ৩৩: ৯
[২৯৬] সূরা আহযাব, ৩৩: ২৫
[২৯৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮১২
[২৯৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৮৯৯
[২৯৯] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৭৯
[৩০০] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৬৮২; ইবনু মাজাহ, আসসুনান, হাদীস নং: ১৬৪২
[৩০১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৭৯১৭
[৩০২] সূরা কাদর, ৯৭: ৪-৫
[৩০৩] সূরা হাশর, ৫৯ : ২

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 চতুর্থ পর্ব : রমাদানের শেষ দশকের আলোচনা

📄 চতুর্থ পর্ব : রমাদানের শেষ দশকের আলোচনা


আয়িশা বলেছেন, 'রমাদানের শেষ দশক আসলে নবি শক্ত করে কোমর বাঁধতেন। রাতে নিজে জেগে থাকতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।' [৩০৪] আয়িশা আরও বলেন, 'রাসূলুল্লাহ রমাদানের শেষ দশক (ইবাদাতে) এমনভাবে সচেষ্ট থাকতেন, অন্য সময়ে ততটা থাকতেন না।' [৩০৫]

নবিজির আমল
রমাদানের শেষ দশকে নবি অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি বেশি আমল করতেন। এ সময়টাতে যেসব আমল তিনি করতেন:
১. রাতে জেগে ইবাদাত করা।
২. পরিবারের লোকদের জাগিয়ে দেওয়া।
৩. নবি শক্ত করে কোমর বাঁধতেন (অর্থাৎ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকতেন)।
৪. মাগরিব এবং ইশার সালাতের মাঝে গোসল করা।
৫. ইতিকাফ করা।

স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক করার জন্য সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াই ইতিকাফের মর্ম। উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য শারীয়াত অনুমোদিত নির্জনবাস হলো মাসজিদে ইতিকাফ করা। নবি ইন্তেকাল পর্যন্ত রমাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। [৩১৩]

আল্লাহ তাআলা বলেন, 'নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কী জানেন? লাইলাতুল কদর হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠ।' [৩১৫] আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, 'যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।' [৩১৭]

টিকাঃ
[৩০৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৭৪
[৩০৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৭৫
[৩০৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭৪৬
[৩০৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৭২১১
[৩০৮] সূরা ত্বা-হা, ২০: ১৩২
[৩০৯] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৭৪
[৩১০] সূরা বাকারাহ, ২: ১৮৭
[৩১১] সূরা আ'রাফ, ৭: ৩১
[৩১২] সূরা আ'রাফ, ৭: ২৬
[৩১৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০২৬
[৩১৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০৪৪
[৩১৫] সূরা কাদর, ৯৭: ১-৩
[৩১৬] মুওয়াত্তা মালিক, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩২১
[৩১৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯০১

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 পঞ্চম পর্ব : রমাদানের আখেরি সাত রাত

📄 পঞ্চম পর্ব : রমাদানের আখেরি সাত রাত


আবদুল্লাহ ইবনু উমার থেকে বর্ণিত, নবি -এর কয়েকজন সাহাবিকে স্বপ্নযোগে রমাদানের শেষ সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। (এ কথা শুনে) রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তোমাদের দেখা তো দেখছি আমার দেখা শেষ সাত রাতের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে।' সহীহ মুসলিমে ইবনু উমার থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমরা রমাদানের শেষ দশদিনে কদরের রাত তালাশ করো। তোমাদের কেউ দুর্বল বা অপারগ হয়ে পড়লে শেষ সাত রাতে যেন অলসতা না করে।' [৩১৮]

অধিকাংশ আলিমের মতে, শেষ দশকের রাতগুলিতেই লাইলাতুল কদর হয়ে থাকে। বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলিই বেশি সম্ভানাময়। উবাই ইবনু কা'ব শপথ করে ২৭ তারিখ লাইলাতুল কদর হওয়ার কথা বলতেন। ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, একজন লোক নবি -এর কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর নবি! আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। সালাতে দাঁড়িয়ে থাকা আমার জন্য কষ্টকর। এখন আপনি আমাকে এমন একটি রাতের কথা বলে দিন, যাতে আল্লাহর তাওফীকে আমি লাইলাতুল কদর পাব।' নবিজি বললেন, 'তুমি ২৭শের রাতে ইবাদাত কোরো।' [৩২২]

লাইলাতুল কদরের আমল
নবিজি -কে আয়িশা বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই, তবে কী দুআ করব?' নবিজি বললেন, তুমি বলবে:

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

'ইয়া আল্লাহ! আপনি তো অত্যন্ত ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে আপনি ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।' [৩২৪]

টিকাঃ
[৩১৮] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬৫
[৩১৯] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬৯
[৩২০] সহীহ রাবিুখ, হাদীস নং: ১২০২
[৩২১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭৬২
[৩২২] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২১৪৯
[৩২৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯০১
[৩২৪] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫১৩
[৩২৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৮৬

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 ষষ্ঠ পর্ব : বিদায় মাহে রমাদান

📄 ষষ্ঠ পর্ব : বিদায় মাহে রমাদান


সহীহ বুখারি এবং মুসলিমে আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবি বলেছেন, 'যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমান-সহ এবং সাওয়াবের আশায় রমাদানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।' [৩২৬]

সালাফরা আমল করার ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতেন, যেন তা যথাসম্ভব নিখুঁত হয়। তারপর সেটা কবুল হওয়ার প্রতি তারা গুরুত্বারোপ করতেন এবং কবুল না হওয়ার আশঙ্কায় থাকতেন।

রমাদান মাসে মাগফিরাত লাভের অনেক মাধ্যম আছে। যেমন, রমাদানের সিয়াম পালন, তারাবীর সালাত আদায় এবং বিশেষত লাইলাতুল কদরে সালাত আদায় করা। ইসতিগফার হলো সিয়ামের মধ্যকার ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং অনর্থক কথা-াজের ক্ষতিপূরণ। এজন্যই পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম বলেছেন, সিয়াম পালনকারীর জন্য সাদাকাতুল ফিতর হলো সালাতের সাহু সিজদাহ এর মতো।

সহীহ ইবনু খুযাইমাতে সালমান থেকে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন, এ মাসে তোমরা চারটি কাজ বেশি বেশি করবে। দুটি কাজ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; আর বাকি দুটি এমন যে, তা করতেই হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজ দুটি হলো— (১) আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই সাক্ষ্য দেওয়া। (২) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর যে কাজ দুটি তোমাদের করতেই হবে তা হলো—আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া। [৩৩৫]

টিকাঃ
[৩২৬] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৮৬
[৩২৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭৫৯; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২০০৮
[৩২৮] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১১৫৩২
[৩২৯] সূরা মা-ঊন, ১০৭: ৪-৫
[৩৩০] সূরা মু'মিনূন, ২৩: ৬০
[৩৩১] সূরা মায়িদা, ৫: ২৭
[৩৩২] সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদীস নং: ৯০৭
[৩৩৩] সূরা বাকারাহ, ২: ১৮৫
[৩৩৪] সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৩
[৩৩৫] সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস নং: ১৮৮৭
[৩৩৬] সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস নং: ১৮৮৭
[৩৩৭] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৯
[৩৩৮] আবু দাউদ, আস সুনান, হাদীস নং: ৭৯২।
[৩৩৯] সূরা আলি ইমরান, ৩: ১৮৫
[৩৪০] সূরা হাশর, ৫৯: ২০
[৩৪১] সূরা হূদ, ১১: ১০৬ - ১০৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00