📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 শাবান মাসে পালনীয়

📄 শাবান মাসে পালনীয়


প্রথম পর্ব: নবি ﷺ-এর সিয়াম

উসামা ইবনু যায়িদ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনভাবে ধারাবাহিক সিয়াম রাখতে থাকতেন যে আমরা বলতাম, তিনি বোধহয় সিয়াম ছাড়বেন না। আবার এমনভাবে সিয়াম ছাড়া থাকতেন যে মনে হতো তিনি আর সিয়ামই পালন করবেন না। তবে জুমুআর দিন থেকে দুটি দিন ছিল ব্যতিক্রম। ধারাবাহিক সিয়াম অবস্থায়ও তিনি সে দুটি দিন সিয়াম পালন করতেন, আবার ছাড়াকালীনও সে দুটিতে সিয়াম রাখতেন। শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনো মাসে তিনি ততটা সিয়াম পালন করতেন না। একবার আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সিয়াম পালন করতে থাকলে মনে হয় যেন সিয়াম ছাড়বেনই না। আর সিয়াম ছাড়া থাকলে মনে হয় সিয়ামই পালন করবেন না। তবে দুটি দিনের কথা ভিন্ন। যখন একনাগাড়ে সিয়াম পালন করতে থাকেন, তখন সে দিন দুটিতেও সিয়াম রাখেন। আবার সিয়াম ছাড়া অবস্থাতেও দিন দুটিতে ঠিকই সিয়াম পালন করেন।' নবিজি বললেন, 'কোন দিন দুটি?' আমি বললাম, 'সোম এবং বৃহস্পতিবার।' তিনি বললেন,
ذَانِكَ يَوْمَانِ تُعْرَضُ فِيهِمَا الْأَعْمَالُ عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمُ
'সে দিন দুটিতে বান্দার আমল আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়। আমার আকাঙ্ক্ষা—আমল পেশ করার সময় আমি যেন সিয়াম অবস্থায় থাকি।'

উসামা বলেছেন, তখন আমি বললাম, শাবান মাসে আপনি যত সিয়াম পালন করেন অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত সিয়াম পালন করতে দেখিনি। তিনি বললেন,
ذَاكَ شَهْرُ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرُ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمُ
'রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সে মাসে মানুষ উদাসীন থাকে। এ মাসে আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। আমার আকাঙ্ক্ষা-আমার আমল পেশ করার সময় আমি যেন সিয়ামরত থাকি।' [২০১]

এই হাদীসে নবি ﷺ-এর সারা বছরের সিয়াম, সাপ্তাহিক সিয়াম এবং বিভিন্ন মাসের সিয়ামের আলোচনা এসে গেছে। সারা বছরের সিয়াম সম্পর্কে বলা হয়েছে, নবি মাঝে মাঝে একনাগাড়ে সিয়াম পালন করতেন, মাঝে মাঝে করতেন না। যখন সিয়াম পালন করতেন তখন বলা হতো যে তিনি বোধহয় সিয়াম ছাড়বেন না। আবার তাঁকে সিয়াম ছাড়া দেখে বলা হতো যে তিনি সিয়াম পালন করবেন না।

নফল আমল পালনে শারীআর দৃষ্টিভঙ্গি
ইফতার না করে লাগাতার সিয়াম পালন করা নবি ﷺ অপছন্দ করতেন। তিনি নিজেও এমনটা করতেন না। সহীহ বুখারি এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, নবি আমাকে বললেন, 'তুমি নাকি দিনে সিয়াম পালন করো এবং রাত জেগে সালাত আদায় করো?' আমি বললাম, 'জি হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
فَإِنَّكَ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ هَجَمَتْ عَيْنُكَ، وَنَفِهَتْ نَفْسُكَ، وَإِنَّ لِنَفْسِكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ حَقًّا، فَصُمْ وَأَفْطِرْ، وَقُمْ وَنَمْ
'এমনটা করতে থাকলে তো তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে। নিজের প্রতি তোমার (যেমন) অধিকার আছে, তেমনি তোমার পরিবার-পরিজনেরও রয়েছে। কাজেই তুমি সিয়াম পালন করবে এবং বাদও দেবে। রাত জেগে ইবাদাত করবে, আবার ঘুমিয়েও নেবে।' [২০২]

আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবি ﷺ-এর ক'জন সাহাবি উম্মুল মুমিনীনদের কাছে তাঁর গোপন ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর ওই সাহাবিদের একজন বললেন, আমি কখনো বিয়ে করব না। অন্যজন বললেন, আমি কখনো গোশত খাব না। আবার কেউ বললেন, আমি কখনো বিছানায় ঘুমাব না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে বললেন,
مَا بَالُ أَقْوَامٍ قَالُوا كَذَا وَكَذَا؟ لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ، وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
‘লোকদের কী হয়েছে যে, তারা এমন এমন কথা বলছে? কিন্তু আমি তো (রাতে) সালাত আদায় করি আবার নিদ্রাও যাই। সিয়াম পালন করি আবার বাদও দিই। আর আমি বিয়েও করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়। [২০৩]

সহীহ বুখারিতে আছে, সালমান এবং আবুদ দারদা (রাঃ)-কে নবিজি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। একবার সালমান (রাঃ) আবুদ দারদা (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। এসে উম্মুদ দারদা (রাঃ)-কে মলিন কাপড় পরা অবস্থায় দেখতে পেলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মুদ দারদা (রাঃ) বললেন, 'আপনার ভাই আবুদ দারদার তো পার্থিব কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ নেই।'

কিছুক্ষণ পর আবুদ দারদা (রাঃ) এসে সালমান (রাঃ)-এর জন্য খাবার প্রস্তুত করালেন। এরপর বললেন, 'আপনি খেয়ে নিন, আমি সিয়াম পালন করছি।' সালমান (রাঃ) বললেন, 'আপনি না খেলে আমিও খাব না।'

আবুদ দারদা (রাঃ) তখন সালমান (রাঃ)-এর সঙ্গে খেলেন। রাতে আবুদ দারদা (রাঃ) সালাতে দাঁড়াতে গেলে সালমান (রাঃ) বললেন, 'এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।' আবুদ দারদা (রাঃ) শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার সালাতে দাঁড়াতে উদ্যত হলে সালমান (রাঃ) বললেন, 'ঘুমিয়ে যান।' অবশেষে রাতের শেষভাগে আবুদ দারদা (রাঃ)-কে ডেকে সালমান (রাঃ) বললেন, 'এখন দাঁড়ান।' এরপর তাঁরা দুজনে সালাত আদায় করলেন।

পরে আবুদ দারদা (রাঃ)-কে সালমান (রাঃ) বললেন, 'আপনার প্রতি আপনার প্রতিপালকের (যেমন) অধিকার আছে, তেমনি নিজের প্রতিও আপনার অধিকার রয়েছে। আবার আপনার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান করুন।' আবুদ দারদা (রাঃ) পরে নবি ﷺ-এর কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনা জানালেন। (সব শুনে) নবি বললেন,
«صَدَقَ سَلْمَانُ» 'সালমান ঠিকই বলেছে।' [২০৪]

অন্য বর্ণনামতে নবি বলেছিলেন,
مَا لِسَلْمَانَ ثَكِلَتْهُ أُمُّهُ؟ لَقَدْ أُشْبِعَ مِنَ الْعِلْمِ» 'সালমান খুব চমৎকার কথা বলেছে! তাকে তো ইলম দ্বারা ভরপুর করে দেওয়া হয়েছে।' [২০৫]

তদ্রূপ আমর ইবনিল আস-এর ছেলে আবদুল্লাহ-কে লাগাতার সিয়াম পালন করতে দেখে নবি নিষেধ করেন। এর পরিবর্তে তাকে দাউদ-এর মতো একদিন পরপর সিয়াম পালনের পরামর্শ দেন। আর বলেন,
«لَا أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ» 'এর থেকে উত্তম হতেই পারে না।' [২০৬]

সুতরাং শ্রেষ্ঠতম নফল সিয়াম সেটাই, যা পালন করলে আল্লাহর হক বা বান্দার হক পালনের ক্ষেত্রে শারীরিক দুর্বলতাজনিত অপারগতা সৃষ্টি না হয়। কারণ, যে আমল করলে তার চেয়ে উত্তম আমল পালনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা অনুভূত হয়, এমন আমল না করাই ভালো।

আল্লাহর হকের উদাহরণ হলো সালাত, যিকর অথবা ইলম অর্জনে দুর্বলতা বোধ হলে নফল সিয়াম ত্যাগ করা। যেমন (শুধু) জুমুআর দিন এবং আরাফার দিন ময়দানে অবস্থানকারীদের সিয়াম পালন করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা সিয়ামের কারণে সৃষ্ট দুর্বলতা দিন দুটিতে যিকর এবং দুআয় বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ নফল সিয়াম কম পালন করতেন। এ ব্যাপারে তিনি বলতেন, 'নফল সিয়াম পালন করলে আমি কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি না। আর কুরআন তিলাওয়াত আমার কাছে অন্যান্য নফল আমলের তুলনায় বেশি পছন্দনীয়।'

সুতরাং নফল সিয়াম পালন থেকে কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম। সুফইয়ান সাওরি -সহ অন্য ইমামগণ এ কথাই বলেছেন। তদ্রূপ উপকারী ইলম শেখা এবং শেখানো নফল সিয়াম থেকে উত্তম। আর ইমাম চতুষ্টয় এ ব্যাপারে একমত যে ইলম অর্জন করা নফল সালাত থেকে উত্তম। আর নফল সালাত তো নফল সিয়াম থেকে উত্তম। তাই ইলম অর্জন যে নফল সিয়াম থেকে উত্তম হবে, সেটা তো বলাই বাহুল্য। ইলম হলো মূর্খতা এবং প্রবৃত্তির অন্ধকারে দীপ্তি ছড়ানো আলো। সুতরাং আলো ছাড়া অন্ধকারে পথ চলতে গেলে খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতেই পারে।

ইবনু সীরীন বলেন, একদল লোক ইলম অর্জন না করেই মাসজিদে পড়ে থাকে। তাদের সালাত-সিয়াম হয় ইলম ছাড়া। আল্লাহর কসম! ইলম ছাড়া আমল তো লাভের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি।

বান্দার আবশ্যক হক (লঙ্ঘনের) উদাহরণ হলো পরিবারের জন্য উপার্জন কিংবা জীবনসঙ্গীর অধিকার আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়া। এমনটা হলে নফল সিয়াম ত্যাগ করাই উত্তম। এদিকে ইঙ্গিত করেই নবি বলেন,
«إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا» 'তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে।' [২০৭]

'নিজের প্রতিও আপনার অধিকার রয়েছে। ... প্রত্যেক হকদারকে তার অধিকার প্রদান করুন।' এ কথা বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে আদম-সন্তানের কাছে তার নিজের সত্তাকে আমানত রাখা হয়েছে। এর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। যার অন্যতম অধিকার হলো কবরে যাওয়া পর্যন্ত তার সাথে সদয় আচরণ করা।

হাসান বলেন, 'তোমাদের সত্তা আল্লাহ তাআলার কাছে পৌঁছার বাহনস্বরূপ। সুতরাং নিজেদের বাহনগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। যাতে সেগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে তোমাদেরকে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিতে পারে।'

সুতরাং ইবাদাতে সহায়ক হবে এ নিয়তে নিজের প্রতি যত্নবান হলে সাওয়াব মিলবে। এজন্যই মুআয বলতেন, 'আমি ইবাদাতের মতো ঘুমের মাধ্যমেও সাওয়াবের প্রত্যাশা করি।' [২০৮]

এর বিপরীতে নিজের যত্ন না নিয়ে দুর্বল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা অবিচার হবে। আবদুল্লাহ ইবনু আমর-কে এটা বোঝানোর জন্যই নবিজি বলেছিলেন, 'এমন করতে থাকলে তো তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে।'

সারকথা হলো, বিক্ষিপ্ত সিয়ামের মাধ্যমে নবি লাগাতার সিয়ামের একাংশের সাওয়াব এবং তার চেয়ে বেশি সাওয়াব পেয়েছেন। তেমনি আকাঙ্ক্ষা থাকার কারণে সাওয়াব পেয়েছেন ধারাবাহিক সিয়ামেরও। অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ আমলের জন্যই তিনি ধারাবাহিক সিয়াম থেকে বিরত থাকতেন।

একটি কথার ব্যাখ্যা
'রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সময়ে মানুষ কি উদাসীন থাকে?' আসলে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, লোকমুখে যে স্থান, সময় বা মানুষ শ্রেষ্ঠ বলে প্রসিদ্ধি লাভ করে তার বাইরেও শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে। সেই শ্রেষ্ঠত্ব হতে পারে স্বাভাবিক কারণে, হতে পারে কোনো বিশেষ কারণে। বিষয়টি অধিকাংশ মানুষের না-জানা থাকার কারণে তারা প্রসিদ্ধ বিষয়টি নিয়ে মজে থাকে। আর অপ্রসিদ্ধ বিষয়টির ফযিলত তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

হাদীসের এ অংশটি মানুষ জানে না। রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সময়ে ইবাদাত করা যে মুস্তাহাব, এটি তার দলিল। এমন সময় আমল করা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়। যেমন একদল সালাফ মাগরিব এবং ইশার মধ্যবর্তী সময় সালাতে কাটিয়ে দিতেন। তাদের বক্তব্য ছিল, 'এ সময় মানুষ বেখবর থাকে।' তদ্রূপ মধ্যরাতে সালাত আদায়ের ফযিলত বেশি হওয়ার কারণ এটাও যে, সে-সময় অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির চাদর মুড়ি দিয়ে থাকে। আর নবি বলেছেন,
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرَّبُّ مِنَ الْعَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ الآخِرِ، فَإِنْ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمَّنْ يَذْكُرُ اللَّهَ فِي تِلْكَ السَّاعَةِ فَكُنْ
'রাতের শেষভাগে বান্দা তার রবের সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে থাকে। সে সময়টাতে যদি তুমি আল্লাহর যিকরকারীদের একজন হতে সক্ষম হও, তবে হয়ে যেয়ো।'[২১৭]

এ কারণেই নবি ইশার সালাত অর্ধরাত পর্যন্ত বিলম্ব করে আদায় করতে চাইতেন। তবে মানুষের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তা পরিহার করেছেন। একবার ইশার সালাতের জন্য বের হয়ে অপেক্ষমাণ সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন,
مَا يَنْتَظِرُهَا أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ غَيْرُكُمْ»
'তোমরা ছাড়া পৃথিবীর কেউই এই সালাতের জন্য অপেক্ষা করছে না।' [২১৮]

নির্জনে ইবাদাতের ফায়দা
১. ইবাদাতটি অধিকতর গোপনে হয়। আর নফল আমল যত বেশি গোপনে করা যায়, ততই ভালো। বিশেষত সিয়াম পালন। কারণ এটা আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যকার বিষয়। এজন্য বলা হয়, সিয়ামে রিয়া তথা লৌকিকতার কিছু নেই।

সালাফের মাঝে এমন ব্যক্তি ছিলেন যিনি চল্লিশ বছর ধরে সিয়াম পালন করেছেন, কিন্তু কেউ জানতেও পারেনি। তাঁর দোকান ছিল। প্রতিদিন ঘর থেকে দোকানে যাওয়ার সময় দুটি রুটি নিয়ে বের হতেন এবং পথিমধ্যে সেগুলো সাদাকাহ করে দিতেন। ঘরের লোকেরা ভাবত, দোকানে বসে খাওয়ার জন্য তিনি রুটি নিয়ে গিয়েছেন। আর বাজারের লোকেরা ভাবত, তিনি ঘর থেকে খেয়ে এসেছেন। সিয়াম পালনকালীন এমন ভাব প্রকাশ করতেন, যাতে সিয়ামের ব্যাপারটি গোপন থাকে। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলতেন, 'সিয়াম পালন করলে তেল ব্যবহার করবে।'

২. তা নফসের জন্য কষ্টকর। আর নফসের জন্য যে আমল কষ্টকর, তা সর্বোত্তম। কারণ নফসের অভ্যাস এমন যে, সে সমজাতীয়দের অবস্থা দেখে সান্ত্বনা লাভ করে। মানুষের সচেতনতা এবং ইবাদাতের পরিমাণ বেশি হলে অনুসারীদের আধিক্যের কারণে ইবাদাতকারীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। ফলে ইবাদাত হয়ে যায় সহজলভ্য। পক্ষান্তরে গাফিলতি এবং উদাসীন লোকের সংখ্যা বেশি হলে নফস তখন গাফিলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে সান্ত্বনা লাভ করে থাকে। ফলে সচেতন ব্যক্তির সংখ্যা কমে যায়। আর তখন ইবাদাত করাটা নফসের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ অর্থেই নবি বলেছেন,
«لِلْعَامِلِ فِيهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا يَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ» 'ফিতনার সময় যে ব্যক্তি নেক আমল করবে, সে ব্যক্তি তার মতো পঞ্চাশ জন আমলকারীর সমান সাওয়াব পাবে।' [২১৯]

নবি বলেছেন,
«بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ» 'ইসলাম শুরুতে অপরিচিত ছিল, অচিরেই তা আবার অপরিচিত হয়ে পড়বে। সুতরাং অপরিচিতদের জন্য মুবারকবাদ।' [২২০]

৩. গুনাহগার এবং উদাসীন ব্যক্তিদের মাঝে থেকে একাকী ইবাদাত করার দ্বারা, অনেক সময় মানুষের ওপর আসতে থাকা বিপদ প্রতিহত হয়। এমন ইবাদাতকারী মানুষকে হেফাজত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

রমাদানের কাযা সিয়ামের মাসআলা
রমাদানের কাযা সিয়াম যদি সামর্থ্যবান কারও জিম্মায় থাকে, তা আদায় করে নেওয়া উচিত। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া পরবর্তী রমাদানের পর পর্যন্ত তা পেছানো জায়েয নেই। যদি কেউ পিছিয়ে দেয়, তবে ইমাম মালিক, শাফিয়ি এবং আহমাদ এর মতে কাযা করার সাথে সাথে প্রতিদিন একজন মিসকিনকে আহার করাতে হবে। আর ইমাম আবূ হানীফা এর মতে স্রেফ কাযা করবে। [২২৩]

দ্বিতীয় পর্ব: অর্ধ শাবানের আলোচনা

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ، فَلَا تَصُومُوا 'শাবান মাস অর্ধেক হয়ে গেলে তোমরা আর সিয়াম পালন করো না।' [২২৪]

পনেরো শাবানের সিয়াম
মধ্য শাবানের রাত এলে তাতে তোমরা সালাত আদায় করো এবং দিনে সিয়াম পালন করো। কেননা এদিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর নিকটস্থ আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছ আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। রিযকপ্রার্থী কেউ আছ কি? আমি তাকে রিযক দান করব। [২২৫]

শামের তাবিয়িগণ এ রাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। তবে হিজাযের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম তা গ্রহণ করেননি।

তৃতীয় পর্ব : শাবানের শেষে সিয়াম পালন করা

ইমরান ইবনু হুসায়ন থেকে বর্ণিত, নবি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন, يَا أَبَا فُلانٍ، أَمَا صُمْتَ سَرَرَ هَذَا الشَّهْرِ? 'হে অমুকের পিতা! তুমি কি এ মাসের শেষভাগে সিয়াম পালন করোনি?' লোকটি উত্তর দিল, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন নবি বললেন, فَإِذَا أَفْطَرْتَ فَصُمْ يَوْمَيْنِ 'তাহলে সিয়াম পালন শেষে দুদিন সিয়াম পালন করে নিয়ো।' [২৩৪]

রমাদানের এক-দুদিন আগে সিয়াম পালনের নিষেধাজ্ঞা এসেছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে কিনা নফল সিয়ামে অভ্যস্ত নয়। [২৩৬]

টিকাঃ
[২০১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২১৭৫৩, হাসান
[২০২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৫৩
[২০৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৪০১; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫০৬৩
[২০৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৬৭
[২০৫] তাবারানি, আলমু'জামুল আওসাত, হাদীস নং: ৭৬৩৭
[২০৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৫৯
[২০৭] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪৩২
[২০৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৪৩৪১
[২১৭] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫৭৯
[২১৮] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬৩৬; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭০
[২১৯] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ৪৩৪১, হাসান; তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩০৫৮
[২২০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৪৫
[২২৩] আবূ হানীফা-এর দলিল হলো, সিয়ামের কাযা সম্পর্কে কুরআনে فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أَخَرَ বলা হয়েছে।
[২২৪] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৩৩৭; তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৭৩৮
[২২৫] সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদীস নং: ১৩৮৮
[২৩৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৮৩
[২৩৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৮২

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 শাওয়াল মাসের পালনীয়

📄 শাওয়াল মাসের পালনীয়


প্রথম পর্ব: শাওয়াল মাসের সিয়াম

আবূ আইয়ূব আনসারি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমাদান মাসে সিয়াম পালন করল, তারপর শাওয়াল মাসের ছয়টি দিন তার অনুগামী করল, সে যেন সারা বছর সিয়াম পালন করল।’ [৩৪২]

রমাদানের সিয়াম দশ মাস সিয়ামের সমতুল্য। আর (শাওয়ালের) ছয়দিনের সিয়াম দুই মাস সিয়ামের সমান। রমাদানে সিয়াম পালনের পর পুনরায় সিয়াম পালন করতে পারাটা রমাদানের সিয়াম কবুল হওয়ার নিদর্শন।

দ্বিতীয় পর্ব: হাজ্জের আলোচনা

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন আমলটি উত্তম? তিনি বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা।' প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'মাকবুল হাজ্জ।' [৩৪৭]

হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান কেবল জান্নাত। [৩৬০] যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হাজ্জ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে ওইদিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরবে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল। [৩৬২]

তৃতীয় পর্ব : ওজরের কারণে বদলি হাজ্জ ও উমরাহ

দরিদ্র লোকেরা নবি ﷺ-এর কাছে এসে অভিযোগ করলেন যে বিত্তবানরা অনেক সাওয়াব লুটে নিচ্ছেন। নবি ﷺ তাঁদের আমল বাতলে দিলেন। [৩৭৩] রমাদান মাসে উমরাহ পালন করা নবি ﷺ-এর সঙ্গে একটি হাজ্জ করার সমান। [৩৯৬] যে ব্যক্তি জামাআতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে বসে আল্লাহর যিকর করবে এবং এরপর দু'রাকাআত সালাত আদায় করবে, তার জন্য একটি হাজ্জ ও উমরাহ পালনের সাওয়াব হবে। [৩৯৭]

টিকাঃ
[৩৪২] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬৪
[৩৪৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৩
[৩৬০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৪৯
[৩৬২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৫০
[৩৭৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৮৪৩
[৩৯৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১২৫৬
[৩৯৭] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং ৫৮৬

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 যুল-ক্বা'দাহ মাসে পালনীয়

📄 যুল-ক্বা'দাহ মাসে পালনীয়


ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন, জনৈক সাহাবি অতিরিক্ত সিয়াম পালনের ফলে শুকিয়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ তাঁকে দেখে বললেন, ‘কে তোমাকে বলেছে নিজেকে (এভাবে) কষ্ট দিতে?’ এরপর নবিজি ﷺ তাঁকে প্রতি মাসে তিনদিন এবং সম্মানিত মাসগুলিতে সিয়াম পালনের পরামর্শ দিলেন। [৩৯৮]

শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ে ইবাদাত করতে শারীয়াত আদেশ করেনি। আল্লাহর নবি ﷺ যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলেছেন, যুল-কাদাহ তার অন্যতম। নবি ﷺ হাজ্জের সাথে যে উমরাহ পালন করেছিলেন, সেটা বাদে প্রতিটি উমরাহ-ই তিনি যুলকাদাহ মাসে আদায় করেন। [৪০০]

টিকাঃ
[৩৯৮] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২০৩২৩
[৪০০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৭৪-১৯৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৫৯

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 যুল-হিজ্জাহ মাসে করণীয়

📄 যুল-হিজ্জাহ মাসে করণীয়


প্রথম পর্ব: প্রথম দশকের গুরুত্ব

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যাতে আমল করা আল্লাহর কাছে যুলহিজ্জাহ মাসের এই দশ দিনের নেক আমল থেকে বেশি প্রিয়।’ সাহাবিরা বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর পথে জিহাদ করা কি এর থেকে প্রিয় নয়?’ নবি ﷺ বললেন, ‘না, আল্লাহর পথে জিহাদও এর থেকে প্রিয় নয়। তবে কোনো ব্যক্তি যদি জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়ে এবং দুটির কিছু নিয়ে আর ফিরে না-আসে, তবে ভিন্ন কথা।’ [৪০৪]

প্রথম পরিচ্ছেদ: এ দশকের আমলের ফযিলত

উপর্যুক্ত হাদীসটি থেকে এটা বোঝা যায়, অন্য যে-কোনো দিনের চেয়ে এ দশদিনের আমল আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। আর আল্লাহর কাছে যেটা প্রিয়, সেটা শ্রেষ্ঠ। এটাই স্বাভাবিক। এ দশদিন সব ধরনের নেক আমলের সাওয়াব বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই দশকের কিছু আমল নিম্নরূপ:

১. সিয়াম পালন করা: উম্মুল মুমিনীন হাফসা বলেছেন, ‘নবি ﷺ চারটি আমল কখনও ছাড়েননি। (ক) আশূরার সিয়াম, (খ) যুলহিজ্জাহর দশ দিনের সিয়াম, (গ) প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম এবং (ঘ) ফজরের আগে দু’ রাকাআত।’ [৪০৮]

২. রাত জেগে ইবাদাত করা: এই দশকে রাত জেগে ইবাদাত করা মুসতাহাব। যুলহিজ্জাহ শুরু হলে সাঈদ ইবনু জুবাইর একরকম সাধ্যাতীত অধ্যবসায় করতেন।

৩. বেশি বেশি যিকর: এই দিনগুলোতে বেশি বেশি যিকর করা মুসতাহাব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং নির্দিষ্ট দিনগুলিতে তারা যেন আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ [৪১১] অধিকাংশ আলিমের মতে এই নির্দিষ্ট দিনগুলি হলো যুলহিজ্জাহর দশ দিন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: এই দশকের ফযিলত

এই দশকের একটি শ্রেষ্ঠত্ব হলো, আল্লাহ তাআলা সামষ্টিকভাবে এই দশকের এবং বিশেষভাবে এর বিভিন্ন অংশের শপথ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘শপথ ফজরের। শপথ দশ রাতের।’ [৪১৪] বিশুদ্ধ মতানুসারে এখানে দশ রাত বলে যুলহিজ্জাহর দশরাত উদ্দেশ্য। আরেকটি শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এই দশক হাজ্জের নির্দিষ্ট মাসগুলোর শেষাংশ। যে সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘হাজ্জের নির্ধারিত কয়েকটি মাস আছে।’ [৪১৫]

এই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এ দিনগুলিতেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নামে চতুষ্পদ প্রাণী জবাই করতে আদেশ দিয়েছেন। হাজিদের পাশাপাশি সাধারণ লোকেরা যিকর এবং কুরবানির মাধ্যমে হাজিদের সাথে শরিক হয়। নবি ﷺ সর্বোত্তম হাজ্জের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘(যাতে) উচ্চস্বরে তালবিয়াহ ও তাকবীর পাঠ করা এবং কুরবানি দেওয়া (হয়)।’ [৪১৭]

দ্বিতীয় পর্ব: আরাফাহ এবং কুরবানির দিনের ফযিলত

আরাফা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন। এদিন আরাফায় অবস্থানকারী এবং অনুপস্থিত মুসলমানদেরকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। হাজ্জ পূর্ণ হয় আরাফার দিনে আরাফায় অবস্থান করার মাধ্যমে। নবি ﷺ বলেছেন, ‘হাজ্জ হলো আরাফায় অবস্থানের নাম’। [৪২৯] এর পরবর্তী দিনটি হলো কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আযহা। ঈদ দুটির মাঝে এটিই বড় এবং উত্তম।

আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব:
১. এ দিনেই দ্বীন এবং নিয়ামাত পরিপূর্ণ হয়েছিল।
২. আল্লাহ তাআলা কুরআনে জোড় এবং বেজোড়ের শপথ করেছেন। এ দিনটি হলো জোড় তারিখ।
৩. আরাফার দিনটি সর্বোত্তম দিন। নবি ﷺ বলেছেন, ‘আরাফার দিনটি সর্বোত্তম দিন।’ [৪৩৭]
৪. এ দিনটিতে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। [৪৩৮]

আরাফার দিনে করণীয়:
১. সিয়াম পালন করা। নবি ﷺ বলেছেন, ‘আরাফার দিনের সিয়াম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী বছর এবং পরবর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ [৪৪০]
২. ক্ষমা এবং মুক্তির জন্য বেশি বেশি দুআ করা। নবি ﷺ বলেছেন, ‘সর্বোত্তম দুআ হলো আরাফা দিনের দুআ।’ [৪৪২]
৩. একনিষ্ঠভাবে সততার সঙ্গে বেশি বেশি কালিমা পড়া।

তৃতীয় পর্ব: তাশরীকের দিনগুলো সম্পর্কে

নুবায়শা আল-হুযালি থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘তাশরীকের দিনগুলি পানাহার করা এবং আল্লাহর যিকর করার দিন।’ [৪৪৫] তাশরীকের দিনগুলি হলো ঈদের পরবর্তী তিনদিন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নির্দিষ্ট দিনগুলিতে তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো।’ [৪৪৭] এই নির্দিষ্ট দিনগুলি হলো তাশরীকের দিন।

তাশরীকের দিনগুলিতে যিকর-আযকার:
১. ফরয সালাতের পরে তাকবীর বলা।
২. কুরবানির পশু জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া এবং তাকবীর বলা।
৩. পানাহারের শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা।
৪. সাধারণভাবে আল্লাহ তাআলার যিকর করা।

চতুর্থ পর্ব: বছরের পড়ন্ত বেলা

জাবির থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, ‘তোমরা মৃত্যু কামনা কোরো না। কারণ মৃত্যুর প্রথম ছোবল বড় ভয়াবহ। আসল সৌভাগ্য হলো বান্দার আয়ু দীর্ঘ হওয়া এবং আল্লাহ তাঁকে একাগ্রতা দান করা।’ [৪৭১] দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হওয়ার কারণে মৃত্যু কামনা করা নিষিদ্ধ। নবি ﷺ বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভালো লোক হলে নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে মন্দ লোক হলে সে লজ্জিত হয়ে তাওবা করার সুযোগ লাভ করবে।’ [৪৭৬]

টিকাঃ
[৪০৪] তিরমিজি, আসসুনান, হাদীস নং: ৭৫৭; আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪৩৮
[৪০৮] নাসায়ি, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪১৬
[৪০৯] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪৩৭
[৪১০] সাঈদ ইবনু জুবাইরের জীবনী গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
[৪১১] সূরা হাজ্জ, ২২: ২৮
[৪১২] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৬৪৪৫
[৪১৩] সূরা ফাজর, ৮৯ : ২
[৪১৪] সূরা ফাজর, ৮৯ : ১-২
[৪১৫] সূরা বাকারাহ, ২: ১৯৭
[৪১৬] সূরা হাজ্জ, ২২: ২৭-২৮
[৪১৭] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৮২৭
[৪১৮] সূরা বাকারাহ, ২: ১৯৮-১৯৯
[৪১৯] সূরা বাকারাহ, ২: ২০০
[৪২০] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ১৮৮৮
[৪২১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭৭
[৪২২] সহীহ বুখারি: ২/২০
[৪২৯] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৮৮৯
[৪৩০] সূরা আনআম, ৬: ১৬২
[৪৩১] সূরা ইউনুস, ১০: ২৬
[৪৩২] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৭৭৩, সহীহ
[৪৩৩] সূরা মায়িদাহ, ৫ : ৩
[৪৩৪] সূরা ফাতহ, ৪৮ : ২
[৪৩৫] সূরা মায়িদাহ, ৫: ৬
[৪৩৬] সূরা বুরূজ, ৮৫: ৩
[৪৩৭] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১৯০৭৫
[৪৩৮] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৪৮
[৪৩৯] আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৭০৮৯
[৪৪০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬২
[৪৪১] আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১৬৯৬
[৪৪২] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫৮৫
[৪৪৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৪১
[৪৪৬] দারাকুতনি, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪০৭
[৪৪৭] সূরা বাকারাহ, ২: ২০৩
[৪৪৮] আবূ দাউদ আসসুনান, হাদীস নং: ১৯৯৯
[৪৫০] সূরা বাকারাহ, ২: ২০৩
[৪৫১] সূরা বাকারাহ, ২: ২০৩
[৪৫২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৫২১
[৪৫৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৪১
[৪৫৪] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭৩৪
[৪৫৫] সূরা বাকারাহ, ২: ২০০-২০১
[৪৫৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৯০
[৪৫৭] সূরা নিসা, ৪: ১০৩
[৪৫৮] সূরা জুমুআ, ৬২: ১০
[৪৫৯] সূরা ইনশিরাহ, ৯৪: ৭-৮
[৪৬০] সূরা ইসরা, ১৭:৪৪
[৪৬১] সূরা নাহল, ১৬:৪৯
[৪৬২] সূরা হাজ্জ, ২২:১৮
[৪৬৩] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১৫৬২৯
[৪৬৪] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৬
[৪৬৫] সূরা তুর, ৫২ : ১৯
[৪৬৬] সূরা হাক্কাহ, ৬৯ : ২৪
[৪৬৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২০০৩
[৪৬৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৮৩৩
[৪৬৯] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ২৮৬০
[৪৭০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৭২৮১
[৪৭১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১৪৫৬৪
[৪৭২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৬৭১
[৪৭৩] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২৪৭১৩
[৪৭৪] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩২৩৩
[৪৭৫] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৩১৪
[৪৭৬] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৬৭৩
[৪৭৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৮২
[৪৭৮] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ২৩২৯
[৪৭৯] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭২০
[৪৮০] সূরা শু'আরা, ২৬: ২০৫-২০৭
[৪৮১] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৬৪১৯
[৪৮২] ইবনু মাজাহ, আসসুনান, হাদীস নং: ৪২৩৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00