📄 রজব মাসে পালনীয়
আবূ বাকরাহ থেকে বর্ণিত আছে, নবি ﷺ বলেছেন,
إِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللهُ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاثُ مُتَوَالِيَاتُ : ذُو القَعْدَةِ، وَذُو الحِجَّةِ، وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ
'সময় অতিবাহিত হয়ে যথাযথ অবস্থায় ফিরে এসেছে, যে অবস্থায় আল্লাহ আকাশসমূহ এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। বছর হয় বার মাসে, যার মধ্যে চারটি মাস পবিত্র। এর মধ্যে তিনটি মাস ধারাবাহিক। (সেগুলো হলো) যুল-কাদা, যুল-হিজ্জাহ, এবং মুহাররাম। আরেকটি হলো মুযার গোত্রের রজব মাস যা জুমাদাস সানি এবং শাবানের মধ্যবর্তী।'[১৯৩]
আল্লাহ বলেন,
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ وَقَتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
'আসমান-জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) মাসগুলোর সংখ্যা হলো বারো। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। এটা হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। কাজেই ওই সময়ের মধ্যে নিজেদের ওপর জুলম করো না। মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করো, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে। জেনে রেখো, আল্লাহ অবশ্যই মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।' [১৯৪]
এই আয়াতে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, যখন থেকে তিনি আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, রাত এবং দিনের আবর্তনের সূচনা ঘটিয়েছেন, আকাশে থাকা চাঁদ, সূর্যসহ অন্যান্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন এবং চাঁদ-সূর্যকে কক্ষপথে বিচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, তখন থেকেই রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলো আছে। তখন থেকেই চাঁদের হিসেবে বছরকে তিনি বারো মাসে বিভক্ত করেছেন। সুতরাং শারীআয় বছর ধর্তব্য হবে চাঁদের আবর্তন এবং উদয় হিসেবে। কিতাবিরা সূর্যের পরিভ্রমণ এবং স্থানান্তর হিসেবে যে বর্ষ গণনা করে থাকে, শারীআয় সেটা ধর্তব্য নয়।
⇨ 'সময় অতিবাহিত হয়ে যথাযথ অবস্থায় ফিরে এসেছে...' এ কথা বলে নবি ﷺ জাহিলি যুগের মাস পিছিয়ে দেওয়ার কাজ রহিত করলেন। যেমনটা আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا النَّسِيءُ زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا يُحِلُّونَهُ عَامًا وَيُحَرِّمُونَهُ عَامًا لِيُوَاطِئُوا عِدَّةَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيُحِلُّوا مَا حَرَّمَ اللَّهُ
'এই মাস পিছিয়ে দেওয়ার কাজ কেবল কুফরির মাত্রা বৃদ্ধি করে, যার মাধ্যমে কাফিররা গোমরাহীতে পতিত হয়। তারা একে কোনো বছর বৈধ করে নেয় এবং অন্য বছর অবৈধ করে। যাতে তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ মাসগুলোর গণনা পূর্ণ করে নিতে পারে, এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করে নিতে পারে।' [১৯৫]
মাস পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যা
একদল আলিম বলেছেন, 'জাহিলি যুগে কাফিররা নিজেদের প্রয়োজনে কোনো এক সম্মানিত মাসকে অন্য কোনো সাধারণ মাস দিয়ে পরিবর্তন করে নিতো। এরপর সেই সাধারণ মাসটিকে সম্মানিত মাস বলে গণ্য করত। তবে এ ক্ষেত্রে তারা চান্দ্র মাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করত না।' এই মতের প্রবক্তারা বলেছেন, মাস পিছিয়ে দেওয়ার কাজ মূলত তারা করত মুহাররাম মাসের ক্ষেত্রে। কারণ দীর্ঘ তিন মাস যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকায় তাদের সমস্যা হতো। তাই মুহাররামের স্থলে তারা সফর মাসকে সম্মানিত সাব্যস্ত করত। ব্যাপারটা যেন ধার নিয়ে পরিশোধ করার মতো। তারা যেন মুহাররাম মাসের সম্মান ধার নিয়ে সফর মাসে পরিশোধ করত।
আরেক দলের মত হলো, 'তারা কোনো বছরের সফর মাসের সাথে মুহাররামও বৈধ করে নিত। তখন তারা বলত, এ বছর সফর মাস দুটি। পরবর্তী বছর মুহাররাম এবং সফর মাস দুটোই সম্মানিত করে তারা বলত, এ বছর মুহাররাম মাস দুটি।'
এই মাস চারটিকে 'সম্মানিত' বলার কারণ
কারও মতে, এই মাসগুলোর গুরুত্ব অনেক এবং এই মাসের পাপও বিশেষভাবে নিষিদ্ধ। তাই মাসগুলোকে 'সম্মানিত' বলা হয়। আর কারও মতে, এ মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে তা সম্মানিত। জাহিলি যুগে এ কথা প্রচলিত ছিল। আবার কারও মতে, আরবের মাঝে এই চারটি মাস মূলত হাজ্জ এবং উমরাহ'র কারণে নিষিদ্ধ ছিল। যুল-হিজ্জাহতে হাজ্জ অনুষ্ঠিত হয়। যুল-কাদা মাসে হাজ্জে গমন করা এবং মুহাররাম মাসে হাজ্জ থেকে নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর নির্বিঘ্নে উমরাহ পালনের জন্য বছরের মধ্যবর্তী রজব মাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ মাসে মক্কার নিকটস্থ লোকেরা উমরাহ পালন করত।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে সম্মানিত মাসের ব্যাপারে নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُحِلُّواْ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ وَلَا ٱلشَّهْرَ ٱلْحَرَامَ
'হে মুমিনগণ! আল্লাহর নিদর্শনসমূহের এবং সম্মানিত মাসগুলোর অবমাননা করো না।'[১৯৬]
يَسْـَٔلُونَكَ عَنِ ٱلشَّهْرِ ٱلْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالٌ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَدٌّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِۦ مِنْهُ أَكْبَرُ عِندَ ٱللَّهِ وَٱلْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ ٱلْقَتْلِ
'সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে; বলে দিন এতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মাসজিদুল হারামে বাধা দেওয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদের বহিষ্কার করা, আল্লাহর কাছে তার চেয়েও বড় অন্যায়। আর ফিতনা সৃষ্টি করা হত্যা থেকেও গুরুতর অন্যায়।'[১৯৭]
সম্মানিত মাসগুলোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে কি না
আতা-সহ সালাফের এক দলের মতে নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ আছে। পরবর্তীদের অনেকেই এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিজেদের মতের সপক্ষে তারা সূরা মায়িদার আয়াত দিয়ে দলিল পেশ করে থাকেন। আর সূরা মায়িদা হলো কুরআনের অবতীর্ণ হওয়া সর্বশেষ অংশ। বর্ণিত আছে যে, সূরা মায়িদার আয়াতটির অর্থ হলো, বৈধ মাসগুলোর বৈধতা দাও এবং সম্মানিত মাসগুলোতে বিরত থাকো। কারও কারও মতে সূরা মায়িদাতে রহিত কোনো আয়াত নেই।
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে এই নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে। ইমাম আহমদ-সহ অন্য ইমামগণ এ মত ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা বলেন, নবি ﷺ-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন দেশ জয় এবং অনবরত জিহাদের কাজে মশগুল ছিলেন। সম্মানিত মাস উপলক্ষে তাঁরা যুদ্ধবিরতি দিয়েছেন, এমন বর্ণনা কোথাও পাওয়া যায় না। এটাই সর্বসম্মতিক্রমে সম্মানিত মাসের নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ।
মুযার গোত্রের রজব মাসের ব্যাখ্যা
রজব শব্দের অর্থ সম্মান। সম্মানিত হওয়ার কারণে মাসটিকে এই নাম দেওয়া হয়েছে। ভাষাবিদ আসমাঈ, মুফাযযাল এবং ফাররার মত এটাই। কারও মতে, ফেরেশতারা তাসবীহ এবং তাহমীদ দিয়ে এ মাসকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। তাই এই নামকরণ। এ ব্যাপারে একটি মারফু হাদীস রয়েছে, তবে সেটা মাউযূ।
মুযার গোত্রের সাথে এ মাসকে সম্পৃক্ত করার কারণ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেছেন, 'তারা এ মাসকে বেশি সম্মান করত। সেজন্য এ মাসকে তাদের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।' আবার অনেকে বলেছেন, 'রবীয়া গোত্র রমাদান মাসকে সম্মানিত মাস বলে অভিহিত করত আর মুযার গোত্র করত রজব মাসকে। এজন্যই মুযার গোত্রের রজব বলা হয়েছে।'
রজব মাসের সাথে সম্পৃক্ত বিধান
রজব মাসের সাথে সম্পৃক্ত অনেক বিধান আছে। কিছু বিধান এমন আছে, যার প্রচলন জাহিলি যুগে ছিল। তবে ইসলামে তা বলবৎ থাকবে কি না, এ নিয়ে উলামাদের মতবিরোধ আছে। যেমন, কিতাল করা। পূর্বে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।
⇨ এমনই আরেকটি প্রচলন হলো জবাই করা। জাহিলি যুগে জবাই করার একটি প্রচলন ছিল, যার নাম 'আতীরাহ'। ইসলামে এর প্রচলন আছে কি না, এ বিষয়ে অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বলেছেন, 'ইসলাম এর বিলোপ সাধন করেছে।' আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, নবি ﷺ বলেছেন,
«لا فَرَعَ وَلَا عَتِيرَةَ»
'ফারা ও আতীরাহ বলতে (ইসলামে) কিছু নেই।'[১৯৮]
ফারা হলো উটের প্রথম বাচ্চা, যা কাফিররা তাদের দেবদেবীর নামে বলি দিত।[১৯৯]
ইবনু সীরীন প্রমুখের মতে তা মুস্তাহাব। ইমাম আহমাদ বসরার আলিমদের থেকে এটা বর্ণনা করেছেন।
রজব মাসের আয়োজন
ইবনু আব্বাস সম্পর্কে বর্ণিত আছে, রজব মাসে কোনো উৎসব করা তিনি অপছন্দ করতেন। মূলকথা, ইসলাম যেটাকে উৎসব বলে নির্ধারণ করেছে, সেটা ছাড়া অন্য কিছুকে উৎসব বানানো শারীআ অনুমোদন করে না। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, আইয়ামুত তাশরীক তথা যুল-হিজ্জাহর ১১ থেকে ১৩ তারিখ হলো শারীআ-অনুমোদিত বার্ষিক উৎসবের দিন। আর জুমুআর দিন হলো সাপ্তাহিক উৎসবের দিন। এগুলো ছাড়া অন্য কোনো সময় বা দিনকে উৎসবের দিন সাব্যস্ত করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। শারীআ এর অনুমোদন দেয় না।
রজব মাসের ইবাদাত
⇨ সালাত : রজব মাসের নির্ধারিত কোনো সালাত নেই। রজবের প্রথম জুমুআর রাতে সালাতুল রাগায়িব নামে যে সালাতের বর্ণনা আছে, তা মিথ্যা এবং অসার বর্ণনা। এর কোনো ভিত্তি নেই। অধিকাংশ উলামাদের মতে এই সালাত আদায় করা বিদআত।
পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মধ্যে আবূ ইসমাঈল আনসারি, আবূ বকর ইবনুস সামআনি, আবুল ফাযল ইবনু নাসির, আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি -সহ প্রমুখ এ কথা বর্ণনা করেছেন। পূর্ববর্তী উলামাদের এটা নিয়ে আলোচনা না-করার কারণ হলো, তাঁদের যুগে এটা ছিলই না। এই বিদআতের উদ্ভব ঘটেছে চার শ হিজরির পরে। পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের এটা জানা ছিল না, তাই তারা এ বিষয়ে কলম ধরেননি।
⇨ সিয়াম: রজব মাসের সিয়াম পালনের ফযিলত সম্পর্কে নবি ﷺ বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশেষ কিছু বর্ণিত হয়নি। উমার রজব মাস উপলক্ষ্যে সিয়াম পালনকারীদের হাতে আঘাত করতেন, যাতে তারা খাবার গ্রহণ করে। অর্থাৎ সিয়াম ভাঙতে বাধ্য করতেন। আর বলতেন, 'রজবে আবার (বিশেষ সিয়াম) কী? জাহিলি যুগের লোকেরা রজব মাসকে সম্মান করত। ইসলাম এসে এই প্রথার বিলোপসাধন করেছে।' অন্য বর্ণনায় আছে, রজব মাসে বিশেষ সিয়াম পালন করা তিনি সুন্নাহ মনে করতেন না।
আবূ বাকরাহ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি পরিবারের লোকদের রজব মাসের জন্য সিয়াম পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে দেখে বললেন, 'রজবকে তোমরা কি রমাদান বানিয়ে নিলে নাকি? খেজুরের টুকরি এবং পানির মশক ভেঙে ফেলতে চাও?'
ইবনু আব্বাস তো গোটা রজব মাসেই নফল সিয়াম পালন করা অপছন্দ করতেন।
⇨ যাকাত প্রদান: অনেক দেশের লোকেরা রজব মাসে যাকাত প্রদান করায় অভ্যস্ত। হাদীসে এর বিশেষ কোনো ফযিলত বর্ণিত হয়নি বা সালাফের কেউ এমনটা বর্ণনা করেননি। তবে হ্যাঁ, রমাদানে সাদাকাহর বিশেষ ফযিলত আছে। তখন যাকাত প্রদানে বিশেষ সাওয়াব মিলে থাকে। উসমান সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বরে উঠে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, 'এটা তোমাদের যাকাতের মাস। কারও ঋণ থাকলে সে ঋণ পরিশোধ করার পর অবশিষ্ট (নিসাব পরিমাণ) সম্পদের যাকাত দাও।'
যাকাত মূলত ফরয হয় নিসাব পূর্ণ হয়ে বছর অতিক্রান্ত হলে। নিসাব পূর্ণ হওয়ার পর বছর অতিক্রান্ত হওয়ার হিসাব প্রত্যেকের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। বছরের যে-কোনো মাসে এটা হতে পারে।
⇨ রজব মাসে উমরাহ পালন: ইবনু উমার একবার বললেন, 'নবি ﷺ রজব মাসে উমরাহ পালন করেছেন।' তখন আয়িশা তাঁর সামনেই এ কথা অস্বীকার করলেন। ইবনু উমার তখন নীরব ছিলেন।[২০০]
আয়িশা ও ইবনু উমার এ মাসে উমরাহ পালন করেছেন। ইবনু সীরীন বর্ণনা করেছেন, সালাফগণ রজব মাসে উমরাহ পালন করতেন। কারণ এক সফরে হাজ্জ করা এবং হাজ্জের মাসের বাইরে অন্য সফরে উমরাহ পালন করা উত্তম। তাহলেই হাজ্জ এবং উমরাহ পালন পূর্ণ হবে। উমার, উসমান এবং আলি -সহ অনেক সাহাবিই এমনটা বলেছেন।
টিকাঃ
[১৯৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৪৬৬২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৬৭৯
[১৯৪] সূরা তাওবা, ৯: ৩৬
[১৯৫] সূরা তাওবা, ৯ : ৩৭
[১৯৬] সূরা মায়িদা, ৫: ২
[১৯৭] সূরা বাকারাহ, ২: ২১৭
[১৯৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৪৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭৬
[১৯৯] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৪৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭৬
[২০০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৭৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১২৫৫
📄 শাবান মাসে পালনীয়
প্রথম পর্ব: নবি ﷺ-এর সিয়াম
উসামা ইবনু যায়িদ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এমনভাবে ধারাবাহিক সিয়াম রাখতে থাকতেন যে আমরা বলতাম, তিনি বোধহয় সিয়াম ছাড়বেন না। আবার এমনভাবে সিয়াম ছাড়া থাকতেন যে মনে হতো তিনি আর সিয়ামই পালন করবেন না। তবে জুমুআর দিন থেকে দুটি দিন ছিল ব্যতিক্রম। ধারাবাহিক সিয়াম অবস্থায়ও তিনি সে দুটি দিন সিয়াম পালন করতেন, আবার ছাড়াকালীনও সে দুটিতে সিয়াম রাখতেন। শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনো মাসে তিনি ততটা সিয়াম পালন করতেন না। একবার আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সিয়াম পালন করতে থাকলে মনে হয় যেন সিয়াম ছাড়বেনই না। আর সিয়াম ছাড়া থাকলে মনে হয় সিয়ামই পালন করবেন না। তবে দুটি দিনের কথা ভিন্ন। যখন একনাগাড়ে সিয়াম পালন করতে থাকেন, তখন সে দিন দুটিতেও সিয়াম রাখেন। আবার সিয়াম ছাড়া অবস্থাতেও দিন দুটিতে ঠিকই সিয়াম পালন করেন।' নবিজি বললেন, 'কোন দিন দুটি?' আমি বললাম, 'সোম এবং বৃহস্পতিবার।' তিনি বললেন,
ذَانِكَ يَوْمَانِ تُعْرَضُ فِيهِمَا الْأَعْمَالُ عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمُ
'সে দিন দুটিতে বান্দার আমল আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়। আমার আকাঙ্ক্ষা—আমল পেশ করার সময় আমি যেন সিয়াম অবস্থায় থাকি।'
উসামা বলেছেন, তখন আমি বললাম, শাবান মাসে আপনি যত সিয়াম পালন করেন অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত সিয়াম পালন করতে দেখিনি। তিনি বললেন,
ذَاكَ شَهْرُ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرُ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمُ
'রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সে মাসে মানুষ উদাসীন থাকে। এ মাসে আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। আমার আকাঙ্ক্ষা-আমার আমল পেশ করার সময় আমি যেন সিয়ামরত থাকি।' [২০১]
এই হাদীসে নবি ﷺ-এর সারা বছরের সিয়াম, সাপ্তাহিক সিয়াম এবং বিভিন্ন মাসের সিয়ামের আলোচনা এসে গেছে। সারা বছরের সিয়াম সম্পর্কে বলা হয়েছে, নবি মাঝে মাঝে একনাগাড়ে সিয়াম পালন করতেন, মাঝে মাঝে করতেন না। যখন সিয়াম পালন করতেন তখন বলা হতো যে তিনি বোধহয় সিয়াম ছাড়বেন না। আবার তাঁকে সিয়াম ছাড়া দেখে বলা হতো যে তিনি সিয়াম পালন করবেন না।
নফল আমল পালনে শারীআর দৃষ্টিভঙ্গি
ইফতার না করে লাগাতার সিয়াম পালন করা নবি ﷺ অপছন্দ করতেন। তিনি নিজেও এমনটা করতেন না। সহীহ বুখারি এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, নবি আমাকে বললেন, 'তুমি নাকি দিনে সিয়াম পালন করো এবং রাত জেগে সালাত আদায় করো?' আমি বললাম, 'জি হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
فَإِنَّكَ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ هَجَمَتْ عَيْنُكَ، وَنَفِهَتْ نَفْسُكَ، وَإِنَّ لِنَفْسِكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ حَقًّا، فَصُمْ وَأَفْطِرْ، وَقُمْ وَنَمْ
'এমনটা করতে থাকলে তো তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে। নিজের প্রতি তোমার (যেমন) অধিকার আছে, তেমনি তোমার পরিবার-পরিজনেরও রয়েছে। কাজেই তুমি সিয়াম পালন করবে এবং বাদও দেবে। রাত জেগে ইবাদাত করবে, আবার ঘুমিয়েও নেবে।' [২০২]
আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবি ﷺ-এর ক'জন সাহাবি উম্মুল মুমিনীনদের কাছে তাঁর গোপন ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর ওই সাহাবিদের একজন বললেন, আমি কখনো বিয়ে করব না। অন্যজন বললেন, আমি কখনো গোশত খাব না। আবার কেউ বললেন, আমি কখনো বিছানায় ঘুমাব না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে বললেন,
مَا بَالُ أَقْوَامٍ قَالُوا كَذَا وَكَذَا؟ لَكِنِّي أُصَلِّي وَأَنَامُ، وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
‘লোকদের কী হয়েছে যে, তারা এমন এমন কথা বলছে? কিন্তু আমি তো (রাতে) সালাত আদায় করি আবার নিদ্রাও যাই। সিয়াম পালন করি আবার বাদও দিই। আর আমি বিয়েও করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়। [২০৩]
সহীহ বুখারিতে আছে, সালমান এবং আবুদ দারদা (রাঃ)-কে নবিজি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। একবার সালমান (রাঃ) আবুদ দারদা (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। এসে উম্মুদ দারদা (রাঃ)-কে মলিন কাপড় পরা অবস্থায় দেখতে পেলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মুদ দারদা (রাঃ) বললেন, 'আপনার ভাই আবুদ দারদার তো পার্থিব কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ নেই।'
কিছুক্ষণ পর আবুদ দারদা (রাঃ) এসে সালমান (রাঃ)-এর জন্য খাবার প্রস্তুত করালেন। এরপর বললেন, 'আপনি খেয়ে নিন, আমি সিয়াম পালন করছি।' সালমান (রাঃ) বললেন, 'আপনি না খেলে আমিও খাব না।'
আবুদ দারদা (রাঃ) তখন সালমান (রাঃ)-এর সঙ্গে খেলেন। রাতে আবুদ দারদা (রাঃ) সালাতে দাঁড়াতে গেলে সালমান (রাঃ) বললেন, 'এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।' আবুদ দারদা (রাঃ) শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার সালাতে দাঁড়াতে উদ্যত হলে সালমান (রাঃ) বললেন, 'ঘুমিয়ে যান।' অবশেষে রাতের শেষভাগে আবুদ দারদা (রাঃ)-কে ডেকে সালমান (রাঃ) বললেন, 'এখন দাঁড়ান।' এরপর তাঁরা দুজনে সালাত আদায় করলেন।
পরে আবুদ দারদা (রাঃ)-কে সালমান (রাঃ) বললেন, 'আপনার প্রতি আপনার প্রতিপালকের (যেমন) অধিকার আছে, তেমনি নিজের প্রতিও আপনার অধিকার রয়েছে। আবার আপনার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান করুন।' আবুদ দারদা (রাঃ) পরে নবি ﷺ-এর কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনা জানালেন। (সব শুনে) নবি বললেন,
«صَدَقَ سَلْمَانُ» 'সালমান ঠিকই বলেছে।' [২০৪]
অন্য বর্ণনামতে নবি বলেছিলেন,
مَا لِسَلْمَانَ ثَكِلَتْهُ أُمُّهُ؟ لَقَدْ أُشْبِعَ مِنَ الْعِلْمِ» 'সালমান খুব চমৎকার কথা বলেছে! তাকে তো ইলম দ্বারা ভরপুর করে দেওয়া হয়েছে।' [২০৫]
তদ্রূপ আমর ইবনিল আস-এর ছেলে আবদুল্লাহ-কে লাগাতার সিয়াম পালন করতে দেখে নবি নিষেধ করেন। এর পরিবর্তে তাকে দাউদ-এর মতো একদিন পরপর সিয়াম পালনের পরামর্শ দেন। আর বলেন,
«لَا أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ» 'এর থেকে উত্তম হতেই পারে না।' [২০৬]
সুতরাং শ্রেষ্ঠতম নফল সিয়াম সেটাই, যা পালন করলে আল্লাহর হক বা বান্দার হক পালনের ক্ষেত্রে শারীরিক দুর্বলতাজনিত অপারগতা সৃষ্টি না হয়। কারণ, যে আমল করলে তার চেয়ে উত্তম আমল পালনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা অনুভূত হয়, এমন আমল না করাই ভালো।
আল্লাহর হকের উদাহরণ হলো সালাত, যিকর অথবা ইলম অর্জনে দুর্বলতা বোধ হলে নফল সিয়াম ত্যাগ করা। যেমন (শুধু) জুমুআর দিন এবং আরাফার দিন ময়দানে অবস্থানকারীদের সিয়াম পালন করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা সিয়ামের কারণে সৃষ্ট দুর্বলতা দিন দুটিতে যিকর এবং দুআয় বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ নফল সিয়াম কম পালন করতেন। এ ব্যাপারে তিনি বলতেন, 'নফল সিয়াম পালন করলে আমি কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি না। আর কুরআন তিলাওয়াত আমার কাছে অন্যান্য নফল আমলের তুলনায় বেশি পছন্দনীয়।'
সুতরাং নফল সিয়াম পালন থেকে কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম। সুফইয়ান সাওরি -সহ অন্য ইমামগণ এ কথাই বলেছেন। তদ্রূপ উপকারী ইলম শেখা এবং শেখানো নফল সিয়াম থেকে উত্তম। আর ইমাম চতুষ্টয় এ ব্যাপারে একমত যে ইলম অর্জন করা নফল সালাত থেকে উত্তম। আর নফল সালাত তো নফল সিয়াম থেকে উত্তম। তাই ইলম অর্জন যে নফল সিয়াম থেকে উত্তম হবে, সেটা তো বলাই বাহুল্য। ইলম হলো মূর্খতা এবং প্রবৃত্তির অন্ধকারে দীপ্তি ছড়ানো আলো। সুতরাং আলো ছাড়া অন্ধকারে পথ চলতে গেলে খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতেই পারে।
ইবনু সীরীন বলেন, একদল লোক ইলম অর্জন না করেই মাসজিদে পড়ে থাকে। তাদের সালাত-সিয়াম হয় ইলম ছাড়া। আল্লাহর কসম! ইলম ছাড়া আমল তো লাভের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি।
বান্দার আবশ্যক হক (লঙ্ঘনের) উদাহরণ হলো পরিবারের জন্য উপার্জন কিংবা জীবনসঙ্গীর অধিকার আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়া। এমনটা হলে নফল সিয়াম ত্যাগ করাই উত্তম। এদিকে ইঙ্গিত করেই নবি বলেন,
«إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا» 'তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে।' [২০৭]
'নিজের প্রতিও আপনার অধিকার রয়েছে। ... প্রত্যেক হকদারকে তার অধিকার প্রদান করুন।' এ কথা বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে আদম-সন্তানের কাছে তার নিজের সত্তাকে আমানত রাখা হয়েছে। এর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। যার অন্যতম অধিকার হলো কবরে যাওয়া পর্যন্ত তার সাথে সদয় আচরণ করা।
হাসান বলেন, 'তোমাদের সত্তা আল্লাহ তাআলার কাছে পৌঁছার বাহনস্বরূপ। সুতরাং নিজেদের বাহনগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। যাতে সেগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে তোমাদেরকে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিতে পারে।'
সুতরাং ইবাদাতে সহায়ক হবে এ নিয়তে নিজের প্রতি যত্নবান হলে সাওয়াব মিলবে। এজন্যই মুআয বলতেন, 'আমি ইবাদাতের মতো ঘুমের মাধ্যমেও সাওয়াবের প্রত্যাশা করি।' [২০৮]
এর বিপরীতে নিজের যত্ন না নিয়ে দুর্বল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা অবিচার হবে। আবদুল্লাহ ইবনু আমর-কে এটা বোঝানোর জন্যই নবিজি বলেছিলেন, 'এমন করতে থাকলে তো তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে।'
সারকথা হলো, বিক্ষিপ্ত সিয়ামের মাধ্যমে নবি লাগাতার সিয়ামের একাংশের সাওয়াব এবং তার চেয়ে বেশি সাওয়াব পেয়েছেন। তেমনি আকাঙ্ক্ষা থাকার কারণে সাওয়াব পেয়েছেন ধারাবাহিক সিয়ামেরও। অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ আমলের জন্যই তিনি ধারাবাহিক সিয়াম থেকে বিরত থাকতেন।
একটি কথার ব্যাখ্যা
'রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সময়ে মানুষ কি উদাসীন থাকে?' আসলে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, লোকমুখে যে স্থান, সময় বা মানুষ শ্রেষ্ঠ বলে প্রসিদ্ধি লাভ করে তার বাইরেও শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে। সেই শ্রেষ্ঠত্ব হতে পারে স্বাভাবিক কারণে, হতে পারে কোনো বিশেষ কারণে। বিষয়টি অধিকাংশ মানুষের না-জানা থাকার কারণে তারা প্রসিদ্ধ বিষয়টি নিয়ে মজে থাকে। আর অপ্রসিদ্ধ বিষয়টির ফযিলত তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
হাদীসের এ অংশটি মানুষ জানে না। রজব এবং রমাদানের মধ্যবর্তী সময়ে ইবাদাত করা যে মুস্তাহাব, এটি তার দলিল। এমন সময় আমল করা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়। যেমন একদল সালাফ মাগরিব এবং ইশার মধ্যবর্তী সময় সালাতে কাটিয়ে দিতেন। তাদের বক্তব্য ছিল, 'এ সময় মানুষ বেখবর থাকে।' তদ্রূপ মধ্যরাতে সালাত আদায়ের ফযিলত বেশি হওয়ার কারণ এটাও যে, সে-সময় অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির চাদর মুড়ি দিয়ে থাকে। আর নবি বলেছেন,
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرَّبُّ مِنَ الْعَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ الآخِرِ، فَإِنْ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمَّنْ يَذْكُرُ اللَّهَ فِي تِلْكَ السَّاعَةِ فَكُنْ
'রাতের শেষভাগে বান্দা তার রবের সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে থাকে। সে সময়টাতে যদি তুমি আল্লাহর যিকরকারীদের একজন হতে সক্ষম হও, তবে হয়ে যেয়ো।'[২১৭]
এ কারণেই নবি ইশার সালাত অর্ধরাত পর্যন্ত বিলম্ব করে আদায় করতে চাইতেন। তবে মানুষের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তা পরিহার করেছেন। একবার ইশার সালাতের জন্য বের হয়ে অপেক্ষমাণ সাহাবিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন,
مَا يَنْتَظِرُهَا أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ غَيْرُكُمْ»
'তোমরা ছাড়া পৃথিবীর কেউই এই সালাতের জন্য অপেক্ষা করছে না।' [২১৮]
নির্জনে ইবাদাতের ফায়দা
১. ইবাদাতটি অধিকতর গোপনে হয়। আর নফল আমল যত বেশি গোপনে করা যায়, ততই ভালো। বিশেষত সিয়াম পালন। কারণ এটা আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যকার বিষয়। এজন্য বলা হয়, সিয়ামে রিয়া তথা লৌকিকতার কিছু নেই।
সালাফের মাঝে এমন ব্যক্তি ছিলেন যিনি চল্লিশ বছর ধরে সিয়াম পালন করেছেন, কিন্তু কেউ জানতেও পারেনি। তাঁর দোকান ছিল। প্রতিদিন ঘর থেকে দোকানে যাওয়ার সময় দুটি রুটি নিয়ে বের হতেন এবং পথিমধ্যে সেগুলো সাদাকাহ করে দিতেন। ঘরের লোকেরা ভাবত, দোকানে বসে খাওয়ার জন্য তিনি রুটি নিয়ে গিয়েছেন। আর বাজারের লোকেরা ভাবত, তিনি ঘর থেকে খেয়ে এসেছেন। সিয়াম পালনকালীন এমন ভাব প্রকাশ করতেন, যাতে সিয়ামের ব্যাপারটি গোপন থাকে। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলতেন, 'সিয়াম পালন করলে তেল ব্যবহার করবে।'
২. তা নফসের জন্য কষ্টকর। আর নফসের জন্য যে আমল কষ্টকর, তা সর্বোত্তম। কারণ নফসের অভ্যাস এমন যে, সে সমজাতীয়দের অবস্থা দেখে সান্ত্বনা লাভ করে। মানুষের সচেতনতা এবং ইবাদাতের পরিমাণ বেশি হলে অনুসারীদের আধিক্যের কারণে ইবাদাতকারীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। ফলে ইবাদাত হয়ে যায় সহজলভ্য। পক্ষান্তরে গাফিলতি এবং উদাসীন লোকের সংখ্যা বেশি হলে নফস তখন গাফিলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে সান্ত্বনা লাভ করে থাকে। ফলে সচেতন ব্যক্তির সংখ্যা কমে যায়। আর তখন ইবাদাত করাটা নফসের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ অর্থেই নবি বলেছেন,
«لِلْعَامِلِ فِيهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلًا يَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ» 'ফিতনার সময় যে ব্যক্তি নেক আমল করবে, সে ব্যক্তি তার মতো পঞ্চাশ জন আমলকারীর সমান সাওয়াব পাবে।' [২১৯]
নবি বলেছেন,
«بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ» 'ইসলাম শুরুতে অপরিচিত ছিল, অচিরেই তা আবার অপরিচিত হয়ে পড়বে। সুতরাং অপরিচিতদের জন্য মুবারকবাদ।' [২২০]
৩. গুনাহগার এবং উদাসীন ব্যক্তিদের মাঝে থেকে একাকী ইবাদাত করার দ্বারা, অনেক সময় মানুষের ওপর আসতে থাকা বিপদ প্রতিহত হয়। এমন ইবাদাতকারী মানুষকে হেফাজত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
রমাদানের কাযা সিয়ামের মাসআলা
রমাদানের কাযা সিয়াম যদি সামর্থ্যবান কারও জিম্মায় থাকে, তা আদায় করে নেওয়া উচিত। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া পরবর্তী রমাদানের পর পর্যন্ত তা পেছানো জায়েয নেই। যদি কেউ পিছিয়ে দেয়, তবে ইমাম মালিক, শাফিয়ি এবং আহমাদ এর মতে কাযা করার সাথে সাথে প্রতিদিন একজন মিসকিনকে আহার করাতে হবে। আর ইমাম আবূ হানীফা এর মতে স্রেফ কাযা করবে। [২২৩]
দ্বিতীয় পর্ব: অর্ধ শাবানের আলোচনা
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ، فَلَا تَصُومُوا 'শাবান মাস অর্ধেক হয়ে গেলে তোমরা আর সিয়াম পালন করো না।' [২২৪]
পনেরো শাবানের সিয়াম
মধ্য শাবানের রাত এলে তাতে তোমরা সালাত আদায় করো এবং দিনে সিয়াম পালন করো। কেননা এদিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর নিকটস্থ আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছ আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। রিযকপ্রার্থী কেউ আছ কি? আমি তাকে রিযক দান করব। [২২৫]
শামের তাবিয়িগণ এ রাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। তবে হিজাযের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম তা গ্রহণ করেননি।
তৃতীয় পর্ব : শাবানের শেষে সিয়াম পালন করা
ইমরান ইবনু হুসায়ন থেকে বর্ণিত, নবি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন, يَا أَبَا فُلانٍ، أَمَا صُمْتَ سَرَرَ هَذَا الشَّهْرِ? 'হে অমুকের পিতা! তুমি কি এ মাসের শেষভাগে সিয়াম পালন করোনি?' লোকটি উত্তর দিল, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন নবি বললেন, فَإِذَا أَفْطَرْتَ فَصُمْ يَوْمَيْنِ 'তাহলে সিয়াম পালন শেষে দুদিন সিয়াম পালন করে নিয়ো।' [২৩৪]
রমাদানের এক-দুদিন আগে সিয়াম পালনের নিষেধাজ্ঞা এসেছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে কিনা নফল সিয়ামে অভ্যস্ত নয়। [২৩৬]
টিকাঃ
[২০১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২১৭৫৩, হাসান
[২০২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৫৩
[২০৩] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৪০১; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫০৬৩
[২০৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৬৭
[২০৫] তাবারানি, আলমু'জামুল আওসাত, হাদীস নং: ৭৬৩৭
[২০৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৫৯
[২০৭] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪৩২
[২০৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৪৩৪১
[২১৭] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫৭৯
[২১৮] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬৩৬; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭০
[২১৯] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ৪৩৪১, হাসান; তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩০৫৮
[২২০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৪৫
[২২৩] আবূ হানীফা-এর দলিল হলো, সিয়ামের কাযা সম্পর্কে কুরআনে فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أَخَرَ বলা হয়েছে।
[২২৪] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ২৩৩৭; তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৭৩৮
[২২৫] সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদীস নং: ১৩৮৮
[২৩৪] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৮৩
[২৩৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৮২
📄 শাওয়াল মাসের পালনীয়
প্রথম পর্ব: শাওয়াল মাসের সিয়াম
আবূ আইয়ূব আনসারি থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমাদান মাসে সিয়াম পালন করল, তারপর শাওয়াল মাসের ছয়টি দিন তার অনুগামী করল, সে যেন সারা বছর সিয়াম পালন করল।’ [৩৪২]
রমাদানের সিয়াম দশ মাস সিয়ামের সমতুল্য। আর (শাওয়ালের) ছয়দিনের সিয়াম দুই মাস সিয়ামের সমান। রমাদানে সিয়াম পালনের পর পুনরায় সিয়াম পালন করতে পারাটা রমাদানের সিয়াম কবুল হওয়ার নিদর্শন।
দ্বিতীয় পর্ব: হাজ্জের আলোচনা
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন আমলটি উত্তম? তিনি বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা।' প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'মাকবুল হাজ্জ।' [৩৪৭]
হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান কেবল জান্নাত। [৩৬০] যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হাজ্জ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে ওইদিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরবে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল। [৩৬২]
তৃতীয় পর্ব : ওজরের কারণে বদলি হাজ্জ ও উমরাহ
দরিদ্র লোকেরা নবি ﷺ-এর কাছে এসে অভিযোগ করলেন যে বিত্তবানরা অনেক সাওয়াব লুটে নিচ্ছেন। নবি ﷺ তাঁদের আমল বাতলে দিলেন। [৩৭৩] রমাদান মাসে উমরাহ পালন করা নবি ﷺ-এর সঙ্গে একটি হাজ্জ করার সমান। [৩৯৬] যে ব্যক্তি জামাআতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে বসে আল্লাহর যিকর করবে এবং এরপর দু'রাকাআত সালাত আদায় করবে, তার জন্য একটি হাজ্জ ও উমরাহ পালনের সাওয়াব হবে। [৩৯৭]
টিকাঃ
[৩৪২] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬৪
[৩৪৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৩
[৩৬০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৪৯
[৩৬২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৫০
[৩৭৩] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৮৪৩
[৩৯৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১২৫৬
[৩৯৭] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং ৫৮৬
📄 যুল-ক্বা'দাহ মাসে পালনীয়
ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন, জনৈক সাহাবি অতিরিক্ত সিয়াম পালনের ফলে শুকিয়ে গিয়েছিলেন। নবি ﷺ তাঁকে দেখে বললেন, ‘কে তোমাকে বলেছে নিজেকে (এভাবে) কষ্ট দিতে?’ এরপর নবিজি ﷺ তাঁকে প্রতি মাসে তিনদিন এবং সম্মানিত মাসগুলিতে সিয়াম পালনের পরামর্শ দিলেন। [৩৯৮]
শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ে ইবাদাত করতে শারীয়াত আদেশ করেনি। আল্লাহর নবি ﷺ যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলেছেন, যুল-কাদাহ তার অন্যতম। নবি ﷺ হাজ্জের সাথে যে উমরাহ পালন করেছিলেন, সেটা বাদে প্রতিটি উমরাহ-ই তিনি যুলকাদাহ মাসে আদায় করেন। [৪০০]
টিকাঃ
[৩৯৮] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২০৩২৩
[৪০০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৯৭৪-১৯৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৫৯