📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 তৃতীয় পর্ব : হাজীদের আগমন

📄 তৃতীয় পর্ব : হাজীদের আগমন


আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
مَنْ حَجَّ هَذَا البَيْتَ، فَلَمْ يَرْفُتْ، وَلَمْ يَفْسُقُ، رَجَعَ كَمَا وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
'যে ব্যক্তি এ ঘরের হাজ্জ করল, অশ্লীলতায় লিপ্ত হলো না এবং আল্লাহর নাফরমানি করল না, সে মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য-প্রসূত শিশুর মতো (নিষ্পাপ) হয়ে (হাজ্জ থেকে) প্রত্যাবর্তন করবে।' [৯৫]

ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির প্রতিটিই গুনাহের কাফফারা এবং পাপ মোচনকারী। যেমন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সমস্ত গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এটি অপেক্ষা উত্তম আমল হতেই পারে না।[৯৬] পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে পরবর্তী জুমুআ এবং এক রমাদান থেকে পরবর্তী রমাদানের মধ্যবর্তী সমস্ত গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। তবে কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।[৯৭] সাদাকাহর কারণে গুনাহ মিটে যায়, পানি দিয়ে যেমন আগুন নিভে। [৯৮] অশ্লীলতা এবং আল্লাহর নাফরমানি-মুক্ত হাজ্জের মাধ্যমে বান্দা সদ্য-প্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।

নবি বলেছেন,
«الحج المبرور ليس له جزاء إلا الجنة» 'কবুল হাজ্জের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।' [৯৯]

আরেক বর্ণনায় আছে, নবি বলেছেন, «أن الحج يهدم ما كان قبله» 'হাজ্জ, পূর্বের সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয়।' [১০০]

মোটকথা, হাজ্জে মাবরুর তথা কবুল হাজ্জ হলো গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত এবং জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম। সুতরাং হাজি নিজের জন্য যত দুআ করে অথবা তার জন্য অন্যরা যত দুআ করে, তার মধ্যে সর্বোত্তম দুআ হলো মাবরুর হাজ্জের দুআ।

হাজ্জের আমল শেষ করে ইহরাম থেকে হালাল হতে হয় যুলহিজ্জার দশ তারিখ। তখন জামরাতুল আকাবাতে পাথর নিক্ষেপ করার পর এই দুআর বিধান দেওয়া হয়েছে : 'ইয়া আল্লাহ! আপনি এই হাজ্জকে মাবরুর বানিয়ে নিন, আমলকে বানিয়ে দিন গ্রহণযোগ্য এবং গুনাহকে বানিয়ে দিন মার্জনীয়।' আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমার থেকে এমনটা বর্ণিত হয়েছে।

হাজ্জে মাবরুরের নিদর্শন
হাজ্জে মাবরুরের বিনিময় হলো জান্নাত। এ কথা হাসান -কে বলা হলে তিনি বললেন, 'এর নিদর্শন হলো, হাজ্জে মাবরুর সম্পাদনকারী দুনিয়া থেকে বিমুখ হয়ে আখিরাত-মুখী হবে।' আরেকবার তাকে বলা হলো, হাজ্জে মাবরুরের প্রতিদান তো ক্ষমা। উত্তরে তিনি বললেন, 'এর নিদর্শন হলো, হাজ্জে মাবরুর সম্পাদনকারী পূর্বেকার গুনাহ ছেড়ে দেবে।'

ইবাদাত কবুলের নিদর্শন হলো, এর পরপরই অন্য একটি ইবাদাত করতে পারা। পক্ষান্তরে ইবাদাতের পরে গুনাহে লিপ্ত হওয়া, কবুল না-হওয়ার প্রমাণ। নেককাজের পর নেকি করা উত্তম কাজ। বিপরীতে নেককাজের পরে গুনাহ করা নিকৃষ্টতম কাজ। তাওবার পরের গুনাহ, পূর্বের সত্তরটি গুনাহ থেকেও নিকৃষ্ট। রোগের পুনরাক্রমণ, প্রথমবারের থেকেও জটিল হয়ে থাকে। ইবাদাতের সম্মান পাওয়ার পর, অবাধ্যতার লাঞ্ছনা ভোগ করা কতই-না ভয়াবহ! এজন্যই মৃত্যু পর্যন্ত ইস্তিকামাত থাকা এবং (আমল) বৃদ্ধির পরে হ্রাস পাওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত।

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল দুআতে বলতেন: ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার আনুগত্যের কারণে আমাকে সম্মানিত করুন। আপনার নাফরমানির কারণে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না।’

ইবরাহীম ইবনু আদহাম প্রায়ই এ দুআ করতেন: ‘ইয়া আল্লাহ! আমাকে নাফরমানির লাঞ্ছনা থেকে উদ্ধার করে, আনুগত্যের সম্মানের দিকে নিয়ে যান।’

মাবরুর হাজ্জ সমাপ্ত করার পর গুনাহ মাফ হয়ে যায়, দুআ কবুল হয়। তাই হাজির সাথে সাক্ষাৎ করা, তাকে সালাম দেওয়া এবং তার কাছে দুআ চাওয়া মুস্তাহাব।

হাজি'র সাথে সাক্ষাৎ করা সুন্নাহ। এর প্রমাণ হলো আবদুল্লাহ ইবনু জাফর -এর হাদীস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সফর থেকে ফিরে পরিবারের শিশুদের সাথে মিলিত হতেন। একবার তিনি সফর থেকে ফেরার পর, সবার আগে আমার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে (বাহনের) সামনে বসালেন। এরপর ফাতিমা -এর এক ছেলেকে নিয়ে আসা হলো। তাঁকে বসালেন পেছনে। আমরা তিনজন একই বাহনে করে মদীনায় প্রবেশ করলাম। [১০১]

হাজিদের আগমন ঘটলে সালাম দেওয়া, তার সাথে মুসাফাহা করা এবং তার থেকে দুআ চাওয়ার প্রমাণ হলো আবদুল্লাহ ইবনু উমার থেকে বর্ণিত হাদীস। নবি বলেছেন,
إِذَا لَقِيتَ الْحَاجَّ فَسَلَّمْ عَلَيْهِ وَصَافِحْهُ، وَمُرْهُ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتَهُ» . فَإِنَّهُ مَغْفُورُ لَهُ
'হাজি'র সাথে দেখা হলে তাকে সালাম দাও এবং তাঁর সঙ্গে মুসাফাহা করো। সে ঘরে প্রবেশ করার আগেই, তোমার জন্য তাকে ইসতিগফার করতে বলো। কারণ তাকে তো ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।' [১০২]

হাজি'র আগমন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়। জনৈক মুসাফির সফর থেকে ফিরলে, পরিবারের সবাই খুব খুশি হলো। কিন্তু সেখানে থাকা একজন নেককার মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'এই আগমন আমাকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। তখন কতজন খুশি হবে আর কতজন বঞ্চিত হবে?'

কত লোক তো এমন হবে, যাদের সম্পর্কে বলা আছে:
لَا يَحْنُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ وَتَتَلَقَّهُمُ الْمَلَائِكَةُ هَذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
'মহাভীতি তাদেরকে পেরেশান করবে না। আর ফেরেশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবে, এটাই তোমাদের সেই দিন, যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।' [১০৩]

আবার অনেকে এমন হবে, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
يَوْمَ يُدَعُونَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعَا
'সেদিন তাদেরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।' [১০৪]

টিকাঃ
[৯৫] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৮১৯
[৯৬] ইবনু মাজাহ, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৭৯৭; দায়লামি, মুসনাদুল ফিরদাউস, হাদীস নং: ৭২৭৭
[৯৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৩৩
[৯৮] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৬১৪; ইবনু মাজাহ, আসসুনান, হাদীস নং: ৪২১০
[৯৯] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৪৯
[১০০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১২১
[১০১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪২৮
[১০২] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৫৩৭১, হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
[১০৩] সূরা আম্বিয়া, ২১: ১০৩
[১০৪] সূরা তুর, ৫২: ১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00