📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : তাহাজ্জুদ সালাতের গুরুত্ব
পূর্বে বর্ণিত আবূ হুরায়রা -এর হাদীসটি থেকে জানা যায় যে তাহাজ্জুদের সালাত হলো ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত। তবে সেটা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদার চেয়েও উত্তম কি না, তা নিয়ে অবশ্য উলামাদের দ্বিমত রয়েছে।
ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'প্রকাশ্য সাদাকাহর চেয়ে গোপন সাদাকাহ যেমন শ্রেষ্ঠ, দিনের সালাতের চেয়ে রাতের সালাতও তেমন শ্রেষ্ঠ। দিনের সালাতের ওপর তাহাজ্জুদের সালাতকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হলো, তা গোপনে করা হয়। আর তাই ইখলাসের বেশি কাছাকাছি হয়ে থাকে।'
নফল আমলে গোপনীয়তা রক্ষা
তাহাজ্জুদ গোপন রাখতে সালাফগণ সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। হাসান বলেছেন, ‘এক ব্যক্তির কাছে মেহমান ছিল। সে ব্যক্তি রাতে এমনভাবে সালাত আদায় করতেন যে, মেহমানও টের পেত না।'
অনেক সালাফ মনোযোগ দিয়ে দুআ করতেন কিন্তু কোনো আওয়াজ হতো না। তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন, যিনি সারা রাত কেঁদেছেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী টের পায়নি। অথচ স্ত্রীর সাথে এক বালিশে শুয়েই রাত কাটিয়েছেন। মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি মক্কায় যাওয়ার পথে হাওদাতে বসে সারারাত সালাত আদায় করতেন। লোকেরা যাতে তা বুঝতে না পারে, এজন্য তিনি উটচালককে জোরে আওয়াজ করতে বলতেন।
সালাফদের অনেকে মধ্যরাতে এমন চুপিচুপি উঠতেন যে, টের পাওয়া যেত না। ভোর হয়ে এলে তখন সশব্দে তিলাওয়াত শুরু করতেন। যাতে মনে হয়, তিনি মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছেন।
তাহাজ্জুদের সালাত শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ
তাহাজ্জুদের সালাত শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হলো, এটা আদায় করা বেশি কষ্টকর। দিনের পরিশ্রম এবং খাটুনির পর রাত হলো ঘুম এবং আরামের সময়। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঘুম ত্যাগ করা কঠোর পরিশ্রমের বিষয়। বলা হয়ে থাকে, যে আমল করতে মনকে বাধ্য করা হয়, সেটাই সর্বোত্তম।
আরেকটি কারণ হলো, রাতের সালাতে তিলাওয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা সহজ। রাতে ব্যস্ততা না থাকায়, সহজেই মন বসে। ফলে মুখে উচ্চারণ করা আয়াত, অন্তর অনুধাবন করতে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا )
'রাত জাগরণ করা আত্মসংযমের জন্য বেশি কার্যকর এবং (কুরআন) স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।'[৪৯]
এ অর্থেই রাতের সালাতে কুরআনকে তারতীলের সাথে তথা ধীরেসুস্থে এবং স্পষ্টভাবে পড়তে বলা হয়েছে। তাহাজ্জুদের সালাতকে প্রাধান্য দেওয়ার আরও একটি কারণ হলো, তাহাজ্জুদের সময়টা নফল সালাতের সর্বোত্তম সময়। বান্দা এ সময় আল্লাহর বেশি নিকটবর্তী হয়ে থাকে। এ সময়েই আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, দুআ কবুল করা হয়। আর প্রয়োজনগ্রস্তকে বলা হয়, তার জরুরত উপস্থাপন করতে।
আল্লাহ তাআলার প্রশংসা
রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যিকর, দুআ, ইসতিগফার, এবং মুনাজাতকারীদেরকে আল্লাহ অনেক প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ * فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ )
'তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। কেউই জানে না, তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে চোখ জুড়ানো কী (জিনিস) তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে।'[৫০]
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ )
'এবং শেষ রাতে ইসতিগফারকারী।'[৫১]
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ * وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ * 'তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ইসতিগফার করত।'[৫২]
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَمًا ) 'তারা রাত কাটিয়ে দেয় তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সাজদাবনত হয়ে এবং দাঁড়িয়ে।'[৫৩]
أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ ءَانَاءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَقَابِمَا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُوا رَحْمَةَ رَبِّهِ، قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ ) 'যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সাজদাবনত হয়ে এবং দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এমন করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? আসলে বুদ্ধিমানরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।' [৫৪]
مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَائِمَةٌ يَتْلُونَ ءَايَاتِ اللَّهِ وَانَاءَ الَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ ) 'কিতাবিদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে, যারা রাতের গভীরে অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতগুলো পাঠ করে এবং সাজদা করে।' [৫৫]
নবি ﷺ-কে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِنَ الَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا * 'রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়েম করুন, এটা আপনার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।' [৫৬]
وَمِنَ الَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ، وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طَوِيلًا )
'রাতের কিছু অংশে তাঁর প্রতি সাজদাবনত হোন এবং রাতের দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা ও মহিম ঘোষণা করুন। [৫৭]
يَأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ الَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نَصْفَهُوَ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْءَانَ تَرْتِيلًا )
'হে বস্ত্রাবৃত! রাত জাগরণ করুন, কিছু অংশ বাদ দিয়ে, অর্ধ রাত বা তার চেয়ে কিছু কম, অথবা তার চেয়ে বেশি। এবং কুরআন আবৃত্তি করুন ধীরেসুস্থে ও স্পষ্টভাবে।'[৫৮]
আয়িশা -এর উপদেশ
আয়িশা এক লোককে বলেছিলেন, 'কখনো তাহাজ্জুদের সালাত ছাড়বে না। কেননা, রাসূল ﷺ কখনোই তা পরিত্যাগ করেননি। কখনো অসুস্থ বা অবসন্ন বোধ করলে বসে বসে আদায় করতেন (কিন্তু পরিত্যাগ করতেন না)।[৫৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়িশা বলেছেন, "শুনেছি এক দল লোক নাকি বলে, 'আমরা কেবল ফরয আদায় করাই যথেষ্ট মনে করি; এর থেকে বেশি করার প্রয়োজন বোধ করি না।' আল্লাহর কসম! তিনি তো কেবল ফরয সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করবেন। কিন্তু এসব লোক তো রাত দিন কত গুনাহই করে থাকে! তোমরা তো তোমাদের নবির চেয়ে উত্তম নও। আর তিনি ছিলেন তোমাদের মতো মানুষ। তবুও আল্লাহর রাসূল কখনো তাহাজ্জুদের সালাত ছাড়েননি।”
এ কথা বলে আয়িশা তাহাজ্জুদের দুটি উপকারিতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
প্রথমত, আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ এবং তাঁর আদর্শ গ্রহণ করা। যেমনটা আল্লাহ বলেছেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةً
'অবশ্যই তোমাদের জন্যে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।'[৬০]
দ্বিতীয়ত, গুনাহের কাফফারা হওয়া। আদম সন্তানের রাতদিন গুনাহ হতেই থাকে। সেজন্য অধিক হারে প্রায়শ্চিত্ত করা প্রয়োজন। আর তাহাজ্জুদের সালাত বড় বড় প্রায়শ্চিত্তের মধ্যে অন্যতম। যেমন মুআয ইবনু জাবাল -কে নবি বলেছিলেন,
قِيَامُ الْعَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ يُكَفِّرُ الْخَطَايَا 'রাতের মধ্যভাগে সালাত আদায় করা বান্দার গুনাহের কাফফারা।' এরপর নবি সূরা সাজদাহ'র ১৬ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। [৬১]
তাহাজ্জুদের আরও কিছু উপকারিতা
⇨ বর্ণিত আছে, তাহাজ্জুদ আদায়কারীরা কোনো রকম হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।
⇨ জনৈক সালাফ বলেছেন, রাতের সালাতের কারণে কিয়ামাতের দিন অবস্থান করা সহজ হবে।
⇨ আবূ উমামা এবং বিলাল থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأَبُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَإِنَّ قِيَامَ اللَّيْلِ قُرْبَةٌ إِلَى اللَّهِ» . وَمَنْهَاةً عَنْ الإِثْمِ، وَتَكْفِيرُ لِلسَّيِّئَاتِ، وَمَطْرَدَةُ لِلدَّاءِ عَنِ الْجَسَدِ 'তোমাদের উচিত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা। কেননা, এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককারদের পালিত রীতি। তাহাজ্জুদের সালাত আল্লাহর নৈকট্যলাভ এবং গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়। মন্দ কাজের কাফফারা এবং দৈহিক রোগের প্রতিষেধক। [৬২]
⇨ 'স্বপ্নের প্রসিদ্ধ হাদীসটিতে' এসেছে, সর্বোচ্চ ফেরেশতাদের মাজলিসে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল। ওই মাজলিসে মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয় হলো—মানুষকে খাবার খাওয়ানো, সালামের প্রসার ঘটানো এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাত আদায় করা। [৬৩]
⇨ আবদুল্লাহ ইবনু সালাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় এলে লোকেরা দ্রুত তাঁর দিকে ছুটে গেল। বলাবলি হতে লাগল, আল্লাহর রাসূল এসেছেন। লোকদের মধ্যে আমিও তাঁকে দেখতে গেলাম। রাসূল ﷺ-এর চেহারা আমার সামনে স্পষ্ট হওয়ামাত্র আমি চিনে ফেললাম। এ চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তিনি প্রথম যে কথা বললেন তা হলো,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامُ تَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِسَلَامٍ
'হে লোকসকল! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, লোকদের আহার করাও এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাতে দাঁড়াও। তাহলে তোমরা নিশ্চিন্তে জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।' [৬৪]
⇨ তাহাজ্জুদের অন্যতম ফযিলত হলো, এই সালাত আদায়কারীদের আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন। ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব করেন এবং তাদের দুআ কবুল করে থাকেন। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
عَجِبَ رَبُّنَا عَزَّ وَجَلَّ مِنْ رَجُلَيْنِ: رَجُلٍ ثَارَ عَنْ وِطَائِهِ وَلِحَافِهِ، مِنْ بَيْنِ أَهْلِهِ وَحَيَّهِ» إِلَى صَلَاتِهِ، فَيَقُولُ رَبُّنا : أَيَا مَلَائِكَتِي، انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي، ثَارَ مِنْ فِرَاشِهِ وَوِطَائِهِ، . وَمِنْ بَيْنِ حَيَّهِ وَأَهْلِهِ إِلَى صَلَاتِهِ ، رَغْبَةً فِيمَا عِنْدِي، وَشَفَقَةً مِمَّا عِنْدِي
'আমাদের মহান প্রতিপালক এমন বান্দার প্রতি খুশি হন, যে কিনা বিছানা থেকে কম্বল সরিয়ে নিজের পরিবার ও প্রিয়জনদের মাঝ থেকে উঠে সালাতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন আল্লাহ বলেন, ফেরেশতারা! আমার বান্দাকে দেখো! সে বিছানা থেকে কম্বল সরিয়ে পরিবার ও প্রিয়জনের মাঝ থেকে উঠে সালাতে দাঁড়িয়েছে। বান্দার এ কাজের কারণ হলো, আমার কাছে থাকা পুরস্কারের প্রতি (তার) আগ্রহ এবং আমার শাস্তির ভয়।' [৬৫]
মূল হাদীসে ثَارَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা উদ্যমতা এবং দৃঢ়তা প্রকাশ করে।
আরেক হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন,
نِعْمَ الرَّجُلُ عَبْدُ اللَّهِ، لَوْ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ»
'আবদুল্লাহ (ইবনু উমার) বড় ভালো লোক, যদি সে রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করত!'[৬৬]
এ কথা শোনার পর আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাতে খুব কম ঘুমাতেন।
আবূ যার একবার লোকদের বললেন, 'বলো তো দেখি, কোনো লোক সফর করতে চাইলে কি যথাযথ এবং দরকারি পাথেয় গ্রহণ করবে না?' লোকেরা জবাব দিল, অবশ্যই করবে। আবূ যার বললেন, 'তাহলে কিয়ামাতের সফর তো অনেক দীর্ঘ। সুতরাং তোমরা প্রয়োজনীয় পাথেয় গ্রহণ করো। গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নাও। যেদিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে, সেদিনকার ভীষণ গরম থেকে আত্মরক্ষার জন্য গরমের দিনে সিয়াম পালন করো। কবরের অন্ধকার দূর করার জন্য রাতের অন্ধকারে দু' রাকআত সালাত আদায় করো। কঠিন দিনের কষ্ট দূর করার জন্য সাদাকাহ করো।'
কোথায় সেই তাহাজ্জুদ আদায়কারীরা? হাসান, সুফইয়ান আর ফুযাইল কোথায়?
তাহাজ্জুদের সময়
দাউদ -এর তাহাজ্জুদের পদ্ধতি আল্লাহ তাআলার কাছে পছন্দনীয়। তিনি রাতের প্রথম অর্ধেক ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং রাতের ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন।[৬৭]
নবি তাহাজ্জুদের জন্য কখন জাগতেন, সেটা জানতে চাওয়া হলো আয়িশা -এর কাছে। তিনি বললেন, 'যখন মোরগের ডাক শুনতে পেতেন।[৬৮] মোরগ ডেকে ওঠে মধ্যরাতে।
তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে না পারার কারণ
সকাল পর্যন্ত ঘুমে কাটিয়েছে, এমন এক ব্যক্তির আলোচনা উঠলে হলে নবি বললেন,
«بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنِهِ»
'শয়তান তার কানে পেশাব করে দিয়েছে।' [৬৯]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, আমরা রাতে সালাতের জন্য উঠতে পারি না কেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'গুনাহ তোমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।'
হাসান কে একজন বলল, আমরা তো তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে অক্ষম হয়ে গেছি। উত্তরে তিনি বললেন, 'গুনাহ তোমাদের আটকে রেখেছে।'
ফুযাইল বলেন, 'রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে এবং দিনে সিয়াম পালন করতে না পারলে বুঝে নিও, তুমি একজন শৃঙ্খলিত বন্দি। গুনাহ যাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রেখেছে।'
হাসান বলেছেন, 'গুনাহের কারণেই বান্দা তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।'
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'একবার একটি গুনাহ করার কারণে আমি টানা ছয়মাস তাহাজ্জুদের সালাত থেকে বঞ্চিত হয়েছি।'
রাত আসলে একটি ঘাটের মতো। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া নিয়ে প্রত্যাশীরা জড়ো হয়। প্রত্যেকেই নিজের স্থান চিনে নেয়। প্রেমিক উপভোগ করে তার প্রিয়জনের সাথে একান্ত কথাবার্তা। ভীত ব্যক্তি নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চেয়ে কাকুতি-মিনতি করে কাঁদতে থাকে। আশাবাদী ব্যক্তি নাছোড়বান্দা হয়ে প্রার্থনা করে চলে। কিন্তু দুর্ভাগা ও উদাসীন ব্যক্তি বঞ্চিত হয়ে সব খুইয়ে বসে।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর কে নবি বলেছেন,
«يَا عَبْدَ اللهِ ، লَا تَكُنْ مِثْلَ فُلانٍ كَانَ يَقُومُ اللَّيْلَ، فَتَرَكَ قِيَامَ اللَّيْلِ»
'আবদুল্লাহ! তুমি অমুক লোকের মতো হয়ো না-যে রাতে (সালাতে) দাঁড়াত, কিন্তু পরে তা ছেড়ে দিয়েছে।' [৭০]
রাতের বেলা আলি এবং ফাতিমা-এর দরজায় এসে নবি বলতেন,
«أَلَا تُصَلِّيَانِ؟»
'তোমরা সালাত আদায় করছ না?' [৭১] নবি বলেছেন,
إِذَا أَيْقَظَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّيَا ، أَوْ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا، كُتِبَا فِي الذَّاكِرِينَ وَالذَّاكِرَاتِ 'কোনো লোক যদি রাতে তার স্ত্রীকে ঘুম হতে জাগিয়ে, দুজনে মিলে সালাত আদায় করে কিংবা প্রত্যেকে দুই-দুই রাকআত সালাত আদায় করে, তবে যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী মহিলা হিসাবে তাদের নাম আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয়।' [৭২]
হাবীব আজামির স্ত্রী রাতের বেলা স্বামীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলতেন, 'রাত কেটে গেছে। আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ কিন্তু আমাদের পাথেয় সামান্য। ভালো লোকদের কাফেলা সামনে এগিয়ে গেছে অথচ আমরা পড়ে আছি পিছনে।'
টিকাঃ
[৪৯] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩:৬
[৫০] সূরা সাজদাহ, ৩২: ১৬-১৭
[৫১] সূরা আলি ইমরান, ৩: ১৭
[৫২] সূরা যারিয়াত, ৫১: ১৭-১৮
[৫৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৪
[৫৪] সূরা যুমার, ৩৯: ৯
[৫৫] সূরা আলি ইমরান, ৩: ১১৩
[৫৬] সূরা ইসরা, ১৭: ৭৯
[৫৭] সূরা ইনসান, ৭৬: ২৬
[৫৮] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩: ১-৪
[৫৯] আবূ দাঊদ, আসসুনান, হাদীস নং: ১৩০৭, হাকিম এই হাদীসটিকে মুসলিম -এর শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন।
[৬০] সূরা আহযাব, ৩৩: ২১
[৬১] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ২২০৬৮
[৬২] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৫৪৯; সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস নং: ১১৩৫; হাকিম, আলমুসতাদরাক: ১/৪৫১; আবূ উমামা -এর রিওয়ায়াতটি বিশুদ্ধতম। তবে তাতে 'দৈহিক রোগের প্রতিরোধক' বাক্যটি নেই।
[৬৩] আহমাদ, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ৩৪৮৪; তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩২৩৩, সহীহ।
[৬৪] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ২৪৮৫, তিরমিযি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[৬৫] ইবনু আবি শায়বাহ, আলমুসান্নাফ, হাদীস নং: ১৯৩৯৫, সহীহ
[৬৬] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১২২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৭৯
[৬৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৩১
[৬৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৩২
[৬৯] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৪৪
[৭০] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৫৯
[৭১] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ১১২৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭৭৫
[৭২] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ১৩০৯, সহীহ