📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 অনুবাদকের কথা

📄 অনুবাদকের কথা


সময়ের বিবর্তন, রাত দিনের আবর্তন, মৌসুমের পরিবর্তন সবই আল্লাহর দান। এগুলো পৃথিবীতে আল্লাহর রীতি। তাঁরই একান্ত অনুগ্রহের ফলে পালাক্রমে সবকিছুর পরিবর্তন হয়। উদ্দেশ্য, বান্দা যাতে এসব দেখে আল্লাহকে স্মরণ করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয় এবং শিক্ষা নেয়। আল্লাহ বলেন, يُقَلِّبُ اللَّهُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعিবْرَةً لِّأُوْلِي الْأَبْصَارِ 'আল্লাহ দিন ও রাতের আবর্তন ঘটান, নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।'[১] وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّরَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا 'যারা উপদেশ গ্রহণ করতে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়, তাদের জন্য তিনি রাত-দিন সৃষ্টি করেছেন সেগুলো পালা করে আসতে থাকে।'[২]

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। সেগুলো শেখানোর জন্য আল্লাহ মানুষের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে নবি-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আদি পিতা আদম থেকে শুরু করে সব নবিই এ দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষ নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এরও দায়িত্ব ছিল এটাই। এ দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ 'আপনি মনে করিয়ে দিন; কারণ, মনে করিয়ে দিলে মুমিনদের উপকার হয়।'[৩]

নবিগণের পরে তাঁদের উত্তরাধিকারীগণ যুগে যুগে এ দায়িত্ব পালন করছেন এবং করে চলেছেন। তাদের অনেকে আমাদের মাঝে রেখে গেছেন অনেক কীর্তি, গড়ে গেছেন অনেক ইতিহাস। সেসব অমর কীর্তি ও স্মরণীয় ইতিহাসের প্রভাব আজও অনস্বীকার্য। দেশের পর দেশ, যুগের পর যুগ পেরিয়ে আজও সেগুলো সমান সমাদৃত।

সেসব পূর্বসূরির একজন হলেন ইমাম যাইনুদ্দীন আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ ইবনু রজব হাম্বলী। ইবনু রজব হাম্বলী নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। ১৩৩৫ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৭৩৬ হিজরিতে তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৭৯৫ হিজরিতে তাঁর ইন্তিকাল হয়। জ্ঞানবিজ্ঞানের বহু শাখায় তিনি ছিলেন পারদর্শী। মূলত হাম্বলী ফিকহের অনুসারী হলেও, তিনি বিশেষ কোনো ফিকহের নয়; বরং গোটা উম্মাহর এক অনন্য সম্পদ ছিলেন। হাদীস অনুধাবন এবং তার শিক্ষা উম্মাহর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন।

তাঁর সংকলিত 'লাতায়িফুল মাআরিফ' গ্রন্থটি এক অনবদ্য সংকলন। এতে তিনি বছরের বিভিন্ন সময়, মাস এবং ঋতু সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ, পূর্বসূরিদের বক্তব্য, শিক্ষণীয় ঘটনাবলি এবং কবিতার অপূর্ব সমাহার ঘটিয়েছেন। চমৎকার আলোচ্যবিষয়, সুন্দর ভাষাশৈলী এবং প্রাসঙ্গিক সংযোজনের মাধ্যমে উপদেশ এবং শিক্ষা যেমন লাভ হয়, তেমনি পাঠকের আত্মিক পরিশুদ্ধিও ঘটে থাকে। উপস্থাপনা এবং বর্ণনাভঙ্গি চমৎকার হওয়ার কারণে গ্রন্থটি পড়তে পাঠকের মনে কোনো রকম বিরক্তির উদ্রেক হয় না।

আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি, এ অমূল্য গ্রন্থটি বাংলাভাষী পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তিনি আমাকে নির্বাচন করেছেন। দেশের অন্যতম সৃজনশীল প্রকাশনী 'দারুল ফালাহ' এর কর্ণধার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আহমাদ রোকন উদ্দিন আমাকে বইটি অনুবাদের দায়িত্ব প্রদান করেন। পাশাপাশি নির্দেশ দেন-মূল কিতাবটির কলেবর বড় হওয়ায় বাঙালি পাঠকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে সংক্ষিপ্ত সংস্করণটি অনুবাদ করতে।

আমি খোঁজ করে কিতাবটির দুটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণের সন্ধান পাই। একটি শাইখ আহমাদ ইবনু উসমান আল-মাযইয়াদকৃত; আর অপরটি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান আল-মুহান্নাকৃত। উভয়টিকেই সামনে রেখে শুরু করি অনুবাদকর্ম। তবে বরাবরই মূল কিতাবটি পাশে রেখেছি। দুই সংক্ষিপ্ত সংস্করণের যথাসাধ্য সমন্বয় ঘটিয়ে কখনো কখনো মূল কিতাব থেকেও যেসব অংশ অতীব প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, তার কিছু অংশ তুলে দিয়েছি। বাংলায় বক্তব্যের গতি ধরে রাখার সুবিধার্থে আরবি কবিতাগুলি এড়িয়ে গেছি। কতটা সফল হয়েছি, তা বিজ্ঞ এবং বিচক্ষণ পাঠকই ভালো বলতে পারবেন। এ ব্যাপারে তাদের সুচিন্তিত মতামত আমরা সাদরে গ্রহণ করব ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে দুআ করি, তিনি যেন আমাদের এই ক্ষুদ্র পরিশ্রমকে একান্তভাবে তাঁর নিজের জন্য বানিয়ে নেন। এর বিনিময়ে তিনি যেন উপকৃত করেন সম্মানিত গ্রন্থকার, অনুবাদক, অনুবাদকের সম্মানিত বাবা-মা এবং উস্তায, গ্রন্থের সম্মানিত প্রকাশক, শ্রদ্ধাভাজন পাঠকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং সব মুমিন নর-নারীকে।

আমরা যেন তাঁর পছন্দনীয় কাজগুলো আঞ্জাম দিতে পারি। আমাদের জীবিতদের তিনি যেন ঈমানের সাথে, সালামতের সাথে, আফিয়াতের সাথে এবং কাফালতের সাথে 'খাতিমা বিল খাইর' নসীব করেন। আমীন।

মহান আল্লাহর অনুকম্পাপ্রার্থী আবদুল্লাহ জোবায়ের রাফে

টিকাঃ
[১] সূরা নূর, ২৪:৪৪
[২] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬২
[৩] সূরা যারিয়াত, ৫১ : ৫৫

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 সংকলকের ভূমিকা

📄 সংকলকের ভূমিকা


আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ ءَايَتَيْنِ فَمَحَوْنَا ءَايَةَ الَّيْلِ وَجَعَلْنَا ءَايَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِتَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّবِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ
'আমি রাত ও দিনকে করেছি দুটি নিদর্শন। রাতকে করেছি নিরালোক এবং দিনকে করেছি আলোকময়, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা বর্ষ সংখ্যা ও হিসাব স্থির করতে পারো; এবং আমি সবকিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।' [৪]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاءَ وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ
'তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিমান আর চাঁদকে বানিয়েছেন জ্যোতির্ময় এবং তার কক্ষপথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।' [৫]

আল্লাহ তাআলা বছর ও সময়ের হিসাব জানাকে চাঁদের কক্ষপথের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। কারও কারও মতে, তিনি এটাকে সম্পৃক্ত করেছেন সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চাঁদকে জ্যোতির্ময় বানানোর সাথে। কারণ, বছর ও মাসের হিসাব জানা যায় চাঁদের মাধ্যমে, আর সপ্তাহ ও দিনের হিসাব জানা যায় সূর্যের মাধ্যমে। সূর্যের সাথে সালাত এবং সিয়ামের বিধান সম্পৃক্ত করার কারণ হলো, সূর্য দৃশ্যমান। এর জন্য কোনো রকম হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন পড়ে না। সুবহে সাদিক, সূর্যোদয়, সূর্য হেলে পড়া, অস্ত যাওয়া কিংবা বস্তুর ছায়া সমপরিমাণ হওয়া এবং লালিমা অস্ত যাওয়ার সাথে সালাতের ওয়াক্ত জড়িত। আর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের অংশটুকু সিয়ামের সময়।

কিছু হুকুম মানার জন্য বান্দাকে আল্লাহ দৈনিক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ সময়গুলোতে কিছু হুকুম মানা ফরয আর কিছু নফল। ফরয হুকুম হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং নফল হলো নফল যিকর, তিলাওয়াত, তাসবীহ ইত্যাদি। আবার চান্দ্রমাস অনুযায়ীও কিছু হুকুম মানার সময় নির্ধারণ করেছেন। যেমন : সিয়াম, যাকাত এবং হাজ্জ। এখানেও রমাদানের সিয়াম এবং হাজ্জের মতো কিছু হুকুম মানা ফরয আবার কিছু নফল। যেমন: শাবান, শাওয়াল এবং সম্মানিত কয়েকটি মাসের সিয়াম।

কয়েকটি মাসকে তিনি অন্য মাসগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন,
مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُواْ فِيهِنَّ أَنফُسَكُمْ
'তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এগুলোতে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না।'[৬]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْحَجُّ أَشْهُرُ মَّعْلُومَاتٌ
'হাজ্জ হয় সুনির্দিষ্ট কয়েকটি মাসে।'[৭]

আবার কিছু রাত এবং দিনকে অন্যান্য রাত এবং দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যেমন লাইলাতুল কদরকে হাজার মাস থেকেও বেশি শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন এবং শপথ করেছেন দশটি রাতের। নির্ভরযোগ্য মতানুসারে এই দশটি রাত হলো যুল-হিজ্জাহ মাসের প্রথম দশ রাত। এ বিষয়ে আল্লাহ চাহেন তো যথাস্থানে আলোচনা করব।

এই শ্রেষ্ঠ সময়গুলোতে বান্দাকে আল্লাহ তাঁর নৈকট্য অর্জন করার জন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, যা বান্দার জন্য এক গোপন উপহার বিশেষ। সুতরাং সে ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে। বিশেষ মাস, দিন এবং সময়গুলো কাজে লাগিয়ে নির্ধারিত উপহার লাভ করে। ফলে জাহান্নাম ও সেখানে থাকা কষ্ট থেকে বেঁচে গিয়ে হয় চিরসুখী।

তাবিয়ি মুজাহিদ বলেছেন, "প্রতিটি দিন মানুষকে লক্ষ করে বলে, 'হে আদম-সন্তান! আমি আজ তোমার কাছে এসেছি। আজকের পরে আমি আর তোমার কাছে ফিরে আসব না। সুতরাং তুমি আমার মাঝে কী কাজ করছ, তা ভেবে-চিন্তে করো।' দিনটি চলে যাওয়ার পর সেটিকে গুটিয়ে নিয়ে তাতে সিলমোহর মেরে দেওয়া হয়। কেবল কিয়ামাতের দিনই আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সেই সিলটি ভাঙা হবে।”

হাসান বলেন, 'দুনিয়ার প্রতিটি দিন মানুষকে ডেকে বলে: লোকসকল! আমি তো একটি নতুন দিন। আমাতে যেসব কাজ করা হয় সে ব্যাপারে আমি সাক্ষী থাকি। আজকে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে কিয়ামাতের দিন পর্যন্ত আমি আর ফিরে আসব না।'

উমার ইবনু যার বলেন, 'তোমরা নিজেদের জন্য আমল করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের এই রাতের আঁধারেও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। সত্যিকারের প্রতারিত তো সে ব্যক্তি, যে রাত-দিনের কল্যাণের ব্যাপারে প্রতারিত। আর বঞ্চিত তো সে ব্যক্তি, যে এ দুয়ের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। মুমিনদের জন্য রাত এবং দিনকে আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যদের জন্য এ দুটি হলো উদাসীনতার মাধ্যম। তোমরা আল্লাহর যিকরের মাধ্যমে নিজেদের অন্তরকে সতেজ রাখো। কারণ, অন্তর কেবল আল্লাহর যিকরের মাধ্যমেই সতেজ থাকে। কবরে এমন কত রাত্রি জাগরণকারী আছে, যারা নিজেদের রাত্রি জাগরণ নিয়ে পরিতৃপ্ত। আবার এমন অনেক ব্যক্তি আছে, যারা ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছে। তারা যখন আগামীকাল আল্লাহর কাছে ইবাদাতকারীদের মর্যাদা দেখবে, তখন অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকবে। সুতরাং চলে যাওয়া সময় এবং রাতগুলোর ব্যাপারে যত্নবান হও।'

কাতাদাহ বলেন, 'মুমিন কখনো রাতে ইবাদাতের কথা ভুলে যায় এবং দিনে তার স্মরণ হয়। আবার কখনো দিনে ইবাদাতের কথা ভুলে যায় এবং রাতে তার মনে পড়ে।' তিনি আরও বলেন, এক লোক সালমান ফারসি এর কাছে এসে বলল, আমি রাত জেগে ইবাদাত করতে পারি না। তিনি বললেন, (রাতে ইবাদাত করতে না পারলেও) দিনে ইবাদাত করা থেকে বিরত থেকো না।

পরকথা এই যে, কল্যাণ লাভের আশায় এ কিতাবে আমি সালাত, সিয়াম, যিকর, শোকর, খাবার বিতরণ এবং সালাম প্রসারের মতো বছরের বিভিন্ন সময়কার পালনীয় ইবাদাত সংকলন করেছি। যাতে এ কিতাবটি আমার নিজের এবং আমার বন্ধুদের পরকালীন পাথেয় এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ হয়ে যায়। অবশেষে আমার এ বিষয়টি আমি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি। তিনি তো বান্দার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। পাশাপাশি যারা ওয়াজ ও নাসীহাহ করতে আগ্রহী, এ সংকলনটি তাদের জন্যও উপযোগী। কারণ, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বান্দাকে সতর্ক ও সচেতন করা। এ ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে তিনি বলেন,
وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ * 'আপনি মনে করিয়ে দিন; কারণ মনে করিয়ে দিলে মুমিনদের উপকার হয়।'[৮]

তিনি এ-ও জানিয়েছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাদাকাহ এবং কল্যাণের আদেশদাতাকে তিনি মহা প্রতিদান দেবেন।[৯] আর নবি বলেছেন,
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ 'যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে আহ্বান জানায়, তার জন্য সে পথের অনুসারীদের সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব রয়েছে।'[১০]
অবশ্যই এটা এক মহা অনুগ্রহ।

মাসের সাথে সম্পৃক্ত এই পালনীয়গুলো আমি পর্ব হিসেবে বিভক্ত করেছি। মাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি চান্দ্রবর্ষের হিসেবে। মুহাররাম থেকে শুরু করে যুল-হিজ্জাহতে শেষ করেছি। প্রত্যেক মাসের অধীনে তার পালনীয় বিষয়গুলো এনেছি। যে মাসে বিশেষ কোনো পালনীয় নেই, সে মাসে কিছু উল্লেখ করিনি। সবগুলোর শেষে সৌরবর্ষের তিনটি ঋতু তথা বসন্ত, শীত এবং গ্রীষ্মের আলোচনা করেছি। আর কিতাবের পরিশিষ্টে তাওবা এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র পর্ব রেখেছি। কারণ তাওবা গোটা জীবনেরই অংশ। মাসগুলোর পালনীয় শুরু করার আগে যিকরের ফযিলত নিয়ে একটি পর্ব দিয়েছি। যাতে যিকরের মাজলিসের উপকারিতাও সন্নিবেশিত আছে। কিতাবটির নামকরণ আমি করেছি—লাতায়িফুল মা'আরিফ ফীমা লিমাওয়াসিমিল 'আমি মিনাল ওয়াযায়িফ।

আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই কাজকে একান্তভাবে তাঁর জন্য বানিয়ে নেন। একে যেন তাঁর চিরস্থায়ী নিয়ামাতপূর্ণ শান্তির আলয়ে নৈকট্যের মাধ্যম বানিয়ে দেন। এর বিনিময়ে তিনি যেন উপকৃত করেন আমাকে এবং তাঁর সব মুমিন বান্দাকে। আমাদের দিয়ে যেন করিয়ে নেন তাঁর পছন্দনীয় কাজগুলো। আমাদের যেন তিনি কল্যাণকর মৃত্যু নসীব করেন। তিনি তো পরম সম্মানিত এবং সর্বাধিক দয়াবান। আমীন।

এখন আমরা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য অভিমুখে যাত্রা আরম্ভ করছি। পূর্বে বলা পদ্ধতি অনুসারে আমাদের আলোচনা শুরু হবে প্রথম পর্বের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলাই শক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে থাকেন।

টিকাঃ
[৪] সূরা ইসরা, ১৭:১২
[৫] সূরা ইউনুস, ১০:৫
[৬] সূরা তাওবা, ৯: ৩৬
[৭] সূরা বাকারা, ২: ১৯৭
[৮] সূরা যারিয়াত, ৫১ : ৫৫
[৯] সূরা নিসা, ৪: ১১৪-এর মর্মার্থ।
[১০] মুসলিম, ২৬৭৪

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 আল্লাহর যিকরের গুরুত্ব এবং উপদেশের আলোচনা

📄 আল্লাহর যিকরের গুরুত্ব এবং উপদেশের আলোচনা


আবূ হুরায়রা বলছেন, আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যতক্ষণ আপনার কাছে থাকি ততক্ষণ আমাদের মনটা নরম থাকে। দুনিয়ার প্রতি আমরা অনাসক্ত থাকি এবং আমরা আখিরাতের বাসিন্দা হয়ে যাই। কিন্তু আপনার কাছ থেকে উঠে পরিবারের সাথে মিলিত হলে, সন্তানদের আদর করলে, তখন আমরা নিজেদেরকেই চিনতে পারি না। নবি বললেন,
لَوْ أَنَّكُمْ تَكُونُونَ إِذَا خَرَجْتُمْ مِنْ عِنْدِي كُنْتُمْ عَلَى حَالِكُمْ ذَلِكَ لَزَارَتْكُمُ المَلَائِكَةُ فِي بُيُوتِكُمْ، وَلَوْ لَمْ تُذْنِبُوا حَجَاءَ اللهُ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ كَيْ يُذْنِبُوا فَيَغْفِرَ لَهُمْ
'আমার কাছে থাকার সময় তোমাদের যে অবস্থা থাকে এখান থেকে উঠে যাওয়ার পরও যদি সে অবস্থা বহাল থাকত, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের ঘরে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করত। তোমরা গুনাহ না করলে আল্লাহ নতুন এক দল সৃষ্টি করতেন। যেন তারা গুনাহ করে, আর তিনি তাদের মাফ করে দেন।'

আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সৃষ্টির উৎস কী? তিনি বললেন, 'পানি।' আমি বললাম, জান্নাত কী দিয়ে তৈরি? তিনি বললেন,
لَبِنَةُ مِنْ فِضَّةٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ، وَمِلَاحُهَا الْمِسْكُ الْأَذْفَرُ، وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ» وَاليَاقُوتُ، وَتُرْبَتُهَا الرَّعْفَرَانُ مَنْ دَخَلَهَا يَنْعَمُ وَلَا يَبْأَسُ، وَيَخْلُدُ وَلَا يَمُوتُ، لَا تَبْلَى . ثِيَابُهُمْ، وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُمْ
'জান্নাতের একটি ইট স্বর্ণের, আরেকটি ইট রুপার। তার গাঁথুনি নির্ভেজাল মিশকের সুগন্ধি। সেখানকার নুড়ি হলো মুক্তা এবং নীলকান্তমণি। আর মাটি হলো জাফরান। সেখানে প্রবেশকারী (সীমাহীন) নিয়ামাত ভোগ করবে। তারা দুঃখ পাবে না, মারাও যাবে না। চিরস্থায়ী হবে। তাদের পরনের কাপড় কখনো পুরোনো হবে না, আর না তাদের যৌবন ক্ষয় হবে।'[১১]

নবি ﷺ-এর মাজলিস
নবি ﷺ-এর সাধারণ মাজলিস ছিল আল্লাহর যিকর, তাঁর রহমতের প্রতি আশা জাগ্রতকরণ এবং আযাবের প্রতি ভীতিপ্রদর্শন সংক্রান্ত। সেখানে কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত হতো। হিকমাত, সদুপদেশ এবং দ্বীনের উপকারী আলোচনা চলত। যেমনটা কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা নবিজিকে আদেশ করেছেন, তিনি যেন উপদেশ দেন এবং নাসীহাহ করেন। ঘটনা শোনান। হিকমাত এবং সদুপদেশের মাধ্যমে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করেন। সুসংবাদ দেন এবং সতর্ক করেন।

নবি ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুসংবাদ দেওয়া এবং সতর্ক করাই হলো আশা জাগ্রতকরণ এবং ভীতিপ্রদর্শন। ফলে সেসব মাজলিসে অংশগ্রহণকারীদের মন নরম হতো। তাঁরা দুনিয়ার প্রতি হতেন বিরাগভাজন, আর আখিরাতের প্রতি হতেন আগ্রহী।

মন নরম হওয়ার কারণ
মন নরম হতো আল্লাহর স্মরণের কারণে। আল্লাহর স্মরণে মন ভীত হয়, মন্দ অবস্থা হয় সংশোধিত। সৃষ্টি হয় নম্রতা ও কোমলতা এবং দূর হয়ে যায় রুক্ষতা ও উদাসীনতা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
'যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়ে থাকে।'[১২]

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ عَايَتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
'মুমিন তো তারাই, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কম্পিত হয়। এবং আল্লাহর আয়াত তাদের কাছে পাঠ করা হলে, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে।' [১৩]

الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّبِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
'সুসংবাদ দিন বিনয়ীদের, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে যাদের হদয় ভয়ে কেঁপে ওঠে। যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে, সালাত কায়েম করে। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি, তা থেকে খরচ করে।' [১৪]

أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْ أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
'যারা ঈমান আনে তাদের হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় কি আসেনি- আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে? তারা যেন সেসব লোকের মতো না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল এরপর বহুকাল অতিক্রম হওয়ায় যাদের অন্তর হয়ে গিয়েছিল কঠিন।' [১৫]

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهَا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
'আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী, সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব (আল- কুরআন), যা বারবার আবৃত্তি করা হয়। যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের শরীর এতে শিহরিত হয়। তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়ে যায়।' [১৬]

ইরবায ইবনু সারিয়া বলেছেন, একবার আল্লাহর রাসূল আমাদের অনেক কঠোর নাসীহাহ করলেন। ফলে আমাদের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল এবং অন্তর ভীত হয়ে পড়ল। [১৭]

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, যে মাজলিসে হিকমাতের প্রচার হয় এবং আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করা হয়, সে মাজলিস কতই-না উত্তম। (অর্থাৎ যিকরের মাজলিস)

এক লোক হাসান বসরি -এর কাছে অন্তর কঠোর হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করল। তখন তিনি বললেন, অন্তরকে যিকরের কাছাকাছি নিয়ে যাও। তিনি আরও বলেছেন, যিকরের মাজলিসগুলো ইলমকে সতেজ করে এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে।

বৃষ্টিতে ভূমি যেমন উর্বর হয়, যিকরের মাধ্যমে তেমনি সতর্ক হয় উদাসীন অন্তর।

যিকরের মাজলিসের উপকারিতা
যিকরের মাজলিসের [১৮] কারণে দুনিয়াবিমুখতা সৃষ্টি হয়। কেননা, সেখানে দুনিয়ার সমালোচনা, নিন্দা এবং তার প্রতি অনাসক্তির জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। জান্নাতের শ্রেষ্ঠত্ব, এর প্রতি আশাজাগানিয়া আলোচনা যেমন হয়, তেমনি জাহান্নাম, এর ভয়াবহতা এবং তার প্রতি ভীতিপ্রদর্শনও করা হয়।

যিকরের মাজলিসগুলোতে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়। সাকীনা (প্রশান্তি) সেগুলোকে ছেয়ে ফেলে। ফেরেশতারা সেসব বেষ্টন করে রাখেন। আর ফেরেশতাদের কাছে আল্লাহ সেসব লোকদের কথা আলোচনা করে থাকেন। তাদের সাথে থাকা লোকেরাও বঞ্চিত হয় না। সেখানে অংশগ্রহণকারী পাপীর ওপরও আল্লাহর রহমত নাযিল হয়ে থাকে। কখনো দেখা যায়, তাদের মাঝে থাকা এক ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করেছে। তখন সে ব্যক্তির কারণে মাজলিসের অন্য সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

মাজলিস সমাপ্তির পর
মাজলিস শেষ হলে সেখানে থাকা লোকেরা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক শ্রেণির লোক তো তাদের প্রবৃত্তি নিয়েই ফিরে যায়। মাজলিসে শোনা কথার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাদের হিদায়াতও হয় না, আবার মন্দ কাজ থেকেও তারা পিছিয়ে আসে না। এই প্রকারের লোকেরা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। মাজলিসে আলোচিত কথাগুলোই তাদের বিপক্ষে উপস্থাপন করে তাদের আযাব বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এরা নিজেদের প্রতি অবিচারকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أُوْلَـٰئِكَ ٱلَّذِينَ طَبَعَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَـٰرِهِمْ ۖ وَأُوْلَـٰئِكَ هُمُ ٱلْغَـٰفِلُونَ
'এরাই তারা, যাদের অন্তর, কান এবং চোখের ওপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই গাফিল।' [১৯]

আবার কিছু লোক মাজলিসের কথার দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকে। এরা কয়েক ভাগে বিভক্ত। এক দল আলোচনা শুনে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকে এবং করণীয় জিনিস পালন করে। এই সত্যপন্থিরা ডানদিকে শামিল হবে। আরেক দল এর থেকে আগে বেড়ে নফল আমলে মনোনিবেশ করে। ছোটোখাটো মাকরূহ বিষয়ও এড়িয়ে চলে। পূর্বসুরিদের অনুসরণ করে চলতে আগ্রহী হয়। এরা হবে নৈকট্যপ্রাপ্ত অগ্রবর্তী।

মাজলিসের আলোচনা স্মরণ রাখা
আলোচনা স্মরণ রাখা এবং ভুলে যাওয়া—এই হিসেবে মানুষ তিন ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের মানুষ দুনিয়ার বৈধ কাজে লিপ্ত হয়ে আলোচনা ভুলে যায়। এমনটা সাহাবিদেরও হতো। এজন্য তাঁরা ভীত হয়ে পড়তেন। এটা আবার নিফাক নয়তো! অবশেষে নবি ﷺ-কে বিষয়টি অবগত করলে তিনি আশ্বস্ত করে দেন যে, এটা নিফাক নয়।

হানযালা উসাইদি বলেন, আমি রাসূল ﷺ-কে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গিয়েছে। রাসূল বললেন, 'সে কী কথা!' আমি বললাম, আমরা আপনার কাছে থাকলে, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সে সময় আমরা যেন সরাসরি তা দেখতে পাই। কিন্তু এরপর যখন স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এবং ধনসম্পদের মাঝে যাই, তখন অনেক কিছু ভুলে যাই। রাসূল এই কথা শুনে বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي، وَفِي الذِّكْرِ، لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ، وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً
'যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি! আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি সর্বদা এ অবস্থায় অবিচল থাকতে এবং আল্লাহর যিকরে মশগুল থাকতে, তবে তো ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় এবং রাস্তাঘাটে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হানযালা! ধীরেসুস্থে এটি হবে।' কথাটি রাসূল তিনবার বললেন। [২০]

এ থেকে বোঝা যায়, সর্বদা আখিরাতের কথা স্মরণ রাখাটা কষ্টকর। অধিকাংশ মানুষই তা পারে না। কিছু সময় স্মরণ রাখলেও দুনিয়ার বৈধ কাজে ব্যস্ত হয়ে তা ভুলে যায়। কিন্তু মুমিনের কাছে এটাও কষ্টকর ঠেকে। এজন্য সে নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে।

আরেক ধরনের মানুষ যিকরের মাজলিস থেকে উঠে যাওয়ার পরও সেখানকার আলোচনা স্মরণ রাখে। এ ধরনের লোকেরা দুই প্রকার। প্রথম ধরনের লোকেরা দুনিয়াবি বৈধ কারবারে ব্যস্ত হতে পারেন না। ফলে মানুষ থেকে তারা হয়ে পড়েন বিচ্ছিন্ন। না পারেন তাদের সাথে মিশতে, আর না পারেন তাদের হক আদায় করতে। এজন্য সালাফের অনেকেই হাসতেন না।

আরেক প্রকারের লোকেরা আল্লাহর যিকর, তাঁর বড়ত্ব, তাঁর সাওয়াব এবং শাস্তির কথা স্মরণে রাখেন। তা সত্ত্বেও সশরীরে হালাল উপার্জন, পরিবার পরিচালনা ও মানুষের সাথে মেলামেশার মতো দুনিয়াবি কাজে অংশ নেন। ইলম শিক্ষাদান, জিহাদ করা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের মতো ইবাদাতও তারা মিলেমিশে পালন করে থাকেন। আলোচ্য দুই প্রকারের মাঝে এরাই সর্বোত্তম।

সহীহ মুসলিমে জাবির -এর বর্ণনায় এসেছে, খুতবা দেওয়ার সময় নবি ﷺ-এর চোখ দুটো লাল হয়ে যেত, স্বর উঁচু হতো এবং কঠোর রাগ প্রকাশ পেত।[২১]
আবার আয়িশা -এর কাছে নবি ﷺ-এর একান্ত জীবন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন, 'তিনি ছিলেন সর্বাধিক নম্র। হাসিমুখে থাকতেন এবং মজাও করতেন। [২২]

উপদেশের হাকীকত
উপদেশ হলো চাবুকের মতো, যার মাধ্যমে অন্তরকে আঘাত করা হয়ে থাকে। চাবুক দ্বারা শরীরে আঘাত করলে তাৎক্ষণিকভাবে খুব ব্যথা অনুভূত হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা হালকা হয়ে আসে। আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী যন্ত্রণা বোধ হতে থাকে। আঘাত যত জোরালো হয়, যন্ত্রণাও তত বেশি অনুভূত হয়।

অনেক সালাফের অবস্থা এমন ছিল যে, যিকরের মাজলিস থেকে ওঠার পর তাদের মাঝে স্থিরতা এবং গাম্ভীর্য ফুটে উঠত। কেউ কেউ তো সেখান থেকে ওঠার পর খাবার খেতে পারতেন না। আবার কেউ কেউ একটা সময় পর্যন্ত শোনা বিষয়ের ওপর আমল জারি রাখতেন। আসলে শ্রেষ্ঠতম সাদাকাহ হলো অজ্ঞ লোককে শিক্ষা দেওয়া, অথবা উদাসীনকে সতর্ক করা।

একবার আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়িদ লোকদেরকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক লোক চিৎকার করে বলে উঠল, 'থামুন! আপনি তো আমার হালচাল প্রকাশ করে দিয়েছেন।' আবদুল ওয়াহিদ কথা থামিয়ে দিলে, লোকটি সেখানেই মৃত্যুবরণ করল।

উপদেশ কখন ফলপ্রসূ হয়
সালাফরা বলতেন, 'উপদেশ ফলপ্রসূ হয় যদি সেটা অন্তর থেকে আসে। তখন সেটা শ্রোতার অন্তরে পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে বক্তার মুখ থেকে বের হওয়া কথা শ্রোতার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়।'

জনৈক সালাফ বলেছেন, 'আলিমের উপদেশ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে শ্রোতার অন্তর থেকে তা এমনভাবে সরে যায়—মৃসণ পাথরের ওপর থেকে যেভাবে পানি গড়িয়ে পড়ে।'

আসলে যে আলিম তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না সে হলো এমন প্রদীপ, যে মানুষকে আলো দেয় ঠিকই কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে শেষ করে (ঠিক যেন মোমের মতো)।
উপদেশ হচ্ছে গুনাহের প্রতিষেধক। অভিজ্ঞ আর সুস্থ চিকিৎসকই কেবল প্রতিষেধক সেবন করাতে পারেন। পক্ষান্তরে গাফিল ব্যক্তি অন্যকে দেওয়ার পরিবর্তে নিজেই সেবন করার অধিক হক রাখে।

পূর্ববর্তী কোনো এক গ্রন্থে আছে, 'তুমি মানুষকে নাসীহাহ করার আগে নিজেকে উপদেশ দাও। যদি সে উপদেশ গ্রহণ করে থাকে, তবে তো ভালো। না হয় আমাকে নাসীহাহ করা থেকে বিরত থাকো।'

তবুও মানুষকে সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ এবং নাসীহাহ করতে হবে। যদি এমন হয় যে নিষ্পাপ ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ উপদেশ দিতে পারবে না, তবে তো নবিজির পরে এ কাজের যোগ্য কেউ থাকবে না। কারণ তাঁর পরে কেউ নিষ্পাপ নয়।

হাসান বসরি -কে বলা হলো, অমুক ব্যক্তি কাউকে উপদেশ দেয় না। সে বলে, নিজে যা করি না, এমন কথা অন্যকে বলতে সংকোচ বোধ করি। তখন হাসান বললেন, 'মানুষ যা বলে, তার সবই কি করতে পারে?- এই চিন্তার মাধ্যমে শয়তান জয়ী হয়ে গেছে। কারণ লোকটি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা থেকে বিরত ছিল।'

সাঈদ ইবনু জুবাইর বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি যদি ভাবে সে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হয়ে তবেই সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে, তাহলে সে কখনোই তা করতে পারবে না।' মালিক বলেছেন, 'সাঈদ ঠিক কথা বলেছেন। কোনো ব্যক্তি কি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হতে পেরেছে?'

হে আল্লাহ! আপনি মহামহিম এবং শ্রেষ্ঠতম দয়াবান! আপনার কাছে প্রত্যাশা করে আপনার জন্যেই আপনার বান্দাদেরকে আপনার দরবারে ডেকে এনেছে, এমন বান্দাকে আপনি খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনার সাথে বান্দাদের জুড়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করায়, আমি আপনার অনুগ্রহ প্রত্যাশা করি। যদিও নিজেকে যোগ্য বলে দাবি করতে পারি না। কিন্তু আপনার ব্যাপক উদারতা এবং বদান্যতার কাছে আমরা আশাবাদী। কারণ আপনি উদারতা এবং বদান্যতার অধিকারী। উদার ব্যক্তিও তো তার দস্তরখানে বসা অনাহৃত ব্যক্তিকে উঠিয়ে দিতে সঙ্কোচ বোধ করে।

বান্দা গুনাহ না করলে, নতুন এক দল সৃষ্টি
বান্দা গুনাহ না করলে আল্লাহ নতুন এক দল সৃষ্টি করতেন—যারা গুনাহ করত, আর তিনি তাদের তিনি ক্ষমা করে দিতেন। বান্দার অন্তরে আল্লাহ যে উদাসীনতা দিয়ে রেখেছেন, তার রহস্য উদ্‌ঘাটনই এর মূল উদ্দেশ্য। এ উদাসীনতার কারণেই বান্দা গুনাহ করে ফেলে। তা না হলে উপদেশ শোনার সময়কালীন অবস্থা সবসময় বিরাজমান থাকত।

মাঝেমধ্যে উদাসীন হয়ে গুনাহ সংঘটিত হয়ে যাওয়ার দুটি উপকারিতা রয়েছে। প্রথমত, বান্দা নিজের গুনাহের স্বীকারোক্তি দেয়। নিজের অক্ষমতার কারণে মনিবের সামনে লজ্জায় তার মাথা হেঁট হয়ে আসে। এ অবস্থা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি ইবাদাত করার থেকেও পছন্দনীয়। কারণ অধিক ইবাদাতে আত্মমুগ্ধতা সৃষ্টি হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়ত, গুনাহের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা লাভ করে। তাওবা কবুল এবং মাফ করতে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন। এ সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যবাচক নামও তাঁর রয়েছে। বান্দাকে যদি গুনাহ থেকে সর্বদা বিরতই রাখেন, তবে তাঁর এ বিশেষত্ব কার সামনে প্রকাশ করবেন?

জান্নাতের ভিত্তি, গাঁথুনি, নুড়ি এবং মাটির বর্ণনা
আবূ হুরায়রা -এর প্রশ্নের উত্তরে নবি বলেছেন,
لَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ، وَمِلَاطُهَا الْمِسْكُ الْأَدْفَرُ، وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ» وَاليَاقُوتُ، وَتُرْبَتُهَا الزَّعْفَرَانُ مَنْ دَخَلَهَا يَنْعَمُ وَلَا يَبْأَسُ، وَيَخْلُدُ وَلَا يَمُوتُ، لَا تَبْلَى ثِيَابُهُمْ، وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُمْ
'জান্নাতের একটি ইট স্বর্ণের, আরেকটি ইট রুপার। তার গাঁথুনি হচ্ছে নির্ভেজাল মিশকের সুগন্ধি। সেখানকার নুড়ি হলো মুক্তা এবং নীলকান্তমণি। আর মাটি হলো জাফরান।'

এখানে চারটি বিষয় লক্ষণীয় :
⇨ প্রথমত, জান্নাতের ভিত্তির বর্ণনা। এটা জান্নাতের প্রাসাদের ভিত্তিও হতে পারে, আবার দেয়াল বা সীমানা-প্রাচীরও হতে পারে। দ্বিতীয়টি হওয়াই অধিক সঙ্গত। বিভিন্ন হাদীসে এর পক্ষে দলিল পাওয়া যায়। যেমন :
(ক) আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
جَنَّتَانِ مِنْ فِضَّةٍ آنِيَتُهُمَا، وَمَا فِيهِمَا، وَجَنَّتَانِ مِنْ ذَهَبٍ آنِيَتُهُمَا، وَمَا فِيهِمَا، وَمَا بَيْنَ الْقَوْمِ وَبَيْنَ أَنْ يَنْظُرُوا إِلَى رَبِّهِمْ إِلَّا رِدَاءُ الْكِبْرِيَاءِ عَلَى وَجْهِهِ فِي جَنَّةِ عَدْنٍ
'দুটি জান্নাত এমন হবে, যেখানকার পানপাত্রসহ ভেতরে থাকা সবকিছুই হবে রুপার। আর দুটি জান্নাত এমন হবে, যেখানকার পানপাত্রসহ অভ্যন্তরীণ সবকিছুই সোনার। জান্নাতু আদন-এ তাদের ও তাদের প্রতিপালকের দর্শনের মাঝে তাঁর চেহারার গর্বের চাদর ছাড়া কোনো কিছুর অন্তরাল থাকবে না।' [২৩]
(খ) আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
قَالَ اللَّهُ : أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنُ رَأَتْ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلَا خَطَرَ . عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ
'আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার নেক বান্দাদের জন্য আমি এমন সব সামগ্রী তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো অন্তরের কল্পনাতেও আসেনি।' [২৪]
⇨ দ্বিতীয়ত, জান্নাতের গাঁথুনির বর্ণনা। যা হবে খাঁটি এবং নির্ভেজাল মিশকের সুগন্ধি। আনাস থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
ثُمَّ أُدْخِلْتُ الْجَنَّةَ، فَإِذَا فِيهَا جَنَابِذُ اللُّؤْلُؤً، وَإِذَا تُرَابُهَا الْمِسْكُ»
'তারপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলে সেখানে আমি মুক্তার গম্বুজ দেখতে পেলাম। তার মাটি ছিল মিশকের সুগন্ধি।' [২৫]
এখানে মাটি বলতে পানি-মিশ্রিত গাঁথুনি উদ্দেশ্য। যেমন আল-কাউসার সম্পর্কে একটি হাদীস আছে, যা আনাস থেকে বর্ণিত। নবি বলেছেন,
«طِينُهُ مِسْكُ أَذْفَرُ»
'তার মাটি ছিল উৎকৃষ্ট মানের মিশকের সুগন্ধি।'[২৬]
⇨ তৃতীয়ত, জান্নাতের নুড়ির বর্ণনা। যা হবে মুক্তা এবং নীলকান্তমণি। নুড়ি বলতে ছড়িয়ে থাকা পাথরকণা বোঝানো হয়েছে। আল-কাউসারের একটি বর্ণনা মুসনাদু আহমাদে এসেছে। আনাস থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
«وَإِذَا رَضْرَاضُهُ اللُّؤْلُؤُ»
'আমি দেখলাম, তাতে থাকা পাথরকণাগুলো হচ্ছে মুক্তার।'[২৭]
⇨ চতুর্থত, জান্নাতের মাটি হবে জাফরান। এখানে মাটি বলতে পানিবিহীন সমতল জমিন উদ্দেশ্য। আর পানি মেশানো মাটি অর্থাৎ গাঁথুনি সম্পর্কে পূর্বেই বলা হয়েছে। সেটা হবে মিশকের সুগন্ধি। জান্নাতের মাটির যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় তার সমষ্টি থেকে এটা বুঝে আসে যে, জান্নাতের মাটির রং হবে সাদা। উজ্জ্বলতা এবং সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে তা হবে জাফরানের মতো। যার ঘ্রাণ হবে খাঁটি মিশকের সুগন্ধির ন্যায়। স্বাদের ক্ষেত্রে তা হবে একদম টাটকা রুটি সদৃশ। মহান আল্লাহ এই নিয়ামাত থেকে যেন আমাদের বঞ্চিত না করেন।

জান্নাতি নিয়ামাতের বর্ণনা
'জান্নাতে প্রবেশকারী নিয়ামাত ভোগ করবে। সে কোনো কষ্ট পাবে না। চিরস্থায়ী হবে, মৃত্যুবরণ করবে না। পরনের কাপড় কখনো পুরানো হবে না, যৌবন কখনো ক্ষয় হবে না।' এ কথা বলে নবি এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, জান্নাত এবং সেখানকার সব নিয়ামাত চিরস্থায়ী। সেখানকার অধিবাসীদের বৈশিষ্ট্য এমন যে, যুবকদের কোনো রকম পরিবর্তন হবে না। তাদের পরনের পোশাক কখনো পুরাতন ও জীর্ণ হবে না। এমন নিয়ামাতের কথা কুরআনের কয়েক স্থানে বলা হয়েছে। যেমন:
وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ মُّقِيمٌ
'এবং জান্নাত, যেখানে তাদের জন্য স্থায়ী নিয়ামাত আছে।'[২৮]
أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا
'তার (জান্নাতের) ফলসমূহ চিরস্থায়ী এবং তার ছায়াও।'[২৯]
خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا
'তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।' [৩০]

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَنْعَمُ لَا يَبْأَسُ ، لَا تَبْلَى ثِيَابُهُ وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُ
'যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে আরাম-আয়েশে চিন্তামুক্ত থাকবে। না তার কাপড় কখনো পুরাতন হবে এবং না তার যৌবন কখনো নিঃশেষ হবে।' [৩১]
নবি আরও বলেছেন,
يُنَادِي مُنَادٍ : إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا ، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَنْعَمُوا فَلَا تَبْأَسُوا أَبَدًا، { فَذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ: {وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
'এক আহ্বানকারী জান্নাতি লোকদের ডেকে বলবে, এখানে তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনোই অসুস্থ হবে না। তোমরা যুবক থাকবে, কোনোদিনও বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সুখে থাকবে, কখনোই দুর্দশাগ্রস্ত হবে না। এটাই হলো আল্লাহ তাআলার বাণী: এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে। [৩২]

দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী
জান্নাতে প্রবেশকারীদের কথা বলে নবি প্রকারান্তরে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার নিন্দা করেছেন। কারণ দুনিয়ার অধিবাসীরা যত সুখেই থাকুক না কেন, চিন্তামুক্ত থাকে না। এখানকার বাসিন্দাদের মরতেই হবে। চিরস্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই। তাদের যৌবন ফুরিয়ে যায়। কাপড় তো বটেই, দেহও জীর্ণ হয়ে পড়ে।

কুরআন কারীমেও আখিরাতের প্রশংসা এবং তার পূর্ণতা ও স্থায়ীত্বের বর্ণনা দিয়ে প্রকারান্তরে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَثَابِ قُلْ أَو نَبِّئُكُم بِخَيْرٍ মِّن ذَلِكُمْ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
‘নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য, চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের কাছে সুশোভিত করে তোলা হয়েছে। এসব হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর কাছেই আছে উত্তম আশ্রয়। আপনি বলুন, আমি কি তোমাদের এসবের চেয়েও উত্তম বিষয়ের সন্ধান বলবো? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহর কাছে তাদের জন্যে রয়েছে এমন সব জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। তাদের জন্য সেখানে পবিত্র সঙ্গীগণ রয়েছে এবং রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ বান্দাদের সবকিছু দেখেন। [৩৩]

إِنَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ وَالْأَنْعَامُ حَتَّى إِذَا أَخَذَتِ الْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَازَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَن لَّمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِى مَن كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ মُّسْتَقِيمٍ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرُ وَلَا ذِلَّةٌ أُولَبِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
‘বস্তুত পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত এরকম, যেমন আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি যা দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, যা মানুষ ও জীবজন্তু খেয়ে থাকে। তারপর জমিন যখন শোভা ধারণ করে এবং তার অধিকারীরা মনে করে এসব তাদের আয়ত্তাধীন, তখন দিনে অথবা রাতে আমার নির্দেশ এসে পড়ে। আর আমি তা এমনভাবে নির্মূল করে দিই, যেন গতকালও তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এভাবে আমার নিদর্শনগুলো আমি বিশদভাবে বর্ণনা করি চিন্তাশীল লোকদের জন্য। আর আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরলপথ প্রদর্শন করেন। যারা সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তারও চেয়ে বেশি। আর তাদের মুখমণ্ডলকে মলিনতা ও অপমান আচ্ছন্ন করবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা অনন্তকাল বসবাস করতে থাকবে।'[৩৪]

وَاضْرِبْ لَهُم مَّثَلَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَاءٍ أَنزَلْنَهُ مِنَ السَّমَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذْرُوهُ الرِّيَاحُ وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ মُّقْتَدِرًا الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرُ أَمَلًا
'তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা পানির মতো, যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি। তা দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগত হয়, তারপর তা শুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন। ধন-সম্পদ এবং সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা; এবং স্থায়ী সৎকর্ম আপনার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত হিসেবেও উত্তম।'[৩৫]

وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
'এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়। পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।'[৩৬]

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَتْهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَمًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ মِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ মِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ
'জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহমিকা, ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছুই না। তার উপমা বৃষ্টি, যা দ্বারা উৎপন্ন সবুজ ফসল কৃষকদের চমকিত করে। এরপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা আর সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়। তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং সেই জান্নাত লাভের তরে, যার প্রশস্ততা আসমান এবং জমিনের মতো। তা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস-স্থাপনকারীদের জন্য।'[৩৭]

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকো! অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী।'[৩৮]

أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا মَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ
'তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গিয়েছ? আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অতি অল্প।'[৩৯]

ফিরআউন-পরিবারের একজন মুমিন ব্যক্তি স্বজাতিকে উপদেশ দিয়েছিল। তার ভাষ্য আল্লাহ তাআলা তুলে ধরেছেন,
يَقَوْمِ إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْইَا মَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
‘হে আমার সম্প্রদায়! এই পার্থিব জীবন তো ক্ষণস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং আখিরাত হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।’[৪০]

ক্ষণস্থায়িত্ব এবং অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে দুনিয়াকে যত বেশি দোষারোপ করা হবে, দুনিয়ার সমাপ্তি এবং পতনের সেটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারণ দুনিয়ার সুস্থতা অসুস্থতায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। অস্তিত্ব পাল্টায় অনস্তিত্বে। যৌবন বদলে যায় বার্ধক্যে। সুখ পরিবর্তিত হয় অসুখে। জীবন বদলায় মৃত্যুতে। আবাদ পাল্টায় অনাবাদে। আর প্রিয়জনের মিলন পরিণত হয় বিচ্ছেদে। পরিশেষে মাটির ওপরে থাকা সবকিছুই মাটি হয়ে যায়।

হাসান বলেছেন, ‘মৃত্যু দুনিয়াকে লাঞ্ছিত করেছে। ফলে জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য দুনিয়াতে আনন্দদায়ক বলতে কিছু নেই।’
মুতাররিফ বলেছেন, ‘এই মৃত্যু তো সুখীদের সুখ খতম করে দিয়েছে। সুতরাং এমন কোনো সুখ খুঁজে দেখো, যেখানে মৃত্যু নেই।’
জনৈক সালাফ একবার বললেন, ‘মৃত্যুর স্মরণ—জীবন এবং আনন্দের সমস্ত স্বাদ কেড়ে নিয়েছে।’ তারপর তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘ইশ! এমন জগৎ কতই-না চমৎকার হবে, যেখানে থাকবে না কোনো মৃত্যু!’
ইউনুস ইবনু উবাইদ বলেছেন, ‘মৃত্যুর স্মরণের কারণে, না পরিবার-পরিজনের মধ্যে শান্তি আছে, আর না ধন-সম্পদে আছে।’
ইয়াযীদ রাক্কাশি বলেছেন, ‘মৃত্যু থাকবে না বলেই জান্নাতিরা সুখে থাকবে। আর রোগ-বালাই থাকবে না বলে, তারা আল্লাহর প্রতিবেশী হয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করবে।’

সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা! এমন এক জগতের দিকে চলুন, যেখানকার অধিবাসীরা না মারা যাবে, আর না তাদের বাড়িঘর কখনো বিরান হবে। সেখানে যুবকদের কখনো বার্ধক্য স্পর্শ করবে না। সব সৌন্দর্য এবং নিয়ামাত হবে চিরস্থায়ী। সেখানে বয়ে যাওয়া হিমেল হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যাবে। পানি হবে অমৃতের মতো। সেখানে থাকা লোকেরা পরম দয়াময়ের অনুগ্রহে ঘুরে বেড়াবে এবং সর্বক্ষণ উপভোগ করবে তাঁর দিদার।

دَعْوَلَهُمْ فِيهَا سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ وَءَاخِرُ دَعْوَنَهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'সেখানে তাদের প্রার্থনা হবে 'ইয়া আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র।' আর অভিভাবদন হবে সালাম আর তাদের প্রার্থনার সমাপ্তি হবে (এই বলে,) সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।'[৪১]

টিকাঃ
[১১] তিরমিযি, ২৫২৬; আহমাদ, ৮০৪৩; আবু দাউদ, ২৭০৬; মান: সহীহ। “আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সৃষ্টির উৎস কি? তিনি বললেন, 'পানি।” এ অংশটুকু কেবল ইমাম তিরমিযি এর বর্ণনাতে এসেছে।
[১২] সূরা রা'দ, ১৩: ২৮
[১৩] সূরা আনফাল, ৮ : ২
[১৪] সূরা হাজ্জ, ২২: ৩৫
[১৫] সূরা হাদীদ, ৫৭ : ১৬
[১৬] সূরা যুমার, ৩৯: ২৩
[১৭] আহমাদ, ১৭১৪৫; সহীহ
[১৮] যিকরের মাজলিস বলে ওয়াজ, নাসীহাহ এবং আল্লাহর কথা স্মরণ করানোর মাজলিস, আলিমদের মাজলিস এবং তিলাওয়াতের মাজলিস উদ্দেশ্য।
[১৯] সূরা নাহল, ১৬: ১০৮
[২০] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭৫০
[২১] মুসলিম, ৮৬৭
[২২] ইসহাক ইবনু রাহুয়া, আলমুসনাদ, হাদীস নং: ১০০১
[২৩] বুখারি, ৪৮৭৮; মুসলিম, ১৮০।
[২৪] মুসলিম, ২৮২৪; বুখারি, ৪৭৭৯।
[২৫] বুখারি, ৩৩৪২; মুসলিম, ১৬৩।
[২৬] বুখারি, ৬৫৮১।
[২৭] আহমাদ, ১৩৪২৫। হাদীসটি ইমাম মুসলিমের শর্তানুসারে সহীহ।
[২৮] সূরা তাওবা, ৯: ২১
[২৯] সূরা রা'দ, ১৩: ৩৫
[৩০] এই আয়াতাংশটি জান্নাতিদের সম্পর্কে কুরআন কারীমে ৮ বার এসেছে। যথা- সূরা নিসা, ৪: ৫৭ ও ১২২; সূরা মায়িদা, ৫: ১১৯; সূরা তাওবা, ৯: ২২ ও ১০০; সূরা তাগাবুন, ৬৪: ৯; সূরা ত্বলাক, ৬৫: ১১ এবং সূরা বাইয়্যিনাহ, ৯৮ : ৮
[৩১] মুসলিম, ২৮৩৬।
[৩২] মুসলিম, ২৮৩৭; আয়াতটি সূরা আ'রাফ, ৭:৪৩
[৩৩] সূরা আলি ইমরান, ৩: ১৪-১৫
[৩৪] সূরা ইউনুস, ১০ : ২৪-২৬
[৩৫] সূরা কাহফ, ১৮: ৪৫-৪৬
[৩৬] সূরা আনকাবূত, ২৯: ৬৪
[৩৭] সূরা হাদীদ, ৫৭ : ২০-২১
[৩৮] সূরা আ'লা, ৮৭: ১৬-১৭
[৩৯] সূরা তাওবা, ৯ : ৩৮
[৪০] সূরা গাফির, ৪০: ৩৯
[৪১] সূরা ইউনুস, ১০: ১০

📘 জীবনকে কাজে লাগান > 📄 সফর মাসে পালনীয়

📄 সফর মাসে পালনীয়


আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
لَا عَدْوَى وَلَا صَفَرَ وَلَا هَامَةَ
'(আল্লাহর চাওয়া ছাড়া) কোনো সংক্রমণ নেই, সফরে কোনো কুলক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যেও অশুভ কিছু নেই।'

তখন এক বেদুইন বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা হয় কেন? চারণভূমিতে থাকাকালীন সেগুলো মুক্ত হরিণপালের মতো থাকে। এরমধ্যে চর্মরোগাক্রান্ত উট এসে সেগুলোর মধ্যে মিশে সেগুলোকেও আক্রান্ত করে ফেলে। নবি বললেন,
فَمَنْ أَعْدَى الأَوَّلَ؟»
'তাহলে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছে?'[১০৫]

সংক্রমণ অর্থ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তির কাছে রোগ ছড়িয়ে পড়া। যার ফলে সুস্থ ব্যক্তিটিও অসুস্থ হয়ে পড়ে। আরবের লোকদের বিশ্বাস ছিল চর্মরোগ-সহ অনেক রোগের ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে। এজন্যই বেদুইন নবি-কে জিজ্ঞেস করেছিলে, সুস্থ উটের পালের মধ্যে চর্মরোগী উট ঢুকলে সুস্থগুলো আক্রান্ত হয়ে পড়ে কেন? নবিজি তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, 'তাহলে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছে?' এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য হলো, প্রথম উটটি তো কোনো সংক্রমণের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়নি। বরং আল্লাহর ফায়সালা এবং নির্ধারণের মাধ্যমেই আক্রান্ত হয়েছে। পরবর্তীগুলোও সেভাবেই আক্রান্ত হয়েছে (অর্থাৎ জীবাণুর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহ চাইলেই কেবল সংক্রমণ ছড়ায়।)

কিছু হাদীস বোঝা অধিকাংশ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য। এজন্যই অনেকে ভেবেছেন, সেগুলোর দ্বারা আলোচ্য হাদীসটি রহিত হয়ে গিয়েছে। যেমন আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীস। নবি বলেছেন,
(لَا يُورِدَنَّ مُمْرِضُ عَلَى مُصِحٌ) 'রোগাক্রান্ত উট কেউ যেন সুস্থ উটের সাথে না রাখে।' [১০৬]

এ হাদীসে রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের সাথে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। অন্য হাদীসে নবি বলেছেন,
فِرَّ مِنَ المَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِ» 'কুষ্ঠরোগী থেকে এমনভাবে পলায়ন করো, যেমন তুমি সিংহ থেকে পালিয়ে থাকো।' [১০৭]

আর মহামারি সম্পর্কে নবি বলেছেন,
إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلَا تَدْخُلُوهَا» 'কোনো এলাকাতে মহামারির প্রাদুর্ভাবের সংবাদ পেলে, তোমরা সেখানে প্রবেশ করো না।' [১০৮]

এখানে রহিত হওয়ার ধারণা অর্থহীন। কারণ 'কোনো সংক্রমণ নেই' একটি সংবাদ মাত্র, যা রহিত করা সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে এটা সংক্রমণের (নিজস্ব ক্ষমতার ওপর) বিশ্বাস করার নিষেধাজ্ঞা, ওপরের হাদীসের খণ্ডন নয়।

বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, ওই হাদীস রহিত নয়। এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মত। তবে 'কোনো সংক্রমণ নেই'-এ কথার মর্ম নিয়ে তাদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। এ ব্যাপারে খোলাসা হলো, এখানে জাহিলি যুগের বিশ্বাস খণ্ডন করা হয়েছে। আল্লাহর ফয়সালার ওপর বিশ্বাস না রেখে তারা ধারণা করত, রোগ নিজে থেকেই সংক্রমিত হয়ে থাকে। এই মতের পক্ষে দলিল হলো নবি-এর পরবর্তী বক্তব্য- 'তাহলে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছে?' এ কথা বলে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, প্রথমটি যেমন আল্লাহর হুকুমে রোগাক্রান্ত হয়েছে, তেমনি পরবর্তীগুলোও আল্লাহর ফয়সালাতেই আক্রান্ত হয়েছে। (অর্থাৎ জীবাণু আল্লাহর হুকুম ছাড়া সংক্রমিত হয় না।)

তবে, রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সাথে রাখতে বারণ করা হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এমন এলাকায় যেতে নিষেধ করা হয়েছে, যেখানে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এর কারণ হলো, সেখানে আল্লাহর সৃষ্টি করা ধ্বংস এবং কষ্টের উপকরণ (অর্থাৎ জীবাণু) রয়েছে। আর বান্দাকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য এমন সব উপকরণ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ব্যাপারটা আসলে আগুনে ঝাঁপ দিতে বারণ করা, হেলে-পড়া দেয়ালের কাছে অবস্থান না করতে বলার মতো। কারণ, এসবের মাধ্যমে ক্ষতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অসুস্থের সংস্পর্শে আসা, মহামারিপূর্ণ এলাকাতে প্রবেশ করা, এগুলো হচ্ছে অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণ। আর আল্লাহ তাআলা কারণ সৃষ্টি ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। তিনি ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা এবং নির্ধারক নেই।

কারণ বা মাধ্যমের প্রকারভেদ
কারণ বা মাধ্যম দুই ধরনের। প্রথমত, কল্যাণের মাধ্যম। শারীআ তা নিয়ে খুশি হওয়া এবং সেটাকে শুভ মনে করার অনুমোদন দেয়। তবে এর ওপর ভরসা করা যাবে না। বরং ভরসা করতে হবে সেই সত্তার ওপর, যিনি একে সৃষ্টি করেছেন ও তাকে মাধ্যম বানিয়েছেন। এটাই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর ওপর ভরসা করার বাস্তবতা। ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করার ব্যাপারে আল্লাহ যেমনটা বলেন,
وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ *
'আল্লাহ এটা করেন শুধু সুসংবাদ দানের জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে— যাতে তোমাদের মন প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [১০৯]

দ্বিতীয়ত, অকল্যাণের মাধ্যম। এটাকে শুধু গুনাহের সাথেই সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ, বান্দার গুনাহের কারণেই বিপদ আসে। যেমনটা আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ
'অকল্যাণ যা কিছু হয়, তা তোমার নিজের কারণে।' [১১০]
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
'তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' [১১১]

বোঝা গেল, সংক্রমণ বা এই জাতীয় কিছুর মাধ্যম হিসেবে গুনাহ ছাড়া অন্যকিছুকে যুক্ত করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে নির্দেশ হলো, শারীআ কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ প্রকাশ পেলে, তা পরিহার করা। তা থেকে বেঁচে থাকা। যেমন: কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে না যাওয়া, মহামারি ছড়িয়ে পড়া এলাকাতে না ঢোকা। পক্ষান্তরে (লক্ষণ) প্রকাশ না পেলে, সেটা পরিহার করার দরকার নেই। কারণ, তখন সেটা হবে অশুভ লক্ষণের অন্তর্ভুক্ত। এটা নিষিদ্ধ।

অশুভ লক্ষণ গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা
অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা মুশরিক এবং কাফিরদের কাজ। ফিরআউনের গ্যাং, সালিহ-এর কওম এবং জনপদবাসীর কাছে রাসূল এলে, তারা অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করেছিল। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এটা উল্লেখ করেছেন। এ ব্যপারে নবি স্পষ্টভাষায় বলেছেন, (লা তিরাতা) 'অশুভ লক্ষণ বলতে কিছু নেই।'[১১২]

একবার নবি ﷺ-এর কাছে শুভ-অশুভ লক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলে তিনি বললেন, أَحْسَنُهَا الْفَأْلُ وَلَا تَرُدُّ مُسْلِمًا ، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ فَلْيَقُلِ اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي» بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
'শুভ-অশুভ নির্ণয়ের সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে ফাল। কিন্তু এটা কোনো মুসলিমকে (তার কাজ থেকে) বিরত রাখতে পারে না। তবে হ্যাঁ, তোমাদের কেউ অসুবিধাজনক কিছু দেখতে পেলে বলবে-ইয়া আল্লাহ! কল্যাণ আপনিই দেন এবং অকল্যাণ আপনিই প্রতিহত করেন। আপনি ছাড়া আমাদের কোনো শক্তি-সামর্থ্য নেই।'[১১৩]

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'অশুভ লক্ষণের মাধ্যমে কেবল সে ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যে তা গ্রহণ করে।'

অর্থাৎ যে ব্যক্তি অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করে, বা শোনা কথার ওপর ভরসা করে নিজের প্রয়োজন সমাধা থেকে বিরত থাকে, সে অবশ্যই অপছন্দনীয় বিষয়ে আক্রান্ত হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে, মনে আশা ও ভয় রাখে আল্লাহর প্রতি, এবং মাধ্যমের প্রতি ভীত না হয়ে ওপরে বর্ণিত দুআটি বলে, সে কোনো রকম ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।

কাক ডাকতে শুনলে ইবনু আব্বাস বলতেন, 'ইয়া আল্লাহ! আপনি যা অশুভ বানিয়েছেন, সেটাই সত্যিকারের অশুভ। আর আপনি যাকে কল্যাণকর বানিয়েছেন, সেটাই প্রকৃত কল্যাণ।'

তদ্রূপ নবি-ও আদেশ করেছেন, সূর্যগ্রহণের মতো ভীতিপ্রদ আসমানি আযাব কেটে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যেন সালাত, দুআ, সাদাকাহ এবং দাসমুক্তির মতো নেককাজ জারি রাখা হয়। এথেকে প্রমাণিত হয়, অপছন্দনীয় মাধ্যম সামনে এলে শারীআর আদেশ হলো, ভীতিপ্রদ আযাব থেকে বাঁচার সম্ভাব্য পথ অবলম্বন করা। যেমন: নেক আমল করা, দুআ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ও আস্থা রাখা। কারণ, এসব (অপছন্দনীয়) মাধ্যম তো কাজের ফলাফল মাত্র, সংঘটক নয়। নেক আমল, তাকওয়া, দুআ, তাওয়াক্কুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বারা এগুলো প্রতিহত করা সম্ভব।

আযাব এবং রহমতের মাধ্যম সংঘটনের সময় আমল
মুসলমানদের বিশ্বাস হলো, একমাত্র আল্লাহই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তবে তিনি আযাব এবং রহমতের জন্য পৃথক পৃথক মাধ্যম বাস্তবায়ন করে থাকেন। আযাবের মাধ্যম দিয়ে বান্দাদের ভীতি প্রদর্শন করেন। এর উদ্দেশ্য হলো, বান্দাকে তাঁর কাছে তাওবা এবং কাকুতি মিনতি করানো। যেমন: সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ। এ দুটি মূলত আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন। এর দ্বারা তিনি বান্দাদের ভয় দেখিয়ে পরীক্ষা করেন যে, কার নসীবে তাওবা জুটে। সুতরাং বোঝা গেল, এই ধরনের গ্রহণ হলো আযাব পতনের সম্ভাব্য একটি মাধ্যম।

আয়িশা-কে চাঁদের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাওয়ার আদেশ দিয়ে আল্লাহর নবি বলেছিলেন,
«فَإِذَا هَذَا هُوَ الْغَاسِقُ إِذَا وَقَبَ»
'কারণ, এটা (কুরআনে বর্ণিত) সেই অস্তগামী, যখন তা অন্ধকার হয়ে যায়।' [১১৪]

ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলে তাতে থাকা কল্যাণ ও যে কল্যাণ দিয়ে তাকে প্রেরণ হয়েছে, তা প্রার্থনা করতে হয়। আর তাতে থাকা অকল্যাণ ও যে অকল্যাণ দিয়ে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে, তা থেকে পানাহ চাইতে হয়।[১১৫] ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকলে বা মেঘ দেখলে নবি-এর চেহারা পাল্টে যেত। পায়চারী করতে থাকতেন তিনি। অবশেষে বৃষ্টি নামলে তিনি খুশি হয়ে যেতেন। বলতেন,
{ قَدْ عُذِّبَ قَوْمٌ بِالرِّيحِ، وَقَدْ رَأَى قَوْمٌ الْعَذَابَ، فَقَالُوا: هَذَا عَارِضٌ مُّمْطِرُنَا}
'কোনো কোনো জাতিকে ঝড়ো হাওয়া দিয়ে আযাব দেওয়া হয়েছে। এক সম্প্রদায় আযাব দেখতে পেয়ে বলেছিল, এই মেঘ আমাদের বৃষ্টি বর্ষণ করবে।' [১১৬]

সিক্ত মেঘমালা, উত্তম বাতাস এবং প্রয়োজনমতো বৃষ্টির মতো রহমতের মাধ্যম দিয়ে বান্দাকে আশান্বিত করে তোলা হয়। এজন্যই বৃষ্টি বর্ষণের সময় দুআ করতে হয়, 'ইয়া আল্লাহ! রহমতের বৃষ্টি দিন; আযাবের বৃষ্টি দেবেন না।'

পক্ষান্তরে ক্ষতির মাধ্যম সংঘটিত হওয়ার পর, এথেকে বাঁচার জন্য নিষিদ্ধ উপকরণের দ্বারস্থ হওয়ার মাধ্যমে কোনো উপকারই হয় না। অশুভ লক্ষণ থেকে বাঁচতে মানুষ যা প্রত্যাখ্যান করে, অধিকাংশ সময় সেটাই তাকে পেয়ে বসে। যেমনটা পূর্বে ইবনু মাসউদ-এর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহিলি যুগের বিশ্বাস খণ্ডন
'পেঁচার মধ্যেও কোনো ধরনের অশুভ কিছু নেই।' এ কথাটি জাহিলি যুগের একটি বিশ্বাসের খণ্ডন। সে যুগে লোকদের বিশ্বাস ছিল, কোনো লোক মারা গেলে তার আত্মা বা হাড় পেঁচায় পরিণত হয়। এটা পুনর্জন্মে বিশ্বাসীদের মতোই একটি বিশ্বাস। যাদের ধারণা, মৃতদের আত্মার কোনো রকম পুনরুত্থান ঘটবে না। বরং তা কোনো পশুর দেহে স্থানান্তরিত হবে। এসব অলীক বিশ্বাসের দাফন এবং অস্বীকৃতি জ্ঞাপনেরো জন্যই ইসলামের আগমন ঘটেছে। তবে ইসলাম বলে, 'শহীদের রুহগুলো সবুজ পাখির পেটে রক্ষিত থাকে। তারা জান্নাতের ফলমূল খায় এবং জান্নাতে বিচরণ করে। অবশেষে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ সেই রুহগুলোকে তাদের দেহে ফিরিয়ে দেবেন।' [১১৭]

হাদীসে উল্লিখিত 'সফরে কোনো কুলক্ষণ নেই'-এর ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ একাধিক মত পোষণ করেছেন। পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, 'সফর' হলো পেটের পীড়া। বড় বড় কৃমিকে বলা হয় 'সফর'। জাহিলি লোকদের বিশ্বাস ছিল, এটা একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমিত হয়। তাই নবি এ বিশ্বাসের খণ্ডন করেছেন।

আরেক দলের মতে, 'সফর' দ্বারা 'সফর মাস' উদ্দেশ্য। এ ব্যাখ্যা হিসেবেও মুহাদ্দিসগণ একাধিক মত দিয়েছেন। কারও মতে, এখানে জাহিলি যুগের মাস পিছিয়ে দেওয়া কার্যক্রমের খণ্ডন করা হয়েছে। সে-সময় কাফিররা মুহাররম মাসের স্থলে সফর মাসকে সম্মানিত বানিয়ে নিয়েছিল। ইমাম মালিক এই মতের প্রবক্তা।

কেউ কেউ বলেছেন, জাহিলি যুগের লোকেরা সফর মাসকে অশুভ মনে করত। তারা বলত, সফর একটি অশুভ মাস। তাই নবি তাদের এ ধারণা খণ্ডন করেছেন। এ মতটি মুহাম্মাদ ইবনু রাশিদ মাকহুলি থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।

দ্বিতীয় মতটিই সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক মূর্খই সফর মাসকে অশুভ মনে করে। এ মাসে সফর করতে নিষেধ করে থাকে। সফর মাসকে অশুভ মনে করা নিষিদ্ধ লক্ষণের পর্যায়ভুক্ত। যেমন অনেকে বুধবারের মতো নির্দিষ্ট কোনো দিনকে অশুভ মনে করা।

জাহিলি যুগে শাওয়াল মাসে বিবাহ করা অশুভ মনে করা হতো। কোনো এক শাওয়ালের মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে অনেক নববধুর মৃত্যু ঘটে। তখন থেকেই জাহিলি যুগের লোকেরা এই মাসকে অশুভ ভাবতে শুরু করে। ইসলাম এই মন্দরীতির অবসান ঘটায়।

আয়িশা বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে শাওয়াল মাসে বিয়ে করেছেন এবং শাওয়াল মাসে আমার সাথে তাঁর বাসর হয়। রাসূলের কোন স্ত্রী আমার চেয়ে বেশি ভাগ্যবান ছিলেন?' আয়িশা তাঁর বংশের মেয়েদেরকে শাওয়াল মাসে বাসরঘরে পাঠানো পছন্দ করতেন।

মোটকথা, অশুভ বা খারাবি তো শুধু আল্লাহর নাফরমানি ও গুনাহের মধ্যে। এটা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। আর যে বান্দার প্রতি আল্লাহ নারাজ হন, উভয় জগতে সে চূড়ান্ত হতভাগা। বিপরীতে আল্লাহ যার ওপর সন্তুষ্ট, সে তো দোজাহানে কামিয়াব।

জনৈক বুযুর্গের কাছে লোকেরা বিপদের অভিযোগ করল। তিনি তখন বললেন, 'আমার মনে হয়, তোমাদের এ দুর্দশা তোমাদের গুনাহের অশুভ প্রভাবের কারণেই হয়েছে।'

আবূ হাযিম বলেছেন, 'পরিবার-পরিজন, ধনসম্পদ বা অন্যকিছু—যে জিনিসই মানুষকে আল্লাহবিমুখ করে তোলে, সেটাই অশুভ।'

সুতরাং গুনাহ আর অবাধ্যতাই হলো প্রকৃত খারাবি। বিপরীতে, আল্লাহর আনুগত্য আর তাকওয়াই হলো সাফল্য। নাফরমানি এমন এক সংক্রামক ব্যাধি, যার কাছাকাছি হলে ধ্বংস সুনিশ্চিত। যে ব্যক্তি নাফরমানির নিকটবর্তী হয়, নাফরমানের সাথে চলাফেরা করে, তার ধ্বংস নিশ্চিত। নাফরমানিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনকারী মানুষ তো শয়তান থেকেও ক্ষতিকর।

জনৈক সালাফ বলেছেন, 'আসল শয়তান তো আউযুবিল্লাহ শুনলেই পালিয়ে যায়। কিন্তু মানব শয়তান নাফরমানিতে লিপ্ত করিয়ে, তবেই ক্ষান্ত হয়।'

নবি বলেছেন, الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ» 'ব্যক্তি তাঁর বন্ধুর রীতি-নীতির অনুসরণ করে থাকে। কাজেই তোমাদের দেখা উচিত, কার সাথে বন্ধুত্ব করছ। [১২৮]

নবি ﷺ আরও বলেছেন,
لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا، وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ ‘মু’মিন ছাড়া অন্য কারো সাথী হয়ো না। আর মুত্তাক্বী ছাড়া অন্য কেউ যেন তোমার খাবার না খায়।[১২৯]

মোটকথা, গুনাহগার ব্যক্তি নিজের জন্য এবং অপরের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনে। কারণ হতে পারে তার ওপর আল্লাহর এমন কোনো আযাব আসলো, যাতে অন্যরাও আক্রান্ত হবে। বিশেষ করে এমন লোকেরা তো অবশ্যই আক্রান্ত হবে, যারা তার কাজকে অপছন্দ করেনি। এ কারণেই তার থেকে দূরত্ব অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। কারণ অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে মানুষ সাধারণত ধ্বংস হয়ে যায়।

তদ্রূপ নাফরমানি এবং শাস্তির স্থান থেকে দূরে অবলম্বন করা এবং আযাব আসার ভয়ে সেখান থেকে দ্রুত সরে যাওয়া আবশ্যক। সামুদ জাতির অঞ্চল হিজর নামক স্থান অতিক্রম করার সময় নবিজি ﷺ সাহাবিদের বলেছিলেন,
لَا تَدْخُلُوا عَلَى هَؤُلَاءِ الْمُعَذَّبِينَ إِلَّا أَنْ تَكُونُوا بَاكِينَ، فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا بَاكِينَ، لَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِمْ؛ لَا يُصِيبُكُمْ مَا أَصَابَهُمْ ‘তোমরা এসব আযাবপ্রাপ্ত কওমের লোকালয়ে কাঁদতে কাঁদতে অবস্থাতে প্রবেশ করো। কান্না না এলে সেখানে প্রবেশ করা হতে বিরত থেকো। যাতে তাদের ওপর আপতিত হওয়া আযাব, তোমাদের ওপর না আসে।[১৩০]

একশজন লোককে হত্যা করেছিল বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তি। এক আলিমের কাছে সে জানতে চাইল, তার তাওবার কোনো সুযোগ আছে কি না। আলিমটি তখন হ্যাঁ-বাচক উত্তর দিয়ে লোকটিকে মন্দ এলাকা ছেড়ে উত্তম এলাকাতে চলে যেতে বললেন। পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়ে গেল। আযাব এবং রহমত উভয় দলের ফেরেশতারা তাকে নিয়ে যেতে উপস্থিত হলেন। আল্লাহ তাআলা তখন লোকটির মৃতদেহকে উত্তম এলাকার দিকে দুটির মেপে দেখতে বললেন। মাপলে দেখা গেল, উত্তম এলাকার দিকে সে একটু বেশি এগিয়ে রয়েছে। তখন তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।[১২১]

নাফরমানির স্থান বর্জন করা শারীআ’ কর্তৃক আদিষ্ট হিজরতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় বর্জনকারী ব্যক্তিই প্রকৃত মুহাজির।

ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলেন, ‘তাওবা করতে চাইলে অন্যায়ের স্থান ত্যাগ করতে হবে এবং বর্জন করতে হবে পরিচিতজনদের সঙ্গ। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাসিল হবে না।’

সুতরাং গুনাহ ছাড়ুন। কারণ গুনাহ অমঙ্গলজনক, এর পরিণতি নিন্দনীয় এবং শাস্তি যন্ত্রণাদায়ক। গুনাহের প্রতি আকর্ষণ রাখে এমন অন্তর অসুস্থ। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারা এক বিরাট সুযোগ। এই সুযোগ অমূল্য। গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়া, বিশেষ করে যদি সেটা বৃদ্ধ বয়সে হয়, তবে তা বড় রকমের দুর্ঘটনা।

যে ব্যক্তির হৃদয় হারিয়ে গেছে, তার উচিত যিকরের মাজলিসে গিয়ে তা খোঁজ করা। আশা করা যায়—সেখানে পাওয়া যাবে। অসুস্থ অন্তরের চিকিৎসার জন্যও যিকরের মাজলিসে যাওয়া উচিত।

যিকরের মাজলিসগুলো গুনাহের নিরাময়কেন্দ্র। দুনিয়ার হাসপাতালে হয় দৈহিক রোগের চিকিৎসা, আর যিকরের মজলিসে অন্তরের ব্যাধির চিকিৎসা। দুনিয়াবাসীদের দৃষ্টি যেমন খেলাধুলা আর ঘোরাফেরাতে পুলকিত হয়, মুমিনের অন্তর তেমনি হিকমাতপূর্ণ কথায় আনন্দ লাভ করে।

টিকাঃ
[১০৫] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭২৭
[১০৬] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭৭১
[১০৭] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭৭০
[১০৮] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭২৮
[১০৯] সূরা আনফাল, ৪:১০
[১১০] সূরা নিসা, ৪ : ৭৯
[১১১] সূরা শূরা, ৪২: ৩০
[১১২] সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৫৭৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২২২৩
[১১৩] আবূ দাউদ, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৯১৯
[১১৪] তিরমিযি, আসসুনান, হাদীস নং: ৩৩১৬
[১১৫] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৯৯
[১১৬] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৯৯; সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৪৮২৯; আয়াতটি সূরা আহকাফ, ৪৬: ২৪
[১১৭] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৮৮৭
[১২১] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭৬৬
[১২৮] আবু দাউদ, আসসুনান, হাদিস নং : ৪৮৩৩; তিরমিযি, আসসুনান, হাদিস নং : ২৩৯৫
[১২৯] আবু দাউদ, আসসুনান, হাদিস নং : ৪৮৩৪; তিরমিযি, আসসুনান, হাদিস নং : ২৩৯৭
[১৩০] সহীহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৩৩০; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৯১০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00