📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 মাহে শাওয়াল

📄 মাহে শাওয়াল


হজের প্রধান মাসসমূহের মধ্যে শাওয়াল একটি মহিমান্বিত মাস। এটিকে ফিতরের মাস বলা হয়। এ-মাসে ঈদ ও গোনাহ মাফের দিন রয়েছে। হাদীসে এসেছে,

হযরত আনস (ইবনে মালিক) থেকে বর্ণিত, ইন্নাহু কানা ইয়াওমাল ইদি বাহাল্লাহু তাআলা... ঈদের দিন আসলে আল্লাহ তাআলা নিজের সৎ বান্দাদের নিয়ে গর্বভরে ফেরেশতাদের বলেন, 'হে ফেরেশতা! সেসব শ্রমিকের প্রতিদান কী হওয়া উচিৎ, যে তার কাজ পুরো করে'? তারা বললেন, 'হে প্রভু! তাদের প্রতিদান হলো তাদের পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দেওয়া।' আল্লাহ বলেন, 'হে ফেরেশতারা! আমার এসব বান্দা ও গোলামদের প্রতিদান কী দেওয়া যেতে পারে যারা আমার ফরয যা তাদের ওপর দায়িত্ব ছিলো পালন করছে, অতঃপর বের হয়ে আমার কাছে ডেকে ডেকে দুআ করছে। আমার সম্মান, আমার প্রতাপ, আমার মর্যাদা, আমার পরাক্রম ও উচ্চাসনের শপথ! আমি তাঁদের প্রার্থনা কবুল করে নেবো।' তিনি আরও বলেন, 'ফিরে যাও! তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম, তোমাদের পাপকে পুণ্য দ্বারা বদলে দিলাম। (হযরত আনাস ইবনে মালিক) বলেন, সত্যিই তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে। হাদীসটি ইমাম আল-বায়হাকী শুআবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।[1]

ঈদের দিন ঈদগাহে রওয়ানা হবার পূর্বে কিছু খেয়ে নেওয়া সুন্নত। হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বেজোড় কয়েকটি খেজুর খেয়ে নিতেন। হযরত আনাস (ইবনে মালিক) থেকে ইমাম আল-বুখারী-এর বর্ণনা এ-রকম এসেছে।[2] ইমাম আল-হাকিম বর্ণনা করেন হযরত ওতবা ইবনে হুমায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি (নবী করীম ﷺ) ৩ বা ৫ বা ৭টি কিংবা কম-বেশি খেজুর খেতেন।[3]

মুহাদ্দিসগণ বলেন, খেজুর খাওয়া মুস্তাহাব—এর হিকমত হলো খেজুর মিষ্টান্ন জিনিস। আর মিষ্টি সিয়াম পালনে দুর্বল দৃষ্টিকে শক্তিশালী করে। তা ছাড়া শিন্নি আত্মাকে কোমল করে এবং বিশ্বাসবদ্ধ মস্তিস্কের জন্য খুব উপাদেয়। এজন্য বলা হয়, মুমিনরা মিষ্টভাষী। যদি কেউ শিন্নি খেতে স্বপ্নে দেখে তবে তার ব্যাখ্যা হলো সে শিগগিরই ঈমানের স্বাদ ভোগ করবে। সে কারণে মধু ও খেজুরের ন্যায় শিন্নি দিয়েও ইফতার করা উত্তম। যদিও খেজুরে পুষ্টিগুণ পর্যাপ্ত বিশেষত মদীনার খেজুরে। উপর্যুক্ত আলোচনার সারকথা হলো ৩ বা ৫ কিংবা ৭টি খেজুর খেয়েই ঈদগাহে যাবে।

এ-মাসের বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ছয় দিনের সিয়াম পালন। ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহে বর্ণনা করেছেন: হযরত আবু আইয়ুব আল-আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, 'যে-ব্যক্তি রমযানে সিয়াম পালন করলো, অতঃপর শাওয়ালের ছয় তার অনুকরণ করলো, সে তো পুরো জীবন সিয়াম পালন করলো।[4] যদি সে পুরো জীবন এ-ধরনের সিয়াম পালন করে সে-ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। আর যদি সে একমাসেই মাত্র সিয়াম পালন করে তবে তা এক বছর সিয়াম পালনের ন্যায় হবে। এ-অর্থেই হযরত সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন।[5]

অন্য একটি বর্ণনায় 'ছুম্মা' (অতঃপর) সহকারে এসেছে। তাই এখানে প্রকৃত ধারাবাহিকতা উদ্দেশ্য নয়। কারণ এতে ঈদের দিনও সিয়াম পালন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অতএব মাসের প্রথম ও শেষ দিকে সিয়াম পালন করলেও সুষ্ঠু হবে। ইমাম আশ-শাফিয়ী-এর কাছে পছন্দসই হলো মাসের প্রথম থেকে লাগাতার পালন করা। আমাদের মতে সাধারণভাবে পালিত হবে। ইমাম আহমদ (ইবনে হাম্বল)-এর মতও অনুরূপ। বরং তাঁরা বলেছেন যে, আমাদের মতে তা মাকরুহ হওয়া এবং খ্রিস্টানদের সাথে সামঞ্জস্য হওয়া থেকে অনেক দূরে।

দুই ঈদের দিন গোসল করা সুন্নত বলে ফকীহগণ মত ব্যক্ত করেছেন। সম্মিলন হিসেবে জুমুআর ওপর কিয়াস করে এটি প্রমাণের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে হযরত ফাকিহ ইবনে সা'দ থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে—যিনি নবী করীম ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তবে এই হাদীসটি ছাড়া তাঁর ব্যাপারে আর কিছু জানা যায় না—তিনি বলেন, 'কানা রাসূলুল্লাহ ﷺ ইয়াগতাসিলু ইয়াওমাল ফিতরি... হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতর-দিবস, আযহা-দিবস ও আরাফা-দিবসে গোসল করতেন। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে[6], ইমাম আত-তাবারানী রচিত মু'জামুল (কবীরে)[7], ইমাম আল-বাযযার তাঁর মুসনদে বর্ণনা করেছেন এমনটি।

ইমাম আস-সুযুতী জামউল জাওয়ামি'য়ে বর্ণনা করেছেন যিয়াদ ইবনে আয়ায আল-আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি একদল লোক সম্পর্কে বলেন, তাদের প্রত্যেকে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যা করতে দেখেছি তার সবই পালন করতে দেখেছি কিন্তু তাদের কেউ দু'ঈদে গোসল করতেন না।[8] ছয় বিশিষ্ট কিতাবে হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর-এর একটি আমল ছাড়া এ-ধরনের কোনো হাদীস পাওয়া যায় না: 'আন্নাহু কানা ইয়াগতাসিলু ইয়াওমাল ফিতরি... তিনি ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।'[9] মুহাদ্দিসবর্গ বলেন, হযরত ওমর (ইবনুল খাত্তাব) নবী করীম ﷺ-এর সুন্নাতের কঠোর অনুসারী। এজন্য হাদীসটি বিশুদ্ধ বলে দাবি রাখে।

ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর পড়া তিন বিশিষ্ট ইমামের মতে, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ-এর মতে সুন্নত। তবে ইমাম আবু হানিফা-এর মতে এটি ঈদ আল-আযহার সুন্নাত, ফিতরের নয়। উচ্চৈঃস্বরে পড়ার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে। যদি অনুচ্চ স্বরে তাকবীর পড়া হয় তবে তাই ভালো। আর আল্লাহর স্মরণ সর্বসময়েই মুস্তাহাব। বলাবাহুল্য আমাদের বোঝা হয়ে গেলো যে, মতপার্থক্য মূল তাকবীরকে কেন্দ্র করে। অবশ্য ইমাম আবু হানিফা থেকে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর পড়ার বিষয়টিও বর্ণিত হয়েছে।[10]

ইমামবর্গ ইমাম আদ-দারাকুতনী কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীর পড়তেন।[11] ইমাম আবু জাফর বলেন, সাধারণ মানুষকে তাকবীর পড়তে বারণ না করা উচিৎ। কেননা তাদের ভালো কাজে উৎসাহ কম।

ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করা সুন্নাত: বেরুবে এক রাস্তা দিয়ে এবং ফিরে আসবে অন্য রাস্তা দিয়ে। ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ﷺ ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করতেন।[12] ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আদ-দারিমী বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের দিন এক পথে যেতেন, অন্য পথে ফিরতেন।[13] আলিমরা বলেছেন যে, এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক দূরদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম-রহস্য রয়েছে।

রইলো ঈদের সালাতের আগে-পরে সালাত পড়ার বিধানের আলোচনা; এ-বিষয়ে লোকদের অবগত করা দরকার। ইমাম আল-বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন যে, হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের দিন বের হন, অতঃপর দু'রাকাআত সালাত আদায় করেন, তবে তার পূর্বাপর কোনো সালাত আদায় করেননি।[14] ইমাম আত-তিরমিযী বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবু সাঈদ (আল-খুদরী)-এর বর্ণনা মতে, নবী করীম ﷺ-এর অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ সাহাবা এবং তাঁদের পরবর্তী অধিকাংশ আলিম এর ওপর আমল করতেন।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব আল-বারকীর ব্যাখ্যায় বলেছেন, হযরত আলী হযরত আবু মাসউদ আল-আনসারী-কে লোকজনের ওপর স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেন, অতঃপর তিনি ঈদের দিবসে বেরুলেন এবং বললেন, হে লোকসকল! নিশ্চয় ইমামের আগে কোনো সালাত আদায় সুন্নাত নয়।[15] এটি ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন।[16]

এ-নিষেধাজ্ঞা কি শুধু ঈদগাহের সাথে সম্পৃক্ত, নাকি ঈদগাহ ও সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য—এ নিয়েও মতভেদ আছে। অনেকে বলেছেন, যদি ঈদগাহ ব্যতীত অন্যত্র সালাত আদায় করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। বর্ণিত আছে হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের সালাতের পূর্বে কোনো সালাত আদায় করতেন না। ঘরে ফিরে দু'রাকাআত সালাত আদায় করতেন।[17] ফাতাওয়া হিদায়ায় আছে, ঈদগাহে ঈদের সালাতের পূর্বে নফল পড়া যাবে না।

অতঃপর জেনে রাখুন! ছুটে যাওয়া ঈদের সালাত নিয়ে আলিমদের মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানিফা-এর স্পষ্ট মাযহাব হলো, ঈদের সালাতের কোনো কাযা নেই। হিদায়ার কতিপয় ব্যাখ্যাগ্রন্থে আছে, যুহার সালাতের মতো ইচ্ছে মাফিক দুই বা চার রাকাআত সালাত পড়ে নেবে। আল-মুহীত ও ফাতাওয়া কাযীখানে আছে, সর্বোত্তম হলো চার রাকাআত পড়ে নেবে এতে তার যুহার সালাত আদায় হয়ে যাবে।[18] যেমন- হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'মান ফাতাহু সালাতুল ইদি... যে-ব্যক্তির ঈদের সালাত ছুটে যায় সে চার রাকাআত সালাত পড়ে নেবে।'[19] আর এর প্রথম রাকাআতে সুরা আল-আলা, দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা আশ-শামস, তৃতীয় রাকাআতে সুরা আল-লায়ল এবং চতুর্থ রাকাআতে সুরা আয-যুহা পড়বে।

ইমাম আবু হানিফা-এর মতে তার ইখতিয়ার আছে, ইচ্ছে করলে পড়বে, ইচ্ছে করলে পড়বে না। এই অবস্থায় দুই কিংবা চার রাকাআত সালাত আদায়ের ইখতিয়ার আছে তার। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।[20]

টিকাঃ
[1] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, খ. ৫, পৃ. ২৯০, হাদীস: ৩৪৪৪
[2] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ১৭, হাদীসঃ ৯৫৩ (আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কয়েকটি খেজুর খেতেন)
[3] আল-হাকিম, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৩৩, হাদীস: ১০৯০
[4] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৮২২, হাদীস: ২০৪ (১১৬৪)
[5] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৫৪৭, হাদীস: ১৭১৫ (সাওবান থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রসুল ইরশাদ করেছেন, 'ঈদুল ফিতরের পর ছয়দিন সিয়াম পালন করে তা পুরো বছরের সিয়াম পালনের ন্যায় হবে')
[6] ইবনে মাজাহ, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪১৭, হাদীসঃ ১৩১৬
[7] আত-তাবারানী, আস-মু'জামুল আওসাত, খ. ৭, পৃ. ১৮৬, হাদীস: ৭২৩০
[8] ইবনে আসাকির, তারিখু দামিশক, খ. ৪৭, পৃ. ২৫১-২৫২, হাদীস: ৫৪৮৪
[9] মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, খ. ২, পৃ. ২৪৮, হাদীস: ৬০৯
[10] ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ. ২. পৃ. ৭২
[11] আদ-দারাকুতনী, আস-সুনান, খ. ২. পৃ. ৩৮০, হাদীস: ১৭১৪
[12] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ২৩, হাদীস: ৯৮৬
[13] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ২, পৃ. ৪২৪, হাদীস : ৫৩৭
[14] (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ খ. ২. পৃ. ২৪, হাদীস: ৯৮৯; (খ) মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৬০৬, হাদীস: ১৩ (৮৮৪)
[15] আয-যারকাশী, খ. ২. পৃ. ২০১, হাদীস। ১০৪
[16] আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৩, পৃ. ১৮১, হাদীস। ১৫৬১
[17] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, খ. ১, পৃ. ৪১০, হাদীস: ১২৯৩
[18] কাযী খান, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৮৪
[19] ইবনে মাজা, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১১২
[20] আদ-দুলাবী, আল-কুনা ওয়াল আসমা, খ. ২, পৃ. ২৩

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 মাহে যিলহজ্জ

📄 মাহে যিলহজ্জ


عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: (مَا مِنْ أَيَّامِ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ».
'হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'দিনসমূহে এমন কোনো সময় নেই; যার অসংখ্য পূণ্যকর্ম আল্লাহর দরবারে দশই যুল হজের থেকে বেশি পছন্দের।' সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি সমান প্রিয় নয়?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে-ব্যক্তি জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তার জিহাদে গিয়ে সেখান থেকে কিছু না নিয়ে ফেরে সে অবশ্য প্রিয়।' হাদীসটি ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন।[1]

ইমাম ইবনে আওয়ানা-এর সহীহে ও ইমাম ইবনে হিব্বান-এর সহীহে বর্ণিত এসেছে, হযরত জাবির (ইবনে আবদুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, দশই যুল হজের চেয়ে উত্তম কোনো দিন নেই।[2] আলিমরা বলেন, যে-ব্যক্তি বছরের উত্তম দিনসমূহে সিয়াম পালনের মান্নত করে তাহলে এ দশদিনই এর উদ্দেশ্যে হবে। মজার ব্যাপার হলো, এ-দশদিন ফযীলতপূর্ণ হয়েছে এতে আরাফা-দিবস আছে বিধায়। আর রামাযানের দশরাত ফযীলতপূর্ণ হয়েছে সেখানে কদর-রজনী থাকার কারণে।

বাস্তব ব্যাপার হলো, যুল হজের প্রথম দশক তথা নয়টি দিনে সিয়াম পালন এবং এর ফযীলত ও মুস্তাহাব বিষয়েও অনেক হাদীস রয়েছে। ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম আন-নাসায়ী বর্ণনা করেছেন নবী করীম ﷺ-এর কোনো কোনো সহধর্মিনী থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ যুল হজের নয় দিন, আশুরা-দিবস, প্রতি মাসে তিন তিনটি এবং প্রথম সোমবার ও প্রথম বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করতেন।[3]

আর ইমাম মুসলিম, ইমাম আত-তিরমিযী ও ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন হযরত আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মা রাইতু রাসূলুল্লাহ ﷺ সায়িমান ফিল আশরি ক্বাত্তু... আমি কখনো হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দশই যুল হজে সিয়াম পালন করতে দেখিনি।'[4] এ-বর্ণনাটি উপর্যুক্ত হাদীসসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। হয়তো হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সিয়াম পালন সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

কিছু সুন্নাত আছে যা মানুষ একদম ছেড়ে দিয়েছে। যে-ব্যক্তি ফরয হোক বা নফল কুরবানির ইচ্ছা করে তার জন্য কুরবানি না দেওয়া পর্যন্ত চুল-নখ কাটা উচিত নয়। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন হযরত উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ বলেন, '(যুল হজের) প্রথম দশক শুরু হয়, তখন যদি তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করে থাকে তাহলে সে চুল-নখের কিছুই কাটবে না।'[5] অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'ফল ইয়াক্লিমিন্না জুফুরা... সে নখ কাটবে না।'[6]

সর্বোত্তম আরাফা, না জুমুআ বার—তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, আরাফা বছরের দিনসমূহের মধ্যে উত্তম আর জুমুআ সপ্তাহের দিনসমূহের মধ্যে উত্তম। আরাফা-দিবসে সিয়াম পালন; সার্বজনীন মতানুযায়ী আরাফা-দিবসে সিয়াম পালন সুন্নাত। হযরত উম্মুল ফযল বিনতুল হারিস থেকে বর্ণিত, আরাফা-দিবসে কিছু লোক তাঁর কাছে হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সিয়াম পালনের ব্যাপারে কথা কাটাকাটি করছিলো। অতঃপর তিনি এক পিয়ালা দুধ পাঠিয়েছিলেন, সে সময় তিনি উটের ওপর সওয়ার ছিলেন এবং তিনি তা পান করলেন।[7]

হযরত (আবদুল্লাহ) ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, 'আমি নবী করীম ﷺ-এর সাথে হজ করেছি। তিনি এ-দিন অর্থাৎ আরাফা-দিবসে সিয়াম পালন করতেন না। হযরত আবু বকর-এর সাথেও হজ করেছি, তিনিও এ-দিন সিয়াম পালন করতেন না।' অধিকাংশ আলিমদের মতে সশক্তিতে প্রার্থনা করার জন্য আরাফা-দিবসে সিয়াম পালন না করা মুস্তাহাব।[8]

আরাফা-দিবসের ফযীলত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে, 'ইন্নাহু ইউকাফফিরাছ সানাতাল্লাতি বাদাহু ওয়াল্লাতি ক্ববলাহু... নিশ্চয় দিবসটি বিগত একবছর ও আগামী এক বছরের গোনাহ মার্জনা করে দেবে।'[9] সঠিক মতে আরাফা-দিবসে সিয়াম পালন মুস্তাহাব তবে হাজিদের জন্য নয়।

কিছু কিছু লোক বিভিন্ন দেশে আরাফা-দিবসের বিশেষ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। অনেক হানাফী আলেমরা উল্লেখ করেছেন যে, 'আন্নাত তারিফা... আত-তারিফ (আরাফা-দিবসের বিশেষ কর্মকাণ্ড) বলতে, আরাফায় অবস্থানকারীদের সাথে সাদৃশ্য রেখে আরাফা-দিবসে বিভিন্ন স্থানে লোকজন সমবেত হওয়া। এসব ভিত্তিহীন।'[10] অবশ্য এর দ্বারা শরীয়া-সম্মত অন্যান্য ইবাদতও নিষিদ্ধ নয়। তবে এসবকে ওয়াজিব বা সুন্নাত মনে করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

টিকাঃ
[1] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ২০, হাদীস: ৯৬৯
[2] আবু আওয়ানা, আল-মুসতাখরাজ, খ. ২, পৃ. ২৪৬
[3] আবু দাউদ, আস-সুনান, খ. ২, পৃ. ৩২৫, হাদীস: ২৪৩৭; (খ) আন-নাসায়ী, আল-মুজতাবা মিনাস সুনান, খ. ৪, পৃ. ২২০, হাদীস: ২৩১৭
[4] মুসলিম, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ৮৩৩, হাদীস: ৯ (১১৮৬)
[5] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৫৬৫, হাদীস: ৩৯ (১৯৭৭)
[6] মুসলিম, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৫৬৫, হাদীস: ৪০ (১৯৭৭)
[7] আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ১৬২, হাদীস: ১৬৬১
[8] আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর, খ. ৩, পৃ. ১১৫-১১৬, হাদীস: ৭৫০
[9] আত-তিরমিযী, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১১৫, হাদীস: ৭৪৯
[10] আল-মারগীনানী, আল-হিদায়া, খ. ১, পৃ. ৮৬

📘 জীবনের সময়চিত্রে পবিত্র সুন্নাহ 📄 তথ্যপঞ্জি

📄 তথ্যপঞ্জি


তথ্যাবলি

১. আল-কুরআন
২. আল-আইনী : বদরুদ্দীন মাহমুদ আল-আইনী, আল-বিনায়া শরহুল হিদায়া, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া।
৩. আল-আজুরী : মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আল-আজুরী, আশ-শরীআ, দারুল ওয়াতান।
৪. আল-আজলুনী : ইসমাঈল আল-আজলুনী, কাশফুল খিফা, মাকতাবাতুল কুদসী।
৫. আবদ ইবনে হুমায়দ : আল-মুনতাখাব মিন মুসনদি আবদ ইবনি হুমায়দ, মাকতাবাতুস সুন্না।
৬. আবদুর রাযযাক আস-সানআনী: আল-মুসান্নাফ, আল-মাকতাবুল ইসলামী।
৭. আব্দুর রহমান আল-মুবারকপুরী: তুহফাতুল আহওয়াযী, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া।
৮. আবু আওয়ানা : ইয়াকূব আন-নায়শাপুরী, আল-মুসতাখরাজ, দারুল মা'রিফা।
৯. আবু ইয়া'লা আল-মুসিলী : আল-মুসনদ, দারুল মামুন লিত-তুরাস।
১০. আবু তালিব আল-মক্কী : কুয়াতুল কুলুব, দারুল কুতুব আল-ইলনিয়া।
১১. আবু দাউদ : সুলায়মান আল-আযদী আস-সিলিসতানী, আস-সুনান, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়া।
১২. আবু নুআইম আল-আসবাহানী: দালায়িলুন নুবুওয়াত, দারুন নাফায়িস।
১৩. আবু মুসহির আল-গাস্সানী: আন-নুসবা, দারুস সাহাবা।
১৪. আবু শামা আল-মাকদিসী : আল-বায়িস আলা ইনকারিল বিদয়ি ওয়াল হাওয়াদিস, দারুণ হুদা।
১৫. আবুর রবী আন-কালায়ী : আল-ইকতিফা, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া।
১৬. আলাউদ্দীন মুগলতায়ী : মুখতাসারুন সিরাতিন নাবাওরিয়া, দারুল মাআরিফ।
১৭. মোল্লা আলী আল-কারী: মিরকাতুল মাফাতীহ শরহ মিশকাতিল মাসাবীহ, দারুল ফিকর।
১৮. আলী আল-মুত্তাকী : কনযুল উম্মাল, মুআস্সাসাতুর রিসালা।
১৯. আবুদুদ্দীন আল-ইজী : আল-মাওয়াকিফ, দারুল জলীল।
২০. কাযী আয়ায : আশ-শিকা বি তারিকি হকুকিল মুস্তাফা, দারুল ফিকর।
২১. আহমদ ইবনে হাম্বল : আল-মুসনদ, মুআসিসাতুর রিসালা।
২২. আল-ইরাকী : আত-তাওয়াসসাআতু আলাল ইয়াল।
২৩. আল-ইমরানী : আল-বায়ান ফী মাযহাবিল ইমাম আশ-শাফিয়ী, দার আল-মিনহাজ।
২৪. আল-ইয়াফিয়ী : মিরআতুল জিনান, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া।
২৫. ইবনুন নাজ্জার : আদ-দিরাতুস সমীনা ফী আখবারিল মদীনা।
২৬. ইবনুল আরাবী : আল-মাসালিকু ফী শরহি মুওয়াত্তা মালিক, মাকতাবা দারুল ইসলাম।
২৭. ইবনুল আসীর : জামিউল উসূল ফী আহাদীসির রাসূল।
২৮. ইবনুল জওযী : আল-মাওদুআত, আল-মাকতাবাতুস সলফিয়া।
২৯. ইবনুল হাজ : আল-মাদখাল, দারুল ফিকর।
৩০. ইবনুস সালাহ : মারিফাতু আনওয়ায়ি উলুমিল হাদীস।
৩১. ইবনুন সুন্নী : আমলুল ইয়াওমি ওয়াল লায়ল, দারুল কিবলা।
৩২. ইবনুল হুমাম : ফতহুল কদীর শরহুল হিদায়া, দারুল ফিকর।
৩৩. ইবনে আবদুল বার : আল-ইসতিযকার, দারুল কুতুব আল-ইলনিয়া।
৩৪. ইবনে আবু শায়বা : আল-মুসান্নাক ফিল আহাদীস ওয়াল আসার, মাকতাবাতুর রাশাদ।
৩৫. ইবনে আবু হাতিম আর-রাযী : তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, মাকতাবাতু নিযার মুস্তাফা।
৩৬. ইবনে আবিদীন : রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার।
৩৭. ইবনে আসাকির : ইত্তিহাফুয যায়ির ওয়া ইতরাফুল মুকিম।
৩৮. ইবনে ইরাক : তানযীহুশ শরীআ, দারু আল-কুতুব আল-ইলমিয়া।
৩৯. ইবনে ইসহাক : আস-সিয়ার ওয়াল মাগাযী, দারুল ফিকর।
৪০. ইবনে কসীর : আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দারু ইয়াহইয়া।
৪১. ইবনে কাইয়িম আল-জওযিয়া: তুহফাতুল মাওদুদ বি-আহকামিল মাওলুদ।
৪২. ইবনে কানি' : মু'জামুস সাহাবা, মাকতাবাতুন গুরাবা।
৪৩. ইবনে খুযায়মা : আস-সহীহ, আল-মাকতাবুল ইসলামী।
৪৪. ইবনে মাসউদ : হাদীস সঙ্কলন।
৪৫. ইবনে মাযা : আল-মুহীতুল বুরহানী ফিল ফিকহিন নু'মানী।
৪৬. ইবনে রজব আল-হাম্বলী: লাতায়িফুল মাআরিফ।
৪৭. ইবনে শাহীন : নাসিখুল হাদীস ওয়াল মনসুখাহ।
৪৮. ইবনে সাইয়িদুন নাস : উয়ুনুল আসর ফিল মাগাযী।
৪৯. ইবনে সা'দ : আত-তাবাকাতুল কুবরা, মাকতাবাতুল খানজী।
৫০. ইবনে হাজর আল-হায়সামী: আল-ফাতাওয়া আল-হাদীসিয়া, দারুল ফিকর।
৫১. ইবনে হাজর আল-আসকলানী: ফতহুল বারী শরহু সহীহ আল-বুখারী।
৫২. ইবনে হিব্বান : আস-সহীহ, মুআসিসাতুর রিসালা।
৫৩. ইবনে হিশাম : আস-সীরাতুন্নাবাবিয়া।
৫৪. ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ: আল-মুসনদ, মাকতাবাতুল ঈমান।
৫৫. ইয়াকুত আল-হামাওয়ী : মু'জামুল বুলদান, দারু সাদির।
৫৬. আল-কাস্তাল্লানী : আল-মাওয়াহিবুল লাদুনিয়া, আল-মাকতাবা আত-তাওফীকিয়া।
৫৭. আল-কাসানী : বাদায়িউস সানাই, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া।
৫৮. কাযী খান : আল-ফাতাওয়া আল-খানিয়া।
৫৯. আল-খতীবুল বগদাদী : তারিখু বগদাদ, দারুল গারব আল-ইসলামী।
৬০. আল-বায়হাকী : শুআবুল ঈমান, মাকতাবাতুর রাশাদ।
৬১. আল-বাযযার : আল-বাহরুয যাম্বার, মকতব্যতুল উলুম ওয়াল হাকাম।
৬২. আল-বুখারী : সহীহ আল-বুখারী, দারু তওকিন নাজাত।
৬৩. আল-মাযিরী : আল-মুলিম বি-কাওয়ায়িদি মুসলিম।
৬৪. আল-মুতাররিযী : আল-মুগরিব কী তারতীবিল মুরীব।
৬৫. মালিক ইবনে আনাস : আল-মুওয়াত্তা, যায়দ ইবনে সুলতান আলে নাহিয়ান ফাউন্ডেশন।
৬৬. মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী: আল-জামিই'উস সগীর।
৬৭. মুহিব্বুদ্দীন আত-তাবারী : আর-রিয়াযুন নাযরা।
৬৮. মুসলিম : সহীহ মুসলিম, দারু ইয়াহইয়ায়িত তুরাস।
৬৯. আয-যারকাশী : সিয়ারু আলামিন নুবালা।
৭০. আর-রাফিয়ী : আত-তাদওরীন ফী আখবারি কাযওয়ীন।
৭১. আস-সাখাওয়ী : আল-মাকাসিদুল হাসানা।
৭২. আস-সামহুদী : ওয়াফাউল ওয়াফা বি-আখবারি দারিল মুস্তাফা।
৭৩. আস-সুযুতী : তারিখুল খুলাফা, মাকতাবাতু নিযার মুস্তাফা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px